ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ মাঘ ১৪২০, ২৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৫, ৩১ জানুয়ারি ২০১৪

নরেন্দ্র মোদি

আবদুর রহমান মল্লিক
আমাদের কাছে অতি পরিচিত প্রবাদ ‘নিজের চরকায় তেল দাও’। অর্থাৎ অন্যের কাজে মন না দিয়ে নিজের কাজে মন দাও। কারণে অকারণে অন্যের কাজে নাক গলানো, আলোচনা সমালোচনা কাম্য নয়। আবার একথাও ঠিক যে তেল দেয়া যার স্বভাব সে চরকা পেলেই তেল দেয়। সে ক্ষেত্রে মাত্রা জ্ঞানের বিষয়টিও অবান্তর। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। দেশটির সকল বিষয় নিয়ে অতি আগ্রহ ভারতের। বাংলাদেশে কথিত মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা ও মাথাব্যথার শেষ নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এটা ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের সমস্যা, বাংলাদেশের নয়। আর বিশ্ববাসী জানে, সাম্প্রদায়িক সংঘাতের বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি করেছে ভারতই। সেখানে হিন্দু ধর্মভিত্তিক ৩৭টি দল তৎপর রয়েছে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক পরিচয় নিয়েই। বিপরীতে বরাবরই সম্প্রীতির দেশ হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

একটি মুসলিম প্রধান দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে আপত্তি তোলার এবং এনিয়ে রাজনৈতিক মাঠ গরম করার প্রবণতা কেবল বাংলাদেশেই দেখা যায়। অথচ সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপে দেশ ভারতে হিন্দু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলই রয়েছে কমপে ৩৭টি। এর মধ্যে ১০টি সর্বভারতীয় ভিত্তিতে এবং ১০টি আঞ্চলিক দল হিসেবে কর্মতৎপর বলে জানা গেছে। ভারতের সংবিধানে ধর্মনিরপেতা থাকলেও এসব রাজনৈতিক দল বৈধভাবেই কাজ করছে। সর্বভারতীয় হিন্দু ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে, অল ইন্ডিয়া হিন্দু মহাসভা, অখিল ভারত হিন্দু মহাসভা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, হিন্দু জনজাগ্রুতি সমিতি, অখিল ভারতীয় হিন্দু শক্তি দল, অখিল ভারতীয় জন সংঘ, অখিল ভারতীয় রাম রাজ্য পরিষদ, অখিল ভারতীয় শিবসেনা রাষ্ট্রবাদী, অখন্ড হিন্দুস্তান মোর্চা, আপনা হিন্দু রামভক্ত পার্টি, আর্যসভা, ভারতীয় হিন্দু সেনা, ভারতীয় জনশক্তি, ভারতীয় স্বদেশী সংঘ, হিন্দু একতা আন্দোলন পার্টি, হিন্দু প্রজা পার্টি, হিন্দু সমাজ পার্টি, হিন্দু শিবসেনা, হিন্দু স্বরাজ সংগঠন, রাষ্ট্রীয় হিন্দু সংগঠন, রাষ্ট্রীয় হিন্দু মোর্চা, রাম রাজ্য মার্গ, রাম সেনা রাষ্ট্রবাদী, সমরাথ ভারত, শিব রাজ্য পার্টি, শিবসেনা প্রভৃতি। অন্যদিকে, আঞ্চলিক হিন্দুবাদী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে, অসম ভারতীয় জনতা পার্টি, নিখিল মনিপুরি হিন্দু মহাসভা, হিন্দু মুন্নানি (তামিলনাড়–), হিন্দু মাক্কাল কাচ্চি (তামিলনাড়–), জনতা পার্টি (দণি ভারত ও মহারাষ্ট্র), তামিলনাড়– হিন্দু ভেলালার ইয়থ কাজাঘাম, শ্রী রাম সেনা (কর্ণাটক), ভারতীয় জন পাকসাম (কেরালা), সনাতন প্রভাত (মহারাষ্ট্র ও কেরালা), হিন্দু সংহতি (পশ্চিমবঙ্গ) প্রভৃতি। এসব দলের আরএসএস-এর মতো কোনো কোনো দলের আধাসামরিক বাহিনীর মত বাহিনী রয়েছে। এসব দল প্রধানতঃ ভারতকে একটি হিন্দু দেশে পরিণত করতে কিংবা হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে আন্দোলনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) হিন্দু ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে পরিচয় না দিলেও তারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং তাদের পেছনে শক্তি যোগায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস), শিবসেনা ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (বিএইচপি)। বিজেপি ইতোমধ্যে একবার ভারত শাসন করেছে। আবোরো তারা মতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত বলে আভাস পাওয়া গেছে। এ দলের নেতা হবু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চরম সাম্প্রদায়িক এবং গুজরাট দাঙ্গার নায়ক। এসব দল ভারতে এবং গোটা দুনিয়ায় মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক দল হিসেবেই সুপরিচিত।

সাম্প্রদায়িক সংঘাতের দেশ ভারত

ভারত শুধু মৌলবাদী নয়, তীব্র হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক সামাজিক কাঠামো নিয়ে পরিচালিত হয়। সেখানে প্রতিবছর কোনো না কোনো সংখ্যায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে। এসব দাঙ্গার প্রধান শিকার মুসলিম জনগোষ্ঠী। এর পরে রয়েছে শিখ ও খৃস্টানরা। এছাড়াও নি¤œবর্গের নানা গোষ্ঠী এই দাঙ্গার কবলে পড়ে জানমাল ও সহায়-সম্পদ হারায়। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মুজাফফরনগরে হিন্দু ও মুসলিম দাঙ্গায় দু’দিনে অন্তত ২৬ জন নিহত হয়। দাঙ্গায় উস্কানির জন্য হিন্দুত্ববাদী বিজেপির চারজন সংসদ সদস্য, একজন কংগ্রেস নেতাসহ ৪০ জনের নামে মামলা করা হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্ধে সতর্ক করে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেড়ে গেছে। চলতি বছর (২০১৩) এ পর্যন্ত ৪৫১টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। গত বছর দাঙ্গা হয়েছিল ৪১০টি। ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মূলত সংখ্যালঘু মুসলমানরাই মারা যায়।

ভারতে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক অসংখ্য দাঙ্গার মধ্যে কয়েকটি ঘটনা বড় রকম ত তৈরি করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে ১৯৪৮ সালে হায়দরাবাদে ভারতীয় সৈন্য ও হিন্দুদের আক্রমণে প্রায় ৪০ হাজার মুসলমান নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হয়। ১৯৬৯ সালে গুজরাটে হিন্দুদের আক্রমণে সৃষ্ট দাঙ্গায় ৪৩০ জন মুসলমানসহ ৬৬০ জন নিহত হয়। ১৯৮০ সালে উত্তর প্রদেশে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় নিহত হয় ২৫০০ জন। ১৯৮৩ সালে আসামে একতরফা আক্রমণে নিহত হয় ২ হাজারের বেশি মুসলমান। ১৯৮৪ সালে পাঞ্জাবসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের হামলায় নিহত হয় প্রায় ৪ হাজার শিখ। ১৯৮৯ সালের অক্টোবরে বিহারের ভাগলপুরে ১ হাজারের বেশি মুসলমানকে হত্যা করা হয়। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর থেকে ’৯৩-র জানুয়ারিতে মুম্বাইয়ের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় নিহত হয় ৯০০ জন। এদের অধিকাংশই মুসলমান। কংগ্রেস-বিজেপির যৌথ উগ্রবাদীরা ভারতের বিখ্যাত বাবরী মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনার জের ধরে এই দাঙ্গা ঘটে। ২০০২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গুজরাটের আহমদাবাদে মুসলামানদের ওপর ভয়াবহ আক্রমণে সৃষ্ট দাঙ্গায় ২ হাজারের বেশি লোক নিহত হয়। এদের বেশির ভাগই মুসলমান। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই হত্যাযজ্ঞে ইন্ধন দেন বলে সর্বমহলে বিশ্বাস করা হয়। ২০১২ সালের জুলাইয়ে আসামে হত্যা করা হয় ৭৭ জন মুসলমানকে। অন্যদিকে, ভারতের খৃষ্টান ধর্মের লোকেরাও আক্রমণের শিকার হয়ে থাকে প্রায়শই। এক রিপোর্টে দেখা যায়, ১৯৬৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ৯০টি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে তাদের ওপর। এসব ঘটনায় কোথাও খৃষ্টান পাদ্রিকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। কোথাও চার্চ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সাধারণ আহত করার ঘটনা রয়েছে অনেক।

গুজরাট সহিংসতার নায়ক ভারতের ভাবি প্রধানমন্ত্রী

২০০২ সালে গুজরাটের আহমদাবাদে মুসলামানদের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ চালিয়ে দুই সহস্রাধিক লোককে হত্যার দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারছেন না সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা নরেন্দ্র মোদি। তার হাত ও পুরো শরীরে রক্তের দাগ অমোচনীয় হয়ে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে সেদেশে অবাঞ্ছিত করে রেখেছে। কিন্তু ভারতবাসীর অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস, সেই মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবার খাতায় নাম লিখিয়েছেন। ইতোমধ্যে তাকে ‘ভাবি প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং তার ইমেজ বৃদ্ধির নানা চেষ্টা করা হচ্ছে।

গত বছর সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে বক্তারা বলেন, ‘বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকলেও ভারতে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের কারণে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটে থাকে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সৈয়ন নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত ‘দণি এশিয়ায় মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক ড. তপন দে রোজারিও। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ‘বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে। নাগরিকরা তাদের ইচ্ছেমতো ধর্ম পালন করতে পারে। পান্তরে ভারতে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত হয় এবং সংখ্যালঘুদের সাথে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হয়।’ বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই ভারতেই সেমিনার করে সেখানকার বড় বড় মাথাওয়ালা লোকরা বাংলাদেশে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার সঙ্কট দেখতে পেয়েছে। এটা স্রেফ রাজনীতি। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক মৌলবাদের সহিংসতামুক্ত দেশ হওয়ার কারণ হলো, ইসলাম ও মুসলমানরা সাম্প্রদায়িক নয়।

সমগ্র ভারতের ১২২ কোটি জনসংখ্যা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সেখানে ৮০.৫% হিন্দু, ১৩.৪% মুসলিম, ২.৩% খৃস্টান, ও ১.৯% শিখ। এখানে সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দুদের বিরাট অংশ হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে কাজ করছে । এদের কারো কারো রাজ্যসভা, লোকসভা ও বিধানসভায় আসন রয়েছে। অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে ধর্মীয় মৌলবাদ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রাম করা কোনো অনৈতিক ও অবৈধ কাজ নয় বরং রাষ্ট্রদ্বারা স্বীকৃত। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গী ভিন্ন। সিকিম বা ভুটানের বাইরে কিছু নয়। এর মূলে রয়েছে মুসলমানদের গৌরবোজ্জল ইতিহাস। যে মুসলমান এক সময়ে গোটা ভারতকে শাসন করেছিল। কোটি কোটি মানুষের মনে সম্মানের জায়গা দখল করেছিল। সভ্যতা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল। অমুসলিম নাগরিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করেছিল। ধর্মীয় সম্প্রীতি স্থাপন করেছিল। সেই শাসকদের কীর্তিগাঁথা পৃথিবীর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। মুসলিম স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন এখনো ভারত তার বুকে ধারণ করছে।

অন্যান্য মিডিয়া bdnews24 RTNN Sheersha News barta24 Prothom Alo Daily Nayadiganta Jugantor Samakal Amardesh Kaler Kantho Daily Ittefaq Daily Inqilab Daily Sangram Daily Janakantha Amader Shomoy Bangladesh Pratidin Bhorerkagoj Daily Dinkal Manob Zamin Destiny Sangbad Deshbangla Daily Star New Age New Nation Bangladesh Today Financial Express Independent News Today Shaptahik 2000 Computer Jagat Computer Barta Budhbar Bangladesherkhela Holiday Bangladesh Monitor BBC Bangla Redio Tehran
homeabout usdeveloped by

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ মো. তাসনীম আলম।

মহীউদ্দীন আহমদ কর্তৃক জাতীয় মুদ্রণ ১০৯, ঋষিকেশ দাস রোড, ঢাকা - ১১০০ হতে মুদ্রিত ও ১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা - ১১০০ হতে প্রকাশিত। যোগাযোগের ঠিকানাঃ ৪২৩ এলিফেন্ট রোড, বড় মগবাজার, ঢাকা - ১২১৭। ফোনঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৯০৬৫, বার্তা - ৮৮ ০১৬৭০৮১৩২৭৬, সার্কুলেশন - ৮৮ ০১৫৫২৩৯৮১৯০, বিজ্ঞাপন - ৮৮ ০১১৯৯০৯০০৮৫, ফ্যাক্সঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৫৫৭১, ওয়েবসাইটঃ www.weeklysonarbangla.net, ইমেইলঃ weeklysonarbangla@yahoo.com