মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
অভিযুক্ত কেউই ক্ষমতায় ছিলেন না, যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেননি
॥ অনামিকা॥
বিগত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২ সংখ্যা The Daily Star পত্রিকায় "International Criminal Tribunal (ICT) : Responding to its critics” শিরোনামে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম (Professor of law, Macquarie University, Sydney Australia) এর লেখাটি মনোযোগের সাথে পাঠ করলাম। লেখক ICT কে International Criminal Tribunal বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আসলে সেটা হবে International Crime Tribunal লেখক UN working groupএবং Aljazeria টিভি চ্যানেলের সাম্প্রতিক দুটো প্রতিবেদন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। উল্লেখ্য যে, এসব প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের অযৌক্তিকভাবে বিচারপূর্ব কারারুদ্ধ রাখা এবং তাদের প্রতি অসংবেদনশীল আচরণের ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। জাতিসংঘ ওয়ার্কিং গ্রুপের ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে UNHCR এর নিকট পেশকৃত রিপোর্টে বলা হয়, একবছর অধিককাল পর্যন্ত বিচারপূর্ব আটক রাখার পরও বিবাদীদের আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি। এই ধরনের আটক ‘অযৌক্তিক’ এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR)-এর ৭ এবং ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং ICCPR (International Coverant on Civil and Political Rights)এর অনুচ্ছেদ ৯ এবং ১৪ লঙ্ঘন। এই রিপোর্টে এটাও উল্লেখ করা হয় যে, সম্প্রতি সংশোধিত (পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনী আইন) বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৭(ফ)১ এর মাধ্যমে সাংবিধানিক অধিকার হরণ করা হয়েছে যা UDHR জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ৭-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। উপরন্তু ৪৭ফ(২) অনুচ্ছেদে ICTA-এর অধীনে অভিযুক্তদের অধিকার প্রশ্নে সুপ্রিমকোর্টে আবেদন করে প্রতিকার চাওয়ার কোনো সুযোগও রাখা হয়নি। এ বিষয়টিও ICCPR এর অনুচ্ছেদ ১৪(৫) এর লঙ্ঘন।
ওয়ার্কিং গ্রুপ নির্দিষ্টভাবে জনাব মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মো. মুজাহিদ, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ব্যাপারে ১২ সেপ্টেম্বর ২০১১ বাংলাদেশ সরকারের কাছে ৩৫টি বিষয়ে মতামত জানতে চেয়ে পত্র পাঠায়। এতে যেসব অভিযোগ করা হয়, বাংলাদেশ সরকার সে সম্পর্কে কোনো জবাব দেয়নি এবং তা অস্বীকারও করেনি। বাংলাদেশ সরকার যেহেতু জবাব দেয়নি এই যুক্তিতে লেখক ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রতিবেদনকে সঙ্কটাপন্ন এবং একপেশে বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু জবাব না দেয়াটা তো অবশ্যই সরকারের ব্যর্থতা, দুর্বলতা কিংবা উত্থাপিত অভিযোগগুলো যুক্তিযুক্ত ও সঠিক বিধায় সরকার নীরব ভূমিকা পালন করেছে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের মৌনতার অর্থÑ সরকার অভিযোগগুলো মেনে নিয়েছে। মৌনং সম্মতি লক্ষনং। এ সম্পর্কে সম্প্রতি UNHCR সদর দফতর জেনেভায় যে শুনানি ছিল সেখান থেকে দেশে ফিরে নির্মূল কমিটির নেতা শাহরিয়ার কবির ওয়ার্কিং গ্রুপ উত্থাপিত অভিযোগের জবাব না দিতে পারাটাকে সরকারের ব্যর্থতা বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন। যেহেতু একটি কালো আইনের ভিত্তিতে মৌলিক অধিকার হরণ করে ৪০ বছর পর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচারের প্রহসন হচ্ছে এবং উত্থাপিত অভিযোগের বিপক্ষে খুব একটা আইনি যুক্তি নেই সেই হেতু সরকার এটার কোনো জবাব দেয়নি বা দিতে পারেনি বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।
গুয়ানতানামো ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সিআইএ কর্তৃক বিচারপূর্ব আটকের দৃষ্টান্ত বা চিলির পিনোচেট, যুগোশ্লাভিয়া মিলোসেভিস, সার্বিয়ার কারাদজিক, লাইবেরিয়ার টেইলর এবং রুয়ান্ডা ও কম্বোডিয়ার দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে লেখক দাবি করেছেন যে, দীর্ঘদিন তাদের বন্দি রাখা হচ্ছে বা উল্লেখযোগ্য সময় অনেকে আটক আছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে, জাতিসংঘ ওয়ার্কিং গ্রুপ কি তাদের ব্যাপারে কোনো রিপোর্ট তৈরি করেছে? জবাব হলো না। ওসব ট্রাইব্যুনালের বিচারপূর্ব আটকের কোনো রিপোর্ট তৈরি করা না হলে যে বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা যাবে না এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। তাছাড়া লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন যে, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের গ্রহণযোগ্যতা দলিল প্রমাণ সংগ্রহ করা সময়সাপেক্ষ এবং চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। বিবাদীদেরকে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হয়নি বলে ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে প্রদত্ত রিপোর্টকে লেখক অসত্য বলে দাবি করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো ঐ তারিখ পর্যন্ত কেবল দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধেই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি এবং তাদের অনেককে ২০ মাসের অধিককাল যাবত বিনাবিচারে স্বেচ্ছাচারিভাবে আটক রাখা হয়েছে এবং তাদের জামিনের আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
লেখক মন্তব্য করেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের একটি Domestic Tribunal. তা হলে প্রশ্ন আসে তিনি এতসব আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের প্রসঙ্গ এনেছেন কেন। দেশীয় ট্রাইব্যুনালের তো দেশীয় আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার হওয়া উচিত। এজন্য দেশের সংবিধান লঙ্ঘন করে মৌলিক অধিকার হরণ করার প্রয়োজনটা দেখা দিল কেন? তাছাড়া ICT Act এর ১১(৫) ধারা মুতাবেক ধারা ৩ সুনির্দিষ্ট অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করতে পারবে ট্রাইব্যুনাল। আলোচ্য ৬ ব্যক্তির ব্যাপারে এই প্রক্রিয়া যা ১১(৫) এ বর্ণিত হয়েছে তা লঙ্ঘন করা হয়েছে। যাদের আটক করা হয়েছে তাঁরা সুপরিচিত, জনপ্রতিনিধি এবং সম্মানিত বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদ। তাঁদের গ্রেফতার করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই দীর্ঘকাল যাবত (১৮ থেকে ২০ মাস) আটক রাখা হয়েছে। তাঁদের ওভাবে গ্রেফতার ও আটক করে রাখা যে সঠিক হয়নি সে সম্পর্কে দেশের অনেক বিশিষ্ট আইনজীবী প্রকাশ্যে মতামত ব্যক্ত করেছেন।
লেখক “Bangladesh, which being a resource Constrained LDC” বলে একটি হাস্যকর যুক্তি উপস্থাপন করে LDC Standerd এর বিচারের কথা বলেছেন। LDC Standerd এর কোনো ট্রাইব্যুনাল বা বিচার আছে বলে আমাদের জানা ছিল না। এতদিন আমরা প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ সরকারের ডজন ডজন মন্ত্রীর বক্তৃতা-বিবৃতি থেকে জেনেছি যে একটা আন্তর্জাতিক মানের Internaional Standerd বিচার করে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে একটা নজির স্থাপন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্ষমতাবান রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান, সেনাপ্রধান, কমান্ডার, মন্ত্রীদের আটক ও বিচারের কথা উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি চিলির রাষ্ট্রপ্রধান ও স্বৈরশাসক পিনোচেট, যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট ও সেনা প্রধান মিলোসেভিস, সার্বিয়ার কারাদজিক, লাইব্রেরিয়ার টেইলর এবং কম্বোডিয়ার সাবেক ক্ষমতাসীন নেতাদের বিচারের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাধীনতার ৪০ বছর পর যাদের যুদ্ধাপরাধীর অভিযোগ এনে বিচারের নামে ভয়ঙ্কর একটি প্রহসন করা হচ্ছে তারা কেউই ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রপ্রধান, সেনাপ্রধান, সরকার প্রধান তো দূরে থাক সরকারি কোনো ক্ষমতা বা দায়িত্বে অথবা যোদ্ধা ছিলেন না। অধ্যাপক গোলাম আযম একটি ইসলামী দলের নেতা এবং একজন ইসলামী চিন্তাবিদ ছিলেন। অন্য যে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁরা তো ছাত্র ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন (মুহাম্মদ কামারুজ্জামান) একটি কলেজের এইচএসসির ছাত্র ছিলেন। যাদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন করা হয়েছিল সেই ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাকে মুক্তি দিয়ে ১৯৭১ সালে রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণ করতেন বা ছাত্র ছিলেন এবং এখন বিরোধী দলের সুপরিচিত নেতা তাদের আটক করে বিচার করার জন্য মাতামাতি ও হৈচৈ করা হচ্ছে।
লেখক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক হিসেবে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিলে এসব বিষয় উল্লেখ করে একটি ভারসাম্যমূলক এবং গ্রহণযোগ্য বক্তব্য তুলে ধরতে পারতেন। লেখক মহোদয় উল্লেখ করেছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যারা অপরাধ করেছিল তাদের বিচার এখনও চলছে। কিন্তু তিনি কি জানেন না যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সেই বিচার শুরু হয়েছিল এবং যারা চিহ্নিত অপরাধী ছিল এবং অপরাধ করে পালিয়েছিল তাদের ধরে বিচার করা হয়েছে। এসব লোকই ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্ষমতাবান অথবা রণাঙ্গনের নেতৃস্থানীয় কমান্ডার।
কিন্তু গোলাম আযম বা আর যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁদের ব্যাপারটা কি সে রকম? আইনের অধ্যাপক মহোদয় যদি সততার পরিচয় দিতেন তাহলে গোলাম আযমকে নাজি যুদ্ধাপরাধীদের সাথে একাকার করে ফেলতেন না। সর্বোচ্চ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান, সেনা কমান্ডারদের বিচারের সাথে নিছক রাজনৈতিক দলের নেতা, সমর্থক বা ছাত্র যারা যুদ্ধই করেননি তাদের এক কাতারে ফেলে আজ বাংলাদেশে একশ্রেণীর লোক যে উন্মত্ততা প্রকাশ করছে তা যে রাজনৈতিক মতলববাজি এ কথা জনগণের কাছে ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে আসছে।
এ পাতার অন্যান্য খবর
- সাজ-গোছ ও মহড়া চলছে, শিগগিরই আসছে আরেক জজ মিয়া
- ইসরাইলের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ছে বাংলাদেশ!
- সরকার অগণতান্ত্রিক আচরণ করলে জনগণ পাল্টা জবাব দেবে
- আওয়ামী বলয়ে ফাটলের আলামত
- মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজন : নাজির আহমদ
- আগামী নির্বাচনে হাসিনা সরকারের ভরাডুবির তথ্য ভারতের হাতে?
- শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা
