ঢাকা শুক্রবার ১৯ ফাল্গুন ১৪১৮, ৮ রবিউস সানি ১৪৩৩, ২ মার্চ ২০১২

কূটনৈতিক সম্পর্ক কিংবা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নেই

আহমাদ সালাহউদ্দীন
নিষিদ্ধ দেশ ইসরাইলের সাথে গত প্রায় ৪ বছর যাবৎ অঘোষিতভাবে বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ। ইসরাইলে রফতানি করা হচ্ছে বাংলাদেশী পণ্য। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও তা বহাল রেখেছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে যেখানে মাত্র ১ হাজার মার্কিন ডলারের বাংলাদেশী পণ্য রফতানি হয়েছিল ইসরাইলে, সেখানে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ২৪ হাজার মার্কিন ডলারের বাংলাদেশী পণ্য, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৮৬১ ডলারের পণ্য এবং বিগত ২০১০-১১ অর্থবছরে ৩০ হাজার ৫৪৫ মার্কিন ডলারের শুধু বাংলাদেশী গার্মেন্টসই রফতানি হয়েছে ইসরাইলে। যার মধ্যে নীট গার্মেন্টস ২৫ হাজার ৩৮৪ ডলার এবং ওভেন গার্মেন্টস ৫ হাজার ১৬১ ডলার। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বাংলাদেশী হোম টেক্সটাইল ও হিমায়িত চিংড়িও যাচ্ছে সেখানে। গত এক বছরের ব্যবধানে ইসরাইলে বাংলাদেশী নীট গার্মেন্টস রফতানি বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৭শ’ শতাংশ এবং ওভেন গার্মেন্টস বেড়েছে ৫১ শতাংশ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ওয়েবসাইট থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিংবা ইপিবি কেউই এ রফতানির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ধারণা করছেন, এই বাণিজ্য সম্পর্ক অব্যাহত থাকলে ইসরাইল সহসাই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়ে যাবে। বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে এর প্রথম ধাপটি সম্পন্ন করার আয়োজন চলছে। আর সুচতুর ইসরাইল সেই সুযোগের অপেক্ষাতেই রয়েছে। এক পর্যায়ে বলা হবে, ইসরাইল আর ‘ব্যান্ড কান্ট্রি’ নয় কিংবা ইসরাইলকে নিষিদ্ধ রাখা হলে বাংলাদেশের বাণিজ্য স্বার্থ ক্ষুণœ হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৯৪৮ সালে জন্মের পর থেকেই ইসরাইলের সাথে বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক কিংবা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নেই। নেই কোনো ব্যাংকিং যোগাযোগও। তাই বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইসরাইলে কোনো পণ্য রফতানির সুযোগ নেই। তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে এটা হলেও হতে পারে। তবে ইসরাইল থেকে সরাসরি কোনো অর্থ বাংলাদেশে আনা সম্ভব নয়। এমনকি বাংলাদেশ থেকে ইসরাইলে একটি ফোনকল করাও সম্ভব নয়। কিন্তু ইপিবি তার ওয়েব সাইটে দেয়া রফতানি তথ্য সম্পর্কে বলেছে, এটা বাংলাদেশের কাস্টমস বিভাগ থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। যেখানে ইসরাইলে রফতানির সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত পরিসংখ্যানেও বাংলাদেশ থেকে ইসরাইলে পণ্য রফতানির উল্লেখ রয়েছে। এ ব্যাপারে পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ইসরাইলে বিভিন্ন ধরনের পোশাক, হোম টেক্সটাইল, চিংড়ি প্রভৃতি পণ্য রফতানি হচ্ছে। এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, কলকাতা, দুবাই প্রভৃতি বন্দর ব্যবহার করা হচ্ছে। আর ইসরাইলে বাংলাদেশী পণ্য রফতানির পরিমাণ ইপিবি’র ওয়েবসাইটে উল্লেখিত পরিমাণের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। সম্ভবত বর্ডার ট্রেডের মাধ্যমেও এ ধরনের রফতানি হতে পারে বলে তারা জানায়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক পোশাক ও হিমায়িত মৎস্য ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশই ইহুদি, যারা ইউরোপ-আমেরিকার পাশাপাশি ইসরাইলেও বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্য পাঠাচ্ছে। কারণ ইসরাইলে বাংলাদেশের মানসম্পন্ন সস্তা পণ্যের ভালো চাহিদা রয়েছে। তবে মূল উদ্দেশ্যটা রাজনৈতিক। এজন্য তৃতীয় দেশের মাধ্যমে কিছু পণ্য আমদানি করলেও ইসরাইল ঐ পণ্যগুলোর বাংলাদেশী পরিচয়টাই আন্তর্জাতিকভাবে বড় করে তুলে ধরছে। আবার বাংলাদেশ সরকারও এর কোনো প্রতিবাদ করছে না। উপরন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, তাইওয়ানের সাথেও বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও দেশটির সাথে ভালো ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে বাংলাদেশের। এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ইসরাইলকে রাজনৈতিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে তার সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বাংলাদেশের ওপর বহুদিন যাবৎ ইসরাইল ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশের নেপথ্য চাপ রয়েছে। বছর কয়েক আগে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়ী চেম্বার- মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) পক্ষ থেকেও ইসরাইলের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক গড়তে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিল। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘রাজনৈতিক স্পর্শকাতর’ বিবেচনায় এ বিষয়ে তখন কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে জানায়, এর ফলে মুসলিম দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র আরো জানায়, ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে সার্কের অন্যতম বৃহৎ দেশ ভারত বর্তমানে ইসরাইলের সাথে চুটিয়ে ব্যবসা করছে। ইসরাইল থেকে ভারত প্রতিবছর ২শ’ কোটি ডলারেরও বেশি পণ্য আমদানি করছে এবং ইসরাইলও ভারত থেকে বর্তমানে প্রায় ২শ’ কোটি ডলারের পণ্য নিচ্ছে। ইসরাইল থেকে ভারত আনছে সমরাস্ত্র, পারমাণবিক সরঞ্জাম, মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্টস, ম্যানমেড স্ট্যাপল ফাইবার, রাসায়নিক সার, অর্গ্যানিক কেমিক্যালস, ইলেক্ট্রিক ও ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য। আর ভারত থেকে ইসরাইল নিচ্ছে ডায়মন্ড, পার্ল, স্টোন, প্লাস্টিক, কটন, কম্পিউটার সফটঅয়্যার প্রভৃতি। ইসরাইল প্রতিবছর প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে যার মধ্যে ভারতের মার্কেট শেয়ার ৩ শতাংশেরও বেশি। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনই হচ্ছে ইসরাইলে সবচেয়ে বড় রফতানিকারক। বর্তমানে ইসরাইল, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক জোট গড়ে তুলেছে এবং এ ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদী ত্রিপাক্ষিক চুক্তিও করেছে। যার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হচ্ছে পাকিস্তান, ইরান, মধ্যপ্রাচ্যসহ তাবৎ মুসলিম বিশ্ব।

 পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞরা জানান, ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশের প্রথম জন্মের সাথে ইসরাইলের জন্মের একটি নিগূঢ় সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত ভেঙে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের জন্ম হয় এবং এর প্রেক্ষাপটে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে এক নতুন জাগরণের সৃষ্টি হয়, তখন এর পরের বছরেই ১৯৪৮ সালে, মুসলিম শক্তিকে দমন করতে দিল্লীর নেপথ্য প্ররোচনায় ব্রিটিশ-আমেরিকান জোট মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্বের একমাত্র ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের জন্ম দেয়। ইসরাইল তার জন্মের সেই ম্যান্ডেট ও এজেন্ডা বাস্তবায়নে ইঙ্গ-মার্কিন জোট আর ভারতের সহযোগিতায় এখনো সমান তৎপর রয়েছে। যার মধ্যে বাণিজ্য শক্তি সাম্প্রতিককালে তাদের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ইসরাইল, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাদের বন্ধু এবং বাণিজ্য ও অর্থনীতির অংশীদার, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সার্বভৌমত্ব ধ্বংসের জন্য আর কোনো শত্র“র প্রয়োজন নেই বলে পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

অন্যান্য মিডিয়া bdnews24 RTNN Sheersha News barta24 Prothom Alo Daily Nayadiganta Jugantor Samakal Amardesh Kaler Kantho Daily Ittefaq Daily Inqilab Daily Sangram Daily Janakantha Amader Shomoy Bangladesh Pratidin Bhorerkagoj Daily Dinkal Manob Zamin Destiny Sangbad Deshbangla Daily Star New Age New Nation Bangladesh Today Financial Express Independent News Today Shaptahik 2000 Computer Jagat Computer Barta Budhbar Bangladesherkhela Holiday Bangladesh Monitor BBC Bangla Redio Tehran
homeabout usdeveloped by

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ মো. তাসনীম আলম।

মহীউদ্দীন আহমদ কর্তৃক জাতীয় মুদ্রণ ১০৯, ঋষিকেশ দাস রোড, ঢাকা - ১১০০ হতে মুদ্রিত ও ১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা - ১১০০ হতে প্রকাশিত। যোগাযোগের ঠিকানাঃ ৪২৩ এলিফেন্ট রোড, বড় মগবাজার, ঢাকা - ১২১৭। ফোনঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৯০৬৫, বার্তা - ৮৮ ০১৬৭০৮১৩২৭৬, সার্কুলেশন - ৮৮ ০১৫৫২৩৯৮১৯০, বিজ্ঞাপন - ৮৮ ০১১৯৯০৯০০৮৫, ফ্যাক্সঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৫৫৭১, ওয়েবসাইটঃ www.weeklysonarbangla.net, ইমেইলঃ weeklysonarbangla@yahoo.com