মন্ত্রীত্ব না পেয়ে ইনু-মেননের প্রকাশ্য ক্ষোভ
আওয়ামী বলয়ে ফাটলের আলামত
॥ মুনতাসির রহমান॥
আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৪ দলের কয়েকটি শরিক দলের মতবিরোধ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ ও সাম্যবাদী দলকে বাদ দিয়ে ১৪ দলের বাদবাকি শরিক দলগুলো আলাদাভাবে বৈঠক করেছে। বৈঠকের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু। বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে বলা হলেও বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ভিন্ন বলে জানা গেছে। ভিন্ন উদ্দেশ্য হলো সরকারের শেষ সময়ে এসে নতুন করে দর কষাকষি। বৈঠকে যোগ দেননি শরিক একটি দলের নেতা এ প্রতিনিধিকে জানান, মেনন-ইনু মন্ত্রীত্বের দরকষাকষির জন্য বৈঠক ডেকেছেন। সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে যদি মন্ত্রীত্ব পাওয়া যায়। যে কারণে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী পাল্লা ভারি করা হয়েছে সেখানে লাভ না পাওয়া গেলে জোটে থেকে কি হবে- এমন বোধ উল্লিখিত নেতাদ্বয়ের মধ্যে জাগ্রত হয়েছে সরকারের শেষ মুহূর্তে এসে। ওই নেতা আরো বলেছেন, গত তিন বছরে ১৪ দল এটাই প্রথম আলাদাভাবে বৈঠক করে। এ পর্যন্ত মোট পাঁচটি বৈঠক হয়েছে। যেখানে আওয়ামী লীগ ছিল। মাত্র কয়েকদিন আগেও সংসদ উপনেতা বেগম সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে ১৪ দলের বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করাসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখন এমন কি ঘটনা ঘটলো যে, আওয়ামী লীগ ও সাম্যবাদী দলকে বাদ দিয়ে আলাদা বৈঠক ডাকতে হবে?
মেনন-ইনুর আলাদা বৈঠক ডাকাকে আওয়ামী লীগ ভালোভাবে নেয়নি। নাম প্রকাশ করতে চাননি আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, আগামী ১২ মার্চ বিএনপির মহাসমাবেশ। মহাসমাবেশকে সামনে রেখে বিএনপি-জামায়াতসহ সমমনা দলগুলো এক জায়গায় শামিল হচ্ছে। এত বড় সমাবেশ সরকারের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ চলছে। সরকার এ কাজটিও করছে ঝুঁকি নিয়ে। ঠিক এই মুহূর্তে ১৪ দলের আলাদা বৈঠক ডাকা বিরোধী শিবিরের অবস্থানকে আরো শক্ত করবে। তাদের বৈঠক ডাকার আসল রহস্য কি তা আমরা জানি না, তবে এটা যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সরকারের শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়া ১৪ দলের মতপার্থক্য প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেছেন, ১৪ দলের ঐক্যে ফাটল ধরানোর জন্য অনেকে চেষ্টা করছেন। ফাটল ধরানোর চেষ্টা আগে থেকেই চলছে। আগামীতেও হতে পারে। তবে তিনি বলেন, আলাদা বৈঠকের কারণে ১৪ দল ভাঙবে না। নিজেদের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য থাকলে তা বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করতে হবে।
বৈঠক সম্পর্কে ওয়ার্কার্স পার্টির একজন পলিটব্যুরো সদস্য জানান, বৈঠকে দিলীপ বড়–য়াকে উপস্থিত থাকতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে বৈঠকে যেতে রাজি হননি তিনি। তিনি বৈঠকের উদ্যোক্তাদের বলেছিলেন, কোনো বিষয়ে দ্বিমত থাকলে ১৪ দলের বৈঠকে সেটা বলা যেতে পারে। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও বৈঠক করা যেতে পারে। এভাবে আলাদা বৈঠক করলে দূরত্ব যেমন বাড়বে আবার আসল সমস্যারও সমাধান হবে না।
নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য হয়েছেন এমন একজন জাসদ নেতা বললেন, সরকারে মন্ত্রী হতে পারেন এমন নেতা ১৪ দলে আছেন। যোগ্য নেতাদের বাদ দিয়ে শেখ হাসিনা অযোগ্যদের নিয়ে তিন বছর সময় পার করেছেন। আমরা জাসদ থেকে আবার ১৪ দলের হয়ে অনেকবার বলেছি অযোগ্যদের বাদ দিয়ে যোগ্যদের মন্ত্রী করতে। এ নিয়ে দরকষাকষি বা কোনো শর্তও ছিল না। তবে শেখ হাসিনা বলেছিলেন নির্বাচনে জয়ী হলে ছোট দল বলে অবজ্ঞা করা হবে না, যারা যোগ্য তাদের মন্ত্রী পরিষদে নেয়া হবে। আকার ইঙ্গিতে তিনি রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনুর কথাই হয়তো বলেছিলেন। এমন কি রাজশাহীর কোটায় ফজলে হোসেন বাদশার নামও ১৪ দল থেকে প্রস্তাব রাখা হয়। কিন্তু কোনো প্রস্তাব মেনে নেয়া হয়নি। তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী বানিয়েছেন সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়–য়াকে। এত যোগ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য থাকতে অনির্বাচিতকে মন্ত্রী বানানোর কারণ আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।
আওয়ামী দুর্গে ফাটল
বরাবরই আওয়ামী লীগের সঙ্গে বামপন্থীদের সম্পর্ক ভালো। বিএনপি বলয়ের বিপরীতে আওয়ামী বলয় শক্তিশালী করতে বামদের নানা কৌশলে কাছে টানে আওয়ামী লীগ। এ জন্য বিভিন্ন সময়ে রাজপথের আন্দোলনে যোগ্য ইস্যু তৈরি করা হয়েছে। বিগত জোট সরকারের আমলেও তেমন ইস্যু তৈরি করে ১৪ দল গঠন করা হয়। কিন্তু সেদিনকার গঠিত জোটে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ কয়েকটি দল আওয়ামী লীগকে ভারত ও সাম্রাজ্যবাদের দালাল আখ্যায়িত করে জোটে যায়নি। অথচ সিপিবিই ছিল আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় ও বিশ্বস্ত রাজনৈতিক মিত্রশক্তি। বর্তমানে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে যেমন রাজনৈতিক মিত্রতা তদ্রƒপ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সিপিবি’র ছিল। কিন্তু এক সময়ের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে কঠিন তান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী জাসদ এবং চাইনিজ বা পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট খ্যাত ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলের মতো। বৈজ্ঞানিক আর পিকিং সমাজতন্ত্রী নেতা ইনু এবং মেনন বরাবরই আওয়ামী রাজনীতির কড়া সমালোচনা করেছেন। তারা ক্ষমতার মোহে তাদের আদর্শিক রাজনীতি পরিহার করে পুঁজিবাদী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে গিটটু বাঁধে মন্ত্রীর হওয়ার জন্য। তখন ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম আওয়ামী বলয় থেকে বেরিয়ে যায় ক্ষমতার রাজনীতি না করার জন্য। তবে গণফোরামের অনেক কমিউনিস্ট নেতা ইনু-মেননদের পথ অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ড. কামালের শক্ত অবস্থানের কারণে সেটা হয়নি। সদ্য গণফোরাম থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রবীণ রাজনীতিবিদ পংকজ ভট্টাচার্য এ প্রতিনিধিকে বলেন, ইনু-মেননরা আওয়ামী লীগের সঙ্গ গিটটু বেঁধেছিলেন মন্ত্রী হওয়ার জন্য। শেখ হাসিনা তাদের মন্ত্রী বানালে ভালো করতেন। সরকার আর মাত্র দুই বছর ক্ষমতায় আছে। এখন তো টানাপড়েনের সময়। এই টানাপড়েনের মধ্যে আওয়ামী লীগের আমু তোফায়েলের মতো নেতা মন্ত্রী হলেও সরকারের চরম ব্যর্থতার গ্লানিকে মুছতে পারবেন না। সুতরাং ইনু-মেননদের উচিত হবে বামগণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সময় ব্যয় করা।
আওয়ামী লীগ সমর্থিত একাধিক আইনজীবী তাদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের একগুঁয়েমি সিদ্ধান্তের কারণে আওয়ামী লীগ অচিরেই ১৪ দলকে হারাবে। বিদ্যমান যে পরিস্থিতি তাতে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি মহাজোটে থাকবে না বলে আকার ইঙ্গিতে প্রতীয়মান হচ্ছে। জাতীয় পার্টি থাকায় গত নির্বাচনে ভোটের সাফল্য এসেছে। শোনা যাচ্ছে জাপার একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে বিএনপির সঙ্গে ওঠা-বসা শুরু করে দিয়েছে। ১৪ দলের ভোট কম থাকলেও জাতীয় রাজনীতিতে বামপন্থী ভূমিকা, অবস্থা একেবারে ফেলে দেয়ার মতো নয়। আজ সেই বামরা আওয়ামী লীগ থেকে সরে গেলে আগামী নির্বাচন এককভাবে করতে হবে। রাশেদ খান মেনন বা হাসানুল হক ইনু না থাকার অর্থ বাম গোষ্ঠী না থাকা। অন্যদিকে সিপিবি বা ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাঁধবে না। এছাড়া দেশে যেসব ইসলামপন্থী দল রয়েছে তারা তো আদর্শিক প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসবে না। সুতরাং আগামী এক বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগকে একা চলতে হতে পারে। এই একা চলার পথ আওয়ামী লীগ নিজেই সৃষ্টি করেছে।
দিন যতই গড়াচ্ছে ততই ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব-অবিশ্বাস আরো বেড়ে যাচ্ছে। মহাজোট যেমন থাকবে না তেমনি ১৪ দলও থাকবে না। জোট-মহাজোটের এই টানাপড়েনের ঢেউ আওয়ামী লীগের গায়েও লেগেছে- এমন মন্তব্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের। এ অবস্থার মধ্যে বিরোধী দলের রাজপথের আন্দোলনের কর্মসূচি ধীরে ধীরে বেগবান হচ্ছে। এ অবস্থার মধ্যে আগামী ১২ মার্চ বিএনপি’র মহাসমাবেশ সফল হলে চলতি বছরের মাঝামাঝিতে ১৪ দল ভেঙে যেতে পারে। কারণ বিরোধী দলের যৌক্তিক আন্দোলন ঠেকাতে শরিক দলগুলো মাঠে নামবে না।
তবে সরকারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েকদিনের মধ্যে ১৪ দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠকে বসবেন। বৈঠক ডেকে ইনু-মেননদের মন্ত্রী বানানোর প্রস্তাব দেবেন, না আলাদা বৈঠক ডাকার ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করবেন সে বিষয়ে সূত্র কিছু জানাতে পারেনি। তবে পরিস্থিতি যে ভালো না তা আঁচ করা যাচ্ছে।
এ পাতার অন্যান্য খবর
- অভিযুক্ত কেউই ক্ষমতায় ছিলেন না, যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেননি
- সাজ-গোছ ও মহড়া চলছে, শিগগিরই আসছে আরেক জজ মিয়া
- ইসরাইলের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ছে বাংলাদেশ!
- সরকার অগণতান্ত্রিক আচরণ করলে জনগণ পাল্টা জবাব দেবে
- মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজন : নাজির আহমদ
- আগামী নির্বাচনে হাসিনা সরকারের ভরাডুবির তথ্য ভারতের হাতে?
- শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা
