মতিউর রহমান আকন্দ
গত ১৬ ফেব্র“য়ারি বৃহস্পতিবার মহান জাতীয় সংসদে কণ্ঠ ভোটের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্তকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য এক ‘সিদ্ধান্ত প্রস্তাব’ গৃহীত হয়। কোনো বিচার সম্পর্কে ভিন্ন মত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নের জন্য ‘সিদ্ধান্ত প্রস্তাব’ গ্রহণ নজিরবিহীন। আইন ও আদালতের বিরুদ্ধে অথবা বিচারের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য বা অবস্থান গ্রহণ করলে বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। আদালতের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলে আদালত অবমাননার জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণীত হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে আদালত অবমাননার দায়ে সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, লেখক, বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আদালতে হাজির হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। অনেককে আবার জেলে যেতে হয়েছে। অতএব আইন ও আদালতের বিচার বাধাগ্রস্ত করার ব্যাপারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ঘোষিত নীতিমালা এ ট্রাইব্যুনালের বিরোধীতাকারী বা ট্রাইব্যুনালের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তারপরও সরকার কেন শুধু যুদ্ধাপরাধের বিচার বাধাগ্রস্তকারীদের কথা বলে এ ধরনের আইন প্রণয়নের জন্য ‘সিদ্ধান্ত প্রস্তাব’ গ্রহণ করলো তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও রহস্যজনক।
দেশের বুদ্ধিজীবী ও পর্যবেক্ষক মহল সংসদে গৃহীত এ ‘সিদ্ধান্ত প্রস্তাবকে বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রতিপক্ষ দমনের জন্য সরকারের এক নতুন হাতিয়ার বলে মনে করছেন। ভিন্ন মত পোষণকারীদের বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনার পথরুদ্ধ করে বিচারের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই এ প্রস্তাব পাস করা হয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে ও যে আইনে বিচার করা হয়, সে আইনের বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করে আইনের ত্র“টি সম্পর্কে মতামত তুলে ধরার ন্যায়সঙ্গত অধিকার সকলেরই রয়েছে। যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য বক্তব্য রাখার সুযোগ না পান কিংবা আদালত যদি সে বক্তব্য বিবেচনায় না নেন তাহলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হতে পারে না। বিচার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ত্র“টি তুলে ধরা ন্যায়বিচারে সহায়তার সামিল। বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা ও মত প্রকাশ করা আর বিরোধিতা করা কখনো এক কথা নয়।
বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধের যে উদ্যোগ নিয়েছে তা বহু পূর্বের একটি মীমাংসিত ইস্যু। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য সরকার উদ্যোগ নেয়। যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত করার জন্য গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। এ তদন্ত কমিটি ১৯৫ জনকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে, যাদের সকলেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। এসব সেনা সদস্যের সকলেই ভারতের কারাগারে আটক ছিলেন। এই তদন্ত কমিটি ঘোষণা করেছিল এ ১৯৫ জনের বাইরে আর কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই। এসব চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে বিচারের জন্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস্ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট নামে একটি আইন মহান জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছিল ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে। মূলত ঐ আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচারের জন্য- যাদের সকলেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন। যেহেতু তারা সকলেই পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন তাই তাদের বিচারের জন্য প্রণীত এ আইনে মৌলিক অধিকার রাখা হয়নি। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে এ চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দেন। আটক সেনা কর্মকর্তাগণ ভারতের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে পাকিস্তানে ফিরে যান। আসল যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দেয়ায় আইনটি তার কার্যকারিতা হারায়। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটির তখনই পরিসমাপ্তি ঘটে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য সে আইনটি প্রয়োগ করা হচ্ছে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের কথা বলে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে শাস্তি দেয়ার উদ্দেশ্যে। এ আইন ও ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। ব্যাপক সমালোচনা ও আপত্তির মুখে সরকার ঘোষণা করে এটা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল নয়। এটি ডোমেস্টিক ট্রাইব্যুনাল এবং আইনটিও ডোমেস্টিক। তারা আরও ঘোষণা করে এটা যুদ্ধাপরাধের বিচার নয় এটা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার।
এ কালো আইন সম্পর্কে অ্যামিনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস্ ওয়াচ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন জে র্যাপ, যুক্তরাজ্যের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞ টবি ক্যাডম্যানসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের ফোরাম ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশন তীব্র আপত্তি উত্থাপন করে এ আইনের বিভিন্ন ত্র“টিপূর্ণ দিক তুলে ধরে তা সংশোধনের জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ পেশ করেছেন। দেশি-বিদেশি আইনবিদ, মানবাধিকার সংস্থা এ আইন ও ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক মানের নয় বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সর্বশেষে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের ‘ওয়ার্র্কিং গ্র“প অন আরবিট্র্যারি ডিটেনসন’ বাংলাদেশ সরকারের নিকট লিখিত এক চিঠিতে এ আইনের কঠোর সমালোচনা করে বলেছে এটি আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সংঘর্ষশীল, বাংলাদেশের সংবিধানের পরিপন্থী এবং এ আইনের মাধ্যমে যাদের আটক করা হয়েছে তা অবৈধ এবং নিবর্তনমূলক। সরকার সেসব মতামত উপেক্ষা করে দেশকে রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্ব শূন্য করার উদ্দেশ্যে বিচারের নামে প্রহসন চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিচার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠনের পর সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। যেসব সাক্ষী মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে তাদের চারিত্রিক গুণাবলীর যে নমুনা প্রকাশিত হয়েছে তা দেশবাসীকে হতবাক করেছে। সাক্ষীদের অধিকাংশই বাংলাদেশ দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় দণ্ডপ্রাপ্ত ও অভিযুক্ত আসামি। চুরি, ছিনতাই, অর্থ আত্মসাৎসহ নৈতিক স্খলনের কারণে তারা জেল খেটেছে। আমাদের দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামি নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য বলে বিবেচিত হন। সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষীর চারিত্রিক গুণাগুণ ও মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাক্ষীর গ্রহণযোগ্যতার জন্য তার সত্যবাদিতা ও নৈতিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃটিশ আইনে The meaning and significance of character of a witness সম্পর্কে বলা হয়েছে - When the jury or magistrates have to decide between the case presented by the prosecution and that presented by the defense they may approach the comparison in various ways depending upon what the issues are in the case and how the evidence has been presented. --- some one’s character more than his criminal record, it also includes his conduct and reputation. The character of a witness is always relevant if it affects his credibility.
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে উপস্থাপিত সাক্ষীর চারিত্রিক গুণাগুণ এবং ব্যক্তিগত জীবনে তাদের কুকর্মের ফিরিস্তি বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ায় তা প্রচারিত হওয়ায় জনগণের মাঝে এসব সাক্ষীর কর্মকাণ্ড হাস্যরসের সৃষ্টি করছে। এসব সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা প্রদানের কোনো সুযোগ নেই বলে সর্বত্রই আলোচিত হচ্ছে। ফলে বিচার প্রক্রিয়া আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। সচেতন দেশবাসী বিচার প্রক্রিয়ার বিপক্ষে তাদের মতামত ব্যক্ত করে চলেছে।
এ পরিস্থিতিতে সরকার গত ১৬ ফেব্র“য়ারি বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘সিদ্ধান্ত প্রস্তাব’ গ্রহণ করে বিরোধী মতকে দমনের এক নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত জণগণের চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে।
যুদ্ধাপরাধের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির হাত-পা বেঁধে ইচ্ছামত শাস্তি প্রদান করার উদ্দেশ্যেই সরকার তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জনমত স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য জাতীয় সংসদে ‘সিদ্ধান্ত প্রস্তাব’ পাস করে এর ভিত্তিতে আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে। জনগণ সরকারের এ উদ্যোগ কিছুতেই মেনে নেবে না। ইতোমধ্যেই দেশের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, গবেষক, আইনবিদ এর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, কোনো সভ্য সমাজে এ ধরনের আইন হতে পারে না। এটাকে একটি অদ্ভুত সিদ্ধান্ত বলেও তারা মন্তব্য করেছেন। তারা বলেছেন, সিদ্ধান্তের আলোকে আইন প্রণয়ন হলে গণতন্ত্র ও ভিন্নমত বলে আর কিছুই দেশে থাকবে না। তারা পাল্টা প্রশ্ন করে বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাধা দিচ্ছে কে? এই বাধার সংজ্ঞা কী? স্বচ্ছ ন্যায়বিচার আর বিচারের নামে প্রহসন এক জিনিস নয়।
