মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা জয়ের নামে ধোঁকাবাজি : ভারতের সাথেও ঠকে যাবার আশঙ্কা
সমুদ্রে এগিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ
বাংলাদেশ ‘লকড জোন’-এ পরিণত
॥ আহমাদ সালাহউদ্দীন॥
মিয়ানমারের সাথে ‘বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা জয়ে’র এক ধোঁয়াশাচ্ছন্ন আকাশ-কুসুম গল্প ফেঁদে শাসক দল আওয়ামী লীগ হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। তার সাথে বুঝে কিংবা না-বুঝে একশ্রেণীর মিডিয়াও গত কয়েক দিনে তিলকে তাল বানিয়ে বিশ্বজয়ের গল্প শোনাচ্ছে। বলা হচ্ছে, জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত সমুদ্র-আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল (ইটলস) থেকে মিয়ানমারের বিপক্ষে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগর জেতার যে ঐতিহাসিক রায় পেয়েছে তা আরেকটি বাংলাদেশের সমান। যা এক বিশাল অর্জন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা নিয়ে লড়াইয়ে আসলে মিয়ানমারের সাথে পুরোটা জেতেনি। আবার বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছে পুরোপুরি হেরেও যায়নি। কামান চেয়ে পিস্তল পেয়েছে মাত্র। তবে হিসাব করলে বাংলাদেশের তুলনায় জিতটা বেশি হয়েছে মিয়ানমারের। যার সূত্র ধরে অদূর ভবিষ্যতে জিতবে ভারতও। বাংলাদেশ যেখানে ১০০তে ১০০ পাবার আশা করেছিল, সেখানে মাত্র ৩৫ পেয়েছে। আর মিয়ানমার ১০০ পাবার দাবি নিয়ে ৬৫ পেয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ৩৫ পেয়ে ফেলই করেছে বলা যায়। আর এই ফেলের পরিণতিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বংশধরদের চরম খেসারত দিতে হবে একসময়। দেশের সমুদ্র বিশেষজ্ঞরা এ তথ্য দিয়ে বলেছেন, সমুদ্র-সীমার বর্তমান রায় অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরের পূর্বদিকে অন্তত ৪ থেকে ৫টি বাংলাদেশী গ্যাসক্ষেত্রের মালিকানা এখনই পেয়ে যাবে মিয়ানমার। রায়ের ফলে বাংলাদেশ এই গ্যাস ক্ষেত্রগুলো স্থায়ীভাবে হারালো। একইভাবে শিগগিরই পশ্চিমদিকের ৭-৮টি গ্যাসক্ষেত্র হারাতে হবে ভারতের কাছেও। কারণ বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম সীমানা ধরে সোজাসুজিভাবে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত চতুর্ভুজ আকারে ভাগ না হয়ে ওই রায়ের মাধ্যমে অনেকটা কৌণিকভাবে ষড়ভুজ আকারে ভাগ হয়েছে। এতে বাংলাদেশ দক্ষিণে লম্বায় ‘মাছ ধরার’ কিছুটা বাড়তি জায়গা পেলেও চওড়ায় হারিয়েছে মূল্যবান সীমানা। স্থল সীমানার কাছাকাছি যেখানে তেল-গ্যাস ক্ষেত্রগুলো সবচেয়ে বেশি। অথচ সরকার সবখানে বলে বেড়াচ্ছে, তারা ২০০ নটিক্যাল মাইল (২ হাজার গজে ১ নটিক্যাল মাইল) পর্যন্ত সামুদ্রিক সীমানা আদায় করে ফেলেছে। কিন্তু পাওয়ার উপযোগী কি কি হারিয়েছে তা বলছে না। সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতি যেটি হয়ে গেছে তাহলো ওই রায়ে বাংলাদেশ এখন ২০০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে একটি ‘লকড জোন’-এ পরিণত হয়ে বামনে রূপান্তরিত হলো। বাংলাদেশের হাজার বছরের প্রাকৃতিক বৃদ্ধি থেমে গেল কিছু বিদেশির খেলায় আর নিজেদের নির্বুদ্ধিতায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্ম ও বৃদ্ধির ঐতিহাসিক ধারাকে বিবেচনাই করা হয়নি। বাংলাদেশ পরবর্তী হাজার বছরে যেখানে সমুদ্রে আরো শত শত নটিক্যাল মাইল এগিয়ে যেতে পারতো, তা কলমের এক খোচায় হারিয়ে গেল। ভূগোল ও সমুদ্রবিদ্যা সম্পর্কে বাংলাদেশের যে মাত্র দু’তিন জন বিশেষজ্ঞ রয়েছেন তাদের সাথে আলাপ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় বঙ্গোপসাগরের মালিকানা নিয়ে আরেক দাবিদার ভারতের সাথে বাংলাদেশের মীমাংসা কিভাবে কতটুকু হবে তা নিয়ে এখনই ঘোরতর সন্দেহ আর অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রখ্যাত সমুদ্র বিজ্ঞান ও ভূগোল বিশারদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আবদুর রব বলেছেন, বাংলাদেশ যে একটি এ্যাকটিভ ডেলটা (জীবন্ত ব-দ্বীপ) তা হামবুর্গের আদালতকে বোঝানো হয়নি কিংবা আদালত এটা উপেক্ষা করেছে। আর মূল সর্বনাশটি হয়ে গেছে এখানেই। যার ব্যাখ্যা কেউ এখনো দিচ্ছে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারত অথবা মিয়ানমার কিংবা আর দশটা সমুদ্র-তীরবর্তী দেশের মতো কোনো সাধাসিধা দেশ নয়। প্রতিবছর হিমালয়ের হাজার কোটি টন পলি পড়ে সমুদ্রে চর ফেলে একটু একটু করে এগিয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে এবং এই জন্মের ধারা এখনো বহাল রয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণে এই চর জাগার খেলা চলছেই এবং অসংখ্য ডুবোচর একটু একটু করে মাথা তুলছে বঙ্গোপসাগরে। সমুদ্র জরিপে দেখা গেছে, সীমান্ত নদীগুলো দিয়ে গড়িয়ে আসা পলি (সেডিমেন্ট) ও রকের বেশিরভাগই দক্ষিণে বাংলাদেশ বরাবর জমা হচ্ছে। এভাবে সেন্ট মার্টিন, তালপট্টিসহ বিচ্ছিন্ন নানা দ্বীপ ও নতুন নতুন চরগুলো একসময় বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে মিলে গিয়ে উপকূল-রেখা আরো শত শত মাইল দক্ষিণে সরে যাবে। যেমন হাজার বছর আগে এদেশের উপকূল-রেখা একসময় ছিল উত্তরে সিরাজগঞ্জ জেলার সীমানায়। যে কারণে বাংলাদেশকে বলা হয় বিশ্বের একমাত্র জীবন্ত ব-দ্বীপ। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র যতোদিন আছে ততোদিন এই ব-দ্বীপ (এ্যাকটিভ ডেল্টা) ডোবাতো দূরের কথা, শুধু বাড়তেই থাকবে সমুদ্রে। ফলে বাংলাদেশের উপকূল ভবিষ্যতে সমুদ্রে আরো দক্ষিণে সরে যাবে, যেটা ভারত কিংবা মিয়ানমারের ক্ষেত্রে তেমনভাবে ঘটবে না। এটাই হলো বাংলাদেশের চমকপ্রদ বিশেষত্ব যেটা আমলে নেয়নি হামবুর্গের ওই আদালত। এখন আদালত যেখানে বাংলাদেশের উপকূলকে চিহ্নিত করে যেভাবে সমুদ্রে বাংলাদেশের সীমানাকে সীল মেরে আটকে দিল, তাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বেড়ে সমুদ্রের ভেতর আরো বহুদূর এগিয়ে গেলেও বর্তমান উপকূলীয় সীমানা থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইলের চিহ্নিত ত্রিসীমানার বেশি ১ ইঞ্চি সীমানাও আর নিজস্ব বলে দাবি করতে পারবে না। এ এক বিরাট ক্ষতি, যা আর কোনোদিন পূরণ করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া বাংলাদেশের পূর্বপ্রান্তের উপকূলীয় সমুদ্র-সীমানা হামবুর্গের আদালত নাফ নদীর মাঝ বরাবর না টেনে মিয়ানমারের দাবি অনুযায়ী পশ্চিমে বাংলাদেশের ভেতর বেশ খানিকটা ঢুকিয়ে দিয়েছে। অপরদিকে ২০০ নটিক্যাল মাইলের এক্সক্লুসিভ ইকোনোমিক জোনের (ইইজেড) পরবর্তী মহাদেশীয় ঢাল বা মহীসোপানে দাবি অনুযায়ী একক জায়গা পায়নি বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ দলে আমলাদের বাইরে দেশীয় কোনো প্রখ্যাত সমুদ্র ও ভূগোল বিশারদকে না রাখাটা অমার্জনীয় অপরাধ হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ইটলসের রায়ের ফলাফল সম্পর্কে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তাও মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, এ রায়ে সন্তুষ্টিও যেমন কিছুটা আছে, তেমনি পরবর্তী ২০০ নটিক্যাল মাইলে মিয়ানমারের অধিকার সম্পর্কে হতাশাও আছে। তবে ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহীসোপানে যে মিয়ানমারের কোনো অধিকার নেই, সে ব্যাপারে আমরা ট্রাইব্যুনালকে আমাদের যুক্তি বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি।
সমুদ্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশ বুঝে পেলেও মিয়ানমারের নীতিরই জয় : ন্যায্যদূরত্ব নয়, সমদূরত্বের ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারণ
এদিকে ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালে মিয়ানমারের নির্ধারিত ১৩০ নটিক্যাল মাইলের বিপক্ষে বাংলাদেশের ২০০ নটিক্যাল মাইল ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে’র পক্ষে বেশ কিছু ক্ষেত্রে রায় এলেও এটা বলা যাচ্ছে না যে, বাংলাদেশ পুরোপুরি বা একতরফা ‘জয়’ পেয়েছে। জয় হয়েছে মিয়ানমারেরও। তবে মিয়ানমার বাংলাদেশের ভেতরে যতোটা জায়গা চেয়েছিল ঠিক ততোটা পায়নি। কিন্তু অনেকটাই পেয়েছে। পক্ষান্তরে মিয়ানমার সীমান্তে ‘ন্যায্যতা’র ভিত্তিতে বাংলাদেশ যা চেয়েছিল তার বেশিরভাগই পায়নি। পেয়েছে ‘সমতা’র ভিত্তিতে। যেটা ছিল মিয়ানমারের যুক্তি। হামবুর্গের ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দি ল’ অফ দি সি (আইটিএলওএস) এর প্রধান জোসে লুই জেসাসের নেতৃত্বে গত বুধবার দেয়া বিচারকদের রায়ে ঘোষণা করা হয়, ১৯৮২ সালের ইউএন কনভেনশন অন দি ল’ অফ দি সি (আনক্লজ) অনুযায়ী বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) ২০০ নটিক্যাল মাইলের দক্ষিণে মহাদেশীয় ঢাল বা মহীসোপান বিস্তৃত হবে। ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশের প্রথম দাবি ছিল, ১৯৭৪ সালের দুই দেশের ঘোষিত সমুদ্রসীমা অনুযায়ী দু’ দেশের মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে দেয়া হোক, যাতে ২০০৮ সালেও দুই দেশ সম্মত ছিল বলে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ। এ দাবির পক্ষে বাংলাদেশের দাখিল করা দলিলপত্র ও উপস্থাপিত যুক্তি-তর্ক এবং বিপক্ষে মিয়ানমারের যুক্তি খণ্ডন বিচার করে ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের দাবি খারিজ করে দিয়েছে। ট্রাইব্যুনাল বলেছে, ১৯৭৪ সালে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের সভার পর স্বাক্ষরিত ‘সভার কার্যবিবরণী’টি ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কোনো দিক থেকেই কোনো ‘আন্তর্জাতিক চুক্তি’ নয় এবং সংশ্লিষ্ট আনক্লজের ১৫তম অনুচ্ছেদ অনুসারেও তা কোনো ‘চুক্তি’ নয়। ফলে তা ২০০৮ সালে মিয়ানমার কর্তৃক অনুমোদনের প্রশ্নই আসে না। সুতরাং এটাই ছিল ১৯৭৪ সালের তৎকালীন সরকারের মহাভুল। রায়ের ১২৬ অনুচ্ছেদে ট্রাইব্যুনাল স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, দুই দেশের মধ্যে কোনো ‘ঘোষিত’ বা ‘সম্মত’ সার্বভৌম সমুদ্রসীমা (টেরিটোরিয়াল সী) নেই, ফলে বাংলাদেশের দাবি অনুযায়ী তার ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়নি। অথচ ১৯৭৪ সালের চুক্তিতে মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরের অনেকটাই ছেড়ে দিয়েছিল বাংলাদেশকে। যা তৎকালীন সরকারের ব্যর্থতার কারণে ২০১২ সালে এসে রক্ষা করতে পারলো না বাংলাদেশ।
সব মিলিয়ে এ মামলায় সমুদ্রসীমা নির্ধারণে মিয়ানমারের যুক্তি অনুযায়ী ‘সমদূরত্ব’কেই নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে ট্রাইব্যুনাল। ফলে ‘বিশেষ অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা’র পরে আরো গভীর সমুদ্রে ‘মহাদেশীয় ঢাল’ অংশে বাংলাদেশ দাবি অনুযায়ী সীমানা পায়নি। অথচ জার্মানির হামবুর্গস্থ ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দি ল’ অব দি সি বুধবার দুপুরে রায় পড়া শুরু করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বাংলাদেশে পাঠানো এক বার্তায় বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আদালত সমদূরত্বের ভিত্তিতে ন্যায্যতাভিত্তিক সমাধান দিয়েছে।’ যা প্রকৃত অর্থে ছিল গোঁজামিল এবং রাজনৈতিক মতলব হাসিলের লক্ষ্যে দেয়া বক্তব্য। কিন্তু মিডিয়াগুলোর বেশিরভাগই তার কথার ভিত্তিতেই রিপোর্ট করে। কিন্তু রায়ের ১৫৩ নম্বর অনুচ্ছেদে আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, আনক্লজের ১৫তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পক্ষদ্বয়ের মধ্যকার সার্বভৌম সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা হবে সমদূরত্ব রেখার ভিত্তিতে। সমাধান এখানে ন্যায্যতাভিত্তিক নয়। যদিও বাংলাদেশ সবসময় ন্যায্যতাভিত্তিক সমাধানের দাবি জানিয়ে আসছিল। কারণ ভূ-গঠন পদ্ধতি অনুযায়ী বাংলাদেশের ন্যায্যতাভিত্তিক সমাধানই প্রাপ্য ছিল। ট্রাইব্যুনালের ভারতীয় বিচারিক সদস্যরা সুকৌশলে এটি এড়িয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার এক কূটনীতিক জানান, ‘মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিয়ে আদালতে যাওয়ার আগে একটি বৈঠকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপাক্ষিকভাবেই সমাধানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। কারণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বাংলাদেশ অনেকদূর অগ্রসর হয়ে গিয়েছিল। মিয়ানমারও এতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু ভারত বিষয়টি জানতে পেরে একপর্যায়ে মিয়ানমারকে সেখান থেকে পিছিয়ে আসার পরামর্শ দেয় এবং সমুদ্র বিষয়ক তিনটি আদালতের দুটির বিষয়ে উভয়েই আপত্তি দিয়ে রাখে। এরপর বাংলাদেশের সঙ্গে অসহযোগিতা শুরু করে মিয়ানমার। পরে খোলা থাকা একমাত্র আদালতে গিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারত ও মিয়ানমারের একই আইনজীবীদল লড়াই করছে। এতেই স্পষ্ট হয় যে, ভারত মিয়ানমারকে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্ররোচিত করেছিল।’ মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের মামলাটি ছিল জাতিসংঘ সমুদ্র আইন ১৯৮২ (আনক্লজ)-এর আওতায় প্রতিষ্ঠিত ইটলসে। আর ভারতের মামলাটি নেদারল্যান্ডের হেগে স্থায়ী সালিস ট্রাইব্যুনালে। হেগের আদালত নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভারতের আগ্রহই বেশি কাজ করেছে। বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা নির্ধারণী মামলায় বাংলাদেশ তার দাবি-দাওয়াসহ ‘মেমোরিয়াল’ গত বছরের ৩১ মে ওই ট্রাইব্যুনালের কাছে জমা দিয়েছে। চলতি বছরের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ভারত পাল্টা মেমোরিয়াল জমা দেবে। এ বিষয়ে সব লিখিত ও মৌখিক শুনানি শেষে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি নাগাদ অপর মামলার রায় পাওয়া যাবে বলে বাংলাদেশ আশা করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র কর্মকর্তারা।
মিয়ানমার-বাংলাদেশ সমুদ্র-সীমা সংক্রান্ত রায়ের ১৫১ পৃষ্ঠার সারমর্ম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশের দাবি অনুযায়ী ‘ন্যায্যদূরত্বে’র ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারিত না হওয়ায় দেশের উপকূলের সব অংশ থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরত্বে বিশেষ অর্থনৈতিক সীমার অধিকার পায়নি বাংলাদেশ। যেমন সেন্টমার্টিন দ্বীপ উপকূল থেকে দক্ষিণে এ সীমানা নির্ধারণে মিয়ানমারের সমদূরত্বের দাবীি গ্রহণ করে দক্ষিণ-পশ্চিমে ২১৫ ডিগ্রি কোণে সীমানা নির্ধারণ করেছে ট্রাইব্যুনাল। এতে রায় একপক্ষীয় না হয়ে বরং দুই পক্ষকেই সন্তুষ্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে। রায়ের কার্যকরী অংশের ৫০৬ অনুচ্ছেদে ট্রাইব্যুনালের নির্ধারিত সীমানা রেখার অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ হিসেব করে দেখা যায়, বাংলাদেশ সব মিলিয়ে এক লাখ ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অধিকার পেয়েছে। এটা আরো অনেক বেশি হবার কথা ছিল। অবশ্য বাংলাদেশের অপর দাবি অনুযায়ী ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপকে বাংলাদেশের উপকূল রেখায় অবস্থিত সাব্যস্ত করে এর থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এলাকাকে বাংলাদেশের সার্বভৌম সমুদ্রসীমা হিসেবে ঘোষণা করেছে ট্রাইব্যুনাল। মিয়ানমারের যুক্তি ছিল, উপকূল রেখার গঠনের ভৌগোলিক দিক থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপটি মিয়ানমারের উপকূলে অবস্থিত, বাংলাদেশের উপকূলে নয়। কাজেই এ দ্বীপের থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল বাংলাদেশের সার্বভৌম সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা যাবে না। মিয়ানমারের এ যুক্তি ট্রাইব্যুনাল গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশের আইনজীবীদের উপস্থাপিত যুক্তি গ্রহণ করে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে বাংলাদেশের উপকূল রেখার অংশ ধার্য করে এর ভিত্তিবিন্দু থেকে সার্বভৌম সমুদ্রসীমা ধার্য করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, সাধারণত উপকূল রেখার ভিত্তিবিন্দু থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সার্বভৌম সমুদ্রসীমা, তার পরের ২০০ নটিক্যাল মাইল বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড বা এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন) এবং পরের আরো ২০০ থেকে ৩৫০ নটিক্যাল মাইলকে মহাদেশীয় ঢাল (কন্টিনেন্টাল শেলফ) হিসেবে ধার্য করা হয়। ফলে সার্বভৌম সমুদ্রসীমা নির্ধারণ হচ্ছে পুরো সমুদ্রসীমা নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের অন্য মামলাটির রায়ের ওপরও প্রভাব ফেলবে এ মামলার রায়। কারণ আন্তর্জাতিক আদালতে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ হলে বাংলাদেশ পেতো ৪৬০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সীমানা। অবশ্য এজন্য এখন বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে ওই মামলাটিতে অবশ্যই পুরোপুরিভাবে জিততে হবে। বর্তমানে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিয়ে ভারতের সঙ্গে মামলা চলছে নেদারল্যান্ডসের হেগভিত্তিক স্থায়ী সালিশ ট্রাইব্যুনালে। আগামী ২০১৪ সালের মধ্যে সেখানে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির কথা রয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে মামলার রায়ের প্রভাব পরবর্তী মামলাগুলোতে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ সমতাভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় বাংলাদেশ মহীসোপানের (কন্টিনেন্টাল শেলফ) এবং এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের দাবি অক্ষুণœ রাখতে পারবে না। উল্লেখ্য, সমগ্র বঙ্গোপসাগরের মোট আয়তন হচ্ছে সাড়ে ২২ লাখ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশ উপকূলভাগ থেকে সমুদ্র অভিমুখে প্রায় তিন লাখ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট সুবিস্তৃত বাংলাদেশের একান্ত অর্থনৈতিক পানিসীমা (এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন বা ইইজেড)।
পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সূত্রগুলো ও ভূতত্ত্ববিদরা জানিয়েছেন, ২০০৮ সালে বাংলাদেশ গভীর সমুদ্রে যে ২৮টি তেল-গ্যাসক্ষেত্র (ব্লক) নির্ধারণ করে, ইটলসের রায় অনুযায়ী তার পূর্ব প্রান্তের অনেকাংশ (১৩, ১৮ ও ২৩ নম্বর ব্লকসহ) মিয়ানমারের সীমানাভুক্ত হয়ে যাবে। অন্যদিকে ওই রায়ে বাংলাদেশের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলের আয়তন কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তারও গভীরে সম্প্রসারিত মহীসোপানে (এক্সটেন্ডেড কন্টিনেন্টাল শেলফ) যৌথ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে নতুন ব্লক সৃষ্টি করা যাবে কি না সন্দেহ আছে। ইটলসের রায়ে সম্প্রসারিত মহীসোপানে বাংলাদেশের একক অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে জানান কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রায়ের কপি আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়ার পর এটা পর্যালোচনা করলে সবকিছু স্পষ্ট হবে। খনিজ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে সমুদ্রবক্ষে বাংলাদেশ সীমানায় মোট ২৮টি ব্লক নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৮টি অগভীর ও ২০টি গভীর সমুদ্রে। ইটলসের রায় ঘোষণার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেন, বাংলাদেশ যা চেয়েছিল, তার চেয়েও বেশি পেয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রায়টি বাংলাদেশের পক্ষে যেমন এসেছে, তেমনি মিয়ানমারের পক্ষেও গেছে ঠিকই। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে বলেছেন, সেটা বাস্তবের তুলনায় অনেকটা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলার মতো হচ্ছে।
বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. বদরুল ইমাম বলেন, ইটলসের রায়ে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বাংলাদেশের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এই অধিকার সব দেশের ক্ষেত্রেই সমান। এটা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে যে বিতর্ক ছিল, ইটলসের রায়ে তার নিরসন হয়েছে। কিন্তু বড় ধরনের কোনো প্রাপ্তি আসেনি। সংশ্লিষ্ট অন্য সূত্রগুলো জানায়, জাতিসংঘের সমুদ্র আইন (আনক্লস) অনুযায়ী, একটি দেশ ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সম্প্রসারিত মহীসোপানের অধিকার পেতে পারে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দেশকে দেখাতে হবে যে, তাদের দেশের মহীসোপান প্রাকৃতিকভাবেই ৩৫০ নটিক্যাল মাইল বা তারও বেশি প্রলম্বিত। ইটলসে বাংলাদেশের আবেদনে সেটা দেখানো হয়েছিল কি না, কিংবা ইটলসের রায়ে বাংলাদেশকে সম্প্রসারিত মহীসোপান ব্যবহারের অধিকার দেয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কাজেই, বাংলাদেশ যে নতুন তেল-গ্যাস ব্লক করার জন্য অনেক বাড়তি জায়গা পাবে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও বুয়েটের প্রফেসর ড. ম তামিম বলেন, নতুন ব্লক করার জায়গা খুব একটা বাড়বে বলে মনে হয় না, বরং বিদ্যমান ব্লকগুলোর পূর্ব প্রান্তের কয়েকটি ব্লক সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে মিয়ানমানের সীমানাভুক্ত হবে। এমনকি, গভীর সমুদ্রের ১১ নম্বর ব্লকের যে অংশের মালিকানা দাবি করেছিল মিয়ানমার, ইটলসের রায়ে তারও সবটা বাংলাদেশ পায়নি। ওই ব্লকের কিছু অংশ মিয়ানমানের অধিকারভুক্তই রয়ে যাচ্ছে। তবে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলের অধিকার পাওয়ায় দু-একটি নতুন ব্লক সৃষ্টি ও বাংলাদেশের মাছ ধরার সুযোগ বাড়বে। অস্ট্রেলিয়ার মোনাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশী গবেষক জায়েদ হোসেন বলেন, পেট্রোবাংলা ২০০৮ সালে তেল-গ্যাস ব্লকের যে মানচিত্র করেছে, তার সঙ্গে ইটলসের রায় মিলিয়ে দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রের কয়েকটি ব্লক এখন মিয়ানমার পেয়ে যাবে। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য ও সমুদ্র আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ সেলিম মাহমুদ বলেন, ইটলসের রায় অনুযায়ী বাংলাদেশ সম্প্রসারিত মহীসোপানের অধিকার পাবে। ফলে ওই অংশে বাংলাদেশ আরো কিছু নতুন তেল-গ্যাসক্ষেত্র নির্ধারণ করতে পারবে। এদিকে সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ইটলসের দেয়া গত বুধবারের রায়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ মিন লিন। জার্মানির হামবুর্গে দেয়া রায় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি খুব সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করে বলেন, সমুদ্রসীমা নিয়ে এ মামলায় মিয়ানমারের পক্ষ থেকে আইনি লড়াই করা হয়েছে এবং রায়ে মিয়ানমার ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
হিসাব মেলাতে দরকার ব্যাপক বিশ্লেষণ
সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের (ইটলস) রায়ের ফলে চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হয়েছে, তা জানতে রায়টির বিস্তারিত আইনি বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির সঙ্গে যুক্ত কূটনৈতিক ও নৌ-বাহিনীর কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিশ্লেষকেরা মন্তব্য করেছেন। এই রায়ে উপকূল থেকে বঙ্গোপসাগরের ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ওই এলাকা ছাড়িয়ে মহীসোপানের বাইরের সামুদ্রিক সম্পদেও বাংলাদেশ অধিকার পেয়েছে বলে সরকারি তরফে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি এখনো কুহেলিকাময়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমনি ও ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ মিন লিন উভয়েই বলেছেন, ইটলস যে রায় দিয়েছে, তাতে দুই দেশেরই বিজয় অর্জিত হয়েছে। এ রায় দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। গত বুধবার জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত ইটলসে ২১-১ ভোটে রায়টি ঘোষিত হয়। মাত্র একজন বিচারক বাংলাদেশের দাবির পুরোপুরি পক্ষে অবস্থান নেন। ট্রাইব্যুনালের সভাপতি জোসে লুই হেসাস ঘোষিত এই রায়ের মাধ্যমে তেল-গ্যাস সমৃদ্ধ বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমানা বিতর্কের অবসান হলো মাত্র। কিন্তু এতে কে হারলো কে জিতলো তা বিস্তারিতভাবে এখনই বলা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে মন্তব্য চাইলে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমান বলেন, মূল রায়টি পুরোপুরি দেখার পাশাপাশি বাংলাদেশ কি চেয়েছিল এবং মিয়ানমারও কি চেয়েছিল তা মূল্যায়ন করে দেখতে হবে। দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে চলে আসা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার শেষদিকে এসে মিয়ানমার হঠাৎ কঠোর হয়ে গেলে কোনো ফলপ্রসূ সমাধান না পাওয়ায় বাংলাদেশ ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর মিয়ানমারের বিপক্ষে আলোচ্য আইনি কার্যক্রমের সূচনা করে। মূলত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি বিতর্কিত পদক্ষেপই মিয়ানমারকে সরে দাঁড়াতে এবং বাংলাদেশকে ট্রাইব্যুনালে যেতে বাধ্য করে। এখানে বর্তমান সরকারের কোনো কৃতিত্ব নেই। বরং বড় ধরনের পরাজয় আছে। কেননা ১৯৭৪ সালের মুজিব সরকার মিয়ানমারকে একই সমুদ্র সীমানার বিষয়ে যে চুক্তিতে নিয়ে গিয়েছিল তা বহাল রাখতে পারেনি বর্তমান সরকার। এটা শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার উভয় সরকারের জন্যই একটি বড় ব্যর্থতা। ১৯৭৪ সালের চুক্তিতে যা পেয়েছিল বাংলাদেশ, তার অনেকখানি এবারের রায়ে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার মিয়ানমার সীমান্তে বাংলাদেশের কিছু গ্যাসক্ষেত্রকে বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দিলে মিয়ানমার তাদের গ্যাসকূপ অনুসন্ধান কাজে বাধা দেয়। এরপর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নৌবাহিনী সেখানে মুখোমুখি হলে প্রায় যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘে আন্তর্জাতিকভাবে সালিশ-বৈঠকের ব্যাপারে দু’পক্ষই রাজী হলে উভয় দেশের নৌবাহিনী ও বিদেশি গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বিতর্কিত সমুদ্র এলাকা ছেড়ে আসে। এরপর বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বোঝাপড়া করতে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব এ. কে. মাহমুদের নেতৃত্বে একটি কোর কমিটি গঠন করে দেয়, যাতে কমোডর খোরশেদ আলমকে ওই সরকারই কনসালট্যান্ট নিয়োগ করে। এখানে বর্তমান সরকারের তেমন কোন ভূমিকা ছিল না শুধু ধারাবাহিকতা রক্ষা ছাড়া। অথচ বর্তমান সরকার এখন একক কৃতিত্ব জাহির করে জাতিকে ধোঁকা দিচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোর কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর মামলা দাখিল করে বাংলাদেশ। ভারতের ইন্ধনে মিয়ানমারের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের এছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না। এখন ভালো হোক, মন্দ হোক ট্রাইব্যুনালের এই রায় মেনে নেয়া ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো গত্যন্তর নেই। কারণ এর বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ নেই। ইটলস ওয়েবসাইটে ১৫১ পৃষ্ঠার রায়টি এক অর্থে পূর্ণাঙ্গ রায় নয়। এর মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় শ’। এটি পেলে বিস্তারিত জানা যাবে। এখানে একজন বিচারক ভিন্নমত দিয়েছেন এই বলে যে, বাংলাদেশের স্বার্থ আরও ভালোভাবে কেন দেখা হলো না। অথচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমনি জার্মানি থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বলেছিলেন, ‘এটি শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, মিয়ানমারের জন্যও একটি বিজয়।’ সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমান আরো বলেন, দু’ পক্ষের জেতার বিষয়টি রহস্যজনক। এখানে অবশ্যই কিছু ঘাপলা আছে। তাই রায় বিশ্লেষণ ছাড়া মন্তব্যটা হবে রাজনৈতিক। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমনির রায়-পরবর্তী বক্তব্যের সমালোচনা করে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করছেন, বাংলাদেশ ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে রায় পেয়েছে এবং কৌশলগতভাবে উপকৃত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তি কি ছিল? কৌশলগত ভিত্তিটাই-বা কি? কাজেই এসব বিশ্লেষণ না করে বিস্তারিত মন্তব্য করা বা স্বাগত জানানো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সমুদ্রসীমার দাবির বিষয়টি জাতীয় প্রসঙ্গ। এটি তো আওয়ামী লীগ বা বিএনপির বিষয় নয়। সাবেক এই পররাষ্ট্র সচিবের অভিযোগ, সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তি নিয়ে সালিশ আদালতে যাওয়ার আগে স্বচ্ছতার প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। তিনি বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে আমরা কতটা পেয়েছি, কতটা হেরেছি, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। সেই সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে আমাদের পক্ষে আর বিপক্ষে যেসব বিচারক মত দিয়েছেন, তাঁদের এবং মিয়ানমারের প্রতিক্রিয়া।
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাংক ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড কমপ্যারাটিভ ল’র গবেষক এম হাবিবুর রহমানের মতে, রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাত্র। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সাবেক এই ডিন এম হাবিবুর রহমান বলেন, এই রায়ের কারণে এটা বলা যায় না যে, বাংলাদেশের বিপরীতে ভারতের দাবিও আপনাআপনি খারিজ হয়ে যাবে। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক ১৯৮২ সালের কনভেনশন প্রতিবেশী সব দেশকে ১২ নটিক্যাল মাইল করে সার্বভৌম সমুদ্রসীমার এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একান্ত সমুদ্রসীমার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু যেটা আসলে দেখতে হবে তা হলো ম্যাপটা। ঐ অধিকার আমরা সমুদ্রে চতুর্ভুজ আকারে কিংবা ত্রিভুজ আকারে নাকি অন্যকোন লাইন টেনে পেলাম। আইন আছে বলেই আজ ট্রাইব্যুনালে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনি দৃষ্টিতেই আমাদের সমস্যাটাকে এখন দেখতে হবে এবং ঐ আইনে আমাদের আরো ভালো করার সুযোগ ছিল কিনা। যেহেতু দ্বিপাক্ষিকভাবে আমরা দীর্ঘকালেও কোনো ফায়সালা করতে পারিনি তাই ভাবতে হবে আইন অনুযায়ী বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশ, ভারত এবং মিয়ানমারেরও।
বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা-বিরোধ দ্বিপাক্ষিকভাবে মেটাতে উৎসাহী ভারত
ওদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ মেটাতে আন্তর্জাতিক আদালত নয় বরং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপরই এখনো স্বভাব-সুলভ ভঙ্গিতে জোর দিয়ে যাচ্ছে ভারত। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ গত শনিবার এ কথা বলেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপুমনির সঙ্গে তার কার্যালয়ে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের কাছে পঙ্কজ বলেন, আমরা কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে চাই না। দ্বি-পক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতেই সমুদ্রসীমা-বিরোধ মীমাংসা করা সম্ভব। কিন্তু ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। নেদারল্যান্ডসের হেগের আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে ভারতের বিরুদ্ধে সমুদ্র-সীমা নিয়ে দায়েরকৃত মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। জাতিসংঘ আদালতে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা-বিরোধ সংক্রান্ত মামলার রায়ের দু’দিনের মাথায় ভারত আবারো এ অভিমত জানালো। তবে ভারতের এ আহ্বানকে কেউ বিশ্বাস করছে না। কারণ ভারত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার নামে গত ৪০ বছর যাবৎ টালবাহানা করে সময় ক্ষেপণ করে চলেছে। কোনো সমাধানে আসেনি। কারণ তালগাছটা সবসময় ভারতেরই চাই। তাছাড়া ফারাক্কার পানি চুক্তি নিয়েও ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশকে দ্বিপাক্ষিক সমাধানের একই ফাঁদে ফেলেছিল ভারত। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ওই সময় ফারাক্কা পয়েন্টে পানির ন্যায্যহিস্যার দাবিতে জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিকভাবে নালিশ জানালে ভারত দ্বিপাক্ষিকভাবে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সমাধানের আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশের প্রস্তাব প্রত্যাহার করিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে ভারত ঠকিয়ে দেয় বাংলাদেশকে। এরপর ১৯৯৬ সালে ফারাক্কার পানি চুক্তিতে আরেক দফা ঠকায় বাংলাদেশকে। তাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের সঙ্গে এসব বিষয়ে এখন আর দ্বিপাক্ষিক সমাধানে আস্থাশীল নয়।
নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক স্থায়ী আরবিট্রেশন আদালতে (আন্তর্জাতিক সালিশ আদালত) ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে একই সময়ে ভারতের বিপক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে সাগরের সীমানা নিয়ে বাংলাদেশ তার দাবি যাবতীয় তথ্য-উপাত্তসহ আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করেছে। ভারতের বিপক্ষে ২০১১ সালের মে মাসে দাবিনামার বিস্তারিত সালিশ আদালতে জমা দেয় বাংলাদেশ। ভারত এ বছর জুলাইয়ে তার দাবিনামা জমা দেবে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। ভারতের সঙ্গে মামলায়ও একই ন্যায্যতার দাবি বাংলাদেশের। ২০১৪ সালে এ সালিশের রায় দেবে সালিশ আদালত। প্রসঙ্গত, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ টেরিটোরিয়াল ওয়াটার ও মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট করলে ভারত ও মিয়ানমার বাংলাদেশের ঘোষিত বেইজলাইন বিষয়ে প্রতিবাদ জানায়।
এ পাতার অন্যান্য খবর
- জাতীয় সংলাপ জরুরি হয়ে পড়েছে
- পরবর্তীতে বলবৎ আইন দিয়ে পূর্বে সংঘটিত অপরাধের বিচার করা যায় না
- সরকার জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে
- রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই সরকার মুজাহিদকে ২১ আগস্ট মামলায় জড়িয়েছে : মকবুল আহমদ
- দুররানীকে নিয়ে ভুল তথ্য দিয়েছে খালিজ টাইমস
- ভারতের স্বার্থেই বাংলাদেশ : কিসিঞ্জার
- মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে নতুন সাক্ষী আনতে পারল না প্রসিকিউশন
