জনগণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন মেনে নেবে না
জাতীয় সংলাপ জরুরি হয়ে পড়েছে
॥ শামস তারেক॥
গত ১২ মার্চ ঢাকায় বিরোধী দল কর্তৃক আহূত ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচিতে লাখ লাখ লোকের উপস্থিতি আবারো প্রমাণ করলো আগামী সংসদ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। পুলিশের হাজারটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার পরও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের তাৎপর্য যদি সরকার অনুধাবন করে, তাহলেই এ জাতির মঙ্গল নিহিত। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে জোর করে ক্ষমতায় থাকা যায় না। কেউ কোনোদিন পারেওনি। সেই ইতিহাসের ফরাসি বিপ্লবের যুগ থেকে শুরু করে অতি সম্প্রতি ‘আরব বসন্ত’ এর যুগ বারবার প্রমাণিত হয়েছে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। জনতার ঐক্যের কাছে ক্ষমতাসীনদের আস্ফালন নিছক ফাঁকা বুলি ছাড়া কিছুই নয়। বিরোধী দল নেত্রী বেগম জিয়া তিন মাসের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়ে তিনি প্রাজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ইচ্ছে করলে এর আগেই কঠোর কর্মসূচি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা দেননি। বরং সরকারকে একটি সময় নির্দিষ্ট করে দেয়ার মধ্যে দিয়ে ‘বল’টি ঠেলে দিলেন সরকারের দিকে। এখন সরকার কী করে, সেটাই দেখার বিষয়।
বেগম জিয়া একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছেন বটে কিন্তু তার উদ্দেশ্য একটাই- একটি নিরপেক্ষ সরকার, যারা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করবেন। কেন না বর্তমান পরিবর্তিত সংবিধানের আলোকে দলীয় সরকারের আওতায়ই নির্বাচন হবে। সংবিধানে বলা হয়েছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থেকেই নির্ধারিত সময় শেষ হবার তিন মাস আগে নির্বাচন করতে হবে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সংসদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করে সংবিধানে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে শুধুমাত্র একটি উদ্দেশ্যেই আর তা হচ্ছে যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় থেকে যাওয়া। বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তাতে দলীয়ভাবে আয়োজিত নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না। বর্তমান সরকারের আমলে ভোলায় যে উপ-নির্বাচন হয়েছিল তা সুষ্ঠু হয়নি। সেদিনের সংবাদপত্রগুলো সাক্ষী কীভাবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা হয়েছিল। সেদিনও ‘নির্বাচন কমিশন’ ছিল। কিন্তু কমিশনের কোনো ভূমিকা ছিল না। সরকারের ‘হস্তক্ষেপে’র কারণে নির্বাচন তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছিল। আজ যুক্তি হিসেবে ‘শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন’-এর কথা বলা হচ্ছে বটে, কিন্তু নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সরকারি প্রভাব অস্বীকার করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। সবচেয়ে বড় কথা যে নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দল প্রশ্ন তুলেছে, সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সম্মতি ছাড়া ওই নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। এ ক্ষেত্রে ১২ মার্চের বিরোধীদলের জমায়েতের ‘পালস’ বুঝতে সরকার যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে সরকার বড় ভুল করবে। সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য জনতার কাঠগড়ায় অভিযুক্ত হবে সরকার।
এটা সত্য এই মুহূর্তে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কোনো বিধান নেই। কিন্তু তার অর্থ নয় যে, ২০১৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা যাবে না। দু’ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা যায়। এক. সরকার সংসদে ষোলতম সংশোধনী আনতে পারে, যেখানে নতুন আঙ্গিকে, নতুন কাঠামোয় তত্ত্বাবধায়ক অথবা নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা প্রবর্তিত হবে, যাদের কাজ হবে শুধু নির্বাচন পরিচালনা করা। দুই. সরকার উচ্চ আদালতের রায় অনুসরণ করতে পারে, সেখানে বলা হয়েছিল আরো দু’টো সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় পরিচালনা করা। এ ক্ষেত্রে এটা সংবিধানের কোনো অংশ হবে না। সরকারি দল না করুক, মহাজোটের শরিক যে কেউ এ ধরনের প্রস্তাব সংসদে তুলতে পারে এবং সরকার ওই প্রস্তাবে সায় দিতে পারে। মোট কথা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সর্বজন গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। বিএনপি তথা চারদলীয় জোট একটি শক্তিশালী জোট। এখানে এখন আরো বেশ ক’টি দল একত্রিত হয়েছে। তাদের অবজ্ঞা করা ঠিক হবে না। লাখ লাখ মানুষ এদের আদর্শ ও নীতিতে বিশ্বাসী। সংসদেও এদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ইতোমধ্যে বেগম জিয়া অনেক ম্যাচিওরড বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি হঠকারী বক্তব্য দেননি। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একটি সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। যেখানে ১২ মার্চের জনসভায় বেগম জিয়া একটি সমঝোতা প্রত্যাশা করেছেন, সেখানে প্রধানমন্ত্রী ১৪ মার্চ পাল্টা জনসভা ডেকে যে ভাষায় কথা বলেছে, তা সমঝোতার সকল সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। ১৪ মার্চের জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সাধারণ মানুষ আরো ‘ম্যাচিওরড’ বক্তব্য আশা করেছিল। তিনি ‘দুই নম্বরীভাবে’ ক্ষমতায় যাবার দিন শেষ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করলেও বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার ভূমিকা মানুষ ভুলে যায়নি। তিনি ক্ষমতায় যেতে পারলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সকল কর্মকাণ্ডের বৈধতা দেবেন- প্রকাশ্যেই এ কথা বলেছিলেন তিনি। তার সেই বক্তব্য রেকর্ড হয়ে আছে। পরবর্তীতে তার কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মাঝে এ ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল (নবম পার্লামেন্ট) তা সুষ্ঠু ছিল না। প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলেছেন। এ ব্যাপারে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তা হতে হবে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা করে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের নামের যে ধুম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কথাটাই বিএনপি বলে আসছে বারবার। প্রধানমন্ত্রী ১৪ মার্চের জনসভায় বলেছিলেন বিএনপির শাসনামলে ১৬ সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছিল ও ১ হাজার ৮শ’ সাংবাদিককে নির্যাতন করা হয়েছিল (সকালের খবর, ১৫ মার্চ)। আমি জানি না এই কথাটির পেছনে কতটুকু যৌক্তিকতা আছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে বর্তমান সরকারের সময় দু’জন সিনিয়র সংবাদিককে (রুনি ও সাগর) যখন হত্যা করা হয়, তাদের ছোট সন্তান মেঘকে যখন বাবা-মায়ের হত্যাকারীদের বিচার চেয়ে রাস্তায় মানববন্ধনে দাঁড়াতে হয়, তখন আমি একটি ধন্ধে পড়ে যাই। কেন না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে বলেছেন রুনি-সাগরের হত্যাকাণ্ড স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মনিটর করছেন। যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য সত্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই প্রধানমন্ত্রীর মনিটরিং সত্ত্বেও হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা সম্ভব হলো না কেন? এমনকি সৌদি দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব খালাফের হত্যাকাণ্ডেরও কোনো কূল কিনারা হয়নি। এসব ঘটনায় বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হলেও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে এসব কোনো কথা উল্লেখ নেই। দেশের অর্থনীতি নিয়ে ইতোমধ্যে একটা শংকা তৈরি হয়েছে। সিপিডি সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রতি জানিয়েছে, অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে (সকালের খবর, ১২ মার্চ)। সিপিডির অভিমত প্রবৃদ্ধি সাড়ে ছয় শতাংশ হবে না। যেখানে সারা বিশ্বের কৃচ্ছ্রসাধন চলছে। সেখানে আমাদের রাজস্ব ব্যয় বেড়ে গেছে ৩৫ শতাংশ। সরকার যে হারে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে, তাতে করে বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতি। খাদ্যপণ্য মূল্যস্ফীতি এখন ৬৪ শতাংশ। টাকার মান পড়ে গেছে। বিদ্যুৎ-এর অবস্থা বেহাল। ১৪ মার্চের জনসভায় এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য নেই। অথচ অর্থনীতির বেহাল দশায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আছে বিরোধীদলের সমালোচনা, ব্যক্তি বেগম জিয়ার সমালোচনা, আছে বিষোদগার। এই বিষোদগার বাংলাদেশের গণতন্ত্র চর্চাকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবে না। গণতন্ত্রের স্বার্থেই প্রয়োজন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আর এই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলেছেন সবাই। কিছুদিন আগে বাংলাদেশে এসেছিলেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ও’ ব্লেক। তিনি গ্রহণযোগ্য একটি সংসদ নির্বাচনের জন্য একটি ফর্মুলা বের করার জন্য দু’টি বড় দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরাও বলেছেন সে কথা। এটা দুঃখজনক যে, সরকার যদি গত তিন বছরের ভালো কাজ করে থাকে, তাহলে নিরপেক্ষ সরকারের তাদের ভয় কেন? জনগণ খুশি থাকলে, তারাই আবার তাদের আরো পাঁচ বছরের জন্য ম্যাণ্ডেট দেবে। কিন্তু সরকার যদি নিরপেক্ষ সরকারের বদলে দলীয় সরকারের আওতায় নির্বাচন করার ব্যাপারে দৃঢ় থাকে, তাহলে তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবেই। বেগম জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বদলে একটি নিরপেক্ষ সরকারের কাঠামো যদি দাঁড় করানো যায়, আমার বিশ্বাস বিরোধীদল তাতে রাজি হবে। সুতরাং এই মুহূর্তে সংলাপটা জরুরি।
ংযধসংঃধৎবয়ঁব@মসধরষ.পড়স
এ পাতার অন্যান্য খবর
- সমুদ্রে এগিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ
- পরবর্তীতে বলবৎ আইন দিয়ে পূর্বে সংঘটিত অপরাধের বিচার করা যায় না
- সরকার জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে
- রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই সরকার মুজাহিদকে ২১ আগস্ট মামলায় জড়িয়েছে : মকবুল আহমদ
- দুররানীকে নিয়ে ভুল তথ্য দিয়েছে খালিজ টাইমস
- ভারতের স্বার্থেই বাংলাদেশ : কিসিঞ্জার
- মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে নতুন সাক্ষী আনতে পারল না প্রসিকিউশন
