১৮ বছরের যুবককে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আসামি করার নজির ইতিহাসে নেই
পরবর্তীতে বলবৎ আইন দিয়ে পূর্বে সংঘটিত অপরাধের বিচার করা যায় না
বিচারপ্রক্রিয়ায় অনিষ্পন্ন রয়ে গেল অসংখ্য আইনি প্রশ্ন
॥ জামশেদ মেহ্দী ॥
প্রায় ২ বছর হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৫ শীর্ষ নেতাকে বিনা বিচারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। এটি অন্যায়, অবিচার, বেআইনি ও চরম মানবতাবিরোধী কাজ। এটি শুধুমাত্র দেশের প্রচলিত আইনেই বেআইনি নয়, আইসিটি বা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনেও চরম বেআইনি। ১৯৭৩ সালের আইসিটি অ্যাক্টের ২২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে, ট্রাইব্যুনাল তার নিজস্ব আচরণ বিধি বা রুলস অব প্রসিডিওর তৈরি করবে। সে মোতাবেক ২০১০ সালের ৩ জুলাই এই আচরণবিধি প্রণীত হয়। আচরণ বিধিতে বলা হয় :
Sunday, July 3, 2011
Changes to Procedural rules
The registrar of the International Crimes Tribunal has just released the new amendments to the ICT’s Rules of Procedure which were gazetted on 28 June.
Key points in amended rules seem to be: - new bail regime, specifically provision in which a detained person pending investigation should be released on bail after one year if investigation is not completed except in ‘exceptional circumstances.’ (section 4 and 10)
অনুবাদ : ‘বিশেষ অবস্থা ছাড়া এক বছরের মধ্যে যদি তদন্ত সম্পন্ন না হয় তা হলে ঐ এক বছর পর তাকে জামিনে মুক্তি দিতে হবে (অনুচ্ছেদ ৪ ও ১০)।’ কিন্তু জামায়াতের এইসব নেতাকে আজ ১ বছর ৫ মাস হলো কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। আটক নেতৃবৃন্দের তরফ থেকে তাদের মুক্তি অথবা জামিনে মুক্তির জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো ফল হয় নেই। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদেছে!
কামারুজ্জামানের বয়স
রাষ্ট্রপক্ষ অন্যতম অভিযুক্ত জামায়াতের সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে শেরপুর জেলায় মুক্তিযুদ্ধকালে ১২০ ব্যক্তি হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ করেছে। ১১০ পৃষ্ঠার এই অভিযোগপত্রে তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতাকামী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, তাদেরকে নির্মূল করা এবং দেশ ছাড়া করা ইত্যাদি। বলা হয়েছে যে, তিনি ময়মনসিংহ জেলা আল বদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন। অভিযোগ নামায় বলা হয়েছে যে, শেরপুরে সুরেন্দ মোহন সাহার বাসভবনটিকে আল বদর ক্যাম্পে পরিণত করা হয়েছিল। সেখানেই কামারুজ্জামানের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফাসহ ৮২ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়।
কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনীত এ ধরনের অভিযোগ প্রথম দৃষ্টিতেই নাকচ হওয়ার দাবি রাখে। কারণ ১৯৭১ সালে কামারুজ্জামান উচ্চমাধ্যামিক শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। তাঁর বয়স ছিলো ১৭ থেকে ১৮ বছর। ১৭-১৮ বছর বয়সী একজন উঠতি যুবকের সমগ্র ময়মনসিংহ জেলার আল বদর প্রধান হওয়ার মতো যোগ্যতা বা পরিপক্বতা অর্জন করার কথা নয়। একজন অপরিণত যুবক, যখন তাঁর বুদ্ধিমত্তা পরিপক্ব হয়নি, তখন তিনি একটি জিপ গাড়িতে চড়ে সারা ময়মনসিংহ জেলা চষে বেড়াবেন এবং হত্যা ও নির্যাতনের জন্য পাক বাহিনীকে হুকুম দেবেন, সেটি একটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার। এ ধরনের অভিযোগ কোনো ধরনের যুক্তির ধোপেই টেকে না। পৃথিবীর কোনো দেশে ১৭-১৮ বছরের এক যুবককে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়নি। বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে যাদের বিচার করা হয়েছে তারা সবাই ছিলেন হয় রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান, সেনাবাহিনী প্রধান, সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসার, ক্ষমতাসীন মন্ত্রী বা ক্ষমতাসীন দলের সিনিয়র লিডার। কামারুজ্জামান এগুলোর কোনো পর্যায়েই পড়েন না। তারপরও তাকে কোন আইনে বা কোন বিবেচনায় আলোচ্য বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে, সেটি মোটেই বোধগম্য নয়।
সুরেন্দ্র মোহন সাহার কন্যার বক্তব্য
সুরেন্দ্র মোহন সাহার কন্যা মিনা ফারাহ্। বিগত ২৯ বছর হলো তিনি নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। পেশায় একজন দন্ত চিকিৎসক। তিনি সেখানে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িত আছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়াও মিসেস মিনা ফারাহ্ একজন কথাসাহিত্যিক এবং পত্র-পত্রিকার প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট। চলতি মার্চ মাসের পহেলা তারিখে দৈনিক নয়া দিগন্তে মিসেস মিনা ফারাহ্র একটি লেখা ছাপা হয়েছে। লেখাটির শিরোনাম,‘সত্য সন্ধানে ট্রাইব্যুনাল ৭৩’। এই নিবন্ধের একস্থানে তিনি লিখেছেন, “৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কাজটি যারপরনাই কৌতূহলের সাথে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল। কিন্তু সবার চোখেই বিচারের মান নিয়ে প্রশ্ন। এর একটি নমুনা আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দিতে পারি। সুরেন্দ্র মোহন আমার পিতা। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে থাকলেও ফিরে এসে যা দেখেছি এবং যা শুনেছি, পরবর্তীকালে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে ট্রাইব্যুনালসহ অনেককেই দিয়েছি। ট্রাইব্যুনালের প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা আমার সাথে যোগাযোগ করলে জবানবন্দীতে যা বলেছি, এখন দেখছি ঘটনা ভিন্ন। ১৩/০১/১২ তারিখে একটি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত আমাদের বাড়িটি নিয়ে কিছু অসত্য তথ্যে আমি বিস্মিত। যখন গ্রহণযোগ্যতার বাইরে ভুল তথ্য নিয়ে বিচার হবে তখন তো প্রশ্ন উঠবেই। যেমন হলুদ কালিতে হাইলাইট করা তথ্য। সুরেন্দ্র মোহনের বাড়িতে ৭০ থেকে ৮০ জন মানুষকে হত্যা করেছেন কামারুজ্জামান। আসলে কোনটা সত্য।” মিনা ফারাহ্র তথ্য অনুযায়ী মোহন মুন্সী নামক এক ব্যক্তি কামারুজ্জামানের পিয়ন ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের মতে সুরেন্দ্র মোহনের বাড়িতে যেখানে ৭০ থেকে ৮০ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে সেখানে মোহন মুন্সীর মতে ৭০-৮০টির মধ্যে একটি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো হত্যার খবর সে জানে না। তদন্তকারীরা কোত্থেকে এ তথ্য সংগ্রহ করেছেন সেটি মিনা ফারাহ্র জানা নেই। তিনি লিখেছেন, “৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিত শেরপুরে ৬০ জনের বেশি মানুষ খুন হয়নি। আমার ধারণা, ’৭১-এর আবেগে অতিরঞ্জিত একটি গোষ্ঠী ট্রাইব্যুনালে প্রভাব ফেলতে চাইছে। বিচারিক স্বাধীনতা ব্যাহত হচ্ছে।”
সংশোধনী মোতাবেক এই বিচার করা যায় না
উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনটি করা হয়েছে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও অন্যান্য অপরাধের বিচার করার জন্য। যারা এই বিচারের আওতায় পড়বেন তারা হলেন সশস্ত্র বাহিনী, প্রতিরক্ষা বাহিনী অথবা সহায়ক বাহিনীর সদস্য। (১৯৭৩ সালের আইনের ৩ (১) উপঅনুচ্ছেদ)। অপরাধের ৪ অনুচ্ছেদের ২ উপ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সেই অপরাধের দায় একজন কমান্ডারের অথবা তার ঊর্ধ্বতন অফিসারের। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই আইনটি প্রণয়ন করা হয় প্রধানত পাক বাহিনীর ১৯৫ জন সেনা সদস্যের বিচারের উদ্দেশ্যে, যাদেরকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে শেখ মুজিবের সরকার চিহ্নিত ও শনাক্ত করেছিল। এই আইনের বিরুদ্ধে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র সমালোচনা উত্থাপিত হলে সরকার ৩৭ বছর পর এই আইনটির আংশিক সংশোধন করে। বিভিন্ন মহল থেকে মতামত দেয়া হয় যে, এই আইনটি যেহেতু প্রধানত ঈCombatantদের বিচারের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল তাই Non combatantদের বিচার এই আইনে করা সম্ভব নয়। প্রধানত এসব কারণে আইনটির সংশোধন করা হয়।
তাই ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই এই আইনটির সংশোধন করা হয়। ঐ দিন এই সংশোধনীটি প্রেসিডেন্টের সম্মতি লাভ করায় ঐদিন থেকেই অর্থাৎ ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকেই এই আইনটি কার্যকর করা হয়। এই সংশোধনীতে বলা হয়। (১) A Tribunal shall have the power to try and punish any individual or group of individuals, who commits or has committed, in the territory of Bangladesh any of the crimes mention in sub-section (2)’
সংশোধনীতে বলা হয়েছে, এই আইনটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। অর্থাৎ মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০০৯, সাল থেকে এটি কার্যকর হবে। এখানে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই সংশোধনীটি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনী দেশের প্রেসিডেন্টের সম্মতি লাভ করেছে জুলই মাসের প্রথম সপ্তাহে। সুতরাং সেই সময় থেকেই পঞ্চদশ সংশোধনী কার্যকর হয়েছে। যেহেতু বলা হয়েছে যে এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে, তাই এটির ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা বা Retrospectively কার্যকরী করা সম্ভব নয়। এই সংশোধনীটি যেহেতু ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা পায় নাই তাই ২০০৯ সালের জুলাই মাসের পূর্বে সংঘটিত ঘটনাবলী বা কার্যাবলীর বিচার এই আইনের অধীনে করা যাবে না। সুতরাং এই সংশোধনীর আওতায় বর্তমানে কারাগারে অন্তরীণ জামায়াতের ৫ নেতা এবং বিএনপির ২ নেতার বিচার করা যাবে না।
বাংলাদেশের সীমানা
বাংলাদেশের সীমানা বলতে সেই সব এলাকা বোঝানো হয়েছে, যেসব এলাকা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার অব্যবহিত পূর্বে পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল এবং যেসব এলাকা পরবর্তী কালে বাংলাদেশের সীমানাভুক্ত হতে পারে।
সংবিধানের ১৫৩ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখে এটি বলবৎ হবে। আইসিটি বা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনটি ৭২ সালের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী। দেশের প্রথম সংবিধান যেদিন থেকে কার্যকর হয়েছে সেই দিনের আগে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আগে অন্য কোনো সংশোধনী বা আইন কার্যকর হতে পারে না। কারাগারে আটক ৭ নেতার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে সেগুলো, সরকার পক্ষের দাবি অনুযায়ী, সংঘটিত হয়েছে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আগে। সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ মোতাবেক অধ্যাপক গোলাম আযম, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আবদুল আলিমের বিচার করা যায় না। আইসিটি আইনের সংশোধনীটির কার্যকারিতা যেমন ভূতাপেক্ষ বা Retrospectively দেয়া হয় নাই তেমনি সংবিধানের কার্যকারিতাও ভূতাপেক্ষ বা Retrospectively করা হয় নাই। এই বিচার আইনসিদ্ধ হয় নাই।
জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকপর্যায়ে এই বিষয়ে সিনিয়র এবং অভিজ্ঞ আইনজীবীরা বারবার বলছেন যে চলতি বিচারকে আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন হতে হবে। যে সব প্রশ্ন এখানে উত্থাপিত হলো সেগুলো এবং ইতোপূর্বে বিভিন্ন মহল থেকে যেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে সেগুলোর সন্তোষজনক সমাধান ছাড়া এই বিচার সম্পন্ন হলে আগামী দিনের ইতিহাসে এই বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে।
jamshedmehdi15@gmail.com
এ পাতার অন্যান্য খবর
- সমুদ্রে এগিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ
- জাতীয় সংলাপ জরুরি হয়ে পড়েছে
- সরকার জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে
- রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই সরকার মুজাহিদকে ২১ আগস্ট মামলায় জড়িয়েছে : মকবুল আহমদ
- দুররানীকে নিয়ে ভুল তথ্য দিয়েছে খালিজ টাইমস
- ভারতের স্বার্থেই বাংলাদেশ : কিসিঞ্জার
- মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে নতুন সাক্ষী আনতে পারল না প্রসিকিউশন
