বাংলাদেশের সাথে দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। অতিসম্প্রতি মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের আপাতত অবসান হয়েছে। সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল (ইটলস)-র এক ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে বিষয়টি নির্ধারিত হয়েছে। সমুদ্র সীমানা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে চলে আসা দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় কোনো ফলপ্রসূ সমাধান না পাওয়ায় বাংলাদেশ ২০০৯ সালে মিয়ানমারের বিপক্ষে আইনি লড়াই শুরু করে। জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত ট্রাইব্যুনাল দুই বছরের বেশি সময় ধরে শুনানি শেষে এ রায় দেয়। এ রায়ে উপকূল থেকে বঙ্গোপসাগরের মাত্র ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এরসাথে ২০০ নটিক্যাল মাইল ছাড়িয়ে মহীসোপানের বাইরের সামুদ্রিক সম্পদেও বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ ও সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। উল্লেখ্য, এটা ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত রায় এবং এর বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা যাবে না। কিন্তু কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ইটলসের এ রায়ের ফলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ হওয়ায় তার সমুদ্র উপকূল ক্রমান্বয়ে সাগরের দিকে বাড়ছে। ভবিষ্যতে যদি বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল আরো ১০০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে বৃদ্ধি পায় তাহলেও তার সার্বভৌম অধিকার আর বাড়বে না।
মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার বিরোধ মীমাংসা হলেও ভারতের সাথে সমাধান হয়নি। ভারতের সাথে সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তির বিষয়টি এখন নেদারল্যান্ডের হেগে অবস্থিত স্থায়ী সালিশ আদালতে বিচারাধীন। বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা বিরোধের সমাধানের রায়টি ২০১৪ সালে দেয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু ইতোমধ্যে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তারা বাংলাদেশের সাথে সমুদ্রসীমার বিরোধ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে চায়।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সাথে কিন্তু সমুদ্রসীমার বিরোধ দ্বিপক্ষীয়ভাবে তিন দশকেও সমাধান হয়নি। তার সমাধান করতে হয়েছে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমেই। তেমনিভাবে ভারতের সাথেও বাংলাদেশের অনেক বিষয় দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান হয়নি তার বহু উদাহরণ আছে। সাম্প্রতিক সময়ে তিস্তা নদীর পানি বণ্টনসহ দুই দেশের মধ্যকার ছিটমহল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না দ্বিপক্ষীয়ভাবে।
আমরা মনে করি ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের বিষয়টি দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের অভিমত যেহেতু ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারাধীন রয়েছে তাই আদালতের মাধ্যমেই তার ফায়সালা করা উচিত। আমরা মনে করি, আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমেই বাংলাদেশ সমুদ্রে তার ন্যায্য অধিকার পেয়ে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
