দিদারুল আলম মজুমদার
এরশাদের পতনের পর বিচারপতি সাহাব উদ্দিনের শাসন শুরু হলো। দেশে সকল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার হলো। শুরু হলো নির্বাচনী প্রচারণা। জামায়াতে ইসলামীও শতাধিক আসনে প্রার্থী দিল। ফেনী (১) আসনে প্রার্থী হলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক ইসলামী ব্যাংকের নির্বাহী চেয়ারম্যান, দৈনিক সংগ্রামের প্রকাশক ও চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. ইউনুছ। তিনি ছাগলনাইয়াতে এক বিশাল গণসংবর্ধনায় যোগ দেন। এ সভায় অংশগ্রহণ করতে গ্রামের বাড়ি পূর্ব দেবপুর থেকে ছাগলনাইয়া আসব। হেঁটে বক্তার হাঁট গেলাম। উত্তর দিক থেকে আসা একটি রিজার্ভ বাসের ছাদে উঠলাম। অধ্যক্ষ করিম উল্যাহ ভাই স্লোগান দিচ্ছেন আল্লাহর আইন চাই, সৎলোকের শাসন চাই। আমাদের আসনে সৎলোক প্রার্থী কেউ আছেনেরে। আমরা সবাই বলছিলাম, আছে। কোন সে প্রার্থী- ইউনুছ ভাই, সবাই বলে- ইউনুছ ভাই, ছাগলনাইয়ায়- ইউনুছ ভাই, মনুর হাঁটে- ইউনুছ ভাই ইত্যাদি ইত্যাদি স্লোগান দিতে দিতে ছাগলনাইয়ার গণসংবর্ধনায় এসে উপস্থিত হলাম। স্থানীয় নেতাদের মধ্যে আমার যতটুকু মনে পড়ে মাস্টার মীর হোসেন ভাই, তোফাজ্জল হোসেন ভাই, ইসহাক ভাই, পেয়ার আহমদ মজুমদার ভাই, ফেনী জেলা আমীর অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁইয়াসহ অন্যদের বক্তব্যের পর প্রধান অতিথি ইউনুছ ভাইয়ের বক্তব্য শুনছিলাম। একটি ঘটনার বর্ণনা আমার এখনো স্মরণ আছে। তিনি বললেন, ডাকাতের ছোরা থেকে মানুষ ভয়ে দূরে থাকে। আর সেই ছোরা ডাক্তারের হাতে মানুষ নিজ দায়িত্বে উঠিয়ে দেয় তার চিকিৎসার জন্য। সেরকম অসৎ লোকের হাতে দেশ শাসনের দায়িত্ব আসলে অশান্তি সৃষ্টি হবে। আর সৎলোকের হাতে আসলে শান্তিশৃঙ্খলা আসবে। মনোযোগ দিয়ে ইউনুছ ভাইয়ের বক্তব্য শুনলাম। তাকে এর পূর্বে আর কখনো দেখিনি। সেদিনই প্রথম দেখলাম। দেখতে শুনতে যোগ্যতায় সততায় পূর্ণ ইউনুছ ভাইকে সেদিন অনেকে প্রথমই দেখেছিলেন এবং মিটিং শেষে মন্তব্যই করেছেন, এই নেতার কোনো বিকল্প নেই। এমন দশ জনকে দেশ শাসনের দায়িত্ব দিলে দেশের জনগণ মোটা ভাত খেয়ে মোটা কাপড় পরে শান্তিতে ঘুমোতে পারতেন।
ভিভিআইপি বনাম সিআইপি : এরপর প্রায় এক মাস তার নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তিনি নির্বাচনী সভাগুলোতে কর্মীদের উদ্দেশ্যে একটি কথা বেশি বলতেন- আর তাহল এই নির্বাচন- নির্বাচনে ইউনুছিয়া নয়, নির্বাচনে ইসলামিয়া। তখন ইউনুছ ভাই ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের সিআইপি। আর আমাদের আসনে নিয়মিত বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসছেন খালেদা জিয়া। বারবার নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় তিনি হলেন ভিভিআইপি। তৎকালীন সময়ে পত্র-পত্রিকাগুলো তাই লিড নিউজ করলেন- ভিভিআইপি বনাম সিআইপি তীব্র লড়াই। এরপর নির্বাচন শেষে কর্মীদের নিয়ে পর্যালোচনা সভায় ইউনুছ ভাইয়ের আবেগ জড়িত কান্নার রোল দেখেছি। তিনি বলেছেন, আমার ব্যবহারে অনেকে কষ্ট পেয়েছেন। আমি আপনাদের কাছে মাফ চাই। নেতার এমন আবেগ দেখে উপস্থিত কর্মীদের মধ্যেও হু হু করে কান্নার রোল পড়ে গেল।
ইউনুছ ভাইয়ের প্রস্থান : এভাবে ২০০২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ বছর আরও নানা ধরনের স্মৃতি সংগ্রহের মধ্য দিয়ে কেটে যায়। আমিও এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাই। ২০০২ সালে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেক্রেটারি হিসেবে দ্বিতীয় বারের মত নির্বাচিত হই। বিশ্ববিদ্যালয় সংগঠনের আর্থিক দন্যতা থাকায় ইউনুছ ভাইকে ফোন করে এপয়েন্টমেন্ট চাইলাম। তিনি বললেন আমি আগামী ১৭ মার্চ চট্টগ্রামে আসব। তুমি ঢাকায় না এসে চট্টগ্রামেই দেখা কর। আমি যা করার তখনই করব। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ১৬ মার্চ প্রায় রাত ১২ টার দিকে ফেনী জেলা সভাপতি আয়াজ ভাই ফোন করে বললেন ইউনুছ ভাই আমাদের মাঝে আর নেই। তার জানাজা আগামী কাল বাদ জোহর বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত হবে। কথা আর না বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহরের অফিস ইনডেক্সে ফোন করে ট্রেনের টিকেট করলাম। যথা সময়ে বায়তুল মোকাররম এসে পৌঁছলাম। কফিন দক্ষিণ গেটে রাখা হলো। নেতৃবৃন্দ সালাতুল জোহর সমাপ্ত করে দক্ষিণ গেটে রাখা কফিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আমরাও সাথে সাথে যাচ্ছি। গিয়ে দেখলাম হাসি মুখে কফিনের ভেতরে মনে হলো এক জান্নাতি পুরুষ শুয়ে আছেন। প্রফেসর গোলাম আযম ইউনুছ ভাইয়ের কপালে চুমু খেলেন। এরপর জানাজায় ইমামতি করলেন। ইমামের প্রতিটি আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে আবেগ ও কান্নাজনিত কণ্ঠ ভেসে আসল। এতেই বুঝতে পারলাম একজনের প্রতি একজনের কেমন প্রগাঢ় ভালোবাসা ছিল। এর পরই পরিবারের সিদ্ধান্ত ক্রমে বনানী গোরস্তানে নিয়ে গিয়ে আমরা সবাই তাকে দাফন করে আসলাম। দাফন শেষে দোয়া করলেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী।
অনুভূতি ও কিছু উদ্যোগ : অনুভবের বাস্তব রুপায়নে ফেনী ফোরাম ঢাকার উদ্যোগে ইউনুছ ভাইয়ের স্মরণ সভা ইতোমধ্যে দুইবার ফেনী সমিতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমবার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ইউনুছ ভাইয়ের হাতে গড়া সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট এন্ড বিজনেসম্যান ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক আবু নাছের মো. আব্দুজ্বাহের এবং দ্বিতীয় বার প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন বিশ্ব বরেণ্য ইসলামী ব্যক্তিত্ব প্রফেসর গোলাম আযম। সেদিনও ইউনুছ ভাইয়ের মায়ায় প্রফেসর স্যার কষ্ট করে এসে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
গত কিছু দিন থেকে ছাগলনাইয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি কবির আহমদ সিদ্দিকী ভাই, অ্যাডভোকেট আব্দুল হাই চৌধুরীসহ বলেই আসছিলেন ইউনুছ ভাইকে নিয়ে কিছু করা দরকার। প্রায় মাস দুয়েক পূর্বে আইডিয়াল সোসাইটি কর্তৃক পরিচালিত বক্তার হাঁটে দারুল ইরফান আইডিয়াল একাডেমির বার্ষিক ক্রীড়া ও পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে গেলে অনুষ্ঠান শেষে ছাগলনাইয়া ইসলামিক সোসাইটির অফিসে মাওলানা আব্দুর রউফের সভাপতিত্বে “ইউনুছ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট” গঠন সংক্রান্ত অনুষ্ঠিত সভায় আমাকে সভাপতি এবং বিশিষ্ট সমাজসেবক মজিবুর রহমানকে সদস্য সচিব করে ২৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়।
সবাই একমত থাকলে “ইউনুছ স্মৃতি বৃত্তি” চালু করা যায় কি না সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। প্রতি বছর প্রচেষ্টা থাকবে তার ওফাত দিবসে সাধারণ সভা ও দোয়া করা। মনুর হাঁটে কবির আহমদ মজুমদার স্মৃতি পাঠাগার ও ফুলগাজীতে প্রফেসর ড. লোকমান লাইব্রেরি চালু করার বিষয়েও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গিয়েছে।
লেখক : ইউনুছ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সভাপতি।
