দরবার-এ শাহ
‘মিস্টার ক্লিন’ সুরঞ্জিত সম্পর্কে কিছু সুখবর
শুরুতে দু-একটি সুখবর শুনুন। প্রতিটি সুখবরই আবার অন্য সুখবরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রথম সুখবর হলো, ৭০ লাখ টাকার কেলেঙ্কারির কারণে মন্ত্রীর পদ থেকে ‘স্বেচ্ছায়’ সরে যাওয়া এবং ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই মন্ত্রীর পদে ফিরে আসা আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আবারও রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দিয়ে জাতিকে আশ্বস্ত করেছেন। দ্বিতীয় সুখবর হলো, মিস্টার সেনগুপ্তর বহুল আলোচিত সুপুত্র সৌমেন সেনগুপ্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছ থেকে ‘নির্দোষ’ হিসেবে মৌখিক সার্টিফিকেট পেয়ে গেছেন। আইসিএক্স লাইসেন্সের জন্য জুনিয়র সেনগুপ্ত ঠিক কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকা ঋণ এনেছেন সে বিষয়ে দুদক নাকি ‘সন্তোষজনক’ জবাব পেয়েছে। অতএব তিনি আইসিএক্স লাইসেন্সের প্রশ্নে তো বটেই, ‘খালাস’ পেতে যাচ্ছেন অন্য সব দিক থেকেও। সুপুত্রের দেয়া জবাবে দুদক এতটাই সন্তুষ্ট হয়েছে যে, তার সম্পদেরও আর হিসাব চাওয়া হচ্ছে না। তৃতীয় এবং এখনকার মতো শেষ সুখবরটুকু হলো, সুপুত্রের মতো পিতা সুরঞ্জিতও দুদকের ছাড়পত্র পাই পাই করছেন। কারণ, অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় মিস্টার সেনগুপ্তর সম্পৃক্ততা সম্পর্কে তদন্তের বিষয়টিকে আমলে নেয়নি দুদক। খবরটি ২১ মে প্রকাশিত হওয়ার পরদিনই দুদকের সচিব অবশ্য বলেছেন, মিস্টার সেনগুপ্তর এপিএস-এর নিখোঁজ ড্রাইভারের বক্তব্য না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না। বিজিবিকেও একটি পক্ষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। অর্থাৎ দুদকের ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য মিস্টার সেনগুপ্তকে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তা সত্ত্বেও সর্বাত্মক দুর্নীতির অভিযোগে এবং বিশ্বব্যাংক ও দাতা গোষ্ঠীর চাপের মুখে যোগাযোগমন্ত্রীর পদ হারানো সৈয়দ আবুল হোসেনের অভিজ্ঞতাসহ বিশেষ কিছু কারণে মনে করা হচ্ছে, ‘মিস্টার ক্লিন’ হিসেবে রাজনীতিতে মিস্টার সেনগুপ্তর ফিরে আসাটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। সৈয়দ আবুল হোসেন যেহেতু দুদকের সার্টিফিকেট যোগাড় করতে পেরেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং যেহেতু প্রকাশ্যেই সমর্থন জানিয়ে চলেছেন সেহেতু মিস্টার গুপ্তর জন্যও সার্টিফিকেট যোগাড় করাটা কঠিন বা অসম্ভব হবে না। জনগণের উচিত তাকে রাজনীতির মাঠে আবারও স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুতি নেয়া। এটা জবর সুখবরই বটে!
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমরা যা-ই মনে করি না কেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে মিস্টার সেনগুপ্তকে নিয়ে নিন্দা-সমালোচনার শেষই হচ্ছে না। এখনো জল্পনা-কল্পনা চলছে ওই ৭০ লাখ টাকা নিয়ে। পাঁচ কোটি টাকার বিনিময়ে সুপুত্রের আইসিএক্সের লাইসেন্স পাওয়ার পাশাপাশি নিজের নির্বাচনী এলাকায় বিশাল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ এবং কয়েকশ’ একর জমি দখল করার মতো কিছু বিষয় নিয়েও বিস্তর আলোচনা চলছে। কোনোভাবে ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর পরই সরকার কেন তাকে দফতরবিহীন মন্ত্রী বানিয়ে নতুন ফরমান জারি করেছে তার কারণ নিয়েও পর্যালোচনা কম হচ্ছে না। এরই মধ্যে হঠাৎ করে রাজনীতিতে ফিরে আসার ঘোষণা দিয়ে তাক লাগিয়েছেন মিস্টার সেনগুপ্ত। বেছে বেছে ঘোষণাও ঠিক সেই দিনটিতেই দিয়েছেন যেদিন ১৮ দলের নেতারা নিম্ন আদালতে গিয়েছিলেন জামিনের জন্য। ১৬ মে’র এ ঘটনাটিকে কাকতালীয় বা বিচ্ছিন্ন বলার সুযোগ আছে কি না পাঠকরা তা ভেবে দেখতে পারেন। কারণ, প্রধানত বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলীর গুমকেন্দ্রিক যে ইস্যুটির জন্য রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্প্রতি সংকট ঘনীভূত হয়েছে, হরতালের পর হরতাল এসেছে এবং সবশেষে অন্তত জনা চল্লিশেক নেতাকে কারাগারে ঢুকতে হয়েছে সে ইস্যুর সঙ্গে মিস্টার সেনগুপ্তর নাম জড়িয়ে রয়েছে প্রথম থেকেই। বিরোধী দল অভিযোগ করেছে, ইলিয়াস আলীকে গুম করার পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর ৭০ লাখ টাকার কেলেঙ্কারিকে আড়াল করা। অভিযোগ সত্য কি সত্য নয় সে ব্যাপারে জানার জন্য আরো অপেক্ষা করতে হবে সত্য তবে ইলিয়াস আলীর গুমকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহে আসলেও মিস্টার সেনগুপ্তর অর্থ কেলেঙ্কারি আড়ালে চলে গিয়েছিল। উল্লেখ্য, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত কোনো নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই হঠাৎ গুম হয়েছেন ইলিয়াস আলী। আওয়ামী লীগ সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে, তারা নিশ্চিত ছিলেন, সেনগুপ্তর ঘুষ কেলেঙ্কারীর কারণে শেখ হাসিনার সরকার ফেঁসে যাওয়ার পর এমন কিছু একটা ঘটবেই, যার মাধ্যমে জনগণের মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে নেয়া যাবে। গুমের মতো ভয়ঙ্কর কোনো পদক্ষেপের ব্যাপারে অবশ্য কেউই ভাবতে পারেননি। কিন্তু সেটাও হয়েছে। এখানে সময়ের ব্যবধানটা লক্ষ করার মতো। মিস্টার সেনগুপ্ত পদত্যাগ করেছিলেন ১৬ এপ্রিল আর ইলিয়াস আলী গুমের শিকার হয়েছেন ১৭ এপ্রিল।
৭০ লাখ টাকার কেলেঙ্কারিতে মিস্টার সেনগুপ্ত নিজে জড়িত ছিলেন কি না সে প্রশ্ন উঠলেও প্রতিষ্ঠিত সত্য হলো, টাকার বস্তা নিয়ে তার এপিএস তারই বাসার দিকে যাচ্ছিলেন। একই কারণে ফেঁসে গিয়েছিলেন তথাকথিত ‘মিস্টার ক্লিন’। অন্যদের ‘খবর’ বানানোর কর্মকাণ্ডে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠা মিস্টার সেনগুপ্তকে তাই ‘তীরবিদ্ধ’ হতে হয়েছিল। গুজবও যথেষ্টই ডালপালা মেলেছিল সে সময়। যেমন, শোনা গিয়েছিল, ৭০ লাখ নাকি ছিল একটি মাত্র চালানের অংশ, রেলওয়ের সাত হাজার পদে চাকরি দেয়ার নাম করে আদায় করা মোট অর্থের পরিমাণ নাকি চারশ কোটি টাকারও বেশি। শুধু তা-ই নয়, গুজবে আরো শোনা গিয়েছিল, লন্ডন ও ওয়াশিংটনসহ বিভিন্ন দেশে কারো কারো সুপুত্র ও ভগিনীসহ বিশিষ্টজনেরা বসবাস করেন বলে সেনগুপ্তর মতো কারো একার পক্ষে এত বিপুল পরিমাণ টাকা হজম করাটা মোটেও সম্ভব নয়। অর্থাৎ ধরা না পড়লে ওই টাকার ভাগ চলে যেতো সুদূর লন্ডন ও ওয়াশিংটন পর্যন্তও। কিন্তু সহজবোধ্য কারণেই অন্য সকলে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন, মাঝখান দিয়ে ‘ধরা’ খেয়ে ‘খবর’ হয়েছেন বেচারা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত!
ইলিয়াস আলীর গুমকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহে আরো অনেক বিষয়ও প্রাধান্যে এসেছে। কিন্তু সেদিকে যাওয়ার পরিবর্তে এখানে বরং অন্য কিছু প্রসঙ্গে দৃষ্টি ফেরানো যাক। যেনতেন মানুষ নন এবং অন্যদের খোঁচাখুঁচি যথেষ্ট করেছেন বলেই সুযোগ পাওয়া মাত্র সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সকলে। উদ্দেশ্য তাকে পাকড়াও করা হলেও অনেকে এমন মন্তব্যও করেছেন যেগুলো আসলে সঠিক নয় বরং প্রশ্নসাপেক্ষ। যেমন বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর ‘মতো’ এত ‘বিরাট মাপের’ রাজনীতিক ও পার্লামেন্টারিয়ানের কাছে তারা নাকি এতটা ন্যক্কারজনক কেলেঙ্কারি আশা করেননি। অনেকে তাকে মুক্তিযুদ্ধের ‘সংগঠক’ও বলেছেন। এ ধরনের মন্তব্যের সুযোগ নিয়ে মিস্টার সেনগুপ্ত নিজেও ১৬ মে’র সংবাদ সম্মেলনে যথেষ্ট দাপটের সঙ্গেই ঘোষণা করেছেন, ৫৫ বছরের অর্জন নাকি মাত্র ৫৫ সেকেন্ডে নস্যাৎ হয়ে যেতে পারে না!
আমরা অবশ্য কোনো মন্তব্যকেই বিনাপ্রশ্নে ছাড় দেয়ার পক্ষপাতী নই। কারণ, প্রথমত মিস্টার সেনগুপ্ত মোটেও মুক্তিযুদ্ধের ‘সংগঠক’ ছিলেন না। স্বাধীনতার আগে তিনি যুক্ত ছিলেন ‘মস্কোপন্থী’ ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও কোলকাতায় গিয়ে হাওয়া খাওয়া, ফুর্তি করা এবং থিয়েটার রোডে গঠিত অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রিত্ব পাওয়ার জন্য ঝামেলা পাকানো ছাড়া গঠনমূলক তেমন কিছুই করেননি দল দুটির নেতারা। সেকালে প্রচারণা ছিল, মস্কোতে বৃষ্টি হলে কমরেড মণি সিং ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদরা নাকি ঢাকায় ছাতা মাথায় ধরতেন! সেই মস্কো তথা অধুনালুপ্ত সোভিয়েট ইউনিয়ন ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্তও বাংলাদেশকে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হিসেবে উল্লেখ করেছে, ‘রাজনৈতিক সমাধানের’ জন্য পাকিস্তান সরকারকে চাপ ও পরামর্শ দিয়েছে। সুতরাং আর যা-ই হোক, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর পক্ষে অন্তত মুক্তিযুদ্ধের ‘সংগঠক’ হওয়ার সুযোগ ছিল না। তাছাড়া বযসও তার এমন কিছু ছিল না যে, তিনি ‘সংগঠক’ হয়ে যাবেন। কথাটা ভালো না লাগলে যে কেউ মিস্টার সেনগুপ্তকেই জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন। তিনি যদি মুক্তিযুদ্ধের ‘সংগঠক’ হিসেবে ভূমিকা পালন করার পক্ষে তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারেন তখন না হয় ওপরের কথাগুলো প্রত্যাহার করা যাবে।
‘বিরাট মাপের’ রাজনীতিক ও পার্লামেন্টারিয়ান বিষয়ক মন্তব্য সম্পর্কেও কথা আছে। শরীরের দৈর্ঘ্য বা উচ্চতাকে যদি মানদণ্ড করা হয় তাহলে মিস্টার সেনগুপ্ত নিশ্চয়ই ‘বিরাট মাপের’ একজন মানুষ! কিন্তু কেবলই শরীরের দৈর্ঘ্য বা উচ্চতা কোনো মানুষকে ‘বিরাট মাপের’ রাজনীতিক ও পার্লামেন্টারিয়ান বানায় না। একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৭০-এর নির্বাচনে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য বা এমএনএ হননি, হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য তথা এমপিএ। তিনি ছিলেন তিনশ এমপিএ’র মধ্যে একজন। স্বাধীনতার পর নতুন নির্বাচন দেয়ার পরিবর্তে এই পাকিস্তানী এমএনএ এবং এমপিএদের সমন্বয়েই সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ‘গণপরিষদ’ গঠন করা হয়েছিল। এর সদস্যদের বলা হতো এমসিএ বা মেম্বার অব কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি। মিস্টার সেনগুপ্ত সে প্রক্রিয়ায় অনেকাংশে বিরোধী দলীয় এমসিএ’র ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তথ্যটি হলো, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ তো ছিলই, ‘মস্কোপন্থী’ ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির দাবি অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সরকার সমাজতন্ত্রকেও সংবিধানের মূলনীতি বানিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও মিস্টার সেনগুপ্ত বাহাত্তরের ওই সংবিধানে স্বাক্ষর করেননি, ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন। বাহাত্তরের সে সংবিধানের জন্যই বিগত কয়েক মাসে তাকে অনেক লম্ফঝম্ফ করতে দেখা গেছে। এতটাই ‘বিরাট মাপের’ পার্লামেন্টারিয়ান তিনি!
কথা শুধু এটুকুই নয়। সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত সংসদীয় কমিটির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যে ভূমিকা পালন করেছেন তাকেও ‘বিরাট মাপের’ কোনো পার্লামেন্টারিয়ানসুলভ বলার উপায় নেই। কারণ, ১৯৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট দেয়া হাই কোর্টের একটি রায়কে অবলম্বন করেছেন তারা। বিতর্কিত এই রায়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। রায়টি নিয়ে বিতর্ক চলে এসেছে প্রথম থেকে। ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, দুই বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও ফজলে কবির নিজেদের এখতিয়ারের সীমা অতিক্রম করে রায়টি দিয়েছিলেন। কারণ, যে মামলার পরিপ্রেক্ষিতে রায়টি দেয়া, সে মামলার আবেদনে পঞ্চম সংশোধনী কোনো বিষয় ছিল না। মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল পুরনো ঢাকার মুন সিনেমা হলের মালিকানা নিয়ে। এ ধরনের কোনো মামলার রায়ে পঞ্চম সংশোধনীর মতো রাষ্ট্রীয় বা সংবিধানের এমন কোনো বিষয়কে টেনে আনা সমীচীন হয়নি, যার সঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদ জড়িত রয়েছে। কারণ, সংশোধনীসহ সংবিধান সংক্রান্ত সকল বিষয়ে এখতিয়ার কেবল জাতীয় সংসদেরই। অন্যদিকে দুই বিচারপতি অযাচিতভাবে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম ধরে টান মেরেছেন, পঞ্চম সংশোধনীকে বাতিল ঘোষণা করেছেন। অথচ পঞ্চম সংশোধনী দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদে পাস হয়েছিল। এটা ছিল একটি ‘অ্যাক্ট অব পার্লামেন্ট’। সেটা বাতিল বা সংশোধন করার এখতিয়ারও একমাত্র সংসদেরই, বিচারপতিদের নয়। এজন্যও আর একটি ‘অ্যাক্ট অব পার্লামেন্ট’ই দরকার ছিল। তাছাড়া বিচারপতি খায়রুল হকের সর্বশেষ বিতর্কিত রায়টিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হলেও পরবর্তী দুটি নির্বাচন ওই সরকারের অধীনে করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু রায়ের ‘আলোকে’ সংবিধান সংশোধন করলেও মিস্টার সেনগুপ্তরা সেদিকে যাওয়ার নাম করেননি। পরিষ্কার হয়েছে, কত ‘বিরাট মাপের’ পার্লামেন্টারিয়ান তিনি!
দ্বিতীয়ত, প্রধান বিরোধী দল বিএনপির জন্য সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত সংসদীয় কমিটিতে একটি মাত্র সদস্যপদ দেয়া হয়েছিল। প্রতিবাদে বিএনপি অংশ নেয়নি, কিন্তু তা সত্ত্বেও মিস্টার সেনগুপ্তরা সংবিধান সংশোধন করে ছেড়েছেন। তৃতীয় উদাহরণ হিসেবে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে মিস্টার সেনগুপ্তর মনোভাবের কথা উল্লেখ করতেই হবে। ‘সর্বদলীয়’ নামের সংসদীয় কমিটিতে জামায়াতে ইসলামীর কাউকে রাখা হয়নি। রাখা যে হবে না সে ঘোষণার দেয়ার ব্যাপারে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে প্রথম থেকেই সোচ্চার দেখা গেছে। টিভির টকশোসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, জামায়াতকে ‘রাখার প্রশ্নই ওঠে না’। অন্যদিকে সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠেছিল, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার তাদের রয়েছে কি না। কারণ, আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির পর জামায়াত বাংলাদেশের চতুর্থ জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। ১৯৮৬ সাল থেকে প্রতিটি সংসদে জামায়াত প্রতিনিধিত্ব করে এসেছে। বর্তমান সংসদেও দলটির প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। সুতরাং ‘সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল’ দলগুলোর সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হলে সে কমিটিতে জামায়াতের এমপিদের রাখা উচিত ছিল। এটাই গণতন্ত্রের নির্দেশনা। প্রসঙ্গক্রমে ২০০৮ সালের ‘ডিজিটাল’ নির্বাচনের কিছু তথ্য-পরিসংখ্যান স্মরণ করা দরকার যেগুলো মিস্টার সেনগুপ্তদের যুক্তি, দাবি ও সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে না। কারণ, জেনারেল মইন উ’দের চমৎকার ব্যবস্থাপনায় এবং ভারতের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে দেশের প্রধান দল বিএনপির পাশাপশি জামায়াতকেও হারিয়ে দেয়া হয়েছে সত্য, কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে প্রমাণিত হয়নি যে, জনপ্রিয়তা ও প্রাপ্ত ভোটের দিক থেকে জামায়াত পরাজিত হয়েছে। জামায়াতের বরং ভোট অনেক বেড়েছে এবং সবচেয়ে রক্ষণশীল হিসাবেও দেখা গেছে, জামায়াতের অন্তত ৫৮ লাখ ৯৮ হাজার ভোট রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীকে মিস্টার সেনগুপ্ত তাদের সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে জায়গা দেননি। এতটাই ‘বিরাট মাপের’ পার্লামেন্টারিয়ান ও গণতন্ত্রী তিনি! বলা দরকার, কেবলই পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বললেই কেউ ‘বিরাট মাপের’ পার্লামেন্টারিয়ান হয়ে যান না। তাকে নীতি-নৈতিকতা এবং গণতন্ত্রের নির্দেশনাও মেনে চলতে হয়। অন্যদিকে মিস্টার সেনগুপ্ত কিন্তু তেমন নজীর তৈরি করতে পারেননি। বাহাত্তরের সংবিধানকেন্দ্রিক নাটকীয়তা থেকে জামায়াতের ব্যাপারে লম্ফঝম্ফ পর্যন্ত কর্মকাণ্ডের কথা স্মরণ করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
এদিকে জামায়াতের ব্যাপারে যথেষ্ট দেখালেও বৃহত্তর রাজনীতির ক্ষেত্রে মিস্টার সেনগুপ্ত কিন্তু আহামরি কিছুই দেখাতে পারেননি। একটি উদাহরণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সংস্থাপন মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। ২০১০ সালের জুলাই মাসে সরকার বেআইনিভাবে দু’জন বিচারককে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছিল। সে কর্মকাণ্ডে প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন এইচটি ইমাম। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সে সময় এইচটি ইমামকে কমিটির সামনে তলব করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও অনেক হম্বিতম্বি করেছিলেন তিনি। কিন্তু হাজির হওয়া দূরের কথা, ডাকসাঁইটে উপদেষ্টা এইচটি ইমাম উল্টো সুরঞ্জিতের এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি সেই সঙ্গে বলেছিলেন, তাকে ‘তলব’ করার নেপথ্যে দলের ভেতরকার ‘কারো কারো’ বিশেষ ‘উস্কানি’ থাকতে পারে। বলা বাহুল্য, ‘কারো কারো’ বলতে তিনি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকেই বুঝিয়েছিলেন। এখানে সার কথা হলো, এইচটি ইমামকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সামনে হাজির করতে পারেননি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। কার্যপ্রণালী বিধির ২০৩ ধারায় দেয়া ক্ষমতাবলে যে কাউকে ডেকে পাঠানোর এখতিয়ার থাকা সত্ত্বেও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তই সেবার উল্টো পশ্চাদপসরণ করেছিলেন। এইচ টি ইমাম একথাও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তার মতো উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ‘উস্কানি’ দিয়ে কোনো ‘লাভ’ হবে না। এইচ টি ইমামের এই একটি কথা অবশ্য সত্য হয়নি। কারণ, যা কিছু অর্জন করার তার প্রায় সবই করে ফেলেছেন মিস্টার সেনগুপ্ত। মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন, ঘুষ কেলেঙ্কারিতে বিতাড়িত হলেও মন্ত্রিত্ব এখনো বহাল রয়েছে তার। এর পেছনেও আছে কিছু বিশেষ কারণ। প্রধান কারণ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর প্রতি ভারতের আশীর্বাদ। পাঠকদের মনে পড়তে পারে, ২০১০ সালের ৭ আগস্ট ঢাকায় ঝটিকা সফরে এসে অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি আওয়ামী লীগের তিন সিনিয়র নেতার সঙ্গে গোপন বৈঠক করে গেছেন। আমির হোসেন আমু এবং তোফায়েল আহমদের সঙ্গে বৈঠকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও ছিলেন। বৈঠকটিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য পরোক্ষ ‘ধমক’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলা হয়েছিল, প্রণব মুখার্জি বুঝিয়ে গেছেন, ঢাকায় আওয়ামী লীগের মধ্যেই ভারতের ‘সেকেন্ড লাইন’ রয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রচারণা রয়েছে, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ ‘র্যাটস’ নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠা আওয়ামী লীগের চার নেতা মইন উ’দের আমলে শেখ হাসিনাকে ‘মাইনাস’ করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়ে রেখেছেন আওয়ামী লীগের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল। প্রণব মুখার্জির বৈঠকের সময় যেমন বলা হয়েছিল এখনও তেমনি বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনা যদি কোনো কারণে ‘অবাধ্য’ হওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে ভারত তার ‘সেকেন্ড লাইন’কে অর্থাৎ ‘র্যাটস’ নামে পরিচিত চার নেতাকে কাজে লাগাবে (যদিও আবদুর রাজ্জাক কিছুদিন আগে মারা গেছেন)। ‘র্যাটস’-এর মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আবার প্রণব মুখার্জির ‘বন্ধু’ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছেন অনেক আগেই। বলা হচ্ছে, মূলত প্রণব মুখার্জির মাধ্যমে ভারতের আশীর্বাদই এত বড় কেলেঙ্কারির পরও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে রক্ষা করেছে। ভবিষ্যতেও বিপদে রক্ষাই শুধু করবে না তাকে এমনকি আরো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানেও পৌঁছে দিতে পারে। এজন্যই বর্তমান পর্যায়ে বলে রাখা যায়, দুদক যতো ইঙ্গিতই দিক না কেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও নেই। কারণ, ভারত তার ‘সেকেন্ড লাইন’কে নষ্ট হতে দেবে না। একই কারণে সুরঞ্জিত সমাচারেরও সমাপ্তি খুব সহজে হচ্ছে না। বড়জোর ছোটগল্পের সেই সংজ্ঞার অনুকরণে বলা যেতে পারেÑ ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’!
