কল্যাণীয়াসু,
আসসালামু আলাইকুম।
গত চিঠিতে তোমার খালেদ চাচার কথা শেষ করতে পারিনি। আসলে মহৎ মানুষের কথা বলে শেষ করা যায় না। তখন তিনি বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারে সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। সেন্টারের চেয়ারম্যান ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহীম। খালেদ ভাই প্রতি মাসে সেমিনারের আয়োজন করতেন। সেসব সেমিনার ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রবেশাধিকার ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। আয়োজকের আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও দক্ষতা এবং বিষয়-বৈচিত্র্যের কারণে ডান ঘরানার সাংস্কৃতিক কর্মীরা প্রতি মাসের সেমিনারে হাজির হতেন। বলতে কি, একটা সেমিনার শেষ হলে আরেকটা সেমিনারের জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। মনে আছে, ‘ইসলামে সঙ্গীত’ বিষয়ে সিরিজ সেমিনারের আয়োজন করেছিলেন খালেদ ভাই। মূল বক্তা ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহীম। অনেক নতুন নতুন তথ্য দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, জ্ঞাত ও অজ্ঞাতসারে সব মানুষই গান গায়। গুন গুন করে না, নিদাঘ দুপুরে বা গভীর নিশীথে একলা পথ চলতে সুর তোলে না, এমন মানুষ কি ভবে খুঁজে পাওয়া যাবে? আরো এগিয়ে তিনি বলেছিলেন, এ যুগে বাথরুম সিংগার কে নয়? বলেছিলেন মানুষ জোর করে গান গায় না, গান মানুষের হৃদয়ে, এমনকি ধমনীতে বিদ্যমান। মানুষ সুখে গান গায়, দুঃখেও গান গায়। এ বিষয়ে তিনি আনন্দ-গাথা ও শোক-গাথার কথা উল্লেখ করেছিলেন। আমাদের লোকজ গানের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা তিনি করেছিলেন। বলেছিলেন এসবের মধ্যে আল্লাহ-প্রেম আছে, আছে রাসূলপ্রীতি। মারফতিরা না-জেনে, না-বুঝে শেরেক ঢুকিয়েছে, সে অন্য কথা। আমাদের মাঝিরা গলায় গান না তুললে নৌকা বাইতে পারে না। আমাদের গাড়োয়ালরা গলায় সুরের লহরী না তুললে মনের আনন্দে গরুর গাড়ি চালাতে পারে না। আমাদের কিষানরা সমবেত কণ্ঠে গান না গাইলে ধান কাটতে পারে না। এভাবে লোকজ সকল পেশার সাথে গান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পেশা উঠে গেলে গানও উবে যাবে। তিনি ড. কারজাভিসহ আধুনিক যুগের বড় বড় আলেমের উদ্ধৃতি দিয়ে সঙ্গীতের স্বপক্ষেই কথা বলছিলেন। তাঁর কথার সাথে একমত হতে পারেননি প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আলাউদ্দীন আল-আজহারীসহ আরও বেশ কয়েকজন আলেম। তাঁরাও বাঘা বাঘা যুক্তি উত্থাপন করেছিলেন। তবে তাঁরাও স্বীকার করেছেন রাসূলের সময়ে এই গান হতো। গান একেবারে নিষিদ্ধ ছিল না।
আরেকবার ছবি, প্রতিচ্ছবি, স্ট্যাচু- এসব নিয়ে সেমিনার ছিল। মনে আছে মাওলানা আব্দুর রহীম বলেছিলেন, অর্ঘ্য দানের জন্য, পূজার জন্য বা ফুলের মালা জড়িয়ে ভক্তি প্রকাশের জন্য ঘরে ছবি রাখা যাবে না। রেফারেন্সের জন্য, কার্যকারণের জন্য, রেকর্ডের জন্য ছবি রাখা যাবে। কার্পেটে কার্টুন বা ছবি থাকলেও ক্ষতি নেই। কারণ, ওই কার্টুন বা ছবিকে তো আমরা ভক্তি বা শ্রদ্ধা করছি না। পায়ে দলছি। এভাবে খালেদ ভাই বেছে বেছে আধুনিক বিষয়গুলো উপস্থাপন করতেন। বিষয়ের এক্সপার্টদের ডেকে আনতেন। তরুণদের মনে যেসব বিষয় নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন জাগতো, তার সঠিক জবাব সংগ্রহের চেষ্টা করতেন। খালেদ ভাই জানতেন, সবার মনে প্রশ্ন জাগে না, প্রশ্ন জাগে বিশেষ করে সাহিত্য ও সংস্কৃতি কর্মীদের। কারণ তাদের লিখতে হয়, গাইতে হয়, বলতে হয়, নাটক করতে হয়, সিনেমা করতে হয় এবং নানা ধরনের উপস্থাপনায় জড়াতে হয়। এ ক্ষেত্রে ‘দূরে থাক’ বা ‘এড়িয়ে চল’ বললে কাজের কাজ কিছু হবে না। একজন সাধারণ ধর্মনিষ্ঠ মানুষ সাহিত্য, সংস্কৃতি বা বিনোদনকে হয়তোবা চাপের মুখে এড়িয়ে চলতে পারবে (বাস্তবে পারবে না) কিন্তু, সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ চাপের মুখেও তার বোধ ও জীবনাচরণ থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে পারবে না। সে গান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবে না, পারবে শুধু পরহেজ করতে। সংস্কৃতি ক্ষেত্রে পরহেজগারির কৌশল উদ্ভাবনের চেষ্টা করেছিলেন খালেদ ভাই। ধর্মের পরহেজগারি আর সংস্কৃতির পরহেজগারি একই সমান্তরালের বিষয় নয়। ধর্মে মুখ্য ‘না’ আর সংস্কৃতিতে মুখ্য হলো ‘হ্যাঁ’। হ্যাঁ-কে সংস্কার করা, পরিশীলিত করা, ধর্মানুবর্তী করা, মনন-নির্ভর করাই সংস্কৃতির কাজ। ধর্মের কাজ মোটামুটি সহজ ও সরল। সংস্কৃতির কাজ অত্যন্ত জটিল ও ভয়াবহ।
এই ভয়াবহ কাজের কৌশল তিনি আমাদের জানানোর চেষ্টা করেছেন। সংস্কৃতির ময়দানে এখন আর তেমন প্রাজ্ঞ ব্যক্তির উপস্থিতি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। আবারো তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তির সাথে স্মরণ করছি। তাঁর সকল ভালো কাজ আল্লাহ কবুল করুন। তাঁর সন্তান-সন্ততিদের আল্লাহ সুখে শান্তিতে রাখুন এবং তাঁকে যেন মহান আল্লাহ বেহেশতে উচ্চ মর্যাদা দান করেনÑ এই দোয়া করে আজ এখানেই ইতি টানছি।
-মাহবুবুল হক
