ঢাকা শুক্রবার ১ আষাঢ় ১৪১৯, ২৪ রজব ১৪৩৩, ১৫ জুন ২০১২

‘আওয়ামী’ বিরোধী বাজেট হতাশ জনগণ

॥ আহমাদ সালাহউদ্দীন॥
শাব্দিক অর্থ অনুযায়ী ‘আওয়ামী লীগ’ হচ্ছে জনগণের দল। আর বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় বর্তমানে আসীন আওয়ামী লীগ নিজেদের সব সময় ‘জনগণের দল’ বলেই উচ্চৈঃস্বরে দাবি করে থাকে। কিন্তু সেই আওয়ামী লীগ এবার রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে শেষ পর্যন্ত আরো একবার ‘আওয়ামী বিরোধী’ বাজেট উপহার দিলো। এমনকি খোদ আওয়ামী লীগাররাই এবারের এই চরম গণবিরোধী বাজেটে হতাশ হয়ে পড়েছেন। গত ৭ জুন জাতীয় সংসদে আগামী ২০১২-১৩ অর্থবছরের জন্য পেশ করা ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার জাতীয় বাজেটে এবার কর আর ঋণের ছড়াছড়ি। যে করের বেশির ভাগই দিতে হবে গরিব মানুষকে। বর্ধিত আয়কর ও ব্যাপক ভ্যাট ছাড়াও এখন থেকে টেলিফোনে যতো কথা বলা হবে ততো ট্যাক্স দিতে হবে। রাস্তা ব্যবহারের জন্যও দিতে হবে ট্যাক্স। সকল ব্যাংক এ্যাকাউন্টধারীর ওপর বসানো হয়েছে ট্যাক্সের খড়গ। রফতানিকারকদের ওপর দ্বিগুণ হারে উৎসে কর আরোপ করা হয়েছে। ফলে তাদের রফতানি আয় এবং কর্মসংস্থানের পরিমাণ হ্রাস পাবে বলে তারা জানিয়ে দিয়েছে। অপর দিকে বাজেটে ৫২ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি মেটানো হবে দেশ-বিদেশ থেকে নেয়া ঋণের মাধ্যমে। ফলে দেশে বিনিয়োগ হ্রাস পাবে এবং বাড়বে মূল্যস্ফীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেয়া শর্তানুযায়ী এ বাজেট প্রণয়ন করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রীকে প্রচুর জনবিরোধী পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। কমাতে হয়েছে কৃষি ভর্তুকি। এর ধারাবাহিকতায় আগামী মাসেই আরেক দফা বাড়াতে হবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই জ্বালানি তেলের ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দিতে হবে। যার পরিণতিতে দেশে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে বলে অর্থনীতিবিদেরা হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। এবারের বাজেটে সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, রফতানিকারক, আমলা, পেশাজীবী কেউই খুশি হতে পারেননি। গত সাড়ে তিন বছরে আওয়ামী লীগের কিছু মন্ত্রী, এমপি ও রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ীদের ব্যাপক লুটপাট ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকাকে সাদা করার বিতর্কিত সুযোগ দেয়া হয়েছে বাজেটে। বিপুল পরিমাণ এই কালো টাকা যাতে আওয়ামী লীগ নেতাদের পাওয়া নতুন ব্যাংকে পুঁজি হিসেবে আনা যায়, সেজন্য এবার কালো টাকা সাদা করার কোনো সুনির্দিষ্ট খাত উল্লেখ করা হয়নি বলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি অভিযোগ করেছে। এই পদেেপর সমালোচনা করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ বলেছে, নির্বাচনের আগে এটি দুর্নীতির কাছে শাসক দলের ‘রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ’। সিপিডি বলেছে, অর্থমন্ত্রী মুহিতের ঘোষিত এবারের বাজেটে ভাবদর্শন ছাড়া বাস্তব কোনো দর্শন নেই। বর্তমান অদক্ষ ও অযোগ্য সরকারের পক্ষে এ বাজেট বাস্তবায়ন করাও সম্ভব নয়। বিশেষ করে সরকারের এ শেষ অর্থবছরটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে গেলে বাজেট বাস্তবায়ন ও রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি ভয়ানক সংকটে পড়বে।         

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেছেন, বাজেট বিশ্লেষণের জন্য সামগ্রিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা দরকার। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন বিপরীতমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ দেশের অর্থনীতি প্রতিশ্রুতিশীল এবং বর্ধনশীল হলেও তা বর্তমানে প্রচণ্ড ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন। মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট বেড়েই চলেছে। তার ওপর বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা বাড়ছে। এমন ঝুঁকির মাঝে আইএমএফকে দেয়া প্রতিশ্রুতি মেনে এ ধরনের বাজেট প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন খুবই দুরূহ কাজ। অর্থমন্ত্রী নিজেই বাংলাদেশের অর্থনীতির ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি আইএমএফের কাছে লিখিতভাবে স্বীকার করেছেন উল্লেখ করে ড. আকবর আলি খান আরো বলেন, এই ঝুঁকি নিরসনের উদ্দেশ্যেই আইএমএফের কাছে ব্যাপক হারে অভ্যন্তরীণ কর বৃদ্ধি ও সব ধরনের ভর্তুকি হ্রাসের মতো কিছু ‘অজনপ্রিয়’ শক্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনের আগের বছরে ৩ বছর মেয়াদি ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি করা হয়েছে। এই চুক্তির ধারাবাহিকতায় দাতাদের কাছ থেকে আগামী ৩ বছরে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় আরো ১৯ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সহায়তার আশা করছে সরকার। সরকারের জন্য আইএমএফকে যেমন প্রয়োজন হয়েছে তেমনি অন্য দাতাদেরও প্রয়োজন হচ্ছে। তবে তারা দাতাদের সঙ্গে যেভাবে কথা বলছে তাতে করে এ সহায়তা পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। এখন ওই দাতাদের অর্থ পেতে আইএমএফের দেয়া লক্ষ্য ও নির্দেশনা মেনে চলতে হলে আগামী নির্বাচনী বছরটি সরকারের জনপ্রিয়তার জন্য অনেক সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। পদ্মা সেতুর মতো অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নেই মালয়েশিয়া বা ভারতের কাছ থেকে আর উচ্চসুদে অর্থ নেয়া যাবে না। আবার আইএমএফকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হলে আইএমএফের আস্থা হারিয়ে বাংলাদেশ তার পাওনা অবশিষ্ট ঋণসহ বিদেশী দাতাদের ওই ১৯ বিলিয়ন ডলারের সহায়তাও হারাবে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে এক ব্যাপক নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।

আকবর আলি খান বলেন, জ্বালানী খাতে বাংলাদেশ বর্তমানে বড় ধরনের আমদানি নির্ভর দেশে পরিণত হয়েছে। এটা সরকারের জন্য এক মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। পাঁচ বছর আগেও এ ধরনের সমস্যা ছিল না। তখন জ্বালানির বড় উৎস ছিল নিজেদের গ্যাস। এখন কুইক রেন্টালের ফাঁদে পা দিয়ে সরকার শুধু নিজেরই নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিরই বিপদ ডেকে এনেছে। জ্বালানি সমস্যার সমাধান আগে না করে সরকার বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করতে গেছে; যা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়ার শামিল হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ নিয়ে সরকার ও জনগণের দু’ ধরনের দুঃখ রয়েছে। সরকারের দুঃখ হচ্ছে, তাদের উৎপাদিত নতুন বিদ্যুতের জন্য তারা কারো কাছ থেকে কোনো সুনাম পাচ্ছে না। আর জনগণের দুঃখ হচ্ছে, লোডশেডিংয়ের ভূত তাদের কাঁধ থেকে নামছেই না। সুতরাং লোডশেডিংয়ের ‘ইঁদুর’ যখন খেতে পারছে না সরকারের বেড়ালটি, তখন সেই বেড়াল কালো না সাদা তা দেখার অবকাশ কোথায়? অবশ্য সরকারের নীতি-নির্ধারকদের লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা পোহাতে হয় না বলে তারা বিষয়টি বুঝতেও পারেন না। সরকার যত না বেসরকারি বিদ্যুৎ গত দু’ বছরে নতুনভাবে উৎপাদনে সহযোগিতা দিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি সরকারি বিদ্যুৎ এ সময়ে গ্রিড থেকে হারিয়ে গেছে অভিযোগ করে ড. আকবর আলি খান আরো বলেন, আইএমএফের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকার বাজেট থেকে এবার জ্বালানি খাতকে পৃথক করে ফেলেছে। যার পরিণতি এ বছরের শেষদিকে গিয়ে জনগণ বুঝতে পারবে। কারণ তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকবে এবং তার হাত ধরে বাড়বে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যও। ফলে মূল্যস্ফীতি বছরের শেষার্ধে আবারও ব্যাপকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হবে এবং ব্যাংক সুদের হারও বেড়ে গিয়ে কমতে থাকবে বিনিয়োগের পরিমাণ। আর আইএমএফের নির্দেশনা না মানলে সরকারকে আবারো দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ব্যাপকভাবে ঋণ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। তিনি বলেন, আমরা সরকারকে প্রশংসা করবো যদি সরকার বলে, কি পরিমাণ উৎপাদন ক্ষমতার কতগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি ও অন্যান্য সংকটে বর্তমানে বন্ধ হয়ে আছে এবং প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্তমান বাস্তব চিত্র কি? সেই সাথে সরকার যদি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে কোন সরকার এলো আর কোন সরকার গেলো তা বড় কথা নয়। বড় কথা লোডশেডিং বন্ধ হয়েছে কিনা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রিত কিনা। আকবর আলি খান মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে বলেন, ইদানীং সরকারের কেউ কেউ বলেন, মূল্যস্ফীতি নাকি খারাপ কিছু নয়। কিন্তু মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, সুদের হার বাড়ায়, বিনিয়োগ হ্রাস করে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়। ৯ থেকে ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি অবশ্যই কষ্টের। এটি গরিব এবং যাদের আয় স্থির তাদের জন্য খুবই দুঃখের। তিনি আরও বলেন, গত ৩ বছরে মূল্যস্ফীতি ২৫ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর বাজেটে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। এর জন্য কি করা হবে তা বলা নেই। বিগত বছরগুলোতেও একই আশ্বাস দেয়া হয়েছিল এবং ল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে অর্থনীতিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলা আছে। এখন আইএমএফ পর্যন্ত বলছে, আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকবে। আকবর আলি খান বলেন, সরকারের মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী আসছে অর্থবছরে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ কমে যাবে। কিন্তু এ দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি বেসরকারি খাত। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ কমলে তা উদ্বেগের কারণ হবে।

২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট খাতাকলমে অনেকটা ‘ব্যাকরণসিদ্ধ’ হলেও এ বাজেটকে সৃষ্টিশীলতা ও চমকহীন মন্তব্য করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, দেশের ভেঙে পড়া আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষায় এতে নতুন কোনো রক্ষাকবচ নেই। বাস্তব দর্শনহীন এবারের বাজেটে বরং অনেক ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণও উচ্চাভিলাষী। এটা অর্জন করার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের তেমন কোনো পদপে নেই। বর্তমান বছরের চেয়ে আগামী অর্থবছরে ১ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে কমপক্ষে ৮০ হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন, যার কোনো দিকনির্দেশনা নেই এ বাজেটে। নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে বেঁধে রাখার যে আশার কথা বলেছেন, তা অত্যন্ত কঠিন হবে উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমতির দিকে হলেও পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে। আর গড় মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশের বেশি। বাজেটে যেসব ইংগিত দেয়া হয়েছে, তাতে এ কথা স্পষ্ট যে, আগামীতে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম আরো বাড়তে পারে। সেেেত্র খাদ্যপণ্যসহ খাদ্য বহির্ভুত পণ্যের দাম আরো বাড়বে। তখন মূল্যস্ফীতিও উর্ধ্বমুখী হবে। সে অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই দুরূহ হবে। দেবপ্রিয়র মতে, এই বাজেটের ল্য পূরণের জন্য যে নীতি-কাঠামো প্রয়োজন, তা অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবে নেই। অর্থমন্ত্রীর উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে ‘প্রশাসনিক বিপ্লব’ প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে প্রকৃত ও সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় সুকৌশলে এ বিষয়ে কিছু বলেননি। অর্থ বিলে একটি সংশোধনী এনে অনেকটা আড়াল করে এই সুযোগ দেয়া হয়েছে। বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণীর  ন্যূনতম কর ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার টাকা করার প্রস্তাবেরও সমালোচনা করে দেবপ্রিয় বলেন, ব্যাপক মূল্যস্ফীতির কারণে সবাই ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ করার প্রস্তাব করেছিল। অর্থমন্ত্রী তাতে সাড়া না দেয়ায় সবাই হতাশ হয়েছে। এটা ন্যায্যতার পরিপন্থী। কিন্তু আরো অবাক করার বিষয় হলো ন্যূনতম কর ৩ হাজার টাকা করা হয়েছে। ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির বাজারে এটা সামাজিক ন্যায়ের পরিপন্থী। এর মাধ্যমে কম আয়ের মানুষদেরও করের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। অন্যদিকে বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৩৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তার মধ্যে ২৩ হাজার কোটি টাকাই নেয়া হবে ব্যাংক থেকে। বাস্তবে এটা আরো বেড়ে যাবার আশংকা রয়েছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ব্যাপকভাবে কমে যাবে এবং বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হবে। ড. দেবপ্রিয় বলেন, অর্থমন্ত্রী এর আগে বলেছিলেন, চলতি অর্থবছরের ভর্তুকির একটি অংশ পরের অর্থবছরের বাজেটেও স্থানান্তর করা হবে। কিন্তু এবার বাজেট প্রস্তাবে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। বাজেটে সামগ্রিকভাবে মোট ভর্তুকির পরিমাণ কতো হবে তাও উল্লেখ করা হয়নি। এর মাধ্যমে বিষয়টি অস্বচ্ছতার আবরণে ঢেকে রাখা হয়েছে।

ওদিকে ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ঋণের দিকে সরকারের এই নজর ভালো চোখে দেখছে না ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা। বাজেটের তাৎণিক প্রতিক্রিয়ায় এফবিসিসিআই সভাপতি এ কে আজাদ ব্যাংক ঋণের ল্যমাত্রার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রীর কাছে। ঘোষিত বাজেটের তাৎণিক প্রতিক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, এই বাজেট বাস্তবায়ন দুঃসাধ্য। মির্জ্জা আজিজের সংশয় বাজেটের অর্থায়ন নিয়ে। তার মতে, অর্থমন্ত্রী বাজেটে যেসব উৎস থেকে অর্থ আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন, বাস্তবে সেসব খাত থেকে প্রত্যাশিত অর্থ আসবে না। প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে রাখা যাবে কিনা, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন মির্জ্জা আজিজ। বাজেটের ল্যমাত্রা পূরণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের একক সর্ববৃহৎ সমিতি ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি আসিফ ইব্রাহীম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাজেট বাস্তবায়নকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। এটা শুধু ঢাকা চেম্বারের মত নয়, বাংলাদেশ থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম পণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এইচএনএমের শীর্ষ কর্মকর্তারাও এ কথা বলেছেন। তাই এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থতিতে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের আয় কমে যাবে এবং এর প্রেক্ষিতে সরকারের রাজস্ব প্রাপ্তিও হ্রাস পাবে। আর এই রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে মূলত সরকারই দায়ী বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ পরিস্থিতি নিয়ে “বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে এক ধরনের ঝড় আসছে” ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এমন মন্তব্যের বিষয়ে ঢাকা চেম্বার সভাপতি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত যখন কোনো মন্তব্য করেন, তখন তা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এ বিষয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জন্য ছিল ১৮ দশমিক ২ শতাংশ। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক অনুদানসহ সরকারের সর্বমোট আয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৬৮ কোটি টাকা (অনুদান ব্যতীত), যা জিডিপির ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে অনুদানব্যতীত ঘাটতি ছিল ৪৫ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৪৬ হাজার ২২৮ কোটি টাকা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে স্থানীয় ব্যাংক খাত থেকে ১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার ল্যমাত্রা ঠিক করলেও বছরশেষে তা ২৯ হাজার ১১৫ কোটি টাকায় দাঁড়াচ্ছে। এবারের নতুন বাজেটে স্থানীয়ভাবে মোট রাজস্ব আয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ। এর মধ্যে এনবিআরের রাজস্ব দেখানো হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ২৫৯ কোটি, এনবিআর বহির্ভূত রাজস্ব ৪ হাজার ৫৬৫ কোটি এবং কর বহির্ভূত রাজস্ব ২২ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা। বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক উৎস থেকে ২০ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা (জিডিপি’র ২ শতাংশ) এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৩৩ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা (জিডিপি’র ৩.১ শতাংশ) ঋণ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকা (জিডিপি’র ২.১ শতাংশ) এবং ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে ১০ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা (জিডিপি’র ১ শতাংশ) নির্বাহের সংস্থান রাখা হয়েছে। সরকার কাক্সিত রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হলে এই ঘাটতি আরো বেড়ে গিয়ে ঋণের মাত্রাও যাবে এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নও ব্যাহত হবে বলে অর্থনীতিবিদরা আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, সরকারের ব্যাপক ঘাটতি অর্থায়নের কারণে বেসরকারি খাতও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ক্ষেত্রে বঞ্চিত হবে। বাজেটে অনুন্নয়ন বা রাজস্ব খাতসহ অন্যান্য খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা যা জিডিপির ১৩ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ৫৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এডিপিতে মোট বরাদ্দ ৪৬ হাজার কোটি টাকা থাকলেও বাস্তবায়ন সন্তোষজনক না হওয়ায় এবং অর্থাভাবে সংশোধিত বাজেটে তা কাটছাঁট করে ৪১ হাজার ৮০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ২০১১-১২ অর্থবছরের তুলনায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) শতকরা প্রায় ৩৫ ভাগ বেশি বরাদ্দ রাখা রহস্যজনক। এখানে নির্বাচনী কৌশল রয়েছে। এদিকে চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ছিল যেখানে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকার, সেখানে অর্থাভাবে তা সংশোধন করে ১ লাখ ৬১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা করতে হয়েছে। সার্বিকভাবে চলতি অর্থবছরে মূল বাজেট থেকে সংশোধিত বাজেটে ২ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে। আর চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সর্বমোট রাজস্ব আয়ের ল্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের এ ল্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা, যা ল্যমাত্রার চেয়ে ৩ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা কম। বাজেট ঘাটতির ল্যমাত্রা ছিল ৪৫ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। এটা বেড়ে ৪৬ হাজার ৩২৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। তিনি বলেন, ২৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক নির্ভর হলে ব্যক্তিখাত বাধাগ্রস্ত হবে। এখানে ব্যাংকগুলোর পে ঋণ দেয়া সম্ভব হবে না। চলমান তারল্য সংকট আরও বাড়বে। বাড়বে সুদের হারও। তাই সরকারকে বিকল্প উৎস খোঁজার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, সরকার ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ না বাড়িয়ে, বন্ড মার্কেট থেকে এবং সুদের হার বাড়িয়ে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে টাকা নিতে পারতো। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষ সঞ্চয়ের পরিবর্তে বরং সঞ্চয় ভেঙ্গে খাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ে তিনি বলেন, এখন যে পরিমাণ মূল্যস্ফীতি রয়েছে তা উদ্বেগজনক। আমাদের প্রধান সংগ্রাম প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। এজন্য প্রয়োজনে প্রবৃদ্ধিতে ছাড়ও দেয়া যেতে পারে। আরেক অর্থনীতিবিদ ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির প্রফেসর ড. এনামুল হক বলেন, অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা যত সুন্দর, বাজেট ডকুমেন্ট তত সুন্দর নয়। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা এবং বাজেট ডকুমেন্টের বক্তব্যে অনেক গরমিল আছে, যা এক ধরনের ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে। বাজেট বক্তব্যে অনেক আশাবাদ আছে কিন্তু তেমন কোনো নির্দেশনা নেই, নতুন প্রকল্পও নেই।

অন্যান্য মিডিয়া bdnews24 RTNN Sheersha News barta24 Prothom Alo Daily Nayadiganta Jugantor Samakal Amardesh Kaler Kantho Daily Ittefaq Daily Inqilab Daily Sangram Daily Janakantha Amader Shomoy Bangladesh Pratidin Bhorerkagoj Daily Dinkal Manob Zamin Destiny Sangbad Deshbangla Daily Star New Age New Nation Bangladesh Today Financial Express Independent News Today Shaptahik 2000 Computer Jagat Computer Barta Budhbar Bangladesherkhela Holiday Bangladesh Monitor BBC Bangla Redio Tehran
homeabout usdeveloped by

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ মো. তাসনীম আলম।

মহীউদ্দীন আহমদ কর্তৃক জাতীয় মুদ্রণ ১০৯, ঋষিকেশ দাস রোড, ঢাকা - ১১০০ হতে মুদ্রিত ও ১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা - ১১০০ হতে প্রকাশিত। যোগাযোগের ঠিকানাঃ ৪২৩ এলিফেন্ট রোড, বড় মগবাজার, ঢাকা - ১২১৭। ফোনঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৯০৬৫, বার্তা - ৮৮ ০১৬৭০৮১৩২৭৬, সার্কুলেশন - ৮৮ ০১৫৫২৩৯৮১৯০, বিজ্ঞাপন - ৮৮ ০১১৯৯০৯০০৮৫, ফ্যাক্সঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৫৫৭১, ওয়েবসাইটঃ www.weeklysonarbangla.net, ইমেইলঃ weeklysonarbangla@yahoo.com