ঢাকা শুক্রবার ২৯ আষাঢ় ১৪১৯, ২২ শাবান ১৪৩৩, ১৩ জুলাই ২০১২

একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ

দখল ও ধ্বংসের কবলে মধুপুর শালবন

মো.নজরুল ইসলাম, ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) থেকে : হাজার বছরের প্রাচীন মধুপুর শালবন। ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ও চট্টগ্রামের পাহাড়ী বনাঞ্চলের পর বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক বন মধুপুর শালবন। এ বনকে দেশের মধ্যাঞ্চলীয় বনভূমি হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। এ বনের বিস্তৃতি গাজীপুর টাঙ্গাইল ও মোমেনশাহী জেলার অংশজুড়ে। এক সময় রাজধানী ঢাকার কাঁটাবন পর্যন্ত এ বনের সীমানা থাকলেও আজ তা শুধুই অতীত, বইয়ের পাতায় লেখা ইতিহাস। টাঙ্গাইল ও মোমেনশাহী জেলার অংশটুকু মধুপুর গড় বা শালবন নামে পরিচিত। শালগাছের মূল বা শিকড় থেকে গজানো চারায় গাছ হয় বলে স্থানীয়রা একে গজারী বনও বলে থাকে।

যেমন ছিল শালবন : মধুপুর শালবন এক সময় অসংখ্য বড় বড় বৃ, লতাপাতা আর বন্য প্রাণীতে ভরপুর ছিল। ষাটের দশকেও মধুপুর বনে প্রবেশ করতেও গা ছমছম করত, বনকে ঘিরে মানুষের বসতি বাড়ার সাথে সাথে উজাড় হতে থাকে গাছপালা। একই সাথে দখলদারদের কবলে পড়ে এই মধুপুর বনভূমি। টাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল, সখীপুর এবং মোমেনশাহীর মুক্তাগাছা ও ফুলবাড়িয়ার কিছু অংশ নিয়ে প্রায় ৬২ হাজার ৫শ’ একর বনভূমি রয়েছে। এর মধ্যে কাগজে কলমে মধুপুর শালবনের আওতায় ৪৫ হাজার ৫শ’ ৬৫ দশমিক ৩৮একর বনভূমি। ১৯৮৮ সালে মোমেনশহী থেকে টাঙ্গাইলের মধুপুর বনভূমিকে আলাদা করা হয়। একা কেউ এ বনে প্রবেশ করার সাহস করতো না। দল বেঁধে প্রবেশ করতে হতো। কারণ প্রাকৃতিক পরিবেশে নিরাপদে আশ্রয় নিতে চিতা বাঘ, বাঘডাস, বন্য শুকর, বিষাক্ত সাপ ও পাখিরা বনের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে বাস করত। বনে মায়া হরিণ ও চিতল হরিণ প্রচুর ছিল। এক সময় গোটা এলাকাতেই বানর বা হনুমান দেখতে পাওয়া যেত। অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে লেপার্ড, বনবিড়াল, শিয়াল, সজারু, খরগোশ, উদ, গুইসাপ ও বন মোরগের ল্যণীয় বিচরণ ছিল। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির পাখির ঘোরাফেরা ছিল চোখে পড়ার মত। পাখির কলকাকলিতে মুখরিত ছিল গোটা শালবন। বনের ফুল-ফল খুবই লোভনীয়, আর ছোট বড় গাছে মৌমাছিরা বাসা বাঁধত। প্রচুর মধু উৎপাদিত হতো এই বনে। অনেকের মতে মধুপুর বনের মধু থেকেই এ অঞ্চলের নামকরণ মধুপুর হয়েছে।

লুপ্ত জীব বৈচিত্র্য : জীব বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ মধুপুর শালবনে এক সময় ৬৩ প্রজাতির গাছ ছিল। বনের সবচেয়ে মূল্যবান গাছের নামেই বনটির পরিচিতি পায় ‘শালবন’ নামে। বুনো ডুমুর, মনকাটা, বুনো খেজুর, দামন, তিতিজাম, কাশিগোটা, তিতফল, দুধকুরুজ, শতমূল, জারুল, পলাশ, তুফা, নাসিন ও গান্ধী গজারীর মতো দেশীয় প্রজাতির গাছ ছিল। যার অনেকগুলোই ঔষধি গাছ। ফালগুন মাসে শাল গাছের ফুটন্ত ফুলের গন্ধে বন এলাকার বাতাস সুবাসিত হয়ে উঠত। এ সময়ে গড় অঞ্চলের বসবাসরত মানুষের শরীর গরম হতো এবং তন্দ্রা ও আলস্যে যেন হাবুডুবু খেত। এই শরীর গরমকে স্থানীয় ভাষায় গজাইরা জ্বর বলা হতো। গজাইরা জ্বর থেকে রা পেতে এ সময় মা-ঝিয়েরা সন্তানদের নিয়ে দূরের কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে ১৫-২০ দিন কাটিয়ে আসতো। এ ছাড়া এ সময় বনে প্রচুর বেহুর ও আনাইগোটার গাছ ছিল। বেহুর ও আনাই গাছের সুমিষ্টি গোটা (ফল) এ বনের ছিল আরেক ঐশ্বর্য। গড়াঞ্চলের কিশোরের দল বেহুর ও আনাই গোটা খেতে বনে যেত। দুরন্ত কিশোররা গলায়, মাজায় ও হাতে সুতা দিয়ে বেহুরগোটার মালা গেঁথে ঘুরে ঘুরে ছিঁড়ে খেত। এ যেন ছিল প্রতি বছরের একটি প্রথা। এখন তা শুধুই গল্প কথা। অপর দিকে মধুপুর বনের শাল গজারী গাছে খুঁটি ফ্রেম দিয়ে ঘর নির্মাণ ছিল এ অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যগত অভ্যাস।

জাতীয় উদ্যান বা ন্যাশনাল পার্ক : টাঙ্গাইল জেলা সদর থেকে ৫৫ কিলোমিটার উত্তরে মধুপুর জাতীয় উদ্যান বা ন্যাশনাল পার্ক। বনের জীববৈচিত্র্য সংরণ বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল শিা গবেষণা এবং চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে ১৯৬২ সালে এ জাতীয় উদ্যানটি গড়ে তোলা হয়। পরে ১৯৮২ সালে সরকার এটিকে জাতীয় উদ্যান বা ন্যাশনাল পার্ক ঘোষণা করে। কাগজে কলমে মধুপুর জাতীয় উদ্যানের মোট আয়তন ২০ হাজার ৮৩৭ দশমিক ২৩ একর। প্রচুর বৃষ্টিপাত ও উর্বর মাটির কারণে এই উদ্যানে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট ছোট উদ্ভিদ জন্মায়। নানা প্রজাতির গাছগাছালী ও পর্যাপ্ত খাদ্যের সংস্থান থাকায় বিভিন্ন বন্যপ্রাণী এখানে খুব সহজেই জীবন ধারণ করতে পারে। লহুরিয়া বিটে একটি মিনি চিড়িয়াখানা রয়েছে। দোখলা ভিআইপি বাঙলোর সামনে একটি মিনি শিশুপার্ক রয়েছে। উদ্যানের বৃরাজির সবুজ শ্যামলিমা প্রত্য করার জন্য দোখলা ও লহুরিয়ায় রয়েছে দুটি সুউচ্চ টাওয়ার। এক সময় পাহাড় প্রেমিক সৌন্দর্যপিপাসু পর্যটকদের পদভারে মুখরিত থাকতো এই উদ্যান।

ইকোপার্ক : য়িষ্ণু মধুপুর শাল বনকে দুর্বৃত্তদের কালো থাবা থেকে রা করার জন্য বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ১০ কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয় ধরে ইকোপার্ক প্রকল্প গৃহীত হয়। মধুপুর বনের জীববৈচিত্র্য রাকল্পে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৩ হাজার একর ভূমিতে বনবিভাগ ইকোপার্ক করার ঘোষণা দেয়। এ প্রকল্পের আওতায় ৬১ হাজার ফুট দীর্ঘ দেয়াল নির্মাণ করে অভ্যন্তরভাগে ২টি কালভার্ট, ১০টি পিকনিক স্পট, ৩টি কটেজ, পাখির অভয়ারণ্যের জন্য জলধারসহ ৯টি লেক, ২টি ওয়াচ টাওয়ার, ৬টি রেস্ট হাউজ, ২টি পানির ট্যাংক, ৬টি রাস্তা এবং জঙ্গলকর্মীদের জন্য ৬টি ব্যারাক নির্মাণের কথা ছিল। আরো বলা হয় ৪০ লাখ টাকার জীবজন্তু ও পাখি কেনা হবে। এসব প্রাণীর জন্য ১০ লাখ টাকার ওষুধ কেনা হবে। ৩০ হেক্টর জমিতে ঘাস, লিগুম ও কলাগাছ লাগানো হবে। সরকারের ইকোপার্ক ঘোষণার পর স্থানীয় বনবাসী বিশেষ করে গারোরা উচ্ছেদ ও তাদের জীবন-জীবিকা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কায় বিরোধিতা শুরু করে। দেশী-বিদেশী বেশ কয়েকটি এনজিওর উস্কানিতে গারোরা ইকোপার্কের বিপে তুমুল আন্দেলনে নেমে পড়ে। এ আন্দোলনে তাদের কয়েকজন নেতা নিহত হয়। ইকোপার্ক প্রকল্পের অধীনে বেষ্টনি দেয়াল নির্মাণ শুরুর সাথে সাথে গারোদের আন্দোলনের মুখে তা এগুতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ইকোপার্ক প্রকল্পের টাকা বিশ্বব্যাংকে ফেরত দেয়া হয়।

অন্যান্য প্রকল্পও ব্যর্থ : ইকোপার্ক প্রকল্প ছাড়াও মধুপুর বনকে রা করতে আরো কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কোনো প্রকল্পই আলোর মুখ দেখেনি। আবার কোনো কোনো প্রকল্প পুরোপুরিই ব্যর্থ হয়েছে। বন উন্নয়নে সহযোগিতার জন্য ১৯৬৮ সালে মধুপুর বন গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। মধুপুর গড়ের আবহাওয়া ও জলবায়ুর সঙ্গে সমন্বয় রেখে দেশী-বিদেশী উন্নত প্রজাতির ঔষধি ও কাঠজাতীয় গাছ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। কিন্তু ৪৫ বছরে এ গবেষণা কেন্দ্রের ফলাফল একবারে শূন্যের কোঠায়।

১৯৮২ সালে জাতীয় উদ্যানের ভিতর লহুরিয়া বিটে ২৬ একর বনভূমির চারপাশে বেড়া দিয়ে গড়ে তোলা হয় হরিণ প্রজনন কেন্দ্র। ২০০১ সালে তৎকালীন সহকারী বনসংরক সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, হরিণ প্রজনন কেন্দ্রে ৫২টি হরিণ রয়েছে। ২০১০ সালে তাদের হিসাব মতে হরিণের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৪ টিতে। তবে বাস্তব চিত্র হল হরিণ প্রজনন কেন্দ্রের হরিণ কেমন তা মধুপুরের মানুষই জানে না। ১৯৮৯-১৯৯৩ সালে সাড়ে চার একর বনভূমিজুড়ে কৃত্রিম বন বাগান (উডলট ও এগ্রিফরেস্ট্রি) প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে করা সে বাগানের বেশিরভাগ গাছ লুট ও জায়গা দখল হয়ে গেছে। অনুরূপভাবে ১৯৯৭ সালের কৃষি বনায়ন ও ২০০০ সালের সামাজিক বনায়ন প্রকল্পও মুখ থুবড়ে পড়ে।

শালবনের বর্তমান অবস্থা : মধুপুর শালবনের ৮ ভাগের ৭ ভাগই উজাড় হয়ে গেছে। ১৯৮৮ সালে ৪৫ হাজার ৫শ ৬৫ একর ভূমিকে মধুপুর শালবন ঘোষণা করলেও ২০০৯ সাল পর্যন্ত ৩৫ হাজার একর বনভূমি অবৈধ দখলদাদের হাতে চলে গেছে। শুধু ১৯৯০ সালেই বনবিভাগের হিসাব মতে এ বনের ২৮ হাজার ৪৩৮ দশমিক ৪৭ একর ভূমি বেদখল হয়ে যায়। মধুপুর শালবনের জমি নেই, গাছ নেই, প্রাণী নেই, পাখি নেই মধু নেই এবং ভেষজ নেই। এই নেই এর কবলে পড়ে মধুপুর শালবন এখন ইতিহাস হয়ে কাগজের পাতায় বন্দী।

যেভাবে ধ্বংস হয় শালবন : প্রথমে বনে বসবাসরত গারোদের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে তারা বনের গাছ কাটতে থাকে। এদের দমনের জন্য বনরকরা বনের গারোদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে বন ধ্বংসে মেতে ওঠে। আস্তে আস্তে বাহিরের বাঙালি ও প্রভাবশালীরা এই মহা সম্পদের খোঁজ পায়। শুরু হয় যে যার মত বন দখলের যুদ্ধ। রাজনৈতিক নেতারাও পেশী শক্তি নিয়ে বন ধ্বংস খেলায় শরীক হন। যখন যে দল মতায় এসেছে, তখনই যে যার মত করে আখের গুছিয়ে নিয়েছে। পরিশেষে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতিবাজ বনরীদের কবলে পড়ে ঐতিহাসিক শালবন বিপন্ন হয়ে আজ নীরবে কাঁদছে।

এ পাতার অন্যান্য খবর

অন্যান্য মিডিয়া bdnews24 RTNN Sheersha News barta24 Prothom Alo Daily Nayadiganta Jugantor Samakal Amardesh Kaler Kantho Daily Ittefaq Daily Inqilab Daily Sangram Daily Janakantha Amader Shomoy Bangladesh Pratidin Bhorerkagoj Daily Dinkal Manob Zamin Destiny Sangbad Deshbangla Daily Star New Age New Nation Bangladesh Today Financial Express Independent News Today Shaptahik 2000 Computer Jagat Computer Barta Budhbar Bangladesherkhela Holiday Bangladesh Monitor BBC Bangla Redio Tehran
homeabout usdeveloped by

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ মো. তাসনীম আলম।

মহীউদ্দীন আহমদ কর্তৃক জাতীয় মুদ্রণ ১০৯, ঋষিকেশ দাস রোড, ঢাকা - ১১০০ হতে মুদ্রিত ও ১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা - ১১০০ হতে প্রকাশিত। যোগাযোগের ঠিকানাঃ ৪২৩ এলিফেন্ট রোড, বড় মগবাজার, ঢাকা - ১২১৭। ফোনঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৯০৬৫, বার্তা - ৮৮ ০১৬৭০৮১৩২৭৬, সার্কুলেশন - ৮৮ ০১৫৫২৩৯৮১৯০, বিজ্ঞাপন - ৮৮ ০১১৯৯০৯০০৮৫, ফ্যাক্সঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৫৫৭১, ওয়েবসাইটঃ www.weeklysonarbangla.net, ইমেইলঃ weeklysonarbangla@yahoo.com