পদ্মা সেতু নির্মাণের নামে চাঁদাবাজি
বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ আড়াল করতে নতুন ‘চমক’!
পদ্মা সেতু নির্মাণের নামে চাঁদাবাজি
॥ আহমদ আশিকুল হামিদ॥
শিরোনাম দেখে যারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন সে পাঠকদের প্রতি অনুরোধ, তারা যেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ জুলাই সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের খবরটুকু পড়ে দেখেন। সেখানে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগের দু’টি গ্র“পের মধ্যে গোলাগুলিতে ছাত্রলীগেরই একজন মারা গেছে। এই হত্যাকাণ্ডের কারণ ছিল পদ্মা সেতুর জন্য সংগৃহীত অর্থের ভাগবাটোয়ারা। বনিবনা হয়নি বলেই প্রথমে হাতাহাতি, তারপর গোলাগুলি এবং সবশেষে একজনের মৃত্যু। আহতও হয়েছে কয়েকজন। ঘটনার বিশদ ব্যাখ্যা দেয়ার নিশ্চয়ই দরকার পড়ে না। বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রত্যাখ্যাত এবং ঘাড়ে ধাক্কা খাওয়ার মতো অসম্মানিত হওয়ার পর প্রথম ক’দিন পর্যন্ত যুদ্ধংদেহি ভাবসাব যথেষ্টই দেখিয়েছেন মতাসীনরা। পাঠকরাও সম্ভবত টেলিভিশনের পর্দায় তাদের দেখে থাকবেন। তারা এমনভাবেই সব দোষ বিশ^ব্যাংকের ওপর চাপিয়েছেন, যা দেখে মনে হচ্ছিল যেন বিশ^ব্যাংক বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামীর মতো কোনো রাজনৈতিক দল, যে দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে যখন-তখন যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই বলা ও ব্যবস্থা নেয়া যায়! বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিককেও তুলোধুনো করেছেন তারা। শুধু এটুকু বলতেই বাকি রেখেছেন যে, রবার্ট জোয়েলিক তাদের কাছে দু’চার লাখ ডলার ঘুষ চেয়েছিলেন কিন্তু তারা রাজি হননি বলেই বিদায়ের ঠিক প্রাক্কালে লোকটি ঋণচুক্তি বাতিল করে গেছেন! বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে হাওয়ায় তরবারি ঘোরানোর পাশাপাশি ‘চমক’ দেখানোর ঘোষণাও শুনিয়েছেন মতাসীনরা।
সে ‘চমক’ দেখানোর জন্যই কি না সেটা একটি প্রশ্ন বটে, কিন্তু লম্বা অনেক বাগাড়ম্বর করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হঠাৎ ‘নিজেদের অর্থে’ পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে বসেছেন। বলেছেন, তারা আর কারো কাছে ভিা চাইবেন না (Ñযার অর্থ, এতদিন ভিা চাইতেই বিশ্বব্যাংকের কাছে ধরনা দিচ্ছিলেন তারা!)। ‘নিজেদের অর্থ’ সংগ্রহের পন্থা সম্পর্কেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় সংসদে দেয়া সমাপনী ভাষণে তিনি এমনকি ছাত্রলীগকেও অর্থ সংগ্রহের হুকুম দিয়েছেন। সে হুকুম পালনের জন্যই জোর তৎপরতা শুরু করেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কীর্তিমানেরা, যার পরিণতি ছিল ১৫ জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ড। বলা হচ্ছে, এটা তো শুরু মাত্র, ‘নিজেদের অর্থে’ পদ্মা সেতু নির্মাণের কর্মকান্ডে আরো অনেক কিছুই জনগণকে দেখতে হবে। সরকারি-বেসরকারি চারিজীবীদের বেতন কেটে নেয়া থেকে শুরু করে মোবাইল কল, বিদুৎ বিলসহ প্রতিটি পণ্যের ওপর বাড়তি কর বসানো পর্যন্ত নানা পন্থায় জনগণের পকেট কাটবে সরকার। বিপুল সে অর্থের কিছুটা যাবে নেতা-কর্মিদের নিজেদের পকেটে, বাকিটা দিয়ে দলের নির্বাচনী তহবিল বানাবেন মতাসীনরা। লোক দেখানোর জন্য সেতু নির্মাণের কিছু তৎপরতাও তারা চালাবেন। কিন্তু চাঁদাবাজিই আসল তাদের উদ্দেশ্য। পাশাপাশি রয়েছে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার কৌশল। এজন্যই তারা বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহি বক্তব্য রেখেছেন, ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সরদারের মতো হওয়ায় তরবারি ঘুরিয়েছেন। প্রথম ক’দিনে সুফলও কম অর্জন করেননি মতাসীনরা। তাদের শোরগোলে বাজেটের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন হয়নি। এরই ফাঁকে ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ভারতকে নৌ-ট্রানজিট দেয়ার কাজও সেরে নিয়েছে সরকার। একযোগে ‘নিজেদের অর্থে’ পদ্মা সেতু নির্মাণের নামে সর্বাত্মক চাঁদাবাজি শুরু হয়ে যাওয়ায় স্বীকার করতেই হবে, বিশ্বব্যাংক সরকারের জন্য ‘বাপের কাজ’ই করেছে!
এভাবে শুরু করার কারণ সম্পর্কে নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলার দরকার পড়ে না। বিশ্বব্যাংক শুধু পদ্মা সেতু চুক্তি বাতিল করেনি, ৩০ জুনের বিবৃতিতে সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক দুর্নীতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে আওয়ামী মহাজোট সরকারের অসহযোগিতারও উল্লেখ করেছে। বলেছে, বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা ও ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ‘উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র’ সম্পর্কে বিভিন্ন উৎস থেকে ‘বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ’ পাওয়া গেছে। এসবের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের পরিচালিত তদন্তের দুটি রিপোর্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানকে দেয়া হয়েছে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে এবং ২০১২ সালের এপ্রিলে রিপোর্ট দুটি পৌঁছে দেয়ার সময় বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ব্যাপারে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আহবান জানিয়েছিল। কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া ও জবাব ‘সন্তোষজনক’ ছিল না। কোনো পদপেও নেয়নি সরকার। সে কারণে বিশ্বব্যাংকের পে ‘চোখ বুজে থাকা’ সম্ভব হয়নি।
বিশ্বব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণের জন্য প্রচণ্ড অসম্মান হিসেবেই এসেছে। মতাসীনরা কথায় কথায় যাদের দোহাই দিয়ে থাকেন সে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে¦র কাছে দেশের মান-সম্মান একেবারে মাটিতে মিশে গেছে। সরকারের দুর্নীতি, অসততা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় অযোগ্যতার কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন থেকে ধরে নেবে, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রÑ যেখানে সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকজন তথা মতাসীনরাও দুর্নীতিতে আপাদমস্তক জড়িত। এর ফলে বাংলাদেশকে যে কোনো সাহায্য বা ঋণ দেয়ার আগে সব দেশ ও দাতা সংস্থা দশবার চিন্তা করবে। এমন দুর্নাম জাতির ভবিষ্যতের জন্য নিঃসন্দেহে ভয়ংকর। অথচ মতাসীনরা একটু সতর্ক ও যতœবান হলেই বিশ্বব্যাংককে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে নিবৃত্ত করা যেত। কিন্তু উদ্দেশ্যে অসততা থাকায় এবং সেতু নির্মাণের মাধ্যমে জাতির সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার পরিবর্তে মতাসীনদের মধ্যে নিজেদের আখের গোছানোর উদ্দেশ্য প্রধান হয়ে ওঠায় প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। ঘুষ-দুর্নীতির পথে গোপন আয়োজনের মাধ্যমে পরামর্শক নিয়োগের েেত্র যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক প্রতিষ্ঠানের দরপত্র বাতিল করে কাজ দেয়া হয়েছিল কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনকে। দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছিল তখনই। বিশ্বব্যাংকের প্রবল আপত্তির মুখে দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বানের নাটক সাজানো হলেও কাজ দেয়া হয়েছিল কানাডার এসএনসি-লাভালিনকেই। দুর্নীতির প্রথম তথ্য ফাঁস করেছিল দুনিয়া কাঁপানো ওয়েবসাইট ‘উইকিলিকস’। ২০১১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ‘উইকিলিকস’ জানিয়েছিল, বাংলাদেশের যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের ‘সততায় ঘাটতি আছে’। সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হয়ে উঠেছিল বিশ্বব্যাংক। প্রথম অভিযোগে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, টেন্ডার বাছাইকালে অন্য সব বিদেশী কোম্পানিকে ডিঙ্গিয়ে ঘুষের বিনিময়ে কানাডার কোম্পানিকে মনোনীত করা হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছিল, তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কানাডার এই কোম্পানির কাছে ১০ শতাংশ হারে ঘুষ দাবি করেছিলেন। ঘুষের এই বাণিজ্যে বিশেষ কারো কারো প্রবাসী স্বজনসহ প্রভাশালীদের নামও এসেছিলÑ যারা ‘উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র’ করেছিলেন। বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংক প্রথমে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে মতাসীনরা সে সময় অভিযুক্তদের পইে সাফাই গাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিলেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বলে বসেছিলেন, টাকাই যেখানে আসেনি সেখানে ঘুষ খাওয়ার ও দুর্নীতি করার প্রশ্ন আসে কীভাবে? দুর্নীতি দমন কমিশনÑ দুদকও জনগণকে স্তম্ভিতই করেছিল। তদন্তের নামে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে সততার সার্টিফিকেট দিয়েছিল দুদক।
সরকার ও দুদকের এই কার্যক্রমে বিশ্বব্যাংক সন্তুষ্ট হতে পারেনি। সংস্থাটি তখন কানাডা সরকারকে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছিল। থলের বেড়ালও সে সময়ই বেরিয়ে পড়েছিল। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিন। এর দু’জন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। তাদের কাছ থেকেই জানা গেছে, যোগাযোগমন্ত্রী ও সচিবসহ তিনজন ১০ শতাংশ হারে ঘুষ দাবি করেছিলেন এবং এসএনসি-লাভালিনও ঘুষ দিতে সম্মত হয়েছিল। এ ব্যাপারে মধ্যস্থতা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর এক মরহুম ফুফাত ভাইয়ের ছেলে। ওয়াশিংটন, লন্ডন ও কানাডার টরন্টোতে বসবাসরত বিশিষ্ট আরো জনাকয়েকের নামও প্রকাশিত হয়েছিল। এসব তথ্যের ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংক তাগিদ দিয়েছিল সরকারকে। সংস্থাটি একই সাথে তাদের তদন্ত রিপোর্টও পাঠিয়েছিল। অন্য দিকে সরকারের পাশাপাশি দুদকও ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাই চালিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পাঠানো রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর ২০ জুনও দুদকের চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন, ১০ শতাংশ হারে ঘুষ চাওয়ার ব্যাপারটিতে নাকি হিসাবের ‘গরমিল’ রয়েছে! বিশ্বব্যাংকের বুঝতে অসুবিধা হয়নি, সংস্থাটির রিপোর্টে যেহেতু ‘প্রভাবশালী’ অনেকের নাম এসেছে সে কারণে দুদকের পে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে না। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিশ্বব্যাংক কিন্তু কানাডীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘুষ-দুনীতিকেই একমাত্র কারণ বানায়নি। তথ্য-প্রমাণসহ বরং বলেছে, পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক দুর্নীতি হয়েছে আরো অনেকভাবেই। একটি উদাহরণ হিসেবে সেতু নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের কর্মকান্ডে চুরি, জালিয়াতি ও দুর্নীতির কথা উঠেছে। পদ্মা সেতুর জন্য সরকার দু’ হাজার ৭২০ দশমিক ৭৩ একর জমি অধিগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বাংলাদেশেরও বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গেছে, পরিকল্পিত সেতুর এলাকা সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে নালজমিকে ভিটেবাড়ি হিসেবে দেখিয়ে, কোথাও একজনকে অন্যের জমির মালিক সাজিয়ে এবং কোথাও বা খাস জমিতে রাতারাতি বাড়িঘর নির্মাণ করেও বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করা হয়েছে। মতাসীন দলের লোকজনই যে এসব জালিয়াতি ও দুর্নীতিতে জড়িত সে ব্যাপারেও জানতে পেরেছে বিশ্বব্যাংক। সর্বব্যাপী এ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারই তাগিদ দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। অন্যদিকে যোগাযোগমন্ত্রী ও সচিবসহ দু-চারজন কর্মকর্তাকে বদলি করার বাইরে আর কোনো পদপে নেয়নি সরকার। এর মধ্য দিয়েও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, মতাসীনদের মধ্যকার কয়েকজন এবং বিদেশে বসবাসরত তাদের স্বজনরা দুর্নীতিতে জড়িত থাকায় সরকার জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়নি। ফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্তটি সমগ্র জাতির জন্য লজ্জাকর ও অসম্মানজনকই শুধু নয়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকেও অতি ধ্বংসাত্মক। কারণ, কেবলই সমালোচনা ও বিরোধিতা বরং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে তিক্ততা আরো বাড়াবে, যার নেতিবাচক প্রভাব এদেশে চলমান অন্য অনেক প্রকল্পের ওপরও পড়তে পারে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এখনো ৩৪টি প্রকল্পে বিশ^ব্যাংক ৫৮০ কোটি ডলারের সহায়তা দিয়ে চলেছে। এখানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলোও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। বেগম খালেদা জিয়া সরাসরি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ‘পরিবার’ এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলেই এত কিছুর পরও সরকার চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করে চলেছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা তার ‘পরিবার’ সদস্যদের সম্পর্কে নিজেই সার্টিফিকেট দিয়েছেন। বলেছেন, তার ‘পরিবার’ বলতে তিনি নিজে, বোন রেহানা এবং দু’জনের পাঁচ সন্তানকে বোঝায়। কথাটা কিন্তু না বললেও চলতো। কারণ, এটুকু সবই জানেন। জনগণ যা জানে না এবং যা জানতে খুবই আগ্রহী তা হলো, তার বোন রেহানা এবং সুপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও সুকন্যা পুতুলসহ পাঁচ সন্তানের কে ঠিক কোন কাজ করেন অর্থাৎ তাদের আয় আসে কোত্থেকে? এমন প্রশ্নের কারণ, সবাই তারা বিদেশে থাকেনÑ কেউ লন্ডনে, কেউ ওয়াশিংটনে, কেউ কানাডার টরন্টোতে। শোনা যায়, প্রত্যেকে থাকেনও আবার প্রচুর বিলাসিতার মধ্যে, তাদের বিত্ত-বৈভবও নাকি যথেষ্ট। প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুল টাকা তারা পান কোথায়? তাদের কেউই তো নাকি উল্লেখযোগ্য এমন কোনো চাকরি বা ব্যবসা করেন না, যা থেকে এত বিপুল টাকার আয় আসতে পারে।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এসব প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি। সংসদে দেয়া ৪ জুলাইয়ের ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী বরং চারদলীয় জোট সরকারকে ধরে টানাটানি করেছেন, বেগম খালেদা জিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে পাকড়াও করতে চেয়েছেন। বিশ্বব্যাংক যে জোট সরকারের সঙ্গেও কয়েকটি চুক্তি বাতিল করেছিল সে কথাটা তিনি বিশেষ ইঙ্গিত সহকারে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যাতে তার সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করার আগে বিরোধী দল মাত্র সেদিনের ইতিহাস মনে রাখে। কথাটা বলার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কিন্তু ‘প্লাস পয়েন্ট’ অর্জন করতে পারেননি। কারণ, শেখ হাসিনা যত চিৎকারই করুন না কেন, ইতিহাসের সত্য হচ্ছে, পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলপ্রসূ উদ্যোগ প্রথমে নিয়েছিল বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। ২০০৪ সালে জাপানী সংস্থা জাইকাকে দিয়ে মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে বিস্তারিত সমীাও জোট সরকারই করিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয়েছিল বিশ্বব্যাংক এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। জাইকাসহ অন্য দু-একটি সংস্থা ও রাষ্ট্রও পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যাপারে সাহায়তা করতে সম্মত হয়েছিল। সব মিলিয়ে ঋণ পাওয়া যেতো ২২২ কোটি মার্কিন ডলারÑ বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু এসব সত্যের ধারে-কাছে যেতেও রাজি নন মতাসীনরা। উচিত যখন ছিল জিহবা সামাল দেয়া এবং বিশ^ব্যাংকের অভিযোগ ও দুটি রিপোর্টসহ প্রকৃত সকল ঘটনা প্রকাশ করা, তখন প্রধানমন্ত্রীও উল্টো সঙ্গীত শুনিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, তারা দলীয় কর্মী ও ক্যাডারদের দিয়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিছিল পর্যন্ত করিয়েছেন। চুক্তি বাতিল করার দায়দায়িত্ব বিরোধী দলের ওপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য রীতিমতো দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন মতাসীনরা। তারা বোঝাতে চেয়েছেন যেন বিরোধী দলই বিশ্বব্যাংককে দিয়ে চুক্তিটি বাতিল করিয়েছে! এ প্রচার অভিযানেও যথারীতি প্রধানমন্ত্রীকেই নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে। ঢাল-তলোয়াহীন নিধিরাম সরদারের মতো বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণার পাশাপাশি তিনি বিরোধী দলের ওপরই দোষ চাপানোর কসরত করে বেড়াচ্ছেন। নেত্রীর উৎসাহে একের পর এক দৃশ্যপটে এসেছেন অন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। এই প্রক্রিয়ায় সবশেষে দৃশ্যপটে আগত ‘মন্ত্রী’ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আবার নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেও টেনে এনেছেন। এমনভাবেই তিনি ‘ইউনূস সাহেব’ সম্পর্কে বলেছেন যা শুনে বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, তারা আসলে কি বলতে বা বোঝাতে চাচ্ছেন। কিন্তু চেষ্টায় ত্র“টি না থাকলেও তারা সফল হতে পারেননি। কারণ, ঘুষ-দুর্নীতি এবং ‘উচ্চ পর্যায়ের ষড়যন্ত্র’সহ চুক্তি বাতিল করার কারণগুলো বিশ্বব্যাংকের চিঠিতেই রয়েছে।
মতাসীনদের এই মনোভাব ও তৎপরতার কারণে বিরোধী দলকেও কঠোর অবস্থান নিতে হয়েছে। বিরোধী দলের নেতারা দুর্নীতিবাজদের নামের পাশাপাশি সরকারকে লেখা বিশ্বব্যাংকের সব চিঠি প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন। বলেছেন, বিশ্বব্যাংককে নিজেদের লেখা ছয়টি চিঠি প্রকাশ করার মাধ্যমে সরকার যেহেতু এক ধাপ এগিয়ে রয়েছে সেহেতু বিশ্বব্যাংকের চিঠিগুলো এবং রিপোর্ট দুটি প্রকাশ করলেই ষোলকলা পূর্ণ হতে পারে। জনগণ তখন জানতে পারবে, কোন প আসলে দায়ীÑ বিশ্বব্যাংক না মতাসীনরা? জনগণ আরো জানতে পারবে, বিশ্বব্যাংকের আহ্বান সত্ত্বেও সরকার কেন দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো পদপে নেয়নি, সরকারের প্রতিক্রিয়া ও জবাব কেন বিশ্বব্যাংকের জন্য ‘সন্তোষজনক’ ছিল না এবং বিশ্বব্যাংকের পে কেন ‘চোখ বুজে থাকা’ সম্ভব হয়নি। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, চুক্তি বাতিল করার পর মুহূর্ত থেকে বিশ্বব্যাংককে তুলোধুনো করার অভিযানে নেমে পড়লেও মতাসীনরা কিন্তু অভিযোগের জবাবেই যুৎসই কোনো বক্তব্য হাজির করতে পারেননি। না-এর পর না বলে চিৎকার করলেও তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী, সচিব ও প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেয়ার তথ্য স্মরণ করিয়ে দেয়ার মাধ্যমে প্রকারান্তরে তারা বরং প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, দুর্নীতি আসলেও হচ্ছিল। নাহলে মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার পদপে নেয়া কেন? ঠিক এ পর্যন্ত এসেই নিজেদের ফাঁদে আটকে গেছেন মতাসীনরা। কারণ, বিশ্বব্যাংক শুধু ওই ক’জনের কথাই বলেনি, বলেছিল আরো অনেকের কথাওÑ যারা ‘উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র’ করেছিল। প্রশ্নও উঠেছে তাদের সম্পর্কেই। তারা এমন কারা যাদের নাম বলতে লজ্জা লাগছে? তাদের মধ্যে ‘উচ্চ পর্যায়ের’ কারো কারো স্বজনও রয়েছেন বলেই কি এত দ্বিধা? খালেদা জিয়ার মতো দায়িত্বশীল নেত্রীই বা কেন প্রধানমন্ত্রীর ‘পরিবার’ সম্পর্কে অভিযোগ করেছেন?
বর্তমান পর্যায়ে আলোচনার সমাপ্তি টানতে গিয়ে বলা দরকার, মতাসীনরা বুঝতেই পারছেন না যে, ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগে বাংলাদেশের মান-মর্যাদা এরই মধ্যে ধুলায় মিশে গেছে। এই মর্যাদা ফিরিয়ে আনা না গেলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জাতিকে সব সময় মাথা নিচু করে থাকতে হবে। দেশের অর্থনীতিও তিগ্রস্ত হবে সর্বাত্মকভাবে। এমন পরিণতি কিছুতেই চাইবে না জনগণ। একই কারণে ‘নিজেদের অর্থে’ পদ্মা সেতু নির্মাণের গালগল্প শোনানোর আড়ালে চাঁদাবাজির চেষ্টাও তাদের জন্য রিষময় পরিণতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এ পাতার অন্যান্য খবর
- ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে কোনো অর্থনৈতিক সমস্যা থাকবে না : নাজির আহমদ
- লাগামহীন ছাত্রলীগ : আ’লীগের সাড়ে ৩ বছরে নিহত ২৩ মেধাবী ছাত্র
- জনপ্রশাসনে দক্ষতা নিয়ে কিছু কথা
- ভারতের সঙ্গে সরকারের তাঁবেদারি বন্ধুত্ব
- উচ্চ মাধ্যমিকে পাসের হার ৭৮.৬৭ শতাংশ
- জামায়াত অফিস বন্ধ কেন, হাইকোর্টের রুল
- জনসংখ্যা এখন সোয়া ১৫ কোটি
