॥ মুনতাসির রহমান॥
বৃহৎ আওয়ামী বলয়ে বিভক্তির সুর শোনা যাচ্ছে। সরকারের দুঃশাসন বা একদলীয় ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম, পাওয়ার পলিটিক্স করতে যেয়ে বিদেশী প্রভুত্বের বলয় পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশকে দুর্নীতিবাজ রাষ্ট্রে পরিণত করা, সাহায্যদাতা, গোষ্ঠী ও সংস্থার কাছে দেশকে হেয়প্রতিপন্ন করা, বিরোধী গোষ্ঠী ও মতের রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপর সীমাহীন দমনপীড়ন, রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে দুর্নীতি, লুটতরাজসহ যে অব্যবস্থাপনা ও অরাজকতা বিরাজমান তা থেকে পরিত্রাণ পেতে বৃহৎ আওয়ামী বলয়ে বিভক্তি বা ধস নামার মূল কারণ বলে দায়িত্বশীল মহল আভাস দিয়েছে। দায়িত্বশীল মহলটি আরো জানিয়েছে, সরকার এবং দলের অভিন্ন অবস্থান হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের অধিকারী হয়েছেন ঠিকই কিন্তু তার একক এই নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের বিপরীতে একটি অদৃশ্য শক্তির আবির্ভাব ঘটেছে ভেতরে ভেতরে। অদৃশ্যমান এই শক্তিকে অনেকে তৃতীয় শক্তির ইঙ্গিত বলে মনে করছেন। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা খোলাসা করে কিছু বলতে চাচ্ছেন না। তবে আওয়ামী বলয় অর্থাৎ ১৪ দলের কোনো কোনো নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, ক্ষমতায় তৃতীয় শক্তি আসুক বা না আসুক আজ যারা তৃতীয় শক্তিকে স্বাগত জানাচ্ছেন তারা প্রায় সকলেই আওয়ামী ঘরানার। এরাই ওয়ান ইলেভেনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। রাজনীতি থেকে দুই নেত্রীকে মাইনাস করার ফর্মুলা দেন বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে দলীয় পদ থেকে সরে যাওয়ার আওয়াজ তোলেন। তারাই আজ ভেতরে ভেতরে জড়ো হতে শুরু করছে। শোনা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলের পর ভেতরের এই অদৃশ্য শক্তিটি তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করে সামনে এগুবে। দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী বলয়ের বিপরীতে বিএনপি বলয় দৃশ্যমান। যেখানে জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী শক্তিসমূহের বিরাট সমাবেশ। নানা কারণে ক্ষমতার রাজনীতিতে দুই বৃহৎ বলয় ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। তবে ভারসাম্যহীনতার কারণে ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের আগমন ঘটলেও শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হলো এবার ভারসাম্যহীনতা আচ করা যাচ্ছে। ওয়ান ইলেভেনের অভিজ্ঞতা থেকে ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবরাই অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আওয়ামী বৃহৎ দুর্গে ধস নামাতে শুরু করেছে। বৃহৎ আওয়ামী গোষ্ঠীর সহযোগিরা হলো : বামপন্থীদের একটি বড় অংশ, বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বিভিন্ন শ্রেণী ও কর্মপেশার মানুষ, ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসীদের প্রায় পুরো অংশ, কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী মহল, শিক্ষক, সংস্কৃতিসেবী, সাংবাদিক ইত্যাদি। নতুন করে যুক্ত হয়েছে খোদ আওয়ামী লীগের ভেতরের একটি অংশ। গত জাতীয় কাউন্সিলে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে যাদের স্থান হয়নি অর্থাৎ সংস্কারপন্থী হিসেবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে তারা ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেককে দলেও রাখা হয়নি আবার দল থেকে বাদও দেয়া হয়নি। মূল স্রোতের বাইরে যেয়ে বিদ্রোহ করলে পরিণতি সুখকর হবে নাÑ এটা ভেবে আপাতত কেউ মুখ না খুললেও সময়মতো সুর পাল্টে দিতে পারেন। আগামী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত দলীয় প্রধানের ভূমিকার ওপর তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক হবে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।
অদৃশ্যমান তৃতীয় শক্তি
ডাকসুর সাবেক ভিপি প্রথিতযশা মেধাবী রাজনীতিবিদ মাহমুদুর রহমান মান্না আওয়ামী লীগে আছেন না নেই তা বোঝা যাচ্ছে না। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী এই নেতা বামপন্থার রাজনীতিকে পরিহার করে শেখ হাসিনাকে ফুলের তোড়া উপহার দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। শেখ হাসিনা তাকে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক করেন। আওয়ামী লীগে যোগদান করলেও শুরু থেকেই তিনি দলের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না। ার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ওয়ান ইলেভেনের শাসনামলে। তিনিও আমু-রাজ্জাক-তোফায়েল-সুরঞ্জিতের অনুসারী হয়ে যান। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার সমালোচনা করে আলোচিত হন। এর পরিণতি তার জন্য অমঙ্গল ডেকে আনে। বিগত জাতীয় কাউন্সিলে তাকে সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। মান্নাকে দল থেকে বাদও দেয়া হয়নি, আবার তিনিও দল থেকে পদত্যাগ করেননি। দল থেকে পদত্যাগ না করেই তিনি সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে নাগরিক ঐক্য নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। তিনি এই সংগঠনের আহ্বায়ক। ঢাকা সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। আগামী জাতীয় নির্বাচনে নাগরিক ঐক্য থেকে প্রার্থী দেয়া হবে বলেও জানিয়েছেন।
তবে তার এই কর্মকাণ্ডের মূল আলোচিত বিষয় হলো বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির কারণে তিনি তৃতীয় শক্তিকে ক্ষমতায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তার সংগঠনের উপদেষ্টা হলেন দেশের খ্যাতিমান প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মুসা। এবিএম মুসা এক সময়ে আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। সংসদ সদস্যও হন। তার ১৮৪ সদস্যের কমিটির সদস্য সচিব হলেন সামরিক বাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন এম এ জব্বার। তার সঙ্গে আরো আছেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান, কেয়ারটেকার সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দীন খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল, এইচ এম আকরাম, আব্দুল্লাহ সরকার প্রমুখ।
মাহমুদুর রহমান মান্না তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য প্রচারের জন্য স্বল্প আয়োজনে সভা সেমিনার করছেন। আসিফ নজরুল সম্প্রতি জাতীয় প্রেস কাবে অনুষ্ঠিত এক সভায় বলেছেন, বর্তমান সরকার হচ্ছে সবচেয়ে অকর্মণ্য সরকার। এ জন্য দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক তৃতীয় শক্তি চায়।
তৃতীয় শক্তি আবির্ভাবের কথা বলেছেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রবক্তা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডিকে-এর সভাপতি আসম আবদুর রব। তিনি বলেছেন, জেএসডিকে। তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। যেখানে সর্বস্তরের মানুষসহ দলবাজি রাজনীতির বাইরে শ্রমজীবী কর্মজীবী ও পেশাজীবীরা থাকবেন। আসম রব গত ১৩ জুলাই দলের এক সভায় একথা বলেন। রব ও মান্না একই ঘরনার। একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, মাহমুদুর রহমান মান্নার পেছনে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে যারা নেপথ্যে থেকে তাকে শক্তি যোগান দিচ্ছেন। এই শক্তির একটি অংশ হলো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসীরা যারা বিভিন্ন দলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন তারা। তাদের এক জায়গায় আনার দায়িত্ব নিয়েছেন আসম রব। আর মান্না আওয়ামী লীগে কোণঠাসা হয়ে পড়া নেতাকর্মীদের এক কাতারে শামিল করবেন। সূত্র জানিয়েছে, পরিস্থিতি অনুকূলে এলে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টুর নেতৃত্বে একটি অংশ, বামপন্থীদের মধ্যে সিপিবি, বাসদ, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের একটি অংশ, প্রগতিশীল লেখকদের একটি অংশ, সর্বোপরি বিগত ওয়ান ইলেভেনকে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন জানিয়েছিলেন তারা সকলেই এই তৃতীয় ধারার সঙ্গে যুক্ত হবেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানিয়েছে, এই তৃতীয় শক্তি বা ধারার বিদেশী যোগানদার খোদ মার্কিন প্রশাসন। বাংলাদেশস্থ মার্কিন দূতাবাসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে তৃতীয় ধারার নেতাদের ইতোমধ্যে কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে। ওই বৈঠকে জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও উপস্থিত ছিলেন। এর বাইরে শাসক দল আওয়ামী লীগেরও কয়েকজন সিনিয়র নেতা উপস্থিত ছিলেন বলে শোনা গেছে।
মান্নার রাজনৈতিক তৎপরতা প্রসঙ্গে আওয়ামী লগের নেতারা বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তার কথাবার্তা সন্দেহজনক। তাকে আওয়ামী লীগ থেকে বাদ দেয়া হয়নি বা তিনিও দল ত্যাগ করেননি। সুতরাং দল ত্যাগ না করে বা দলে থেকে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া এবং তৃতীয় শক্তিকে ক্ষমতায় আসার জন্য আহ্বান জানানো অগণতান্ত্রিক আচরণ। তার এ অগণতান্ত্রিক আচরণ অব্যাহত থাকলে আগামী কাউন্সিলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। এমন ইঙ্গিত নাকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছেন।
এদিকে আওয়ামী বলয়ের বৃহৎ একটি অংশের বিপরীত অবস্থানে চলে যাওয়ায় সরকারের মধ্যেও টানাপোড়েন চলছে। মহাজোটের অন্যতম শরিক দল জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি তার মত পরিবর্তন করতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। জাতীয় পার্টির আপাতত সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা। এছাড়া ১৪ দলের শরিক দলের নেতাদের মধ্যে রাশেদ খান মেনন এবং হাসানুল হক ইনু নৌকা ছাড়তে চাচ্ছেন না। জানা গেছে, তৃতীয় ধারার কর্ণধাররা ইতোমধ্যেই মেনন ও ইনুর সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। ফলে তারা অনেকটা দোটানার মধ্যে পড়েছেন। তবে অতীব লক্ষণীয় বিষয় হলো তৃতীয় শক্তি বা ধারার বিশ্বাসীদের মার্কিন প্রশাসনের শক্তি যোগান দেশের বিদ্যমান রাজনীতিতে নয়া মেরুকরণ ঘটে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা কী হবে সেটা শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। এমন ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
এ পাতার অন্যান্য খবর
- পদ্মা সেতু : ঋণ বাতিলে ১২ প্রশ্ন, বিশ্বব্যাংকের জবাব
- বিচারের নামে জামায়াত নেতাদের সাথে অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করা হচ্ছে
- নির্যাতন করে আদর্শবাদী দলকে দমানো যায় না : শিবির সভাপতি
- রমজানে অফিস ৯টা থেকে সাড়ে ৩টা
- গোলাম আযমের জামিন আবেদন খারিজ
- কারা পুড়েছে এমসি কলেজ হোস্টেল মন্ত্রীকে জানালেন এক ছাত্রলীগ কর্মী
- গাজীপুরের উপনির্বাচনে যাবে না বিএনপি
