ঢাকা, শুক্রবার, ২০ জুলাই ২০১২, ৫ শ্রাবণ ১৪১৯, ২৯ শাবান ১৪৩

অনামিকা
আমাদের ছাত্রজীবনে অর্থাৎ কলেজে অধ্যয়নকালেই রাজনীতি যখন কিছুটা বুঝতে শুরু করি সেই সময় থেকেই আওয়ামী লীগকে চিনতে শুরু করি বা চিনার সুযোগ লাভ করি। আমরা দেখেছি দলটি কি করে অন্য দলের সভা-সমাবেশে হামলা চালিয়ে সভা পণ্ড করে দিতো। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সভায় কিভাবে লাঠি চালিয়ে বা ইটপাটকেল ছুড়ে সভা ভেঙ্গে দিয়েছে আমাদের চোখের সামনেই এবং আমরা তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানীর রূপমহল সিনেমা হলের সম্মেলনে আওয়ামী লীগের নেতারা কিভাবে হামলা চালিয়েছিল তা সেই সময়কার মানুষজন ভালোই জানেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় আওয়ামী লীগের সত্যিকার রূপ ও চেহারা চরিত্র এবং বৈশিষ্ট্য  বুঝা আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য সহজ হবে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের নেতারা এক সময় পাকিস্তানের মন্ত্রী ছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতারা পাকিস্তানের কেন্দ্রে এবং তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতায় ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবার পর বলেছিল ৯৮% ভাগ স্বায়ত্তশাসন অর্জিত হয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ চার আনা সের চাল, চার আনা দিসতা কাগজ ও চারআনা সের চিনি খাওয়ানোর ওয়াদা করেছিলো। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে হয়ে যায় স্বৈরাচার আর বিরোধী দলে থাকলে বনে যায় গণতান্ত্রিক। আওয়ামী লীগ সমালোচনা বা বিরোধী দল কোনোটাই সহ্য করতে পারে না। ১৯৭৩ সালে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে হয়তোবা ৩০-৪০ জন বিরোধী দলীয় সদস্য জয়লাভ করতেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেটাও বরদাশত করেনি। নির্বাচনে প্রকাশ্যে কারচুপি করে। এমনকি হেলিকপ্টারে ব্যালট বাক্স ঢাকায় এনে নিজ দলীয় কোনো কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করে। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে ফেনা তুললেও এই আওয়ামী লীগই স্লোগান তুলে ‘এক নেতা এক দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’। মাত্র ১২ মিনিটে আওয়ামী লীগ সংসদে ব্রুট মেজরিটির জোরে একদলীয় বাকশাল শাসন কায়েম করে। আওয়ামী লীগের নেতারা কথায় কথায় সংবিধান কাটাছেঁড়ার জন্য অন্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা গলাবাজি করে যাচ্ছেন। অথচ আওয়ামী লীগই ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের গণতান্ত্রিক সংবিধানটি ক্ষতবিক্ষত করে। ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৪০টি অনুচ্ছেদে সংশোধনী আনা হয় এবং দ্বিতীয় তফসিল বিলোপ ও ৩য় এবং ৪র্থ তফসিলে সংশোধনী আনা হয়। কোনো নির্বাচন ব্যতীতই শেখ মুজিবুর রহমানকে আজীবন প্রেসিডেন্ট এবং ‘জাতীয় দল’ বলে কথিত বাকশাল গঠন করে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়া হয়। বাকশালের পথ ধরেই ১৯৭৫ সালে জাতির ওপর চেপে বসে সামরিক শাসন। দেশের জনগণের সকল মৌলিক অধিকার হরণ করে আওয়ামী লীগই গণতন্ত্রের কবর রচনা করে এবং সামরিক শাসনের পথ খুলে দেয়। সেদিন যদি আওয়ামী লীগ একদলীয় শাসন স্বৈরাচরীভাবে জনগণের উপর না চাপাতো তাহলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিকাশের পথ রুদ্ধ হতো না। বলা যায় ৪র্থ সংশোধনী ছিল একটি পুরো নতুন সংবিধান। পৃথিবীর ইতিহাস একটি সংশোধনীর নামে এভাবে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ধ্বংস করার এমন কোনো দ্বিতীয় নজীর নেই। অথচ আওয়ামীরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে সংবিধান কাটাছেঁড়া করার জন্য নির্লজ্জভাবে অন্যের ওপর দোষ চাপায়।

রক্ষীবাহিনী গঠন করে সিরাজ শিকদারসহ ৪০ হাজার নেতা-কর্মী হত্যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগই বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সূচনা করে। সিরাজ সিকদারকে জীপে উঠিয়ে হত্যা করার পরদিন দম্ভভরে বলা হয়েছিল, ‘কোথায় সিরাজ সিকদার?’ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নির্যাতন, নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের ইতিহাস তখনকার দেশবাসীর মনে এখনো জীবন্ত হয়ে গেঁথে আছে। দুঃখে সে সময় ডাকসুর পক্ষ থেকে শেখ মুজিবের আজীবন সদস্য পদ প্রত্যাহার করা হয়নি। মতিয়া চৌধুরী, হাসানুল হক ইনুও মরহুম শেখ মুজিব সম্পর্কে কটুকথা বলতে ছাড়েননি। অবশ্য আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে একাত্ম হওয়ার ফলে আজ মতিয়া বা হাসানুল হক ইনুদের সবকিছু মাফ হয়ে গিয়েছে। নৌকায় উঠে সংসদ সদস্য হয়ে ইনু সাহেবরা এখন কাব্যিক ভাষায় শেখ মুজিবের বন্দনায় ব্যস্ত।

ওয়াদা করে সে ওয়াদা ভঙ্গ করা বা কথা বলে তা উল্টিয়ে ফেলা কিংবা অস্বীকার করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কোনো জুড়ি নাই। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন চলার সময় আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের জনসভায় ঘোষণা করলেন, এরশাদের অধীনে যারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাবে তারা হবে জাতীয় বেঈমান। ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই ঢাকায় ফিরে পরদিন এরশাদের সাথে আঁতাত করে বিএনপিকে ফেলেই নির্বাচনে যাবার কথা ঘোষণা করলেন শেখ হাসিনা। এভাবেই ১৯৮৬ সালে এরশাদের ভোট চুরির নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাকে বৈধতা দান করলো আওয়ামী লীগ।

১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টি এবং আসম আব্দুর রবের জাসদের সমর্থনে সরকার গঠন করার পর আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার হলে শেখ হাসিনা সরকার ওমরাহ করতে গিয়ে সেখান থেকে ঘোষণা করলেন ছয় মাস আগেই নির্বাচন হবে। কিন্তু দেশে ফিরেই চমক দেখিয়ে বললেন, এক ঘণ্টা আগেও তার সরকার ক্ষমতা ছাড়বে না।

বিএনপির ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত শাসনকালে আওয়ামী লীগ জামায়াত এবং জাতীয় পার্টিকে সাথে নিয়ে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা কায়েমের জন্য আন্দোলন করলো। আন্দোলনের ফসল হিসেবে কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা দিতে বিএনপি বাধ্য হলো। কেয়ারটেকার  সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালে এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফসল। কিন্তু আওয়ামী লীগের রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও লুটপাটের কারণে জনসমর্থন যখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে তখনই নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ভয় ঢুকেছে আওয়ামী লীগের মধ্যে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা না দেখে দেশের ৯০ ভাগ মানুষ যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চায় আওয়ামী লীগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছে। নির্বাচনে পরাজয়ের ভয়েই যে দলটি ১৮০০ ডিগ্রি উল্টে গিয়েছে এ ব্যাপারে দেশবাসীর কোনো সংশয় নেই। নির্বাচনে হেরে যাবার ভয়ে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন আওয়ামী লীগ করতে দিল না। সিটির জনগণ না চাইতেই ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে দুই ভাগ করার জন্য মাত্র তিন মিনিটে সংসদে আইন পাস করলো আওয়ামী লীগ। এটাও আসলে নির্বাচন করার উদ্দেশ্যে নয় বরং দলীয় অনুগত লোকদের প্রশাসক হিসেবে বসানোর জন্যই দুই ভাগ করার কৌশল। আবার ওয়ার্ডের সীমানা চিহ্নিত না করেই তফসিল ঘোষণা করে সেই নির্বাচনও  ঠেকিয়ে দেয়া হলো। আসলে জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকা  সিটি নির্বাচন করতে আওয়ামী লীগ সাহস করছে না। এমনিতেই চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। আবার ঢাকা সিটিতেও নিশ্চিত পরাজয় হবে জেনে জাতীয় নির্বাচনের আগে এ নির্বাচন তারা কেন করবে? ২০০৬ সালের অক্টোবরে শেখ হাসিনার নির্দেশে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে রাজধানীর পল্টন মোড়ে জামায়াত-শিবিরের ১৪ জন নেতাকর্মী হত্যা করা হয়।

পরবর্তী সময়ে দেশে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি আইনের আদলে কার্যত সামরিক শাসন জারি করা হলো। শেখ হাসিনা-এরশাদ ও সাবেক সেনা প্রধান মঈনুদ্দীনের মধ্যকার এক অশুভ আঁতাতের মধ্য দিয়েই আসে ১১ জানুয়ারি ২০০৭ এর জরুরি আইন। ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান করে গঠিত হলো সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এই সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে শেখ হাসনা বললেন, ‘এই সরকার আমাদের আন্দোলনের ফসল’। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে এটা নতুন কিছু নয়। ১৯৮২ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের কাছ থেকে বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করে এরশাদ সামরিক শাসন জারি করলে আওয়ামী লীগ সেদিন সন্তোষ প্রকাশ করেছিল।

২০০৮ সালের আঁতাতের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ অঙ্গীকার করেছিল দ্রব্যমূল্য কমাবে, ১০ টাকা কেজি চাল দিবে, বিনামূল্যে সার দিবে, প্রতি পরিবারের জন্য একটি করে চাকরি দিবে, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিবে এবং সুশাসন কায়েম করবে। নির্বাচনের পর তারা অস্বীকার করে বসলো যে ১০ টাকা কেজি চাল বা বিনামূল্যে সার দিবার কথা তারা নাকি বলেন নাই।  অথচ তাদের জনসভার বক্তব্যের অডিও-ভিডিও ক্যাসেট  আছে যে, তারা বলেছেন। যা হোক দিনবদলের সনদ বলে যেসব ওয়াদা করেছিল তারা কোনোটাই বাস্তবায়ন তারা করতে পারেন নাই।

বেড়েই চলেছে দ্রব্যমূল্য এবং মুদ্রাস্ফীতি ১০-এর কোঠায়। জনগণের দুর্ভোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা বলেই চলছেন দ্রব্যমূল্য তারা কমিয়েছেন। সন্ত্রাস মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কেড়ে নিয়েছে। রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ খুন হচ্ছে। ঘর মানুষের সবচাইতে নিরাপদ জায়গা। সেই ঘরে খুন হচ্ছে মানুষ প্রতিদিন। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্য খুনিদের গ্রেফতার করা হবে। ৪৮ ঘণ্টা অতিবাহিত হবার পর তিনি বললেন, প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং এই খুনের ব্যাপারটা মনিটরিং করছেন। কয়েকদিন পর প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘খুনের আলামত নষ্ট হয়ে গিয়েছে’। ‘মানুষের বেডরুমের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের নয়’। এর আগে পুলিশের মহাপরিচালক বলেছিলেন, তদন্তের তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হচ্ছে’। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের পর তদন্তের আর কোনো অগ্রগতি নেই। এক পর্যায়ে উচ্চ আদালত র‌্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দিল। চার মাস হতে চললো চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের খুনিদের পুলিশ বা র‌্যাব চিহ্নিত করতে বা গ্রেফতার করতে পারেনি। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যদি সরকারের নিজের লোকেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকে তাহলে সরকার তাকে খুঁজে বের করবে কিভাবে?

সৌদি কূটনীতিক গুলশান কূটনৈতিক এলাকায় রাজপথে খুন হলেন। অদ্যাবধি সরকার এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ধরতে পারেনি। বনানী থেকে বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলী এবং তাঁর গাড়ি চালককে গুম করে দেয়া হলো। দুই মাস হয়ে গেল আজও পর্যন্ত তাদের উদ্ধার করতে পারেনি সরকার। বিভিন্ন তথ্য ও বাস্তব প্রমাণ বলছে সরকারের লোকেরাই ইলিয়াস আলী এবং তার গাড়ি চালককে ধরে নিয়ে গিয়েছে। যদি সরকারের লোকেরাই ধরে নিয়ে থাকে তাহলে সরকার তাদের খুঁজে পাবে কোথায়?

কয়েক মাস আগে নরসিংদীর মেয়র লোকমানকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং একজন মন্ত্রীর ভাই ও ঘনিষ্ঠ লোকেরা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। ফলে সে হত্যাকাণ্ডেরও কোনো সুরাহা হয়নি। সারা দেশে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, চাকরি-বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, জমি দখল, নদী দখল নিয়ে ব্যস্ত এবং এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি খুনাখুনি হচ্ছে। ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী তাণ্ডবের কারণে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে অস্থিরতা ও সাধারণ ছাত্রদের নিরাপত্তাহীনতা। দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় সরকার দলীয় শিক্ষকরাও এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ইন্ধন যোগাচ্ছে। দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনির্বাচিত ভিসিরা বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছে।  সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন পরাজিত হবে এই ভয়ে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্রসংসদ নির্বাচন দেয়া হচ্ছে না। প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই দেখা যায় কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের গ্রুপগুলোর মধ্যে সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে আধিপত্য বিস্তার অথবা টেন্ডার ভাগাভাগি  নিয়ে। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র সড়ক ভবনে যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের মধ্য বন্দুকযুদ্ধ হয়ে গেলো। প্রধানমন্ত্রী লোক দেখানোর জন্য ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছিলেন। কিন্তু টেন্ডারবাজ ও প্রকাশ্য গুণ্ডামিতে লিপ্ত বেপরোয়া ছাত্রলীগের তিনিই পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছেন এবং সম্প্রতি ছাত্রলীগের দেয়া সংবর্ধনাও তিনি নিয়েছেন।

নির্বাচনের আগে ওয়াদা করা হয়েছিল দুর্নীতি সহ্য করা হবে না এবং এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, ‘শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। ঘুষ ছাড়া কোনো সরকারি চাকরি হয় না’। প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিটি বক্তৃতায় বিরোধী দলের দুর্নীতির কথা বলে থাকেন। বিগত সাড়ে তিন বছরে দেশের জনগণ ও নতুন প্রজন্ম কি দেখছে? দুর্নীতির কারণে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেল। মন্ত্রী আবুল হোসেনের দুর্নীতির উল্লেখ করে বিশ্ব ব্যাংকের পক্ষ থেকে চিঠি দেবার পরও সেই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দেয়া হলো। উপরন্তু দুর্নীতি প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী সাফাই গাইলেন মন্ত্রীর পক্ষে। রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস রাতের বেলায় বস্তাভর্তি টাকা নিয়ে মন্ত্রীর জিগাতলার বাসায় যাবার পথে বিডিআর গেটে ধরা পড়লো। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সুরঞ্জিত পদত্যাগ করলেন সংবাদ সম্মেলন করে। একদিন না যেতেই আবার তাকে দফতরবিহীন মন্ত্রী করা হলো কোনো শপথ ছাড়াই। রেল বিভাগের তথাকথিত এক তদন্তের পর সুরঞ্জিত কলঙ্ক মাথায় নিয়ে নির্লজ্জভাবে রাজনৈতিক গলাবাজিতে নিয়োজিত রয়েছেন। দুদকের তদন্ত শেষ হয়নি। অবশ্য দুদক হচ্ছে দন্তহীন বাঘ। দুদক আজ পর্যন্ত কোনো সরকারি দলের লোকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

ফিলিপাইন, জাপান, নেপাল, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন বাংলাদেশ দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত ও কর্মকর্তাদের অনেক দুর্নীতি, বাংলাদেশ বিমানের দুর্নীতি, পুলিশ ও বিচার বিভাগের দুর্নীতি, রেল ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি, বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ প্রায় প্রতিদিনের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। এমনকি সরকার সমর্থক পত্রিকায়ও প্রতিদিন নানা দুর্নীতির খবর ছাপা হচ্ছে। কিন্তু সরকারের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা কোথাও নেই। অবস্থাটা অনেকটা এ রকম যে, ‘উলট পালট করে দে মা লুটেপুটে খাই’।

শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির জন্য গঠিত কমিটির রিপোর্টে দায়ী ব্যক্তিদের নাম পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকার প্রকাশ করতে পারলো না। ৩৫ হাজার কোটি টাকা লুট করে নিয়ে যারা ৩৩ লাখ ক্ষুদ্র বিনি য়োগকারীকে পথে বসিয়ে দিল সেই দরবেশদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করলো না। পক্ষান্তরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এখন শেয়ারবাজারকে ‘দুষ্টু বাজার’ আখ্যায়িত করে বলছেন, ‘আই এ্যাম একদম ফেডাপ’। এবার বাজেটে শতকরা ১০ ভাগ জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করার বিধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সকল মহলের আপত্তি উপেক্ষা করে দলীয় লোকদের ৯টি ব্যাংক অনুমোদন দিয়ে শেখ হাসিনা সরকার ধরা খেয়ে গিয়েছে। দুর্নীতি করে ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা এই সাড়ে তিন বছরে যে কালো টাকার মালিক হয়েছে সেই কালো টাকা সাদা করার জন্যই বাজেটে এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। একথা বোধ হয় আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যতই অবনতি হোক না কেন সরকার বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ব্যাপারে অন্ধ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক কথা আমি সবচেয়ে সফল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো। পুলিশের অনেক উন্নতি হয়েছে ইত্যাদি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অবশ্য সাংবাদিকদের বলেছেন, পুলিশ থেকে নিরাপদ দূরত্ব রক্ষা করার জন্য। এই যেন ঠিক হিংস্র কুকুর হইতে সাবধান থাকতে বলার মতো। সাংবাদিকরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছেন আওয়ামী শাসন কেমন মজার। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে তিন বছরে ঢাকার সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি, ফরহাদ খান, নূরুল ইসলাম রানা, আতিকুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম টুটুল এবং আলতাফ হোসেন নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের আবুল হোসেন, গাজীপুরের আহসান হাবিব বারী, বরিশালের মনির হোসেন, সিলেটের ফতেহ উসমানি, চট্টগ্রামের মাহবুব টুটুল ও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের ফরিদুল ইসলাম রঞ্জু। তাছাড়া সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে পুলিশ বেধড়ক পিটাচ্ছে সংবাদিকদের।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে বিচার বিভাগ ও প্রশাসনকে আচ্ছামত দলীয়করণ করে। খুনের মামলার আসামিকেও উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগ দিয়েছে দলীয় বিবেচনায় দলীয় পরিচয় ও চেহারা দেখে বিচার হয় এই অভিযোগ প্রবীণ আইনজীবীদের। বিরোধী দল ন্যায় বিচার আশা করতে পারে না আদালতের কাছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় এবার আওয়ামী লীগ তাদের সাত হাজার মামলা প্রত্যাহার করেছে আর বিরোধী দলের মাত্র দুটি। চার শতাধিক সরকারি কর্মচারীকে ওএসডি করে বসিয়ে রাখা হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। রেকর্ড সংখ্যক কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে চুক্তিভিত্তিতে দলীয় বিবেচনায়। দলীয় সভা-সমাবেশের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি কার্যালয় ও বাসভবন। আওয়ামী লীগ সব সময়ই দল ও সরকারকে একাকার করে ফেলে।

গণতন্ত্রের কথা বললেও আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ করতে ফ্যাসিবাদী কায়দায় বাধা প্রদান করছে। বিরোধী দলের কর্মসূচি বানচাল করতে রাজধানীকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আওয়ামী সরকার নিজেই হরতালের পরিবেশ সৃষ্টি করে। বিরোধী দলকে মিছিল শোভাযাত্রা নিয়ে রাজপথে নামতে দেয়া হয় না। হাজার হাজার পুলিশ মোতায়েন করে বিরোধী দলের অফিস অবরুদ্ধ করে রাখে। যখন তখন বিরোধী দলের অফিস তল্লাশি এবং অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেয়।

মিছিল নিয়ে রাজপথে নামলেই লাঠিচার্জ, গ্রেফতার এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো নৈমিত্তিক ব্যাপার। এই সাড়ে তিন বছরে বিরোধী দলের লক্ষাধিক কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। আদালতের আদশে লঙ্ঘন করে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকেও গ্রেফতার করে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের। বিরোধী দলের কর্মসূচির দিন মোবাইল কোর্ট বসায় আওয়ামী লীগ। বিরোধী দলীয় কর্মসূচির দিনে পুলিশ পাহারায় সশস্ত্র মিছিল করে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো। জাতীয় সংসদের  সদস্যরা কোনো মিছিল করতে গেলে তাদের রাস্তায় পেলে পিটিয়ে আহত করা হয়। জামিন পেয়ে মুক্তি লাভের পর নতুন মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হয় জেল গেট থেকে। রিমান্ডের নামে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর চাপানো হয় অকথ্য নির্যাতন। পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ৫৫টি ধারায় পরিবর্তন এনে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যার ফলে সংবিধানের এক-তৃতীয়াংশ অনুচ্ছেদের ব্যাপারে জনগণের স্বাধীন মতামত পেশ করার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। সমালোচনা করলেই রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় অভিযুক্ত করার পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন কথায় কথায় আদালত অবমাননার মামলা হয়। আর এসব মামলার শিকার হচ্ছেন বিরোধী দলের সদস্য বা স্বাধীন সংবাদপত্রের  সম্পাদক সাংবাদিকগণ। দেশে চলছে নির্বাচিত স্বৈরসরকার। আওয়ামী জোটের অন্যতম শরীক এক সময়ের স্বৈরশাসক। এখন দেশে চলছে আওয়ামী বাকশালী এরশাদীয় স্বৈরশাসন।

আওয়ামী লীগের শাসন কেমন তার সাথে নতুন প্রজন্মের পরিচিতি হবার জন্য আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসাটা জরুরি ছিল। আমার মনে হয় স্বাধীনতা ও মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী আমাদের নতুন প্রজন্ম বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করছে যে, আওয়ামী লীগ কেমন এবং ফ্যাসিস্ট এই দলের দানবীয় শাসন কেমন। ফ্যাসিস্ট ও গণতন্ত্র হত্যাকারী আওয়ামী লীগ চিনার জন্য এ দলটির এবারের বর্তমান মেয়াদের শাসনই যথেষ্ট হবে বলে মনে হয়। নির্বাচিত হলেই বা বক্তৃতায় গণতন্ত্রের কথা বললেই গণতন্ত্র ও আইনের শাসন হয় না, দিন বদল বা সুশাসন তো দূরের কথা!

অন্যান্য মিডিয়া bdnews24 RTNN Sheersha News barta24 Prothom Alo Daily Nayadiganta Jugantor Samakal Amardesh Kaler Kantho Daily Ittefaq Daily Inqilab Daily Sangram Daily Janakantha Amader Shomoy Bangladesh Pratidin Bhorerkagoj Daily Dinkal Manob Zamin Destiny Sangbad Deshbangla Daily Star New Age New Nation Bangladesh Today Financial Express Independent News Today Shaptahik 2000 Computer Jagat Computer Barta Budhbar Bangladesherkhela Holiday Bangladesh Monitor BBC Bangla Redio Tehran
homeabout usdeveloped by

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ মো. তাসনীম আলম।

মহীউদ্দীন আহমদ কর্তৃক জাতীয় মুদ্রণ ১০৯, ঋষিকেশ দাস রোড, ঢাকা - ১১০০ হতে মুদ্রিত ও ১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা - ১১০০ হতে প্রকাশিত। যোগাযোগের ঠিকানাঃ ৪২৩ এলিফেন্ট রোড, বড় মগবাজার, ঢাকা - ১২১৭। ফোনঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৯০৬৫, বার্তা - ৮৮ ০১৬৭০৮১৩২৭৬, সার্কুলেশন - ৮৮ ০১৫৫২৩৯৮১৯০, বিজ্ঞাপন - ৮৮ ০১১৯৯০৯০০৮৫, ফ্যাক্সঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৫৫৭১, ওয়েবসাইটঃ www.weeklysonarbangla.net, ইমেইলঃ weeklysonarbangla@yahoo.com