সংবাদ শিরোনামঃ

পদ্মা সেতু প্রশ্নে সরকার গোঁফ নামিয়েছে ** সরকার জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে কালো আইনে বন্দী করে নির্যাতন করছে : এ কে এম নাজির আহমদ ** কালো টাকা : দুই বছরে এক লাখ কোটি টাকা পাচার ** নেতৃত্বসঙ্কটে আওয়ামী লীগ ** কথিত বিচারের নামে তামাশা বন্ধ করে ঈদের আগেই নেতৃবৃন্দকে মুক্তি দিন ** খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে ** বর্তমান সরকারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও ভালো চোখে দেখছে না ** মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে ** সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে সরকার ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে ** রমজানকে স্বাগত জানিয়ে দেশব্যাপী র্যালি ** নোয়াখালীতে রমজানের স্বাগত র্যালিতে পুলিশের হামলায় ১১ শিবির কর্মী আহত॥ গ্রেফতার ৩৭ **

ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ জুলাই ২০১২, ১২ শ্রাবণ ১৪১৯, ৭ রমজান ১৪৩

কালো টাকা : দুই বছরে এক লাখ কোটি টাকা পাচার

॥ আহমাদ সালাহউদ্দীন॥
বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রতিককালে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের মতে, যার পরিমাণ বছরে গড়ে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার বা ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো। এসব টাকার প্রায় পুরোটাই অপ্রদর্শিত অর্থ বা কথিত কালো টাকা। সরকার এসব অর্থ বিনিয়োগে আনতে পারছে না। দেশে ঘুষ-দুর্নীতি, অন্যায়-অনিয়ম যতো বাড়ছে, ততোই বাড়ছে কালো টাকার পরিমাণ। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটা ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। শুধু ২০১০ সালেই শেয়ার বাজার লুটের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে এক বছরে বিদেশে পাচার হয়ে যায় প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বা ৬০ হাজার কোটি টাকা। এরপর গতবছর কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমদানির নামে আরো প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বা ৪০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে সারাবিশ্বে মার্কিন ডলারের দাম কমতির দিকে থাকলেও বাংলাদেশে এক বছরের ব্যবধানে এই ডলারের দাম ১৫ টাকারও বেশি বৃদ্ধি পায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশে পুঞ্জিভূত কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ৮২ শতাংশ পর্যন্ত। অর্থাৎ বাংলাদেশের অর্থনীতির বার্ষিক উৎপাদন বা জিডিপি যেখানে ১১৫ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ৯০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কালো বা অপ্রদর্শিত অর্থ রয়েছে বাংলাদেশীদের মালিকানায়। কিন্তু এই টাকা প্রকৃতপক্ষে দেশে নেই। এটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। অথচ ৫-৬ বছর আগেও এদেশের কালো টাকা এদেশের অর্থনীতিতেই বেশি অবদান রাখতো। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবিশ্বাসের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ ও ব্যবসায়ীদের আস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এদেশ থেকে বিপুল পরিমাণে কালো টাকার পাশাপাশি বৈধ আয়ের অনেক ভালো টাকাও ডলারে রূপান্তরিত হয়ে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। যা অর্থনীতির জন্য মারাত্মক অশনি সংকেত। অর্থ মন্ত্রণালয় প্রায় প্রতি বছরের বাজেটেই কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দিলেও তা তেমন কাজে আসছে না। আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশের কালো টাকার হার বর্তমানে জিডিপির প্রায় ৫৭ শতাংশ হলেও অনেক অর্থনীতিবিদের হিসাবে এর পরিমাণ আরও বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমীা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে কালোটাকা বা আনট্যাক্সড মানি জিডিপির সর্বনিম্ন ৪৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৮২ শতাংশ। এই হিসাবে বাংলাদেশের সর্বমোট কালোটাকার পরিমাণ সর্বনিম্ন ৩ লাখ কোটি টাকা এবং সর্বোচ্চ ৬ লাখ কোটি টাকা। ‘বাংলাদেশের অপ্রকাশ্য অর্থনীতির আকার : একটি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ’ নামে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা এই সমীায় বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময় জমির অতি উচ্চমূল্য এবং শেয়ারবাজারের তেজিভাবের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কালোটাকার যোগসূত্র রয়েছে। এছাড়া, কালোটাকা বাড়ায় কিছু ব্যক্তির কাছে সম্পদ ঘনীভূত হচ্ছে। এতে সমাজে জীবনযাত্রার মানেও বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। এনবিআরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সরকার ১৭ বার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে। তবে এই সুযোগে প্রকাশ্যে সাদা হয়েছে খুব কম টাকাই। ৪১ বছরে সব মিলিয়ে দেশে কালো টাকা সাদা হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার কোটি আর এতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে মাত্র এক হাজার ৪শ’ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরে ৯২৩ কোটি কালো টাকা সাদা হয়েছে। গত অর্থবছরে ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে শেয়ারবাজারে কালো টাকা সাদার সুযোগ ১৫ জুলাই শেষ হয়েছে। তবে এখনো এর পুরো হিসাব পাওয়া না গেলেও এনবিআর বিষয়টি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে। দেশের অর্থনীতিতে সৃষ্ট বিপুল কালো টাকা যাতে দেশের বাইরে পাচার হয়ে না যায় সেজন্য প্রচলিত কর হারের সাথে আরো ১০ শতাংশ জরিমানা ধরে এই অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হচ্ছে বাজেটে। কিন্তু কাক্সিত হারে সাড়া পড়ছে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, যে দেশে আয়কর কম, কালো টাকা কিংবা ভালো টাকাও সেসব দেশে চলে যায়। তাই উচ্চ আয়করও ভালো নয়। অনেক দেশ এজন্য আয়কর কম রেখে তাদের দেশে অন্য দেশের কালো কিংবা ভালো সব টাকাই নিয়ে আসার উৎসাহ দেয়। যাতে এ টাকা ওই দেশের অর্থনীতিতে পুঁজি হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে। সুইজারল্যান্ড এক সময় সারা দুনিয়ার কালো টাকা এভাবে তার অর্থনীতিতে নিয়ে আসার জন্য ‘সুইস ব্যাংকে’র মতো গোপন ব্যাংকও রাষ্ট্রীয়ভাবে চালু করেছে। এখন এ কাজে সুইজারল্যান্ডকে ছাড়িয়ে গেছে ইসরাইল। বাংলাদেশের অনেক কালো টাকা ইদানীং ইউরোপ-আমেরিকা হয়ে ইসরাইলের ব্যাংকগুলোতে জমা হচ্ছে বলে শোনা যায়।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘আমার ধারণা কালো টাকার বেশির ভাগই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। কালো টাকা সাদা করার জন্য এবারের বাজেটে ঢালাওভাবে আবারো সুযোগ দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, এ সুযোগ দিলে কালো টাকার মালিকরা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। তবে খুব বেশি কালো টাকা সাদা হচ্ছে না।’ সুযোগ থাকলেও কালো টাকার মালিকরা তা নিচ্ছেন না কেন প্রশ্ন তুলে তিনি নিজেই এর উত্তরে বলেন, আমার ধারণা বেশির ভাগ কালো টাকাই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাছাড়া বারবার এই সুযোগ দেয়ার ফলে কালো টাকার মালিকরা কালো টাকা উপার্জনেই আরও বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে? এতে দেশের কি লাভক্ষতি হচ্ছে? হ্যাঁ, অর্থনীতিতে বিনিয়োগ অবশ্যই বাড়াতে হবে। তবে এভাবে কালো টাকার মাধ্যমে নয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ ইত্যাদির সরবরাহ বাড়াতে হবে। অবকাঠামোগত খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দেশের অবকাঠামোর আরও উন্নতির দরকার আছে। আর দরকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রাখা। এ প্রসঙ্গে রাজনীতিবিদদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এমনভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করে নিজেদের দাবি আদায় করতে হবে যাতে দেশের অর্থনীতি তিগ্রস্ত না হয়। আবার সরকারকে তার দেশের বিরোধী দলগুলোকেও আস্থায় রাখতে হবে। দমন-পীড়নে আখেরে ক্ষতি ছাড়া লাভ হয় না। একটি ভাঙ্গা অর্থনীতির দেশের মতায় থেকেও কোনো লাভ নেই। তার চেয়ে একটি সুস্থ অর্থনীতির দেশের বিরোধী দলে থাকাও অনেক ভালো।
বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, নির্ধারিত হারে জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সব সময়ই থাকে। এটা একটা পারমানেন্ট ব্যবস্থা। গত বাজেটে ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর দিয়ে স্টক মার্কেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তেমন সাড়া মেলেনি। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় এবারের বাজেটেও এ সুযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে কোনো খাত নির্দিষ্ট করা হয়নি। গতবছর পুঁজিবাজারে অস্থিরতার মধ্যে প্রণোদনামূলক বেশ কয়েকটি কার্যক্রম গ্রহণ করার কথা বলে সরকার। এর মধ্যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা অর্থের উৎস সম্পর্কে এনবিআর প্রশ্ন তুলবে না বলেও তখন জানানো হয়। কিন্তু তাতে পুঁজি বাজার ভালো হয়নি। বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় বাজেটে এ সুযোগ ছিল না। তৃতীয় বাজেটে অর্থাৎ গত অর্থবছরের বাজেটে কেবল শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের শর্তে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়। অর্থমন্ত্রী মুহিত কালো টাকা প্রসঙ্গে বলেন, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার পে আমি না থাকলেও রাজনৈতিক কারণে অনেক কিছু আপস করতে হয়। গণতান্ত্রিক সরকারকে অনেক বিষয়ে সমঝোতা করতে হয়। যেহেতু রাজনীতি হচ্ছে ‘আর্ট অব কম্প্রোমাইজ’। অর্থসচিব ড. মোহাম্মদ তারেকের মতে, প্রচলিত কালো টাকার সঙ্গে দুর্নীতির কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, পুঁজিবাদের কারণে বেশি মুনাফার প্রবণতা তৈরি হয়। সেখান থেকেই কালো টাকা তৈরি হচ্ছে। কালো টাকা অর্থনীতিতে পুঁজি তৈরি করে। এই পুঁজি অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। অর্থসচিবের মতে, বিশাল কর্মযজ্ঞ সৃষ্টির ল্েয কালো টাকা অর্থনীতির মূলধারায় আনার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তাতে কেন তেমন সাড়া পড়ছে না তা বিশ্লেষণ করার দরকার। ড. তারেক বলেন, পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে ‘কালো অর্থনীতি’ নেই। ওই অর্থনীতির মানে হলো, এ সম্পদের ওপর কর দেয়া হয়নি। এটা রাষ্ট্রের অজ্ঞাত। তিনি জানান, ভারত ৫০ বছর ধরে এ ধরনের অর্থ অর্থনীতিকে মূলধারায় আনার চেষ্টা করছে।
কালো টাকা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, প্রথমবার বাজেট করার সময়ই আমি কালো টাকা সাদা করার পে ছিলাম না। তবুও এ সুযোগ দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় বাজেটে সুযোগ দেয়া না হলেও পরের বাজেটে আবার শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের েেত্র কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, কালো টাকা নিরুৎসাহিত করা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। যদিও সরকার জানে কোন কোন উৎস থেকে কিভাবে কালো টাকার জন্ম হয়। অর্থমন্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, কর ফাঁকি দিতে দেশ থেকে অনেকে টাকা পাচার করে কিছু প্রবাসীর কাছে পাঠান। আর প্রবাস থেকে সেই অর্থ ঘুরিয়ে রেমিটেন্স হিসাবে দেশে আনা হয়। কারণ রেমিটেন্স সব ধরনের করমুক্ত। রেমিটেন্সের কারণেও দেশে কালো টাকা উৎপাদন হচ্ছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীরা ব্যাংকের মাধ্যমে যে রেমিটেন্স দেশে পাঠায় সে অর্থ প্রেরণকারী কিভাবে উপার্জন করলো তার কোনো খোঁজ-খবর নেয়া হয় না। সরকার ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করে না। এ কারণেই কালো টাকা হতেই থাকবে। এটা বন্ধ হবে না। অর্থমন্ত্রীর মতে, ১৯৯০-এর দিকে রেমিটেন্স সম্পূর্ণ করমুক্ত ঘোষণা করার পর থেকেই রেমিটেন্সের নামে করমুক্ত সুবিধা নিতে দেশের টাকা বিদেশ ঘুরে আবার দেশে ফিরছে। রেমিটেন্সের ওপর অদূর ভবিষ্যতে করারোপ করা যায় কিনা তা নিয়ে চিন্তাভাবনা হচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে সংশ্লিষ্ট দেশে ওই অর্থের ওপর একবার ট্যাক্স দেয়া হলে তার ওপর এদেশে আর নতুন করে ট্যাক্স ধার্য করা যাবে না। কারণ আন্তর্জাতিক নিয়মে দ্বৈত ট্যাক্স হয় না। টাকার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতি একটা বড় সমস্যা। টাকার বেশি অবমূল্যায়ন হতে থাকলে এবং মূল্যস্ফীতি বেশি ঘটতে থাকলে অনেকে নগদ টাকা রাখার চেয়ে তা ডলার কিংবা স্বর্ণের মতো কোনো মূল্যবান ধাতু আকারে রেখে দেয়া বেশি লাভজনক মনে করেন। এতে করেও প্রচুর টাকা ডলার আকারে বাইরে চলে যায়। কালো টাকা তো যায়ই। এ টাকা অনেকে জমি-জমা ও ফ্যাটেও বিনিয়োগ করেন। এতে জমি ও ফ্যাটের দাম সাম্প্রতিককালে এতো বেড়ে গেছে যে, সাধারণ মানুষের জন্য একখণ্ড জমি বা একটি বাড়ির মালিক হওয়া দুস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এটা ভাঙ্গার জন্যও কালো টাকা সব খাতে সাদা করার সমান সুযোগ থাকা উচিত। যাতে এ টাকা বিশেষ কোনো খাতে একতরফা ঢুকে পড়ে তাকে উচ্চ মূল্যায়িত করে স্থবিরতার পর্যায়ে না নিয়ে যায়। এদেশে শেয়ার মার্কেট ও হাউজিংয়ের ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে জিডিপি’র ৪২ থেকে ৮২ শতাংশ পর্যন্ত অপ্রদর্শিত অর্থ বা কথিত কালো টাকা রয়েছে। এই টাকা সরকার বিনিয়োগে আনতে চায়। যাতে এই বিপুল অর্থ দেশের বাইরে পাচার হয়ে না যায়। সে জন্য প্রচলিত কর হারের সাথে আরো ১০ শতাংশ জরিমানা ধরে এ অর্থ সব ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছে বাজেটে। এটা দোষের কিছু নয়। কারণ বিশ্বের সব দেশেই এ ধরনের অর্থ রয়েছে এবং সব দেশে, সব কালেই কর ফাঁকি দেবার প্রবণতাও রয়েছে। এই অর্থ ভোগে ব্যয় হওয়া কিংবা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার চেয়ে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে আসা বেশি কল্যাণকর। তাই সরকার এ অর্থের উৎপাদনশীল ব্যবহার বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এবং এটা নতুন কিছু নয়। এতে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি হবে এবং দেশের টাকা দেশেই থাকবে। যার পরিণতিতে সরকারের আয় পরবর্তীকালে স্থায়ীভাবে অনেক বেড়ে যাবে। 
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার বিভিন্ন সময়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিলেও এতে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে ভীতি। এনবিআর ছাড় দিলেও এ ব্যাপারে দুদকের কোনো ঘোষণা নেই। ফলে মানুষ আশ্বস্ত হতে পারে না যে, পরবর্তীতে দুদক তাকে এজন্য হেনস্থা করবে কি না। তাই এ ব্যাপারে সরকারের পরিষ্কার ও স্বচ্ছ ঘোষণা এবং আইন থাকা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. একে এনামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘কালো’ টাকা মূলত দু’ ধরনের। সৎভাবে উপার্জিত কালো টাকা এবং অসৎভাবে উপার্জিত কালো টাকা। বাংলাদেশের কথিত কালোটাকার বেশিরভাগই প্রকৃতপক্ষে অপ্রদর্শিত এবং কর অনারোপিত। এদেশের অসংখ্য মানুষের বৈধ উপার্জনের পুরোটার ওপর সরকার নির্ধারিত হারে আয়কর না দেয়ার কারণেও আইনের ভাষায় তা ‘কালো’ টাকায় পরিণত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যেখানে পুঁজিবাদ আছে, সেখানে এ ধরনের কালো টাকার জন্ম হবেই। কিন্তু এ কালো টাকার জন্ম দেয়া যতোটা-না অপরাধ, তার চেয়ে বেশি অপরাধ হচ্ছে এই টাকাকে দেশের বাইরে তাড়িয়ে দেয়া। কিন্তু বাংলাদেশে দ্বিতীয় অপরাধটাই হচ্ছে বেশি। অথচ এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলছে না। বাংলাদেশে কথিত কালো টাকা সম্পর্কে সরকারের কোনো নীতিমালা এবং এনবিআর ও দুদকের মধ্যে কোনো সমন্বয় না থাকায় বেশির ভাগ কালো টাকাই দেশের অর্থনীতিতে ব্যবহৃত না হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে এর পরিমাণ বছরে প্রায় ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার। কালো টাকা নিয়ে সরকারের দোদুল্যমনতা এবং এনবিআরের সাথে দুদকের সমন্বয়হীনতা ও ওয়ান-ইলেভেনের শিক্ষার কারণে সাম্প্রতিককালে এই অর্থ পাচারের পরিমাণ আরো বেড়ে গেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে। যে কারণে ডলারের দামও অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে চলেছে। এতে দেশের সাধারণ ভোক্তা শ্রেণী ও বিনিয়োগকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্বে বর্তমানে জিডিপি’র আকার অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি কালো টাকার জন্ম হচ্ছে চীন ও ভারতে। অস্ট্রিয়ায় জোহান্স কেপলার ইউনিভার্সিটি অব লিনজের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ফ্রেডারিক স্নাইডারের এক গবেষণায় কালোটাকার পরিমাণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে কালো টাকা আছে ৪২ শতাংশ, সাব-সাহারান আফ্রিকায় এই হার সাড়ে ৪১ শতাংশ এবং ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় ৪০ শতাংশ। আর দণি এশিয়ায় কালোটাকার হার গড়ে ৪৫ শতাংশ। সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে সুইজারল্যান্ড, দেশটির অনানুষ্ঠানিক বা ছায়া অর্থনীতির হার বর্তমানে ৯ শতাংশ। সারা দুনিয়ায় কালো টাকা উৎপাদনে উৎসাহ দিলেও দেশটি নিজের ব্যাপারে খুবই সচেতন। দণি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের কালো টাকা ৪৩ শতাংশ, ভুটানের ৩১ শতাংশ, মালদ্বীপের কালোটাকা ৩২ শতাংশ, নেপালের কালো টাকা সাড়ে ৩৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের কালোটাকার হার ৪০ শতাংশ। দণি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে আছে শ্রীলঙ্কা, ৪৭ শতাংশ। তবে তার জিডিপি’র আকার ছোট। সমীা অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপি’র ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ, ২০০০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০০১ সালে ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০০২ সালে সাড়ে ৩৫ শতাংশ, ২০০৩ সালে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০০৪ সালে ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০০৫ সালে ৩৬ শতাংশ, ২০০৬ সালে ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০০৭ সালে তা বেড়ে হয় ৩৭ শতাংশ। অধ্যাপক স্নাইডারের গবেষণায় সর্বশেষ ২০০৭ সাল পর্যন্ত তথ্য রয়েছে। বর্তমানে এই হার আরও অনেক বেশি এবং বাংলাদেশে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ীই এটা ৮২ শতাংশ পর্যন্ত। অর্থাৎ বর্তমান সরকারের গত সাড়ে ৩ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। ‘বিশ্বব্যাপী ছায়া অর্থনীতি : ১৬২টি দেশের নতুন হিসাব’ নামের এই গবেষণা গতবছর প্রকাশিত হয়। অধ্যাপক স্নাইডার ২০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কালোটাকা নিয়ে কাজ করছেন। এটাকেই কালোটাকা নিয়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক গবেষণা ধরা হয়।

অন্যান্য মিডিয়া bdnews24 RTNN Sheersha News barta24 Prothom Alo Daily Nayadiganta Jugantor Samakal Amardesh Kaler Kantho Daily Ittefaq Daily Inqilab Daily Sangram Daily Janakantha Amader Shomoy Bangladesh Pratidin Bhorerkagoj Daily Dinkal Manob Zamin Destiny Sangbad Deshbangla Daily Star New Age New Nation Bangladesh Today Financial Express Independent News Today Shaptahik 2000 Computer Jagat Computer Barta Budhbar Bangladesherkhela Holiday Bangladesh Monitor BBC Bangla Redio Tehran
homeabout usdeveloped by

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ মো. তাসনীম আলম।

মহীউদ্দীন আহমদ কর্তৃক জাতীয় মুদ্রণ ১০৯, ঋষিকেশ দাস রোড, ঢাকা - ১১০০ হতে মুদ্রিত ও ১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা - ১১০০ হতে প্রকাশিত। যোগাযোগের ঠিকানাঃ ৪২৩ এলিফেন্ট রোড, বড় মগবাজার, ঢাকা - ১২১৭। ফোনঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৯০৬৫, বার্তা - ৮৮ ০১৬৭০৮১৩২৭৬, সার্কুলেশন - ৮৮ ০১৫৫২৩৯৮১৯০, বিজ্ঞাপন - ৮৮ ০১১৯৯০৯০০৮৫, ফ্যাক্সঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৫৫৭১, ওয়েবসাইটঃ www.weeklysonarbangla.net, ইমেইলঃ weeklysonarbangla@yahoo.com