বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি’ বা ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়’ বলে একটা কথার ব্যবহার রয়েছে। কথাটা বেশিবার বলেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, অবশ্য মতায় আসার আগে। কথায় কথায় তিনি এই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দোহাই দিয়েছেন। বোঝাতে চেয়েছেন যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন সহযোগিতা না পেলে বাংলাদেশ এক পা-ও এগোতে পারবে না। আর এই সমর্থন পাওয়ার জন্যই তাকে অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে মতায় বসানো দরকার। মিনিটে সাতটি, কোথাও কোথাও দশটিরও বেশি ভোট দেখিয়ে ডিজিটাল নির্বাচনের মাধ্যমে মতায় তাকে বসানোও হয়েছে। কিন্তু তারপর থেকেই সময়ে সময়ে গোলমালে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। সব বিষয়ে তিনি আর আগের মতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন পাচ্ছেন না। এ সংক্রান্ত সর্বশেষ দু-একটি তথ্য নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটনের কিছু কথার উল্লেখ করলে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং এ উদ্দেশ্যে প্রণীত আইন ও গঠিত ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে খোঁজ-খবর করার জন্য ২০১১ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিফেন জে র্যাপ ঢাকায় এসেছিলেন। দেশে ফিরে তিনি যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন তা দেখে হতাশ ও ুব্ধ হয়েছিলেন হিলারি কিনটন।
নিজের প্রতিক্রিয়া ও মতামত জানানোর জন্য হিলারি টেলিফোন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীকে। তিনি বলেছেন, বর্তমানে যেভাবে বিচার প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে তাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করতে পারে না। বাংলাদেশকে অবশ্যই সমগ্র প্রক্রিয়ার সংস্কার করতে হবে, যাতে এই বিচার বিরোধী দলকে শাস্তি দেয়ার মাধ্যম বা হাতিয়ার না হয়ে ওঠে। এ কথার জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অঙ্গীকার করা হয়েছিল বলেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজে হাত দিয়েছে তার সরকার। হিলারি কিনটন তখন বলেছেন, কিন্তু সে বিচার এমন পন্থায় হওয়া উচিত যাতে তা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়। অন্যদিকে বর্তমানে যেভাবে বিচার প্রক্রিয়া চলছে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ত্র“টিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং এর রায় আপনার ভোটাররাও মেনে নেবে না।
বিষয়টিকে এত বেশি গুরুত্বের সঙ্গে না নেয়ার অনুরোধ জানিয়ে এই পর্যায়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, দেশে চিহ্নিত কিছু অপরাধী রয়েছে তার সরকার যাদের ‘সোজা’ করতে চায়। জবাবে হিলারি কিনটন বলেছেন, বিচার বিভাগের ওপর আপনার সরকারের প্রভাব সম্পর্কেও রাষ্ট্রদূত স্টিফেন জে র্যাপ আমাকে অবহিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, কিভাবে সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী আদালত একের পর এক তার রায় দিয়ে চলেছে। টেলিফোনের এই কথোপকথনে নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সাম্প্রতিক অভিযান সম্পর্কেও হিলারি কিনটন কঠোর কিছু কথা শুনিয়েছিলেন। জবাবে ড. ইউনূসের প্রসঙ্গকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। ঠিক এ পর্যায়ে এসেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিলেন হিলারি কিনটন। বলেছিলেন, আমি ভাবিনি যে, আমাকে এত দূর পর্যন্ত যেতে হবে। কিন্তু এখন দেখছি, আমার ভাবনায় ভুল ছিল। এরপর হিলারি একে একে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, কিভাবে ভারতের উদ্যোগে ‘পূর্বনির্ধারিত’ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে মতায় আনা হয়েছিল এবং ভারতের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে ওই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপে বলে সমর্থন জানিয়েছিল। হিলারি কিনটনের কথার মধ্যে শেখ হাসিনাকে ধমক দেয়ার এবং সতর্ক করার উদ্দেশ্য গোপন থাকেনি।
নিবন্ধ এভাবে শুরু করার কারণ হলো, মহাজোট সরকারের বদৌলতে বাংলাদেশ অনেকাংশে আন্তর্জাতিক বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। মতাসীনরা কোনো না কোনো কারণ সৃষ্টি করছেনই যাকে কেন্দ্র করে বিদেশে বাংলাদেশকে নিয়ে আলোচনা চলছে। আলোচনার সঙ্গে নিন্দা-সমালোচনাও যথেষ্টই হচ্ছে। উদাহরণ দেয়ার জন্য পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক দুর্নীতির উল্লেখ করা যায়। কিন্তু গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে সম্প্রতি মানবাধিকার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জোর আলোচনার পাশাপাশি নানা নামে বিদেশীদের রিপোর্টে ঘুরে-ফিরে আসছে গুম ও ক্রসফায়ারসহ গুপ্তহত্যা। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার জন্য গঠিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং তার কার্যক্রম নিয়েও ব্যাপক আলোচনা চলছে। এ দুটি বিষয়ে চলতি মাস জুলাইয়ের প্রথমদিকে সাড়া তুলেছিল নিউ ইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ৪ জুলাই ঢাকায় প্রকাশিত রিপোর্টে সংস্থাটি পিলখানা হত্যকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্তদের বিচার প্রক্রিয়া স্থগিত করার এবং র্যাবকে ভেঙে দেয়ার দাবি জানিয়েছে। বলেছে, বিডিআর বিদ্রোহে অভিযুক্তদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং আটক অবস্থায় নির্যাতনে মৃত্যু ঘটেছে অন্তত ৪৭ জনের। এসব নির্যাতন ও হত্যার জন্য মূলত র্যাব দায়ী ছিল বলে মন্তব্য করে ‘কুখ্যাত’ এ বাহিনীটিকে ভেঙে ফেলারও দাবি রয়েছে রিপোর্টে।
খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এই রিপোর্টের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা চলতে থাকা অবস্থায়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বাংলাদেশের গুম ও গুপ্তহত্যার ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ১৯ জুলাই সিনেটের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির এ শুনানিতে উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ব্লেক এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অ্যাডভোকেসির পরিচালক জন সিফটন উপস্থিত থেকে দীর্ঘ বক্তব্য রেখেছেন। শুনানিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গুমের সংখ্যা ‘ভয়ানক হারে’ বেড়ে চলেছে। বিরোধী দলের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছে। দেশটিতে শ্রমিকের অধিকারসহ মানবাধিকার লংঘিত হচ্ছে। শুনানিতে গার্মেন্ট শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জন সিফটন র্যাবকে ‘কুখ্যাত’ এবং ‘ডেথ স্কোয়াড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। শুনানিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার জন্য গঠিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং তার কার্যক্রম প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে সংঘটিত অপরাধের আসল ‘লেখক ও স্থপতি’ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে ছাড় দিয়ে যে বিচার কাজ চালানো হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ব্যক্তির জবানবন্দীকে স্যা হিসেবে গ্রহণ করার মতো বেশ কিছু তথ্যের উল্লেখ করেছেন তারা, যেগুলো আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যথার্থ নয়।
ল্যণীয় বিষয় হলো, মার্কিন সিনেটের শুনানিতে প্রাধান্য পেয়েছিল গুম ও গুপ্তহত্যা। প্রসঙ্গক্রমে অন্য একটি তাপর্যপূর্ণ তথ্যেরও উল্লেখ করা দরকার। তথ্যটি হলো, ওয়াশিংটনে যেদিন মার্কিন সিনেটের শুনানি হয়েছে সেদিনই ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরাও গুম ও গুপ্তহত্যার ব্যাপারেই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্টস অব বাংলাদেশ বা ডিক্যাব-এর ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুম এবং গার্মেন্ট শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ করে ইইউ-এর রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম হানা বলেছেন, এর ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রফতানি তিগ্রন্ত হবে। কথাটা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করা দরকার। কারণ, উন্নত ও ধনী দেশের ক্রেতারা কোনো পোশাক কেনার আগে রফতানিকারক দেশের শ্রমিকদের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর করেন।
শ্রমিকরা ভালোভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে আছে কিনা তা জানতে চান। সে ক্রেতারাই যদি শোনেন যে, বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রমিকরা মোটেও ভালো অবস্থায় নেই এবং তাদের একজন নেতাকে গুম করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে তখন বাংলাদেশের পোশাক কেনা থেকে পিছিয়ে পড়বেন তারা। এভাবে এক সময় বাংলাদেশের পোশাকই তারা কেনা বন্ধ করে দেবেন। এর ফলে ইউরোপের দেশগুলোতে তৈরি পোশাকের রফতানি বন্ধ হয়ে যাবে। এর পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ, ইউরোপের দেশগুলোই বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান ক্রেতা। সুতরাং, রফতানি বন্ধ হলে অপূরণীয় তির মুখে পড়বে বাংলাদেশ।
এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি এসেও মহাজোট সরকার কিন্তু বিষয়গুলোর ব্যাপারে যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না। মতাসীনরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্টটির মধ্যেও যথারীতি বরং ‘ষড়যন্ত্র’ই আবিষ্কার করে বসেছেন। ‘মন্ত্রী’ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল এবং তার ঠিক পরপর দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বক্তব্য ‘সরকারের পতন ঘটানোর ষড়যন্ত্র’ ছাড়া আর কিছু নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিদেশী প্রতিষ্ঠানের এই রিপোর্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের অংশ। সংস্থাটির ‘মনগড়া’ এ রিপোর্টকে প্রত্যাখ্যান করে র্যাব বলেছে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নিজেই ‘কুখ্যাত’। আর আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের বক্তব্য, বিরোধী নেতাদের বক্তব্য ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বক্তব্যের মধ্যে একই সুর রয়েছে।
লম্বা অনেক কথা বললেও মতাসীনরা তাই বলে রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন অর্জন করতে পারেনি। যেমন ৬ জুলাই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বর্তমান সরকারের আগে আর কোনো সরকারের সময়ই বাংলাদেশে মানবাধিকার লংঘনের এত বেশি ঘটনা ঘটেনি। সরকার র্যাবকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে বলেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সংস্থাটিকে ভেঙে ফেলার সুপরিশ করার সুযোগ পেয়েছে। দেশপ্রেমিক অন্য সব মহলও মনে করেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্টটিকে ঢালাওভাবে প্রত্যাখ্যান করে মতাসীনদের দেয়া বক্তব্য সমর্থনযোগ্য নয়। গুরুতর কিছু অভিযোগ রয়েছে বলেই রিপোর্টটিকে যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া দরকার। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কেন বিশেষ করে এলিট ফোর্স র্যাবকে ভেঙে দেয়ার দাবি জানাতে পেরেছে তা নিয়ে চিন্তা করা দরকার। ল্য করলে দেখা যাবে, আদালত যদি যথাযথভাবে তার দায়িত্ব পালন করতো এবং বিচারকরা যদি অভিযুক্তদের জন্য ন্যায়বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতেন তাহলে কাউকেই বেআইনিভাবে নির্যাতিত হতে হতো না। তেমন অবস্থায় বিচার চলাকালে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালানো সম্ভব হতো না, কারো প্রশ্নসাপে মৃত্যুও ঘটতো না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাও এর সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অভিযোগ আনার সুযোগ পেতো না।
এজন্যই প্রত্যাখ্যান করার পরিবর্তে মূল কারণটির প্রতি নজর দেয়া দরকার। অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে দরকার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। র্যাবের ব্যাপারেও সরকারের নীতি পাল্টানো দরকার। কারণ, এলিট ফোর্স হিসেবে পরিকল্পিত র্যাব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল দেশের ভেতরে সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র কর্মকাণ্ড নির্মূল করার পাশাপাশি অন্য রাষ্ট্রের গোয়েন্দা তৎপরতা প্রতিহত করা। শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের মতো জঙ্গিদের গ্রেফতারসহ অনেক কর্মকাণ্ডেই র্যাব অসাধারণ সফলতা দেখিয়েছে। সুযোগ দেয়া ও সদ্ব্যবহার করা হলে কোনো রাষ্ট্রের পওে বাংলাদেশে গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো সম্ভব হতো না। অন্যদিকে সরকার র্যাবকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে বলেই এলিট এ বাহিনীটিকে ক্রসফায়ারসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে, হতে হচ্ছে নিন্দিতও।
মার্কিন সিনেটের শুনানির ব্যাপারেও প্রত্যাখ্যান করার একই কৌশল নিয়েছেন মতাসীনরা। বলেছেন, সবই নাকি ‘গতানুগতিক’ এবং ‘মনগড়া’। আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম আবার ষড়যন্ত্রও আবিষ্কার করে বসেছেন। তিনি বলেছেন, বিরোধী দল, বিশ্বব্যাংক এবং একজন রাষ্ট্রদূত নাকি মিলিতভাবে সরকারের পতন ঘটানোর জন্য ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে! হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট থেকে মার্কিন সিনেটের শুনানি পর্যন্ত সবকিছুই নাকি সে ষড়যন্ত্রের ফল! অন্যদিকে দেশপ্রেমিক পর্যŸেকরা কিন্তু উল্টোটাই মনে করেন। তাদের মতে, রিপোর্ট ও শুনানি প্রত্যাখ্যানের মধ্যে সমাধান থাকতে পারে না। গুম-খুনের কথাই ধরা যাক। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট, মার্কিন সিনেটের শুনানি এবং ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূতের মূলকথা ল্য করলে দেখা যাবে, এসবের মধ্যে সরকারের জন্য সতর্ক হওয়ার বার্তা শুধু নয়, সুনির্দিষ্ট পরামর্শও রয়েছে। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে গুম ও গুপ্তহত্যাকে অত্যন্ত বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। যেসব দেশের সরকার গুম-খুন ও গুপ্তহত্যার সঙ্গে জড়িত থাকে সেসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার বিরোধিতা করেন ট্যাক্সদাতা জনগণ। ওই দেশগুলোতে গণতন্ত্র রয়েছে বলে ট্যাক্সদাতাদের কথার বাইরে যাওয়ার সুযোগ বা মতা থাকে না সরকারের। তারা বরং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বাধ্য হয়। সে সম্ভাবনার কথাটইি শুনিয়ে রেখেছেন ইইউ-এর রাষ্ট্রদূত। সুতরাং, মহাজোট সরকারের উচিত অবিলম্বে অন্তত গুম ও গুপ্তহত্যার মতো কর্মকাণ্ড বন্ধ করা। র্যাবকে দিয়েও এমন কোনো কাজ করানো চলবে না যার অজুহাতে এলিট এ বাহিনীকেই বিলুপ্ত করার দাবি উঠবে।
মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে মার্কিন সিনেটের শুনানিতে যে মন্তব্য করা হয়েছে সেদিকেও সরকারের উচিত মনোযোগ দেয়া। কারণ, ‘লেখক ও স্থপতি’ তথা প্রধান অপরাধী ছিল পাকিস্তান সরকার ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সেই অপরাধীদের সম্পূর্ণরূপে ছাড় দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন বিশিষ্ট নেতাকে আসামি বানানো হয়েছে বলে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে তো বটেই, বিচার কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন সিনেটের শুনানিতেও এসব কথাই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রাধান্য পেয়েছে। বলার অপো রাখে না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে যখন অন্য কোনো রাষ্ট্রের কোনো বিশেষ বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্তমূলক মন্তব্য করা হয় তখন সংশ্লিষ্ট দেশের মতাসীনদের উচিত সতর্ক হওয়া। বর্তমান পর্যায়ে গুম ও গুপ্তহত্যা বন্ধের পাশাপাশি বিশেষ করে মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমের বিষয়ে পদপে নেয়া দরকার যুক্তি ও আইনের ভিত্তিতে। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের গঠন থেকে সমগ্র বিচার প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই সেটা করা হয়নি, না এখনও হচ্ছে। সরকারের উচিত, সময় একেবারে পেরিয়ে যাওয়ার আগেই প্রতিহিংসামূলক উদ্দেশ্য তথা রাজনীতি পরিত্যাগ করা। একথা অবশ্যই বুঝতে হবে যে, যুদ্ধাপরাধের দায়ে মামলা দায়ের ও নেতাদের গ্রেফতার করা থেকে ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমের প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়েও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তীèভাবেই নজর রাখছে। সুতরাং, সবকিছু মাথায় রেখে পা ফেলতে না পারলে তার পরিণতি মতাসীনদের ভুগতে হবে। বস্তুত সব মিলিয়ে সময় সরকারের জন্য সময় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে। স্টান্টবাজি করার জন্য বাগাড়ম্বর করলেও কোনো একটি বিষয়েই সরকারের নিজের যে কোনো মতা নেই সে সম্পর্কে সর্বশেষ ধারণা পাওয়া গেছে পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহে। ‘নিজেদের অর্থে’ নির্মাণের আড়াল নিয়ে এক শোরগোল তোলার ও চাঁদাবাজি করার বাইরে মতাসীনরা আর কিছুই করতে পারেননি। অর্থমন্ত্রীকে সামনে রেখে সরকারকে বরং মিউমিউ করা বেড়ালের পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। অর্থমন্ত্রী এখন বিশ্বব্যাংকের হাতে-পায়ে ধরছেন। বিশ্বব্যাংকসহ দাতা গোষ্ঠীর হস্তপে কেউই সমর্থন করে না। কিন্তু বিশ্বব্যাংককে ঘাড়ে উঠিয়েছে সরকার নিজেই। মতাসীনরা এমনভাবেই ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন যে, বিশ্বব্যাংক রীতিমতো হুকুমদারি শুরু করেছে। সরকারকেও বাধ্য হয়ে মাথা নত করতে হয়েছে। এর সহজ অর্থ হলো, এই সরকারের পে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে কিছুই করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সে সম্প্রদায়ের কাছেও সরকার অজনপ্রিয় হয়ে বসে আছে। কোনো কোনো গোষ্ঠী এমনকি ভালো চোখেও দেখছে না সরকারকে। এসব তথ্যের মধ্যে ‘আকেলমান্দদের’ জন্য ইশারা যথেষ্টই রয়েছে বলা যায়।
