হারুন ইবনে শাহাদাত
নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ গত ১৯ জুলাই আমেরিকার বেলভিউ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর ইন্তেকালের ৫ দিন পর ২৩ জুলাই তাঁর লাশ বাংলাদেশে আসে। ঐ দিনই জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে নামাজে জানাজা হয়। ২৪ জুলাই গাজীপুরের নুহাশ পল্লীতে তাঁকে দাফন করা হয়েছে। নুহাশ পল্লীতে তাঁর জানাজা পড়িয়েছেন মাওলানা মুজিবুর রহমান। তিনি নুহাশ পল্লীতে অবস্থানকালে তাঁর ইমামতিতে নামাজ পড়তেন।
২৩ জুলাই রাতে ফেসবুকে ফ্রান্স থেকে প্যারিস ভিশন সম্পাদক মান্নান আজাদ আমাকে একটি ভিডিও কিপ শেয়ার করেছেন। একই ভিডিও কিপ শেয়ার করেছেন দিগন্ত টেলিভিশনের ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মজিবুর রহমান মনজু। মনজু ভাই লিখেছেন, পুরো ভিডিও দেখার পর মন্তব্য করবেন। আগ্রহ নিয়ে ভিডিও কিপটি দেখলাম। আমেরিকাতে চিকিৎসার সময় তিনি সম্ভবত যে ফ্যাটে অবস্থান করছিলেন সেখানকার একটি বিশেষ মুহূর্তের ধারণকৃত দৃশ্য। হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপের এক ফাঁকে গিয়াসউদ্দিন রচিত একটি সঙ্গীতের কথা উল্লেখ করেন।
‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে জাদুধন
মরিলে কান্দিস না আমার দায়।
সুরা ইয়াসিন পাঠ করিও বসিয়া কাছায়
যাইবার কালে বাঁচি যেন শয়তানের ধোঁকায় ।
লোবান দিয়া কাছে বইসা গোসল করাই বায়
কান্দোনের বদলে মুখে কলমা পড়িবায়।
কাফন পিন্দাইয়া যদি কান্দো আমার দায়
মসজিদে বসিয়া রে কান্দো আল্লাহরি দরগায়।’
হুমায়ূন আহমেদ গান শোনতে শোনতে চোখের পানি মোছেন। বৈঠকের একজন বলেন, সবাই নামাজ পড়ে দোয়া করবেন স্যার যেন, কমপে আরো পঞ্চাশ বছর বাঁচেন। তখন একজন বৃদ্ধলোক বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের এক সেকেন্ড আগেও কারো মৃত্যু হবে না পরেও না। নির্দিষ্ট সময়েই আসবে। তখন হুমায়ূন আহমেদ বলেন, আমাদের সুরা বনি ইসরাইলে একটি আয়াত আছে,‘ এই আয়াতটি আমার খুব ভালো লাগে , আয়াতটি হলো, ‘আমি তোমাদের প্রত্যেকের ভাগ্য গলায় হারের মতো ঝুলাইয়া দিয়েছি। ইহা আমার পে সম্ভব।’
হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাব এমন সময় বাংলা সাহিত্যে ঘটে যখন আমাদের কথাসাহিত্য ছিল ভারতের কলকাতাকেন্দ্রিক লেখকদের দখলে। তাঁর কথাসাহিত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এতে যৌনতা ও সন্ত্রাস নেই। সেই অর্থে কোন খলনায়ক তাঁর সাহিত্যে নেই। কেন তিনি তাঁর সাহিত্যে কোনো খলনায়ক সৃষ্টি করেননি, সন্ত্রাস ও যৌনতার অশ্লীলতার রসে সিক্ত করেননি, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, সাহিত্য হলো আগুনের মতো এর প্রভাব হৃদয় থেকে হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তাই তিনি এমন কিছু লিখেননি যার নেতিবাচক প্রভাবে সমাজ তিগ্রস্ত হয়।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম অশ্লীল লেখক হুমায়ুন আজাদ আক্রমণের শিকার হলে তখন তিনি ১৮ জুলাই ২০০৮ সালে দৈনিক সমকালের সাথে এক সাাৎকারে বলেছেন, ‘যে বইটা তিনি লিখেছিলেন, তা এতই কুৎসিত যে, যে কেউ বইটা পড়লে আহত হবে। তার জন্য মৌলবাদী হতে হয় না।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সম্পর্কে তিনি বলেন : ওনাকে কেউ তো খুন করেনি। উনিতো ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন। ওনাকে দেশদ্রোহী কখনোই বলা হয়নি। দেশদ্রোহী কথাটা ভুল ইনফরমেশন। তার বিরুদ্ধে কখনোই দেশদ্রোহিতা মামলা হয়নি। তাছাড়া পুরো ব্যাপারটিই ছিল এত তুচ্ছ, আমরা জানি যে, পুরোটাই ছিল একটা সাজানো খেলা।
‘সমাজ ও রাজনীতি’ অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ ও রাজাকার বিষয়ক একটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা পাকিস্তানকে সাপোর্ট করেছেন তাদের মধ্যে আমার নানাও একজন, যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মারা গেছেন। আমার এই নানার মতো, মামার মতো ভদ্রলোকÑ পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত এত পরিপূর্ণ ভদ্রলোক এই জীবনে দেখিনি। আমার নানা একটি আদর্শ নিয়ে বড় হয়েছেন। একটি পূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন। কারণ বড় হওয়ার সময় এই অঞ্চলের হিন্দুদের দ্বারা প্রচণ্ড নির্যাতিত হয়েছিলেন। কোনো মিষ্টির দোকানে গেলে তাদের প্লেটে করে মিষ্টি দেয়া হতো না। তারা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তাদের হাতে দেয়া হতো। এটা শুধু মুসলমানদের সঙ্গেই না, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গেও করতো। এটা ছিল হিন্দুদের কাস্ট সিস্টেম। এসব দেখে দেখে সে সময়ের মুসলমানরা বড় হয়েছেন এবং তাদের মনে হয়েছে একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রয়োজন। অনেক যুদ্ধের পর তারা তা পেয়েছেন। যখন তারা দেখলেন চোখের সামনে দিয়ে সেই রাষ্ট্র ভেঙে যাচ্ছে, তখন তারা মনে করেছেন আবার হিন্দু রাজত্ব শুরু হয়ে যাবে। তখন পাকিস্তানকে সাপোর্ট করা শুরু করেন। কিন্তু পাকিস্তান আর্মির অন্যায়গুলো ক্রমেই চোখে পড়তে থাকে। তারা দেখলেন পাকিস্তানি আর্মিরা তো কেবল হিন্দু মারছে না, সমানে মুসলমানদেরও খুন করছে। আমার নানা দেখলেন, তার অতি আদরের বড় মেয়ের পুলিশ অফিসার স্বামীকে (আমার বাবা) বেঁধে নিয়ে আর্মিরা গুলি করে মেরে ফেলল। তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। কী হচ্ছে এসব? কোন দিকে যাবেন? তিনি কি পাকিস্তান আর্মির সঙ্গেই থাকবেন , নাকি কমন যে স্রোত আছে তাদের সঙ্গে যোগ দেবেন? এই নিয়ে কনফিউশন তৈরি হলো তার মধ্যে। তিনি এই কনফিউশন দূর করতে পারলেন না। এ েেত্র তার যেমন দোষ ছিল, আমাদেরও ছিল। কারণ আমরা তাদের বোঝাতে পারিনি, কনফিউশন দূর করাতে পারিনি। তিনি মারা গেলেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। এখন আমরা তাকে মা করব কি করব না সেই প্রশ্ন। শেখ মুজিব সাহেব তাদের মা করে দিয়েছেন। আমি মার পপাতী। (মাহফুজ আহমেদ, ঘরে-বাইরে হুমায়ূন আহমেদ হাজার প্রশ্ন, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ১৯৯৪. পৃ.৩১-৩২)
রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে যারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন তিনি তাদের ক্ষমা করার কথা বলেছেন। বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো এসব সত্য আড়াল করছে। তিনি কোনো প্রতিহিংসা বা রাজনৈতিক স্বার্থে নয়, জাতীয় ঐক্য ও সংহতির কথা ভেবেই সাহসিকতার সাথে এ মতামত ব্যক্ত করেছেন।
তাঁর এ চিন্তার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস জননী ও জ্যোৎস্নার গল্প ও শ্রাবণ মেঘের দিনসহ বিভিন্ন উপন্যাসে। এ ক্ষুদ্র পরিসরে তাঁকে আলোচনা এক পর্বে অসম্ভব। আল্লাহ তাঁর সকল সৎকর্ম কবুল করুন। আমীন!
