অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব হাসিনার : খালেদা জিয়ার প্রত্যাখ্যান
ঘনীভূত হচ্ছে রাজনৈতিক সঙ্কট
॥ জামশেদ মেহ্দী॥
কোন্ ধরনের সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন পরিচালিত হবে সে সম্পর্কে লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্যের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট আবার ঘনীভূত হয়েছে। গত সোমবার লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড ও বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথা পুনর্বার ব্যক্ত করেন। এবার সেখানে তিনি নতুন একটি পয়েন্ট যুক্ত করে বলেন যে, বেগম জিয়া যদি ইচ্ছা করেন তাহলে বিএনপিও এই সরকারে যোগ দিতে পারে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার হবে ছোট। এই ছোট সরকারে বিএনপি চাইলে যোগ দিতে পারে। তবে সেটি করতে হলে বিএনপিকে সংসদে আসতে হবে এবং পার্লামেন্টে এ সম্পর্কে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বক্তব্য প্রচার হওয়ার সাথে সাথেই ঢাকায় বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐ প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, কোনো অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নয়, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশে আগামীতে কোনো নির্বাচন করতে দেয়া হবে না। একটি ইফতার মাহফিলে বক্তব্য রাখার সময় বেগম খালেদা জিয়া ঈদের পর নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে দুর্বার গণআন্দোলন শুরু করার আহ্বান জানান। এই লক্ষ্যে ১৮ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দকে এই মুহূর্তে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
অন্য দিকে বিবিসি ওয়ার্ল্ডের ‘হার্ড টক’ নামক জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে অনেক অপ্রীতিকর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। ‘হার্ড টক’ অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন বিবিসি প্রতিনিধি স্টিফেন স্যাকার। আজ আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই দুটির বক্তব্য নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকার প্রসঙ্গ।
অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদান প্রসঙ্গ
প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য শুনে এবং পড়ে মনে হয় যে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার সম্পর্কে বিরোধী দলের দাবিকে প্রধানমন্ত্রী মোটেই আমলে নিচ্ছেন না। তা না হলে বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপি যেখানে এই সরকার এবং এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে গাজীপুর উপনির্বাচনেও অংশ নিচ্ছে না সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দল অংশগ্রহণ করবে, এটি প্রধানমন্ত্রী কিভাবে ভাবলেন, সেটি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না। শেখ হাসিনা যে অন্তর্বর্তী সরকাররের কথা বলছেন সেটির কোনো ব্যবস্থা বা প্রভিশনও তো সংবিধানে নেই। এমনকি যে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে ত্রয়োদশ সংশোধনী তথা কেয়ারটেকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে সেই পঞ্চদশ সংশোধনীতেও অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো ব্যবস্থা নাই। প্রধানমন্ত্রী মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলেন, যেগুলো শুনে মনে হয় যে তিনি অশিক্ষিত মানুষকে অক্ষর জ্ঞান দিচ্ছেন। তা না হলে তিনি কিভাবে বলেন যে, অন্য গণতান্ত্রিক দেশে যে ধরনের সরকার ব্যবস্থার অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশেও সেই ধরনের সরকার ব্যবস্থার অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে?
অন্য দেশে পঞ্চদশ সংশোধনী হয়নি
অন্য গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা বলতে প্রধানমন্ত্রী কোন্ কোন্ দেশের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন সেটি খোলাসা করে বলেননি। সারা দুনিয়ায় সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলতে বোঝায় ইংল্যান্ডকে। আর বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র বলতে বোঝায় ভারতকে। এছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ হলো কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া। এই চারটি দেশের একটিতেও সাধারণ নির্বাচনের আগে পার্লামেন্ট বহাল থাকে না। নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের আগে (সাধারণত ৩ মাস) সংসদ ভেঙে দেয়া হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে যেটা করেছেন সেটি একটি আজব ও অদ্ভুত ব্যবস্থা। এখানে পার্লামেন্ট থাকবে, পার্লামেন্টের সদস্যরা বহাল তবিয়তে থাকবেন, মন্ত্রিসভা থাকবে, মন্ত্রীরা থাকবেন ও প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। তার পরও আওয়ামী লীগ বলবে সেটি নাকি হবে একটি নিরপেক্ষ সরকার! কাঁঠালের আমসত্ত্ব আর কাকে বলে! পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পর বাংলাদেশের মানুষকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নতুন করে পড়তে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে আন্ডার এস্টিমেট করছেন
পর্যবেক্ষক মহল বুঝতে অক্ষম যে, বিরোধী দল সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী কী ভাবেন। বিএনপি রাজপথ গরম করতে পারুক আর নাই পারুক, একটি বিষয়ে তাদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। এটি হলো নীতির প্রশ্ন। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া বিরোধী দল কোনো নির্বাচনে যাবে না। এটি শুধু তাদের কথার কথা নয়। বিগত ৩ বছর ধরে তারা এই নীতিগত অবস্থান থেকে এক চুলও সরে আসেনি। এমন কি স্থানীয় সরকার নির্বাচন অর্থাৎ, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও তারা এই অবস্থান ধরে রেখেছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েও নীতির কারণে বিএনপি শেষ মুহূর্তে এডভোকেট তৈয়মুর আলমকে প্রত্যাহার করেছে। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রর্থীরা যখন সরব প্রচারণা চালিয়েছে তখনও বিএনপি সেখানে কোনো প্রার্থী দেয়নি। অথচ নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা স্বীকার করেছেন যে, প্রার্থী দিলে এবং নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে বিরোধীদলীয় প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা ছিলো শতকরা একশত ভাগ। এমন কি মরহুম তাজউদ্দিন আহমদের পুত্র সোহেল তাজের শূন্য আসনে যে উপনির্বাচন হচ্ছে সেখানেও বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না। অথচ বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতা স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ্ ঐ আসনে প্রার্থী হতে যাচ্ছিলেন। তাকেও বসিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং বেগম খালদা জিয়া। এতকিছুর পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিভাবে ভাবতে পারলেন যে, তিনি একটু হাত ইশারা করলেন, আর অমনি বিএনপির নেতারা তার অধীনে ৩ মাস মেয়াদে মন্ত্রিত্ব করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী জবাবটাও পেয়েছেন সাথে সাথেই।
সংকট ঘনীভূত হচ্ছে
প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপিকে যতই আন্ডার এস্টিমেট করুন না কেন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে যোগদানের আহ্বান জানিয়ে তিনি বরং রাজনৈতিক সংকটকে আরো জটিল এবং ঘনীভূত করলেন। তিনি যদি ভেবে থাকেন যে, রাজপথের আন্দোলন থেকে সাময়িক বিরতি দেয়ার অর্থ হলো বিরোধী দল স্থায়ীভাবে রাজপথ ছেড়েছে তাহলে তিনি মারাত্মক ভুল করছেন। ঈদের ছুটির আমেজ যখন শেষ হবে, রাজধানী যখন আবার কোলাহলে ভরে উঠবে তখন রাজনীতির উত্তাপ তার সরকারকে স্পর্শ করবে। তবে একটি ঈদের আমেজ শেষ হতে কি না হতেই আরেকটি ঈদ আসবে বলে পুনর্বার আন্দোলনে ভাটা পড়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে তারপরেই আওয়ামী সরকার রাজনীতির উত্তাপ টের পাবে।
৪৬ জন নেতার বিরুদ্ধে চার্জশিট গঠন
এই মুহূর্তে রাজনীতির উত্তাপ থাক আর নাই থাক গরম বাতাস যে এগিয়ে আসছে, আওয়ামী সরকার মনে হয় সেটি টের পেয়েছে। তাই বিরোধী দলের ৪৬ জন নেতার বিরুদ্ধে গাড়ি পোড়ানোর ঠুনকো মামলার চার্জশিট গঠন হয়েছে এবং আগামী ৭ আগস্ট থেকে তাদের আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হবে। এই মামলার উদ্দেশ্য অত্যন্ত পরিষ্কার। ১৮ দলীয় জোটের সমস্ত শীর্ষ নেতাকে মামলায় ঝুলিয়ে যেন তেন প্রকারে তাদেরকে শাস্তিদান। সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলের প্রায় সমস্ত নেতা নির্বাচনের অযোগ্য হয়ে যাবে। আর আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠে গোল দেবে। অর্থাৎ বিরোধী দলবিহীন এক তরফা নির্বাচন করবে।
প্রধানমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনায় বিবিসি
লন্ডনে থাকাকালে গত সোমবার বিবিসির প্রতিনিধি স্টিফেন স্যাকার ‘হার্ড টক’ নামক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইন্টারভিউ করেন। গত মঙ্গলবার ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিক ঐ সাক্ষাৎকারের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করে। সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেন যে, পদ্মা সেতুতে তিনি বা তার সরকার কেউ কোনো দুর্নীতি করেনি। তখন বিবিসি প্রতিনিধি বলেন যে, আপনার একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। ঐ মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। তিনি দুর্নীতিতে জড়িত না থাকলে পদত্যাগ করবেন কেন? প্রধানমন্ত্রীর উত্তর ছিলো হাস্যকর। তিনি বলেন যে, পদত্যাগ করে ঐ মন্ত্রী একটি সাহসী কাজ করেছেন এবং দেশপ্রেমিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
বিবিসি প্রতিনিধি বলেন যে, বিশ্বব্যাংক যেসব চিঠি দিয়েছে সেসব চিঠিতে দুর্নীতির ৪টি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিবিসি প্রতিনিধি প্রধানমন্ত্রীর নিকট জানতে চান যে, বিশ্বব্যাংকের এসব চিঠি প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন? প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঐগুলো প্রকাশ করার দায়িত্ব নাকি বিশ্বব্যাংকের। উত্তরে বিবিসি প্রতিনিধি জানান যে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাশালী এই সংস্থা কিছু নিয়ম নীতির মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। সেই নিয়ম নীতি বলে যে এটি প্রকাশ করার দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের, বিশ্বব্যাংকের নয়।
বাংলাদেশের জন্য লজ্জা
বিবিসি প্রতিনিধি স্টিফেন প্রধানমন্ত্রীকে মুখের ওপর বলেন যে, বাংলাদেশের মানুষ, যারা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে, তাদের জন্য এটা লজ্জার বিষয় যে, বাংলাদেশের সাথে বিশ্বব্যাংকের সম্পর্ক এতো তিক্ত হয়ে পড়েছে। এটি আরো লজ্জার বিষয় যে, একজন বিশ্ববিখ্যাত লোক, যিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, সেই ড. ইউনূসের সাথেও আপনাদের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে পড়েছে। আপনারা তাকে ‘রক্তচোষা’ বলে অভিহিত করছেন। বিবিসি প্রতিনিধি শেখ হাসিনাকে আরো বলেন যে, তিনি যখন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম জিয়ার নাম নেন তখন তাঁর মধ্যে থাকে শত্রুতার আভাস এবং দেশের মানুষের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় আপনার ব্যর্থতায় ফুটে ওঠে।
ওপরের এই আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, দেশের মধ্যে শেখ হাসিনা বিভেদ সৃষ্টি করে রেখেছেন। দেশের বাইরেও তিনি একের পর এক রাজনৈতিক শত্রু সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। বিবিসির মতে, গত নির্বাচনে যারা বিপুল ভোটে জয়লায় করেছিল মাত্র সাড়ে ৩ বছরে তারা দেশকে সুশাসন দিতে পারেনি। অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা আজ বাংলাদেশকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে।
jamshedmehdi15@gmail.com
এ পাতার অন্যান্য খবর
- জামায়াত নেতৃবৃন্দসহ রাজবন্দীদের মুক্তি দিন
- হুমায়ূন আহমেদ : মৃত্যু নাকি হত্যা
- জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাকওয়ার প্রতিফলন প্রয়োজন
- রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই ফারুক হত্যা মামলায় নেতৃবৃন্দকে আসামি করা হয়েছে : মকবুল আহমাদ
- মিয়ানমারের নিরাপত্তারীরা রোহিঙ্গা মুসলিমদের আটক করে হত্যা ধর্ষণে লিপ্ত
- হুমায়ূন আহমেদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে শাওন ও মাজহারের বিরুদ্ধে মামলা
