হুমায়ূন আহমেদ : মৃত্যু নাকি হত্যা
ইনফেকশনের জন্য দায়ী কে? দুই পাণ্ডুলিপি কোথায়?
॥আহমাদ সালাহউদ্দীন॥
জননন্দিত সাহিত্যিক, নাট্যকার, পরিচালক ড. হুমায়ূন আহমেদ কি মৃত্যুবরণ করেছেন, নাকি তাকে সুকৌশলে হত্যা করা হয়েছে, সে প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান চিকিৎসক, সাংবাদিক এবং সচেতন বুদ্ধিজীবী মহল ইতোমধ্যেই এ প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ক্যান্সার চিকিৎসার নামে তাঁকে আসলে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যদিও তিনি ক্যান্সারে মারা যাননি। ক্যান্সার অপারেশনের কথা বলে তাকে অতিমাত্রায় ‘ইনফেকশন’ ঘটিয়ে জীবাণু সংক্রমণের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। বিশ্বে বহু বিখ্যাত ব্যক্তিকে চিকিৎসার নামে এভাবে সুকৌশলে হত্যার অনেক নজির রয়েছে, যার সর্বশেষ উদাহরণ ফিলিস্তিনী নেতা ইয়াসির আরাফাত। মুসলিম জাতিসত্ত্বার অন্যতম নায়ক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে যারা খুব অল্প বয়সে নিষ্ক্রিয় করে দিতে সক্ষম হয়েছিল, সেই মহলটির কুচক্রী উত্তরাধিকারেরাই বাংলাদেশের কিংবদন্তীতুল্য আরেক সাহিত্য-সম্রাট, মাত্র চৌষট্টি বছরের ‘তরুণ’ হুমায়ূন আহমেদকেও এবার প্রায় একইভাবে একেবারেই নিষ্ক্রিয় করে দিল তার জীবন-প্রদীপ নিভিয়ে। কালজয়ী কবি-সাহিত্যিক কাজী নজরুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়লে কোলকাতায় ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় তাকে একটি ইঞ্জেকশন দেয়ার সাথে সাথেই কবি চিরদিনের মতো বাকরুদ্ধ হয়ে যান। প্রায় একই ধরনের পরিণতি ঘটে হুমায়ূনের ক্ষেত্রেও। এ অবস্থায় হুমায়ূন আহমেদের ‘হত্যা’র সাথে বিদেশী কিছু গোয়েন্দা সংস্থার চক্রান্তের সঙ্গে দেশের একটি রাজনৈতিক ও ভারত-আশ্রিত সাংস্কৃতিক মহল জড়িত বলে ইতোমধ্যেই অভিযোগ উঠেছে। হুমায়ূন আহমেদের অপরাধ হচ্ছে- তিনি সাম্প্রতিককালে একটি রাজনৈতিক উপন্যাস রচনার কাজে হাত দিয়েছিলেন। ‘দেয়াল’ নামের এ উপন্যাসের অংশবিশেষ বা প্রথম পর্ব একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলে আওয়ামী লীগের একটি অংশের আপত্তিতে সেটি আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং গতমাসে আদালত উপন্যাসটি ‘সংশোধন’ করে প্রকাশের নির্দেশ দেয়। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তাতে রাজী হননি। তিনি বলেছিলেন, ইতিহাস কারো নির্দেশিত পথে চলে না। হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় অপরাধ- তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিকাঙ্গনে ভারতীয় সাহিত্যিক ও নট-নটীদের দীর্ঘকালের আধিপত্যকে ভেঙ্গে খানখান করে ফেলে দিয়েছিলেন। সমকালীন লেখকদের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রমী হুমায়ূন আহমেদই তার কোনো লেখাতে সেক্স ও ভায়োলেন্সের আশ্রয় নেননি। তিনি এদেশের কোটি কোটি তরুণ-তরুণীকে বইমুখী, স্বপ্নমুখী এবং রুচিবান করে তুলেছিলেন। সেই সাথে তাদের করেছিলেন দেশপ্রেমীও। নানা মত-পথ সত্ত্বেও হুমায়ূন আহমেদের বইকে কেন্দ্র এসব তরুণ-তরুণীরা হয়ে ওঠে ঐক্যবদ্ধ, যা তাঁর অকাল বিদায়ের পর আরো দৃশ্যমান হয়েছে। তাঁর মার্জিত ও পরিশীলিত রচনা, নাটক ও চলচ্চিত্র এদেশের কোটি তরুণের মাঝে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করে। নতুন প্রজন্মের তরুণেরা মুক্ত হয়ে যায় ভারতীয় সাহিত্যের আগ্রাসন থেকে। শুধু তাই নয়, ভারতের কোটি কোটি বাঙালী পাঠকের মাঝেও এদেশের সমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর উপন্যাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নানা বাধার মুখেও ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে এবং সেখানে বাংলাদেশী বইয়ের চাহিদা ও বাজার বৃদ্ধি পেতে থাকে। যা নিয়ে দিল্লী শংকিত হয়ে ওঠে। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর তাঁর দুটি গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। এর একটি হচ্ছে- আল কুরআনের তরজমা এবং অপরটি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) -এর জীবনী। তিনি এ দুটি বিশেষ গ্রন্থ রচনার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছিলেন। কিন্তু এর প্রকাশনা নিয়ে একটি মহলের আপত্তি ছিল। উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যে বেলভিউ হাসপাতালে হুমায়ূন আহমেদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, সেই হাসপাতালের একটি শাখা রয়েছে ভারতের কোলকাতাতেও। আর যুক্তরাষ্ট্রের বেলভিউ হাসপাতাল ক্যান্সার চিকিৎসার জন্যে বিশেষায়িত কোনো হাসপাতালও নয়। এটি একটি সাধারণ হাসপাতাল। এখানে কেন হুমায়ূনের দ্বিতীয় স্ত্রী শাওন ও তার কথিত বন্ধু মাজহারুল ইসলাম তাকে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্যে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাও এক রহস্য। বিষয়টি নিয়ে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশীদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে। সৃষ্টি হয়েছে ক্ষোভেরও। একজন লেখকের সাথে ছায়ার মতো সার্বণিকভাবে পাশে থাকার জন্যে প্রকাশক মাজহারুল ইসলামের ভূমিকায়ও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বার্তা সংস্থা এনা জানায়, দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচারের পর জ্ঞান ফিরলে লেখক হুমায়ূন আহমেদ আর্তচিৎকার করে তার দ্বিতীয় স্ত্রী শাওনকে বলেছিলেন, ‘কুসুম, ওরা আমাকে ফেরে ফেলবে, এুণি এখান থেকে বাসায় নিয়ে চলো আমাকে’। জীবন সম্পর্কে অনেক বেশী আত্মপ্রত্যয়ী লেখক হুমায়ূনের এ আকুতির নেপথ্যে কি কাজ করছিল তা কি ভেবে দেখা উচিত নয় -এ প্রশ্ন প্রবাসীদের। প্রসঙ্গত, হুমায়ূন আহমেদের প্রথমা স্ত্রী, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ইব্রাহীম খাঁর নাতনী, গুলতেকিন আহমেদ তার ত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবন ভেঙ্গে দেয়ার জন্যে এই মাজহারুল ইসলামকেই দায়ী করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. মোমেন এবং মুক্তধারার বিশ্বজিৎ সাহা জানিয়েছেন, ক্যান্সার চিকিৎসার জন্যে বিশ্বে সবচেয়ে উত্তম স্থান হচ্ছে স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার হাসপাতাল। সেখানে হুমায়ূনের চিকিৎসা শুরু হলেও পরবর্তীতে ম্যানহাটানের বেলভ্যু হাসপাতালে কেন স্থানান্তর করা হয়েছিল সেটি জানতে চান প্রবাসীরা। এ নিয়ে শাওনের কাছে থেকে সঠিক তথ্য জানতে সম না হলেও অপর একটি সূত্র মাজহারের কাছ থেকে জানতে পেরেছে যে, আর্থিক কারণে নাকি স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার হাসপাতালে তার চিকিৎসা অব্যাহত রাখা নাকি সম্ভব হয়নি। এ বিষয়টি এখন প্রবাসে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিমানের ‘ইকনোমি’ কাসে ভ্রমণে অনাগ্রহী মাজহারুল ইসলাম তাহলে কি কারণে আর্থিক অজুহাত দেখিয়ে হুমায়ূনের চিকিৎসা স্থল পরিবর্তন করেছিলেন? -এ জিজ্ঞাসা অনেকের। নিউইয়র্ক থেকে এনা জানায়, বিজনেস কাসের টিকিট ছাড়া শাওন পরিবারের সদস্যরা হুমায়ূনের লাশের সাথে ঢাকা যাবেন না বলে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। এমন নির্দেশ দিয়ে বিব্রত করেছিলেন জননন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম। আর এ দাবি তিনি পেশ করেছিলেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. মোমেনের কাছে। লাশের সাথে নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় যাবেন ৬ জন। শাওন ও তার দুই শিশুপুত্র, শাওনের মা, বোন ও মাজহার। হঠাৎ করে এক ফাইটে ৬টি টিকিট সংগ্রহ করাই যেখানে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, তেমন পরিস্থিতিতে সবগুলো টিকিট বিজনেস কাসের লাগবে বলে উল্লেখ করেন মাজহার। বিষয়টি জানাজানি হবার পর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী কম্যুনিটিতে এ নিয়ে ােভ সৃষ্টি হয়। কারণ, টিকিট দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের লাশসহ পরিবারকে বিজনেস কাসে ঢাকায় পাঠাতে কারোই আপত্তি ছিল না। তবে এটিতো স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়, এত স্বল্প সময়ে বিজনেস কাসে ৬টি টিকিট সংগ্রহ করা কি সহজ- এমন মন্তব্য সচেতন প্রবাসীদের। এ অবস্থায় হুমায়ূন আহমেদের লাশ একদিন দেরীতে সোমবার সকালে ঢাকায় আসে আমিরাত এয়ারলাইন্সে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এ কে এ মোমেন বাংলাদেশ সময় শনিবার সকালে এনাকে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, লাশসহ হুমায়ূনের ঘনিষ্ঠজনদের টিকিটের ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তা করা হয়। লাশের সাথে আসেন লেখক পতœী মেহের আফরোজ শাওন, দুই শিশু সন্তান নিষাদ এবং নিনিথ, শাওনের মা আওয়ামী লীগ নেত্রী তহুরা আলী, শাওনের ছোট বোন সেজুতি এফ আফরোজ এবং প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম। অথচ হুমায়ুন আহমেদের ছোট ভাই ড. জাফর ইকবাল ও তার স্ত্রী এ সময় চিকিৎসাধীন হুমায়ুনের সাথে নিউইয়র্কে থাকলেও তারা নিজ দায়িত্বে বাংলাদেশে আসেন একদিন আগেই। ড. মোমেন উল্লেখ করেন, লেখক পরিবারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত অন্য প্রকাশের মালিক মাজহারুল ইসলাম দাবি করেছিলেন বিজনেস কাসের টিকিটের জন্যে। সেজন্যেই একদিন বিলম্ব হয় লাশ পাঠাতে। এর আগের সংবাদে বলা হয়েছিল যে জেট এয়ারওয়েজে লেখকের লাশ ঢাকায় অবতরণ করবে রোববার সকালে।
গত বছরের মধ্য সেপ্টেম্বরে চিকিৎসার জন্যে সপরিবারে হুমায়ূন যান নিউইয়র্কে। তখন থেকেই সাথে ছিলেন মাজহারুল ইসলাম। নিউইয়র্কে লেখক পরিবারের সাথে ভাড়াটে বাসাতেও বাস করেন মাহজার। সে বাসার ভাড়া কে দিয়েছে তা অবশ্য এখনও জানা যায়নি। তবে লেখকের চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশে মিডিয়ার উপর তিনি মাঝেমধ্যেই নিষেধাজ্ঞা জারি করতেন। লেখকের চিকিৎসার প্রকৃত তথ্য তিনি এবং লেখক পতœী মেহের আফরোজ শাওন ছাড়া কেউ জানেন না বলেও দাবি করেছেন একাধিকবার। তাই অন্য কারো উদ্ধৃতি দিয়ে যেন কোন সংবাদ মিডিয়ায় পরিবেশন করা না হয় সে নির্দেশ দেন মাজহার। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ২৪ ঘন্টা আগে উত্তর আমেরিকার বাংলা ভাষার সর্বাধিক প্রচারিত ‘ঠিকানা’ পত্রিকায় ‘জীবন-মৃত্যুর সন্ধিণে হুমায়ূন’ শীর্ষক সংবাদকেও তিনি প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, হুমায়ূন আহমেদ সুস্থ আছেন। এভাবেই মাজহারুল ইসলাম হুমায়ূনের চিকিৎসার প্রকৃত অবস্থা গোপন রাখতে চেয়েছিলেন কি জন্যে- এ প্রশ্ন এখন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ঢাকার অনলাইন পত্রিকা এবং কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদেরও কঠোর সমালোচনা করেছিলেন মাজহারুল ইসলাম। চিকিৎসারত অবস্থায় জননন্দিত এই লেখককে জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা করেছিল বাংলাদেশ সরকার। এ সুবাদে লেখকের চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিতেন রাষ্ট্রদূত ড. এ কে এ মোমেন। তিনি মাঝেমধ্যে হাসপাতালেও গমন করেন। তাকে উদ্ধৃত করে কোন সংবাদ দিলেও েেপ যেতেন এই মাজহার। নিউইয়র্কে মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা খোঁজ-খবর রাখতেন চিকিৎসার। তার বরাত দিয়েও কোন সংবাদ পত্রিকায় দেয়া চলবে না বলে জানিয়েছিলেন বার্তা সংস্থা এনাকে। এভাবে লেখক হুমায়ূনের চিকিৎসা সম্পর্কিত অনেক কিছুই এই মাজহার এক অজানা কারণে গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। মৃত্যুর পর নিউইয়র্কে হুমায়ূন আহমেদের গোসল সম্পন্ন করেন তার প্রথমা স্ত্রী গুলতেকিন আহমেদের ভগ্নিপতি জামাল আবেদী, আনিসুর রহমান পাশা এবং মামা সাংবাদিক ইব্রাহিম চৌধুরী। এ সময় একজন সাংবাদিক লেখকের ছবি উঠাতে চাইলে শাওন ও মাজহারের বাধায় তুলকালাম কান্ড ঘটে সেখানে। কারণ বিষক্রিযায় হুমায়ূনের লাশ কালো হয়ে গিয়েছিল। ক্যান্সার যাকে কাবু করতে পারেনি, বারোটা কেমো যাকে কাবু করতে পারেনি, অপারেশন যাকে কাবু করতে পারেনি, তাকে কিনা নিয়ে গেলো ইনফেকশন! এ ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ তদন্ত দাবি করেছেন অনেকে।
এ মৃত্যুর দায় এড়ানো যায় না
বিগত প্রায় ১০ মাস ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকলেও কোলন ক্যান্সারের অপারেশনের পর অতিমাত্রায় ইনফেকশন বা জীবাণু সংক্রমণ তার জীবন প্রদীপ রহস্যজনকভাবে নিভিয়ে দিয়েছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। আর অপারেশনের পর ইনফেকশনজনিত কারণে তাঁর এই অকাল ‘মৃত্যু’ বাংলাদেশ বা তৃতীয় বিশ্বের কোন অনগ্রসর দেশ কিংবা এশিয়ার কোন বড় হাসপাতালেও ঘটেনি। তার মৃত্যু হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা চিকিৎসা কেন্দ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগে। এই ‘মৃত্যু’ হুমায়ূন আহমেদের দেশ-বিদেশের কোটি কোটি ভক্ত-অনুরাগী কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি। অপারেশনের পর ইনফেকশন হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মত একটি উন্নত দেশে কোন রোগী মারা যাবে এটা মানুষের ভাবনারও অতীত। যদিও নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতাল কর্তৃপ এখন পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর বিস্তারিত কারণ উল্লেখ করেনি। তবে কোলন ক্যান্সারের অপারেশনের পর ইনফেকশন কেন হয় এ ব্যাপারে বাংলাদেশের বিশিষ্ট কোলোরেকটাল সার্জন, জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের প্রফেসর ডাঃ এ কে এম ফজলুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত তিনি ৬ শতাধিক বাংলাদেশি রোগীর কোলন ক্যান্সারের অপারেশন করেছেন এবং শুধু ২০১১ সালে অপারেশন করেছেন ৮৫ জন কোলন ক্যান্সারের রোগীকে। এর মধ্যে বাংলাদেশের মতো জায়গায় ১ জন রোগীও অপারেশনের সময় অথবা ইনফেকশনজনিত কারণে মারা যায়নি। খ্যাতিমান এই কোলোরেকটাল সার্জনের মতে কোলন ক্যান্সার আক্রান্ত অংশ অপারেশনের মাধ্যমে কেটে ফেলার পর খাদ্যনালী বা কোলন সূক্ষ্মভাবে সেলাই করে জোড়া দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় এনাস্টোমোসিস। তবে হুমায়ূন আহমেদের েেত্র কি ঘটেছে তা কেবল নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সার্জনগণই বলতে পারবেন বলে অধ্যাপক ফজলুল হকের অভিমত। তবে তিনি এটাও মনে করেন ইনফেকশনের কারণে রোগীর মৃত্যু অনভিপ্রেত। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ গতবছর সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল শ্লোন ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টারে ভর্তি হন এবং দু’ দফায় তাকে ১২টি কেমোথেরাপি দেয়া হয়। কেমো শেষে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসেন তিনি। গত জুন মাসে আবার নিউইয়র্কে যান এবং ১২ জুন নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতলে তার সফল অপারেশন হয়। তিনি ৮ দিন হাসপাতালে থেকে বাসায় ফিরে যান এবং তার সফল অপারেশন ও সুস্থতার খবরে তখন দেশের সবাই অত্যন্ত খুশি হয়। বাসায় ফেরার একদিন পর হুমায়ূন আহমেদের পেটে প্রচ ব্যথা অনুভূত হলে প্রথমে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে তাকে পুনরায় বেলভিউ হাসপাতালে ভর্তির পর ২২ জুন পুণরায় তার শরীরে দ্বিতীয় দফা অপারেশন করা হয় এবং তাকে নিবিড় পর্যবেণ ইউনিটে রাখা হয়। কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা যে, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যবহার সত্ত্বেও তাকে আর সুস্থ করা যায়নি। বরং অন্ত্রনালীর পুণরায় সংযোজনের স্থানে ইনফেকশন তীব্রতর হয় এবং পেটে বাতাস ঢুকে যায় বলে জানানো হয়। কোনভাবেই আর ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। কোন এন্টিবায়োটিকও কাজে আসেনি। শেষ পর্যন্ত এ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে লেখক হুমায়ূন আহমেদ গত ১৯ জুলাই বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় দুপুরে এবং বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ২০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই জনপ্রিয় লেখকের মুত্যু ও তার কর্ম নিয়ে হাজারো লেখালেখি হবে। তবে আজীবন একটা প্রশ্ন থেকেই যাবে, যুক্তরাষ্ট্রের মত একটি আধুনিক হাসপাতালে কেমন করে অপারেশনের সময় তার এমন ইনফেকশন হলো? বাংলাদেশের এই খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ কোনভাবেই হুমায়ূন আহমেদের ইনফেকশনজনিত কারণে জীবনাবসানকে মানতে পারছেন না। তার মতে বাংলাদেশে অপারেশন হলেও ইনফেকশনে হুমায়ূন আহমেদের মত একজন কৃতী মানুষকে অসময়ে বিদায় নিতে হতো না। বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের যুগে অপারেশনের সময় কোন রোগীর এ ধরনের ইনফেকশন হবে তা মেনে নেয়া যায় না। এ ধরনের হাজারও অভিমত কোটি কোটি হুমায়ূন ভক্ত-অনুরাগীদের। দেশের এই প্রিয় মানুষটিকে হয়ত আর কোনদিন ফিরে পাওয়া যাবে না। তবে তিনি কেন মারা গেলেন তার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করা উচিত এবং নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতাল কর্তৃপরে বিস্তারিত ব্যাখ্যা থাকা উচিত। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা ব্যবস্থা কঠিন নিয়ম নীতির মধ্যে পরিচালিত হয় এবং কোন সার্জন বা চিকিৎসক দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়। সেেেত্র বেলভিউ হাসপাতালের অপারেশনকালীন ইনফেকশনের দায়িত্ব অবশ্যই হাসপাতাল কর্তৃপকে নিতে হবে। এমন অভিমত দিয়েছেন বাংলাদেশের একাধিক বিশেষজ্ঞ।
মহাখালীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্স এন্ড হাসপাতালের মেডিক্যাল অনকোলজি বিভাগের প্রফেসর ডাঃ পারভিন শাহিদা আকতার বলেন, হুমায়ূন আহমেদ কেন মারা গেলেন- তার সঠিক কারণ আমরা জানতে চাই। এর সঠিক তদন্ত রিপোর্ট চাই। শুধু ইনফেকশনে তিনি মারা গেছেন, এই বক্তব্যই যথেষ্ট নয়। এই খ্যাতিমান ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের মতে, অপারেশনের সময় ইনফেকশনের কারণে রোগীর মৃত্যু দুর্ভাগ্যজনক এবং এর জন্য নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতাল কর্তৃপ দায় এড়াতে পারেন না। এছাড়া নিউইয়র্কের বিখ্যাত ক্যান্সার হাসপাতাল মেমোরিয়াল শ্লোন-ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টারের বিশেষজ্ঞগণ যেখানে অপারেশনে সম্মত ছিলেন না, সেখানে বেলভিউ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞগণ কেন অপারেশনের ঝুঁকি নিলেন তা নিয়েও বিশেষজ্ঞগণ প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলেছেন, ইনফেকশনে কারণে হুমায়ূন আহমেদে এই অস্বাভাবিক মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। এই মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না এবং নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতাল কর্তৃপ ইনফেকশনের কারণে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর দায় এড়াতে পারেন না। বিশেষ করে আমেরিকার মত উন্নত দেশে সংক্রমণের কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কোন রোগীর মৃত্যু হবে এটা একেবারেই অনভিপ্রেত। এসব বিশেষজ্ঞগণ এটাও প্রশ্ন তুলেছেন, হুমায়ূন আহমেদের কোলন ক্যান্সার যদি চতুর্থ গ্রেডের হয়ে থাকে এবং লিভার পর্যন্ত বিস্তৃত হয় তাহলে নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে তার অপারেশনের পূর্বে জটিলতা সম্পর্কে যথেষ্ট বিশ্লেষণ করা হয়েছিল কিনা এবং কোলন ক্যান্সারের ৪র্থ গ্রেডে অপারেশনের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক ছিল কিনা। ক্যান্সার সম্পর্কে ধারণা আছে হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠ এক সিনিয়র সাংবাদিকের মন্তব্য হচ্ছে, ‘নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে তার অপারেশনটা হয়েছে একেবারে হাতুড়ে’। এই হাসপাতালের চিকিৎসার মান নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল শ্লোন-ক্যাটারিং ক্যান্সার হাসপাতাল থেকে কেন তাকে বেলভিউতে নেয়া হরো তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। বেলভিউ হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা অপারেশনের আগে সম্ভাব্য জটিলতা নিয়ে বিশদ মতামত দিলে হয়তোবা হুমায়ূন আহমেদ ও তার স্বজনেরা অপারেশনের েেত্র ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। দেশের একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও প্রশ্ন করেছেন, হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় দফা অপারেশনের পূর্বে সম্ভাব্য মারাত্মক জটিলতার বিষয়টি বিবেচনায় আনা দরকার ছিলো। এতে অন্তত এই মুহূর্তে আমাদের প্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকে অসময়ে হারাতে হতো না। বিশিষ্ট অনকো ইউরোলজিস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোলজি বিভাগের প্রফেসর ডাঃ এম এ সালাম মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা হাসপাতালে কোন রোগীর এ ধরনের অপমৃত্যু কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তার মতে, অন্ত্রনালীর ক্যান্সারের অংশ কেটে ফেলে পুণরায় জোড়া লাগানোর জায়গায় ইনফেকশন হওয়াটা দুঃখজনক। এছাড়া কোলন ক্যান্সার যদি লিভারে সংক্রমিত হয়ে থাকে, সেেেত্র অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে জটিলতা বিবেচনায় আনা উচিত ছিল। বাংলাদেশের এই খ্যাতিমান সার্জন মনে করেন ক্যান্সারের জন্য নয়, হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু হয়েছে সার্জিক্যাল কমপ্লিকেশনের জন্য অথবা ইনফেকশনের জন্য। হাসপাতাল কর্তৃপও এমন রিপোর্ট দিয়েছেন।
হুমায়ূনের মৃত্যু অবহেলায়!
নিউইয়র্কের ‘সাপ্তাহিক বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদেও বলা হয়েছে, ড. হুমায়ূন আহমেদ ক্যান্সারে মারা যাননি। রক্তের সংক্রমণই তার অকাল মৃত্যুর কারণ। হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার একদিন পর তিনি নাকি চেয়ার থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। তবে কেন তিনি পড়ে গিয়েছিলেন তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়া না হলেও একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, ধ্বস্তাধস্তির একপর্যায়ে তিনি পড়ে যান। আর এই ধ্বস্তাধস্তি হয় মূলত সম্পত্তি বন্টনের বিষয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে। এ ঘটনার পর তাৎণিকভাবে হাসপাতালে না নিয়ে জননন্দিত এই ব্যক্তিত্বকে প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় একদিন পর নেয়া হয় জ্যামাইকার কুইন্স মেডিকেল সেন্টারে। এরপরই যত জটিলতা। যার প্রেেিত কোটি মানুষের প্রিয় হুমায়ূন আহমেদকে পাড়ি দিতে হলো পরপারে। কফিনে ভরার আগে লেখক হুমায়ূন আহমেদের লাশ গোসল করানোরও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি প্রথমে। ফলে লাশের গোসলের প্রস্তাব নিয়ে তার ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তিকে হেস্তনেস্ত হতে হয়েছে। পরে অন্য আত্মীয়ের সাহায্য নিতে হয়েছে গোসল করানোর কাজে। ফিউনারেল হোমে হুমায়ূন আহমেদের লাশ পড়েছিল একা, অনাদরে, অবহেলায়। কাউকে তখন দেখা যায়নি প্রিয় ব্যক্তির কফিনের পাশে কিংবা মাতমে অস্থির হতে। আত্মীয় জামাল আবেদীন ও আনিসুর রহমান ছাড়া কেউ নেই। সাধারণত কেউ মারা গেলে লাশের পাশে সার্বণিক কাউকে রাখা হয়। দোয়া কালাম পড়া হয় রূহের শান্তি কামনা করে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের পাশে কেউ না থাকায় গোসলের পর মাত্র চার ব্যক্তিকে প্রথম মোনাজাত করতে হলো। এসব নিয়ে এখন হাজারো প্রশ্ন সাধারণের মনে। কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের মণি হুমায়ূন আহমেদ কেন এমন উপোর শিকার হলেন এর জবাব চান তার ভক্তরা। এ বিষয়ে জানতে গিয়ে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
একটি বিশ্বস্ত সূত্রমতে, গত ১২ই জুন বেলভ্যু হাসপাতালে অপারেশন হয় হুমায়ূন আহমেদের। অপারেশনের পর সবাই খুশি। চিকিৎসকরা বললেন, এটা ১০০% সফল অস্ত্রোপচার। মাত্র ৮ দিনের মাথায় ২০শে জুন হুমায়ূন আহমেদকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করা হলে তিনি নিজেই পায়ে হেঁটে গিয়ে গাড়িতে চড়ে ওজনপার্কের ভাড়া বাড়িতে ফিরে আসেন। সূত্রমতে, বাড়ি ফেরার রাতেই একটি পার্টি করা হয় হুমায়ূন আহমেদের বাসায়। সেখানে সব ধরনের গোশতসহ পানীয় ছিল। ক্যান্সার অপারেশনের একজন রোগীকে এসব খাবার দেয়া সঠিক হয়েছে কিনা তা নিয়ে রয়েছে অনেকের প্রশ্ন। ২১শে জুন দুপুরে হুমায়ূন আহমেদ নাকি চেয়ার থেকে পড়ে যান। এটাই হয়েছিল তার জন্য বড় কাল। চেয়ার থেকে কিভাবে তিনি পড়লেন এটা পরিবারের সদস্যরা বলছেন না। পড়ে যাওয়ার কারণে অপারেশনস্থল আঘাতপ্রাপ্ত হয় মারাত্মকভাবে। এ নিয়ে সার্বণিক সঙ্গীরা কোন ব্যবস্থা নেননি তাৎণিকভাবে। একদিন পর ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠেন হুমায়ূন আহমেদ। এ সময় নিউইয়র্কে মুক্তধারার প্রধান বিশ্বজিৎকে ফোন করেন শাওন। জানতে চান ডাক্তারের ফোন নাম্বার। বিস্ময়কর হলো, শাওন ও মাজহারুল ইসলামের কাছে জরুরি প্রয়োজনের জন্য ফোন নম্বরটিও রাখা হয়নি হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসকের। পরদিন অর্থাৎ ২২শে জুন বিকালে যখন ব্যথা চরম আকার ধারণ করে তখন একটি প্রাইভেটকারে করে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে তারা রওনা হন হাসপাতালের দিকে। গাড়িতেই তিনি সংজ্ঞা হারান। এ পর্যায়ে এম্বুলেন্স ডাকা হলে সংজ্ঞাহীন হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে যাওয়া হয় জ্যামাইকায় অবস্থিত কুইন্স মেডিকেল সেন্টারের ইমার্জেন্সি রুমে। অবস্থা বেগতিক দেখে শেষে তাকে বেলভ্যু হাসপাতালেই নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তখন আরেকটি এম্বুলেন্স ডেকে রাতে লেখককে নিয়ে যাওয়া হয় বেলভ্যুতে। সেখানে যাওয়ার পর পরই অবস্থার ভয়াবহতা দেখে চিকিৎসকরা তাকে আবার অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেন ২৩ জুন। এরই মধ্যে ইনফেকশনে আক্রান্ত হন হুমায়ূন আহমেদ। সূত্র জানায়, হুমায়ূন আহমেদ মারাত্মক ইনফেকশনে আক্রান্ত হলেও সব সময়ই এটাকে ঢেকে রাখার একটি রহস্যময় প্রবণতা ছিল। এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই রয়েছে হাজারো প্রশ্ন। প্রশ্ন উঠেছে, ১২ জুন যখন বেলভ্যুতে হুমায়ূন আহমেদের অপারেশন হচ্ছিল তখন তার স্ত্রী শাওন ও মাজহারের বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে। ড. হুমায়ূন আহমেদের দীর্ঘ অপারেশনের সময় সেখানে উপস্থিত ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, বিশ্বজিৎ সাহাসহ আরও অনেকে ছিলেন। বসে বসে তারা মনিটরে পর্যবেণ করছিলেন লেখকের সর্বশেষ অবস্থার খবর। কিন্তু শাওন ও মাজহার বেরিয়ে যান। তারা ফিরে আসেন প্রায় দুই ঘণ্টা পর। উপস্থিত শুভানুধ্যায়ীরা বিষয়টি স্বাভাবিক মনে করেননি। একটি সূত্রমতে, হুমায়ূন আহমেদ বাসায় পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু একদিন পরে প্রায় মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় রক্তে সংক্রমণ। যা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে তার মৃত্যুর কারণ। এই গাফিলতির দায়ভার কে নেবে এটাই এখন প্রশ্ন।
বাংলা সাহিত্যের স্রোতধারায় পরিবর্তনের নায়ক হুমায়ূন আহমেদ। নন্দিত এ ভালবাসার মহানায়ক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হলেন। বিশ্বের সর্বাধুনিক চিকিৎসার জন্য খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রে এলেন আরোগ্য হওয়ার প্রত্যাশায়। নিউইয়র্কে আগেও আসা-যাওয়া করেছেন পাঠকনন্দিত এ লেখক। পরিবেশ ও প্রতিবেশকে সদাচঞ্চল রাখা হুমায়ূন আহমেদ অকস্মাৎ লাশ হয়ে ফিরে গেলেন। নিউইয়র্ক থেকে গত শনিবার রাতে হুমায়ূন আহমেদের কফিন নিয়ে ফাইট উড্ডয়নের সঙ্গে সঙ্গে এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে গেল। নিউইয়র্কের কোন বইমেলায় হুমায়ূন আহমেদ আর আসবেন না। প্রবাসী কোন ভক্ত-পাঠক আর কখনও অটোগ্রাফ চেয়ে আবদার জানাবেন না। জীবনের সব হিসাব চুকিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন হুমায়ূন আহমেদ। চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্কে এসে প্রায় ১০ মাস ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। মরণব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। দশ মাস নিউইয়র্কে অনেকটা নীরবেই কেটেছে তার। ক্যান্সারের স্পর্শকাতর চিকিৎসার কারণেই নিয়ন্ত্রিত ছিল তার চলাচল। বাংলাদেশী অধ্যুষিত নিউইয়র্কের কুইন্সে ঘরভাড়া করে চিকিৎসা চলছিল। নির্বিঘœ চিকিৎসা অব্যাহত রাখার জন্যই প্রবাসীদের প থেকে অহেতুক বিব্রত করা হয়নি লেখককে। প্রবাসীদের সব আড্ডা-সমাবেশে হুমায়ূন আহমেদের প্রসঙ্গ এসেছে। সবাই কায়মনোবাক্যে দোয়া করেছেন প্রিয় লেখক যেন সেরে ওঠেন। যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। সব শুভ কামনা ধুলায় মিশে যায়। ১৯ জুলাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হুমায়ূন আহমেদ। পাঠকের মনোজগৎ নিয়ে বহু রহস্য সৃষ্টি করে গেছেন ণজন্মা এ শব্দের কারিগর। মৃত্যুর আগে ও পরে নিউইয়র্কেও তাকে নিয়ে বেশকিছু রহস্য, বেশকিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে।
চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল বদল : বিখ্যাত কোন ক্যাটারিং মেমোরিয়েল হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের। শারীরিক অবস্থার উন্নতিও ঘটেছিল। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কোন ক্যাটারিং মেমোরিয়েল হাসপাতাল। হঠাৎ করেই জানা গেল বেলভ্যু হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। বেলভ্যুর কোন বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে পরিচিতি নেই। অথচ এখানেই তার অস্ত্রোপচার হলো। অস্ত্রোপচারের আট দিনের মাথায় অনেকটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন হুমায়ূন আহমেদ। বাড়িতে রহস্যজনক কারণে শরীরের অবস্থার হঠাৎ অবনতি ঘটে। জ্যামাইকা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ হয়ে আবার বেলভ্যু হাসপাতালে গেলেন এবং টানা প্রায় চার সপ্তাহ ওখানে থেকেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। অনেকেরই জিজ্ঞাসা, হাসপাতাল পরিবর্তন করা হলো কেন? কারণটা কি ছিল অর্থনৈতিক? বলা হচ্ছে ক্যান্সারের আক্রমণে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু ঘটেনি। ঘটেছে অজানা ভাইরাসের আক্রমণে। এ আক্রমণটা ঘটলো কোথায়? হাসপাতালে না নিজের ঘরে? ক্যান্সার চিকিৎসা গ্রহণকারী রোগীর জন্য প্রযোজ্য দেখাশোনায় হুমায়ূন আহমেদের বেলায় কোথাও কোন অবহেলা হয়েছে কি? নিউইয়র্কে কে ছিলেন হুমায়ূন আহমেদের অভিভাবক? হুমায়ূন আহমেদের আত্মীয় লুৎফর রহমান নির্ঝর জানিয়েছেন, “আমি এই পরিবারের অনেক কাছাকাছি আছি। দেখছি অনেক কাছ থেকে। যে অভিযোগ তার প্রথম পক্ষের সন্তানদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে তা মিথ্যা। নিউইয়র্কে হাসপাতালের বাইরে থেকে যোগাযোগ করার গেটওয়ে ছিলেন অন্যপ্রকাশের মাজহার। প্রত্যেকদিন ঢাকা থেকে অসংখ্যবার ফোন করা হতো। বেশিরভাগ সময় মাজহার ফোন ধরতেন না। আমেরিকা থেকেও বিপাশা প্রত্যেকদিন অসংখ্যবার ফোন করে খবর নিত, দেখতে যেত নিয়মিত। এই বিষয়গুলো কাউকে জানতে দেয়া হয়নি।
তাদেরকে চিকিৎসার সঠিক কবর দেয়া হয়নি।” ইত্তেফাক প্রতিনিধি জানান, “কেন তাকে (হুমায়ূন আহমেদ) বিশ্বখ্যাত স্লোয়ান কেটারিং সেন্টার হাসপাতাল থেকে বেলভ্যু হাসপাতালে নিয়ে অপারেশন করা হল সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছি। এমনও উত্তর পেয়েছি যে, অর্থ সাশ্রয়ের জন্য এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তার পরিবার, অর্থাৎ মেহের আফরোজ শাওন এবং বন্ধু মাজহার। অথচ আমরা সবাই জানি, এই মার্কিন মুল্লুকে যে কোনো হাসপাতালে সবার আগে রোগীর চিকিৎসা। বিল নিয়ে হাসপাতাল কখনো মাথা ঘামায় না। হুমায়ূনকে নিয়ে চারদিকে এখন এই যে এতো মাতম, এতো হাহাকার সেটা কি আগে ছিল না? যখন হুমায়ূনকে কথিত টাকার অভাবে বিশ্বসেরা একটা হাসপাতাল ছেড়ে সাধারণ হাসপাতালে (হুমায়ূনের ভাষায় বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের মতো) চিকিৎসা নিতে হলো তখন শাওন পরিবারের আবেগ-অনুভূতি কোথায় ছিল? সঙ্গীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের কথা কি মনে আছে? তার অসুস্থতায় সরকারসহ সারাদেশ তার পাশে দাঁড়িয়েছিল, অর্থ দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করেছিল। হুমায়ূনের পাশে দাঁড়ানোর কি কেউ ছিল না? তার দুর্দশার অবস্থা কেন কাউকে জানতে দেয়া হয়নি?”
হুমায়ূন আহমেদ কোন সাধারণ ব্যক্তি ছিলেন না। তার শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর জানার জন্য উদ্বিগ্ন থেকেছে বাংলাদেশের কোটি মানুষ। চিকিৎসার জন্য লেখকের সঙ্গে ছায়ার মতো অনুসরণকারী প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম ছিলেন সার্বণিক। নিউইয়র্কে অবস্থানকালীন চিকিৎসা থেকে নানা বিষয়ে দৌড়ঝাঁপ করেছেন মুক্তধারার বিশ্বজিৎ সাহাও। লেখকের শারীরিক অবস্থা জানার জন্য এ দু’জনের ওপরই সংবাদকর্মীদের নির্ভর করতে হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দু’জনের দেয়া ভাষ্যে ফারাক ছিল বিস্তর। প্রিয় লেখকের সঙ্কটজনক শারীরিক অবস্থা নিয়ে সংবাদ পরিবেশনে হিমশিম খেতে হয়েছে সংবাদকর্মীদের। অনেকেই বলেছেন, ১৯ জুলাই সকাল পর্যন্ত মাজহারুল ইসলাম লেখকের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেননি। অনেকেরই জিজ্ঞাসা, কোথাও কি কিছু আড়াল করার চেষ্টা ছিল?
অব্যবস্থাপনা ছিল ফিউনারেল হোমেও : শুক্রবার সকাল ৯টায় ইসলামিক ফিউনারেল হোমে গিয়ে মরহুম লেখকের কোন স্বজনকে পাওয়া যায়নি। ফিউনারেল হোমের পরিচালক ব্রুস বেইটস জানান, লাশ গোসল করানোর জন্য স্বজনদের অপো করছেন। সকাল সোয়া ১০টার দিকে জামাল আবেদীন ও আনিসুর রহমান ফিউনারেল হোমে উপস্থিত হন। দু’জনই মরহুম লেখকের একান্ত স্বজন এবং প্রথম পরে স্ত্রী গুলতেকিনের নিকট আত্মীয়। অন্য কারও জন্য অপো না করে লাশের গোসল এবং ধর্মীয়ভাবে প্রস্তুত করা হয়। ধর্মীয় নিয়ম-কানুন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলেও প্রিয় লেখকের এ অন্তিম পর্বে প্রবাসীদের কেউ কেউ যোগ দেয়। নিয়ম অনুযায়ী সাদা কাফনের শেষ পরিচ্ছদে মুড়িয়ে দেয়া হয় মরহুমের দেহ। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই মরদেহ কফিনে রেখে দেয়া হয়। ফিউনারেল হোমে পারিবারিক দর্শনার্থীদের জন্য কফিনে রাখা হলেও বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তার সাথে উপস্থিত পরিবারের সদস্যরা সেখানে আসেননি। এখানে একটি প্রার্থনা ক থাকলেও ধর্মীয় কোন আয়োজনও ছিল না ফিউনারেল হোমে। মরহুম লেখকের জন্য ছিল না কোন দোয়া-কালামের ব্যবস্থা। হলরুমে কফিনের মধ্যে লাশ পড়ে আছে একটা। কেউ নেই কিছু বলার। সাংবাদিক ও প্রথম পক্ষের স্ত্রীর দু’ আত্মীয়সহ মাত্র চার জন বসে আছে। এরই মধ্যে ফিউনারেল হোমে পৌঁছেন বাংলা পত্রিকার সম্পাদক আবু তাহের। নীরব নিথর হুমায়ূন আহমেদের কফিন পড়ে আছে। কেউ নেই দেখার। চার জন সিদ্ধান্ত নেন দোয়া-দরুদ পড়ার। তারপর তার রূহের মাগফিরাত কামনায় মুনাজাত করা হয়। শেষ পর্যন্ত বাংলা পত্রিকা সম্পাদক আবু তাহেরকে অনুরোধ করা হয় মুনাজাত পরিচালনার জন্য। মাত্র চারজন মিলে মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করে মুনাজাত করা হয়। বেলা সাড়ে ১১টার কিছু পর হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, তার মা তহুরা আলী, দুই পুত্র নিনিত ও নিশাদকে নিয়ে ফিউনারেল হোমে পৌঁছেন।
লাশ দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা : জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে নামাজে জানাজা শেষ হওয়ার পরও মরহুমের দেশে ফেরার সময় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কার্যত সব টিকিট প্রথম শ্রেণীর না পাওয়ায় বিলম্ব হচ্ছিল। লাশের সঙ্গে যারা ঢাকা যাবেন তারা নাকি প্রথম শ্রেণী ছাড়া ভ্রমণ করবেন না। অথচ হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই ড. জাফর ইকবাল ইকোনমি কাসে ওইদিন ঢাকার উদ্দেশে নিউইয়র্ক ত্যাগ করেন। জননন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদ তখন ফিউনারেল হোমের হিমাগারে। জীবদ্দশায় তার ভ্রমণে প্রথম শ্রেণীর চাহিদা সবসময় ছিল কিনা জানা যায়নি। তবে লাখো জনতার অপো ও উৎকণ্ঠায় স্বদেশ তখন প্রিয় লেখকের কফিনের অপোয়।
এ পাতার অন্যান্য খবর
- অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব হাসিনার : খালেদা জিয়ার প্রত্যাখ্যান
- জামায়াত নেতৃবৃন্দসহ রাজবন্দীদের মুক্তি দিন
- জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাকওয়ার প্রতিফলন প্রয়োজন
- রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই ফারুক হত্যা মামলায় নেতৃবৃন্দকে আসামি করা হয়েছে : মকবুল আহমাদ
- মিয়ানমারের নিরাপত্তারীরা রোহিঙ্গা মুসলিমদের আটক করে হত্যা ধর্ষণে লিপ্ত
- হুমায়ূন আহমেদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে শাওন ও মাজহারের বিরুদ্ধে মামলা
