রেহানাকে নিয়ে দলে বিকল্প চিন্তা
॥ মুনতাসির রহমান॥
রাষ্ট্র পরিচালনায় আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারের ব্যর্থতার পাল্লা এতোটাই ভারী যে, ‘ব্যর্থতাই’ যেন সরকারের অর্জনে পরিণত হয়েছে। গত সাড়ে তিন বছরে সাফল্য কোন খাতে হয়েছে সে হিসাব জনগণের কাছে নেই। ঘুষ, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, দলীয়করণ, পরিবারকরণ, আত্মীয়করণ এতোটাই প্রবল আকার ধারণ করেছে যে, সরকারের স্বাভাবিক উন্নয়নের ধারা পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। ওয়াদা করে জনগণের কাছ থেকে ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের একক রাজত্ব কায়েম দেশের মানুষ মেনে নিতে পারছে না। সরকারের এই যে সীমাহীন ব্যর্থতা তার দায়ভার নির্বাহী প্রধান হিসেবে এককভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর বর্তায়। তিনি কোনোভাবেই ব্যর্থতার দায়দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না। কিন্তু লক্ষ্যণীয় ঘটনা হলো প্রধানমন্ত্রী কোনোভাবেই ব্যর্থতাকে স্বীকার করতে রাজি নন। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থাপনায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে সর্বোময় ক্ষমতা, যদিও সংসদের কাছে তাকে দায়বদ্ধ থাকতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বা প্রচলিত যে বিধান তাতে প্রধানমন্ত্রী যেটা বলবেন, সেটাই আইন হয়ে যায়। তার অর্থ প্রধানমন্ত্রীর কথার ভারত্ব ও গুরুত্ব অত্যধিক। মন্ত্রী পরিষদের কোনো সদস্য ইচ্ছা করলেও প্রধানমন্ত্রীর কথা বা সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো বক্তব্য বা সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না। কিন্তু আশ্চর্যজনক ঘটনা হলো : বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বেলায় তার উল্টো ঘটছে। তার কথা বা সিদ্ধান্তের কোনো বাস্তবায়ন নেই। তিনি বলেন এক কথা তার মন্ত্রীরা বলেন অন্য কথা। সচিবালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলেছে, জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত উন্নয়নমূলক গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের ৯০ শতাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। তবে বাস্তবায়িত হয়েছে রাজনৈতিকভাবে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ। বিরোধী দলকে রাজপথে সভা-সমাবেশ করতে না দেয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা, গ্রেফতার করে জেলে ঢোকানো, জামিন না দেয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ বিরোধী দলকে ঘায়েল করতে বা তাদের ওপর দমন-পীড়ন, নির্যাতনমূলক সকল ধরনের সিদ্ধান্ত দ্রুততার সঙ্গে সরকার বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে। অক্ষম শুধু উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বেলায়। সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে পদ্মা সেতু নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বাইরে যেয়ে তিনি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা করছেন ভেতরে ভেতরে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠে বলেছেন, নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে। বিশ্বব্যাংকের কোনো অর্থের প্রয়োজন হবে না। তিনি একথা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন। সম্প্রতি লন্ডনে প্রবাসীদের এক অনুষ্ঠানেও একই কথা বলেছেন। আরো চমকপ্রদ ঘটনা হলো পদ্মা সেতু দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে তিনি দেশপ্রেমিক বলে তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। যার কারণে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করল আর প্রধানমন্ত্রী তাকে দেশপ্রেমিক বললেন। তার এ বক্তব্যে শুধু রাজনৈতিক মহল নয়, সরকারের মধ্যে, দলের মধ্যে এমনকি প্রবাসীদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
হাসিনার নেতৃত্ব হুমকির মুখে
দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনা দলীয় প্রধানের পদটি আঁকড়ে ধরে আছেন। আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এবং তার বাবা মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরসূরি হিসেবে ১৯৮১ সালে তৎকালীন নেতারা দলের সভানেত্রী করে শেখ হাসিনাকে বিদেশ থেকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। শেখ হাসিনাই একমাত্র দলীয় প্রধান যিনি দলীয় গঠনতন্ত্রের রীতিনীতির বাইরে নির্বাচিত হন। গঠনতন্ত্রের গণতান্ত্রিক বিধিবিধান ভঙ্গ করে নিজেই দলের এই সর্বোচ্চ আসনটি আজো আঁকড়ে ধরে আছেন। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী হলেন দুইবার। ’৯৬ সালে ক্ষমতায় যেয়ে একবার ঘোষণা দিয়েছিলেন রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার। পরবর্তীতে নিজের ওয়াদা নিজেই ভঙ্গ করেন। রাজনীতি তো ছাড়েনই নাই বরং দলীয় রাজনীতিকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছেন। দীর্ঘকাল ধরে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চার কারণে স্বৈরতান্ত্রিক পথে চলে গেছেন। তার একক ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব বেসামাল পর্যায়ে চলে গেছে। এমন মন্তব্য খোদ আওয়ামী লীগ থেকেই উঠেছে। সরকার এবং দল দুই জায়গাতেই তার একক আধিপত্য বিস্তারকে অনেকে মেনে নিতে পারছেন না। দলের সিনিয়র ও প্রবীণ নেতাদের ভালো অবস্থানে রাখলে সভানেত্রী পদটি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রবীণদের সরিয়ে রাখা হয়েছে। বর্তমানে দলের মূল নেতৃত্বে যারা আছেন তারা প্রায় সকলেই বয়স, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতায় তরুণ। হাতে গোনা যে দুই চারজন প্রবীণ আছেন যারা সকলে শেখ হাসিনার বন্দনায় মত্ত থাকেন সারাক্ষণ।
অন্য দিকে সরকারের মধ্যে অবস্থানও একই। মূলত সরকার চালাচ্ছেন বাম রাজনীতি থেকে আসা আওয়ামী নেতারা। সরকারের সফলতা তো নেই, তারপরেও যতটুকু সফলতা সেটুকুর দাবিদার বামপন্থীরা। এখানে আওয়ামী লীগের অবস্থান শূন্যের কোঠায়। এর প্রভাব তৃণমূলপর্যায়েও লক্ষ্যণীয়। যে সকল সহযোগী সংগঠন রয়েছে সেখানেও একই অবস্থা বিরাজমান। দলীয় এবং সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না। যারা তার সিদ্ধান্ত আপাতত মানছেন তারা অনেকটা বাধ্য হয়ে।
আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, প্রতিবাদ করলে দলে থাকা যাবে না এ ভয়ে অনেকে মুখ খুলছেন না। প্রকৃত অর্থে শেখ হাসিনার একক নেতৃত্ব এখন হুমকির মুখে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শেখ হাসিনা ইচ্ছা করে প্রবীণ ও যোগ্য নেতাদের কোণঠাসা করে রেখেছেন। তার নেতৃত্বের ওপর শুধু দল বা সরকার নয়, দেশের সাধারণ মানুষও ুব্ধ অতিষ্ঠ। একজন মানুষ দীর্ঘকাল ধরে একটি পদ আঁকড়ে আছেন। তিনি এই পদ থেকে সরে গেলে আওয়ামী লীগ আরো চাঙ্গা হবে। শেখ হাসিনার উচিত হবে আগামী কাউন্সিলে দলের কোনো প্রবীণ নেতাকে সভাপতির পদটি ছেড়ে দেয়া। সেটা না করতে পারলে আগামী নির্বাচনের আগেই দলের মধ্যে বিভাজন দেখা দেবে। যার প্রভাব জাতীয় নির্বাচনের ওপর পড়বে।
শেখ রেহানাকে নিয়ে বিকল্প চিন্তা
দলের মধ্যে একটি প্রভাবশালী মহল যারা শেখ হাসিনার কাছে বারবার নিগৃহীত হয়েছেন তারা শেখ রেহানাকে দলে টানার উদ্যোগ নিয়েছেন। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের হাল ধরবেন শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, এমন কথা গত কয়েক বছর ধরে শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু জয় রাজনীতিতে আসবেন বা তিনি আসলে দল চালাতে পারবেন না এমনটা বুঝতে পেরে নিজেই সরে গিয়েছেন। আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী নীতি এবং দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোটেই জয়ের অনুকূলে নয়। ফলে বিকল্প হিসেবে একমাত্র শেখ রেহানাই। কিন্তু তার রাজনীতিতে আসার তেমনটা আগ্রহ না থাকলেও অতি সম্প্রতি একটি বিশেষ মহল শেখ রেহানাকে উৎসাহিত করছেন দলের দায়িত্ব নেয়ার জন্য। জানা গেছে, শেখ পরিবার এ ব্যাপারে দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ সেলিম শেখ রেহানার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অন্য দিকে শেখ ফজলে নূর তাপস ও শেখ হেলাল শেখ হাসিনার পক্ষে। এছাড়া দলের মধ্যে কোণঠাসা হয়ে পড়া প্রায় সকল নেতা শেখ রেহানাকে দলে টানতে চাচ্ছেন। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নেতৃত্ব পরিবর্তনের পক্ষে। আওয়ামী সমর্থিত বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশও নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য শেখ রেহানাকে বিকল্প হিসেবে চিন্তা করছেন এবং তারা ইতোমধ্যে শেখ রেহানাকে দলের হাল ধরার অনুরোধও জানিয়েছেন।
এদিকে বিভিন্ন জেলাপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অধিকাংশ নেতাকর্মী সভানেত্রী পরিবর্তনের পক্ষে। তারা জানান, আওয়ামী লীগকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শেখ হাসিনাকে যেমন সরাতে হবে, তেমনি শেখ পরিবারের কাউকে দলের দায়িত্ব দিতে হবে। দলের দায়িত্ব নেয়ার মতো শেখ পরিবারে শেখ সেলিম ছাড়া পুরুষ কোনো নেতা নেই। কিন্তু শেখ সেলিম উগ্র মেজাজের এবং তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আছে। সুতরাং শেখ রেহানা ছাড়া বিকল্প আর কেউ নেই। এর বাইরে দলের মধ্যে থেকে কাউকে সভাপতি করতে গেলে দল ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে এ ব্যাপারে শেখ রেহানা সবুজ সংকেত না দিলেও দল এবং দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চিন্তিত বলে জানা গেছে। সূত্র জানিয়েছে, শেখ রেহানা বর্তমানে দলের কোনো পদে না থাকলেও দলের নেতৃত্ব বদলে তার হাত রয়েছে। শুধু দল নয়, সরকারে তার হাত অনেক লম্বা। গত সাড়ে তিন বছরে তিনি ঘন ঘন দেশে আসছেন। বড় বোন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নাম প্রকাশ করতে চান না আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা বলেছেন, শেখ হাসিনার চেয়ে শেখ রেহানা তীè বুদ্ধিসম্পন্ন ও গভীরের। দলীয় প্রধান হওয়ার জন্য যোগ্যতা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছেন। শেখ হাসিনা বিপক্ষে না থাকলে সহজেই হয়তো দলের হাল ধরবেন। আর শেখ হাসিনা তার গোয়ার্তুমি মনোভাব পরিবর্তন না করলে ক্ষমতা নিয়ে দুই বোনের মধ্যে লড়াই বেধে যেতে পারে।
এ পাতার অন্যান্য খবর
- ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে অব্যাহত ষড়যন্ত্রের অংশ
- দেশপ্রেমিক বা বেহায়া!
- মিসরে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা : সংঘাত নয় সর্বাগ্রে চাই স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্য
- হারুন-রফিকসহ ডেসটিনির ২২ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
- বাংলাদেশের নির্যাতিত মুসলমানদের পাশে দাঁড়াতে হবে
- মাহে রমজান মুসলমানদের বিজয়ের মাস : অধ্যাপক তাসনীম আলম
- ফারুক হত্যা মামলায় মিথ্যা-ভিত্তিহীন চার্জশিট জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের অংশ : ছাত্রশিবির
- ১৮ দলীয় জোটের ৪৬ নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন
- সরকারের প্রতি ৫ শতাংশও জনসমর্থন নেই : এরশাদ
