প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোথাও সফরে যাবেন অথচ তাকে ও তার কথাবার্তা নিয়ে হৈচৈ উঠবে না এমন অবস্থা কল্পনাও করা যায় না। এবারের লন্ডন সফরকালেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। ২৫ জুলাই তিনি লন্ডন গিয়েছিলেন, ফিরেছেন ৩০ জুলাই। উপল অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া হলেও প্রধানমন্ত্রীকে রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়েই কথা বেশি বলতে দেখা গেছে। বিশ্বব্যাংক কেন পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল করেছে সে প্রশ্ন যেমন এসেছে তেমনি এসেছে মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমানদের ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কিত প্রশ্নও। দুটি প্রসঙ্গই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হলেও তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত বলে প্রথমে রোহিঙ্গাদের দিকে দৃষ্টি ফেরানো দরকার। কারণ, কিছুদিন আগে নতুন পর্যায়ে বিপন্ন হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করলে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। সে সময় এমনকি এ অভিযোগও উঠেছে যে, বাংলাদেশে ঢুকতে না দিয়ে এবং মিয়ানমারে ফেরৎ পাঠানোর মাধ্যমে সরকার রোহিঙ্গাদের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু তীব্র নিন্দা-সমালোচনা সত্ত্বেও সরকার তার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনেনি। এমন এক úরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব বর্তেছিল জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ওপর। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর প্রধান অ্যান্টনিও গুটেরেস ইয়াঙ্গুন গিয়েছিলেন চেষ্টা চালাতে। কিন্তু মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থিন সেইন তাকে সাফ বলে দিয়েছেন, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গা মুসলমানদের মিয়ানমার ফিরিয়ে তো নেবেই না, মিয়ানমারের অধিবাসী হিসেবেও স্বীকার করবে না। সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি দেখাতে গিয়ে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট আরো বলেছেন, নৃতাত্ত্বিকভাবে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের অধিবাসী নয়। তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। সে কারণে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসবাসের অধিকার নেই। মিয়ানমার বরং রোহিঙ্গা মুসলমানদের অন্য কোনো দেশে পাঠিয়ে দেয়ার চিন্তা করছে। কোনো দেশ যদি রোহিঙ্গাদের নিতে আগ্রহী হয় তাহলে তাদের সে দেশেই পাঠিয়ে দেয়া হবে। এটাই নাকি রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান! এটা মাত্র সেদিনের, গত ১৩ জুলাইয়ের ঘটনা।
মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের মুখে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানার পর বিশ্ববাসী অধীর আগ্রহে অপোয় ছিল বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য। সে কারণে লন্ডন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বারবার প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। আলজাজিরা টেলিভিশনকে দেয়া তার সাৎকারে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমরা ছিল প্রধান বিষয়বস্তু। আলজাজিরা জানতে চেয়েছিল, শেখ হাসিনার সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দিয়ে মিয়ানমারে ফিরে যেতে বাধ্য করে চরম অমানবিকতা দেখিয়েছে বলে যে প্রচারণা রয়েছে তা সত্য কিনা। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, বিপুল জনস্যংখ্যার চাপে এমনিতেই প্রচণ্ড সমস্যায় রয়েছে বাংলাদেশ। সেজন্যই নতুন করে আরো বেশি সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া অনেক আগে থেকে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় অবস্থান করছে। এভাবে আলজাজিরার কাছে মূল কথায় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অমতার দিকটিকেই তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মিয়ানমারের কর্তব্যের দিকটিকেও সামনে এনেছেন। বলেছেন, আপনাদের উচিত বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারকে চাপ দেয়া।
ল্য করলে দেখা যাবে, আংশিকভাবে হলেও প্রধানমন্ত্রীর মুখে যুক্তির কথাই উচ্চারিত হয়েছে। মিয়ানমার থেকে ধাওয়া খেয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের দু-চারদিনের জন্য আশ্রয় না দিয়ে সোজা মৃত্যুর মুখে পাঠিয়ে দেয়াটা সঠিক হয়েছে কিনা সে আলোচনায় যাওয়ার পরিবর্তে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থিন সেইনের বক্তব্যের প্রতি মনোযোগ দেয়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বলার অপো রাখে না, থিন সেইনের বিশেষ মন্তব্যটুকু বাংলাদেশের জনগণকে স্তম্ভিত করেছে, যেখানে তিনি বলেছেন, নৃতাত্ত্বিকভাবে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের অধিবাসী নয়, তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। সে কারণে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসবাসের অধিকার নেই। মিয়ানমার বরং রোহিঙ্গা মুসলমানদের অন্য কোনো দেশে পাঠিয়ে দেয়ার চিন্তা করছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ, আশ্রয় ও বসবাসের কারণে সৃষ্ট সমস্যার প্রোপটে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে বাংলাদেশ অবশ্যই এ ধরনের মন্তব্য আশা করেনি। ইতিহাসের আলোকে প্রেসিডেন্ট থিন সেইনের যুক্তি ও দাবিই বরং অগ্রহণযোগ্য। ভুল ব্যাখ্যার পাশাপাশি ইতিহাসও বিকৃত করেছেন তিনি। কারণ, রাখাইন প্রদেশ তথা আরাকানে মুসলমানদের বসবাস হাজার বছর ধরে। আরাকান সেকালে ছিল রোসাঙ্গ রাজ্য। এর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে। বাস্তবে রোসাঙ্গ রাজ্য গড়েই উঠেছিল বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে। রোসাঙ্গ রাজ্যকে শুধু নয়, সে যুগের বাংলা সাহিত্যকেও পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন বাংলার ইলিয়াস শাহী রাজবংশের কৃতী পুরুষেরা। পঞ্চদশ শতাব্দীতে রাজধানী গৌড়ের পতন ঘটলে আরাকানের রোসাঙ্গ রাজসভাই বাংলা সাহিত্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। সপ্তদশ শতাব্দীর দৌলত কাজী, আলাওল, মরদন ও নাসুরুল্লা খানের মতো অনেক কবি-সাহিত্যিকের বর্ণনাতেও এসব বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। অর্থাৎ রোহিঙ্গা মুসলমানরা হঠাৎ করে গিয়ে হাজির হয়নি রাখাইন প্রদেশে তথা আরাকানে। তারা সেখানে বসবাস করছে কয়েক শতাব্দী ধরে। বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনেও তারা ভোট দিয়েছে। সরকারকে খাজনা-ট্যাক্সও তারা বহুকাল ধরেই দিয়ে আসছে। সুতরাং প্রেসিডেন্ট থিন সেইন বললেই রোহিঙ্গা মুসলমানরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হয়ে যায় না। নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণেও রোহিঙ্গারাই ওই অঞ্চলের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, যুগে যুগে তাদের ওপর মিয়ানমার তথা সাবেক বার্মার শাসক গোষ্ঠী ও মগসহ বিভিন্ন সম্প্রদায় নিষ্ঠুর দমন-নির্যাতন চালিয়েছে। এমনকি ১৯৪২ সালেও আকিয়াব, রাছিডং, কাকথ, মাব্রা, মিনবিয়া, পুনাজয় প্রভৃতি এলাকায় হত্যা করেছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে। হত্যা ও নির্যাতনের সে নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড এখনও অব্যাহত রয়েছে। এর প্রধান কারণ, তারা মুসলমান। ল্য করলে দেখা যাবে, আধুনিক যুগের রাষ্ট্রনায়ক হলেও প্রেসিডেন্ট থিন সেইনের মুখেও মুসলমানবিরোধী একই মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। রোহিঙ্গাদের নাক বোঁচা না হওয়াটা কারণ নয়, রোহিঙ্গারা মুসলমান বলেই যতো আপত্তি!
রাখাইন অঞ্চলে সাম্প্রতিক হত্যা-নির্যাতন এবং তার ফলে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানের বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার পরিপ্রেেিত দরকার যখন ছিল যুক্তিসঙ্গত আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট তখন নতুন করে ঝামেলা বাঁধিয়েছেন। তার মন্তব্য যেমন মেনে নেয়া যায় না তেমনি বাংলাদেশের ওপর লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানের চাপও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এমনিতেই ১৯৭০-এর দশক থেকে দফায় দফায় আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশই তীব্র সংকটের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। তার ওপর প্রেসিডেন্ট থিন সেইনের থিওরি যদি মেনে নিতে হয় তাহলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরাট অংশকেই বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করার প্রশ্ন আসবে। এমন অবস্থা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এজন্য বেশি দরকার ছিল আসলে জোর কূটনৈতিক উদ্যোগ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আলজাজিরা টেলিভিশনকে যেভাবে বলেছেন তা শুনলে মনে হতে পারে যেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের মতো তিনিও পাল্টা রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই কথা বলেছেন। অন্যদিকে বাস্তব পরিস্থিতি যে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর এবং রোহিঙ্গা নামের একটি জনগোষ্ঠীকেই যে নির্মূল করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে সেদিকগুলো প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে একেবারেই আসেনি। অথচ এসব দিককেই প্রাধান্যে আনা দরকার ছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এবং দ্বিপাকি পর্যায়ে চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি ইতিহাসের আলোকে এই সত্য প্রতিষ্ঠা করাও সরকারের কর্তব্য যে, রোহিঙ্গারা শত শত বছর ধরে মিয়ানমারের আদিবাসী নাগরিক হিসেবে বসবাস করে আসছে। সুতরাং বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর পরিবর্তে তাদের মিয়ানমারেই বসবাস করার অধিকার দিতে হবে। কিন্ত প্রধানমন্ত্রী সেদিকে যাননি।
প্রধানমন্ত্রীর লন্ডন সফরকালে দ্বিতীয় প্রসঙ্গ ছিল বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল। কারণ সম্পর্কে দলীয় এক অনুষ্ঠানে সরাসরি জবাব দেয়ার পরিবর্তে শেখ হাসিনা একটি সঙ্গীতের প্রথম কলি গেয়ে শুনিয়েছেন। গানের কথাগুলো ছিল, ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে ফুলে পাইলা ভ্রমরা, ময়ূর বেশেতে সাজন রাধিকা’। ব্রিটেন আওয়ামী লীগের নেতারও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাল ধরেছিলেন। বেসুরো গলায় তারাও সমবেতভাবে হিন্দু ধর্মের দেবদেবী কৃষ্ণ ও রাধার লীলা বিষয়ক গানটি গেয়ে উঠেছিলেন। বোঝাই যাচ্ছিল, প্রধানমন্ত্রীর মতো তার দলীয় নেতাকর্মীরাও রাধা-কৃষ্ণসহ হিন্দুদের দেব-দেবীদের ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহী। মগজে সব সময় থাকে বলে এ ধরনের সঙ্গীত তারা মুখস্থও রাখেন। লন্ডন থেকে পাঠানো এবং ঢাকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, গানটির মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নাকি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটনের বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, হিলারি নাকি ড. মুহা¤দ ইউনূসের ব্যাপারে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিলেন। চাপ তিনি নাকি সৃষ্টিও করেছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার নতি স্বীকার করেনি বলেই হিলারি কিনটন মার্কিন সরকারের প্রভাব খাটিয়ে বিশ্বব্যাংককে দিয়ে ঋণচুক্তিটি বাতিল করিয়ে ছেড়েছেন।
বলা বাহুল্য, মতাসীনদের এ ধরনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও আত্মরম্ভিতাপূর্ণ ঘোষণার কারণে পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক আলোচনায় এখনো সমাপ্তি ঘটতে পারছে না। পরিবর্তে যতো দিন যাচ্ছে ততো নতুন নতুন প্রসঙ্গে বিতর্ক জমে উঠছে। লন্ডনে একাধিক উপলে প্রধানমন্ত্রীও নানা কথার মারপ্যাঁচে এই বিতর্ককে উস্কে দিয়ে এসেছেন। প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তিনটি বক্তব্যের পরিপ্রেেিত। প্রথমত, ঋণচুক্তি বাতিল করাসহ সবকিছুর জন্য তিনি এককভাবে বিশ্বব্যাংকের ওপর দোষ চাপিয়েছেন। নিজেদের ভুল, দোষ বা দুর্নীতির ধারে-কাছেই যাননি। শুধু তা-ই নয়, তিনি বলে বসেছেন, বিশ্বব্যাংক ‘পার্সেন্টেজ’ খায়! কথাটার অর্থ এভাবে করা যেতে পারে যে, পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য ঋণ দেয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে বিশ্বব্যাংক ‘পার্সেন্টেজ’ তথা ঘুষ দাবি করেছিল। কিন্তু সরকার রাজি হয়নি বলেই বিশ্বব্যাংক চুক্তি বাতিল করেছে! কথাটার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, বিশ্বব্যাংক চীনের একটি প্রতারক কোম্পানিকে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ দেয়ার জন্য মন্ত্রী আবুল হোসেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তিনি রাজি না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে শেষ পর্যন্ত চুক্তি বাতিল করেছে বিশ্বব্যাংক। দ্বিতীয় েেত্র প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ মন্ত্রী আবুল হোসেনকে ‘প্রকৃত দেশপ্রেমিক’ হিসেবে সার্টিফিকেট দিয়ে তার প্রশংসা করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। নিজেদের ‘সাদা কাপড়ের’ সঙ্গে তুলনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জোট সরকার ‘ময়লা কাপড়ের’ মতো ছিল বলে সে কাপড়ে দাগ লাগলেও কারো চোখে পড়তো না। কিন্তু তার সরকার ‘সাদা কাপড়ের’ মতো বলে সত্য-মিথ্যা কিছু একটা বললেই এতে দাগ লেগে যায় এবং তা নিয়ে সবাই হৈচৈ শুরু করে। পদ্মা সেতুর ব্যাপারেও নাকি তেমনটিই হয়েছে। কিন্তু তারা কোনো দুর্নীতি করেননি। প্রশ্ন উঠেছে, দুর্নীতি না করে থাকলে ‘সাদা কাপড়ে’ আবার দাগটুকু লাগলো কিভাবে?
তৃতীয় েেত্র নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে বলে ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করে প্রধানমন্ত্রী প্রবাসীদের প্রতি বেশি করে অর্থ তথা রেমিট্যান্স পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তারা যদি ‘কিছু বেশি’ অর্থ পাঠান তাহলে সেতু নির্মাণে অর্থের কোনো সমস্যা হবে না। প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনে মনে হতে পারে যেন প্রবাসীরা যে অর্থ পাঠান তার সবটাই পাঠান সরকারের ব্যয়ের জন্য। অন্যদিকে সত্য হলো, অর্থ পাঠান তারা স্বজনদের জন্য। এই অর্থের ওপর তাই সরকারের কোনো অধিকার থাকতে পারে না। প্রবাসীদের অর্থের মাধ্যমে সরকারের শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ে। সে রিজার্ভের অর্থ সরকার যে কোনো খাতেই ব্যয় করতে পারে। ব্যয় করেও। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এমনভাবে ‘কিছু বেশি’ অর্থ পাঠাতে বলেছেন যার কারণে এ আশঙ্কাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, এখন থেকে প্রবাসীরা যে অর্থ পাঠাবেন তার সম্পূর্ণটুকুই সরকার দখল করে নেবে এবং পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজে ব্যবহার করবে। বলা বাহুল্য, এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়লে প্রবাসীরা উল্টো অর্থ পাঠানো হয় কমিয়ে দেবেন না হলে বন্ধই করে দেবেন। তেমন অবস্থায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে সেকথা চিন্তা করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বলা দরকার, প্রধানমন্ত্রীর আবেগ ও আকাক্সাই সব নয়, মাঝখানে অর্থ এক বিরাট তথা প্রধান নির্ধারক। কারণ, প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ দু-চার হাজার কোটি টাকা মাত্র নয়। বিশ্বব্যাংকসহ দাতাদের প্রদেয় ঋণের পরিমাণ ছিল ২৯০ কোটি মার্কিন ডলার, বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি ছিল সরকারের দিক থেকেও অংশ গ্রহণের শর্ত। সে হিসাবে দরকার হতো প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার। ঋণের বিপরীতে সুদের বিষয়টিও ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে হিসাব কষে দেখিয়েছেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে গেলে লাভের চাইতে তি হবে বহু গুণ বেশি। বিশ্বব্যাংক যেখানে শতকরা মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ ভাগ সুদে ঋণ দিতে চেয়েছিল সেখানে পাঁচ থেকে আট শতাংশের কমে অন্য কোনো সংস্থা বা রাষ্ট্রের কাছেই ঋণ পাওয়া যাবে না। যাচ্ছেও না। সরকার গোপনে-গোপনে সে চেষ্টা করে দেখেছে। আর পাঁচ, আট বা তার চেয়ে বেশি হারে সুদ গুণতে হলে পদ্মা সেতুকে মোটেও সম্ভাবনাময় বা ভায়াবল বলা যায় না। মূলত সে কারণেই প্রধানমন্ত্রীকে বিতর্কিত মন্ত্রী আবুল হোসেনের ব্যাপারে দৃশ্যত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। মন্ত্রী পদত্যাগ করে আপাতত বিদায় নিয়েছেন। এর ফলে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নতুন পর্যায়ে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার এবং ঋণ পাওয়ার জন্য চেষ্টা শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। অর্থমন্ত্রীও এ প্রসঙ্গে আশাবাদের কথা শুনিয়েছেন। যেমন ২২ জুলাই তিনি বলেছেন, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর নির্মাণে অংশ নেবে বলে ‘এখনো’ তারা আশা করছেন। অর্থমন্ত্রী সেই সাথে অর্থায়নের ব্যাপারে যে তিনটি বিকল্প বা সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যেও বিশ্বব্যাংককেই রেখেছেন এক নম্বরে। দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি রাষ্ট্র ও সংস্থা। নিজস্ব অর্থায়নের কথাও অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তবে তাকে রেখেছেন সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে। অর্থাৎ বিশ্বব্যাংক যদি শেষ পর্যন্তও ঋণ না দেয় এবং অন্য কোনো রাষ্ট্র ও সংস্থার কাছ থেকে সাহায্য যদি না পাওয়া যায় তাহলেই অগত্যা হিসেবে অর্থাৎ নিতান্ত বাধ্য হয়ে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের চেষ্টা করবে।
অর্থমন্ত্রীর এসব কথার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কথাগুলোর কিন্তু মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে ‘পার্সেন্টেজ’ খাওয়ার অভিযোগের কথাই ধরা যাক। এ ধরনের অভিযোগ যে নতুন করে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ পাওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত নেতিবাচক হয়ে উঠবে সেকথা নিশ্চয়ই বলার অপো রাখে না। প্রধানমন্ত্রীরও কথাটা না বোঝার কোনো কারণ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি বিশ্বব্যাংককে সরাসরি আক্রমণ করে বসেছেন, তাও লন্ডনের মতো আন্তর্জাতিক একটি বড় রাজধানী নগরীতে দাঁড়িয়ে। এর মধ্য দিয়ে কিন্তু এমন ধারণাই প্রাধান্যে এসেছে যে, প্রধানমন্ত্রী নিজেও সম্ভবত চান না, পদ্মা সেতু সত্যিই নির্মিত হোক এবং সে প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংক ঋণ দিয়ে অংশ নিক। মন্ত্রী আবুল হোসেন সম্পর্কে সার্টিফিকেট দিয়েও প্রধানমন্ত্রী সমস্যা তৈরি করেছেন। কারণ, আবুল হোসেনকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে আসলে দুর্নীতির অভিযোগের কারণে। প্রধানমন্ত্রী কিন্তু সে দুর্নীতির ব্যাপারে একটি কথাও বলেননি। অন্যদিকে অভিযুক্ত মন্ত্রীকে বিদায় করার মধ্য দিয়ে তিনিই আবার একটু ঘুরিয়ে স্বীকার করে নিয়েছেন, আবুল হোসেন আসলেও দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন। না হলে অমন একজন ‘প্রকৃত দেশপ্রেমিক’কে হঠাৎ বিদায় করা হলো কেন? ‘উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র’সহ বিশ্বব্যাংক যে অভিযোগগুলো করেছে সেগুলোরও কোনো জবাব দেননি প্রধানমন্ত্রী। তা তিনি নাও দিতে পারেন। কারণ, এদেশেরই উচ্চ পর্যায়ের কারো কারো স্বজনদের নাম শোনা যাচ্ছে ঘটনাপ্রবাহে। এসব বিষয়ে কোনো জল্পনা-কল্পনা করার পরিবর্তে আমরা মনে করি, সত্যি পদ্মা সেতু নির্মাণ করার সদিচ্ছা থাকলে প্রধানমন্ত্রীর উচিত বিরোধী দল এবং অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত ও পদপে নেয়া। না হলে এ অভিযোগই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে যে, সেতু মির্মাণের মাধ্যমে জনগণের সেবা করা তাদের উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য আসলে পদ্মা সেতুকে নিয়ে রাজনীতি করা। এই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত দেশের সর্বনাশই করবে।
