জামায়াত-বিএনপিকে বাদ রাখার কূটকৌশল
॥ মুনতাসির রহমান॥
আগামী নির্বাচনের জন্য দেড় বছরেরও কম সময় আছে। বিগত নির্বাচন হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি। সে হিসেবে আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৬ জানুয়ারি তার সরকারের ক্ষমতার মেয়াদকাল ৫ বছর পূর্ণ হবে। জাতীয় নির্বাচনের জন্য দেড় বছরেরও কম সময় খুব বেশি সময় নয়। কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি বাতিল হওয়ার ফলে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট রাজপথে আন্দোলনে আছে। বিরোধী দলের বক্তব্য হলো কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে ছাড়া আগামীতে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। সরকার জোর করে নির্বাচন করলে সে নির্বাচনে বিরোধীদল অংশ নেবে না। ১৮ দলীয় জোট এ অবস্থা থেকে এক চুলও সরে যাবে না বলে জানা যাচ্ছে। তবে কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি ভেতরে ভেতরে নির্বাচনের প্রস্তুতিও আছে। নির্বাচনী প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে জোটকে আরো সংগঠিত করা হচ্ছে আন্দোলন এবং নির্বাচনের জন্য। এমন কথা জানিয়েছেন জোটের প্রধান শরিক দল বিএনপির নেতারা। এ প্রসঙ্গে ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল জামায়াতে ইসলামীর নেতারা বলেছেন, আগামী নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে হতে হবে। এ দাবি জনগণের। জামায়াত এবং ১৮ দল জনগণের এ দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করে যাচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে ভরাডুবির আশঙ্কায় বাঁকা পথে ফের ক্ষমতায় আসতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এজন্য কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি বাতিল করেছে।
এদিকে শাসক দল আওয়ামী লীগ বাঁকা পথে ক্ষমতায় আসার সমস্ত নীলনকশা ইতোমধ্যে তৈরি করে সামনে এগুচ্ছে। দলীয় সূত্র জানিয়েছে আগামী নির্বাচন বর্তমান আওয়ামী দলীয় রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে অনুষ্ঠিত হবে। জিল্লুর রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে বিষয়টি ফয়সালা করেছেন। সূত্র আরো জানিয়েছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে বিবিসি বাংলা বিভাগকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে বিরোধী দলের অংশীদারিত্বের যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা হটকারী ও গভীর ষড়যন্ত্রের একটি অংশ। এ প্রস্তাব দেয়ার অর্থ হলো রাষ্ট্রপতির তত্ত্বাবধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করলে সরকারে অংশীদারিত্ব তো দূরের কথা বিএনপি-জামায়াতসহ ১৮ দল নির্বাচনেও অংশ নেবে না। শেখ হাসিনার এ প্রস্তাবটি একটি কৌশলমাত্র। অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াতকে বাইরে রেখেই নির্বাচন করে নেয়া।
নির্বাচনী কৌশল তৈরি
নির্বাচনী কৌশলের দিক থেকে আওয়ামী লীগ পাকা খেলোয়াড়। কৌশলে যেমন পাকা, নির্বাচন করার অভিজ্ঞতাও অনেক বেশি। অতীত অভিজ্ঞতাকে যেমন কাজে লাগাবে তেমনি নয়া কূটকৌশল নেবে নির্বাচনে জেতার জন্য। কারণ বিদ্যমান পরিস্থিতি যা তাতে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ক্ষমতায় আসতে পারবে না। সাড়ে তিন বছরে রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশের মানুষ সরকারের উপর অতিষ্ঠ। দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি, সন্ত্রাস, দুর্নীতিসহ এমন কোনো অব্যবস্থাপনা নেই যেটা সরকার সৃষ্টি করেনি। রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্নীতিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ায় বিদেশেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ুণœ হয়েছে। মানুষের জানমালের কোনো নিরাপত্তা নেই। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে দলের নেতাকর্মীরা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ লুটপাট করায় দেশে কোনো উন্নয়ন অগ্রগতি নেই। সরকারের লুটপাটের কারণ অর্থনীতিও ভঙ্গুর অবস্থানে চলে গেছে। নির্বাচনী কোনো অঙ্গীকারই সরকার বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এ অবস্থায় আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জনগণের কাছে কিভাবে ভোট চাইবে এ আশঙ্কা দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার গ্লানি বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি করেছে। আগামী নির্বাচনের জন্য যে সময় আছে তার মধ্যে ব্যর্থতার এতো বড় গ্লানি বা ক্ষত দূর করতে পারবে না। আওয়ামী লীগ নেতাদেরই অভিমত বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সত্যি সত্যি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে দলটির চরম ভরাডুবি হবে। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা ছিল ২৩০টি। এবার দুইশ আসনই মাইনাস হয়ে যেতে পারে।
সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন শ’ নির্বাচনী আসনে জরিপ চালিয়েছেন। জরিপের ফলাফল মোটেই আশানুরূপ নয়। প্রভাবশালী অধিকাংশ মন্ত্রীর আসন আগামী নির্বাচনে হাতছাড়া হয়ে যাবে। অন্তত শতাধিক আসনে দলীয় প্রার্থীদের চরম ভরাডুবি হবে। জোটগতভাবে নির্বাচন না করলে অন্তত আরো একশ’ আসন ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় চরম ব্যর্থতা এলাকার উন্নয়ন কাজ না হওয়া, নেতায় নেতায় দ্বন্দ্ব, কোন্দল নির্বাচনে ভরাডুবি হওয়ার অন্যতম কারণ হবে বলে গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে। নাম প্রকাশ করতে চাননি আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সারির একজন নেতা এ প্রতিনিধিকে জানান, গোয়েন্দা জরিপ কেন আমাদের নিজস্ব জরিপের ফলাফল আরো ভয়ানক। বিএনপি-জামায়াতের মতো দল নির্বাচন করলে ২০০১ সালের নির্বাচনের চেয়েও বড় ভরাডুবি হবে। আর কোনো কারণে মহাজোট ভেঙে গেলে এককভাবে নির্বাচন করলে শোচনীয় পরাজয় হবে। তবে জেতার সম্ভাবনা আছে বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে না গেলে এবং সে নির্বাচন হতে হবে বর্তমান রাষ্ট্রপতির অধীনে। আবার সেটা করতে গেলেও জনগণ ভোট দিতে ভোট কেন্দ্রে যাবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
এসব বাস্তবতার নিরিখে শাসক দলের নীতিনির্ধারকরা মূলত ১৮ দলকে বাইরে রেখেই নির্বাচনের পক্ষপাতী। যত রকমের ছলচাতুরী করার প্রয়োজন তার সবকিছু করবে আবার ক্ষমতায় আসতে। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থেকে ঠাণ্ডা মাথায় কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি বাতিল করেছে। এখন নিজেদের দলীয় রাষ্ট্রপতির অধীনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করবে। ১৮ দল তাতে সাড়া না দিলেও নির্বাচন করে নেবে। আওয়ামী লীগের আরেকটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হলো বিরোধী দল নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়ে রাজপথে আন্দোলন করতে চাইলে নতুন করে দমন পীড়ন শুরু করবে। জামায়াতে ইসলামীর তো শীর্ষপর্যায়ের প্রায় সকল নেতাই জেলে আছেন। বিএনপির অন্তত ৫০ জন নেতাকে জেলে পাঠাতে পারলে রাজপথে আন্দোলন চাঙ্গা করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি মহাজোট থেকে আলাদা হয়ে এককভাবে নির্বাচন করবে। এ বিষয়টিও জেনারেল এরশাদের সঙ্গে বৈঠক করে ঠিক করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিপক্ষে সংখ্যালঘু একটি অংশ
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক মহলের এমন কূটকৌশলকে মেনে নিতে পারছেন না দলের একটি ুদ্র অংশ। এই অংশটি ুদ্র হলেও এর সঙ্গে জড়িত আছেন প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা। তবে তারা প্রভাবশালী হলেও দলের মধ্যে তাদের অবস্থান মোটেই শক্তিশালী নয়। গত সাড়ে তিন বছরে তারা নানা কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়ে আছেন। তাতে এই কোণঠাসা নেতাদের আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে না। এটা আঁচ করতে পেরে সংখ্যালঘু বা ুদ্র ওই অংশটি বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এদের সংখ্যা অন্তত ৫০ হবে। যারা কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন। এদের সঙ্গে যোগ দেবেন অন্তত একশ’ বর্তমান নির্বাচিত সংসদ সদস্য যাদেরকে আগামী নির্বাচনে বাদ দেয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে। এর বাইরে জেলা-উপজেলাপর্যায়ে আরো নেতা আছেন যারা দল ক্ষমতায় থাকার পরও কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাননি বা মূল্যায়ন করা হয়নি। এই বিুব্ধরা একত্র হলে তাদের সামাল দেয়া শেখ হাসিনার পক্ষে কঠিন হয়ে যেতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। শুধু নির্বাচন নয়, আওয়ামী লীগের মধ্যে বিভক্তি গত কয়েক বছর ধরে চলে আসছে। দল ক্ষমতায় থাকার কারণে বিভক্তির লক্ষণ অনেকটা অস্পষ্ট। কিন্তু নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে ততই অস্পষ্টতা ধীরে ধীরে কেটে যাবে। দলের বিদ্রোহী অংশটি তাদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে বেরিয়ে পড়বে বলে শোনা যাচ্ছে। নির্বাচনমুখী একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগামী নির্বাচন যথাসময়েই হবে এবং তা দলীয় রাষ্ট্রপতির অধীনেই হবে।
এ পাতার অন্যান্য খবর
- নগরীতে গণপরিবহন সঙ্কট চরমে
- ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে তিউনিসিয়া
- সরকারের রূপরেখা চূড়ান্ত না হলেও দশম জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ করেছে ইসি
- কুরআনের সমাজ কায়েম না হলে খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়
- মাওলানা নিজামীর মামলার রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু ২৬ আগস্ট
- দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেভাবে মানুষের জন্য কাজ করতে চাই : হামিদ আযাদ
- অধ্যাপক গোলাম আযমকে ঠিক মতো ইফতার ও সেহেরি সরবরাহ করা হচ্ছে না : মিসেস আফিফা আযম
- সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ল্েয সকলকে কুরআনের আলোকে জীবন গঠন করতে হবে : মাওলানা আবদুল হালিম
