নগরীতে গণপরিবহন সঙ্কট চরমে
সীমাহীন দুর্ভোগ নগরবাসীর : উদাসীন কর্তৃপ
আফজালী রহমান : প্রায় দেড় কোটি মানুষের বসবাস ঢাকা মহানগরীতে। নগরবাসীর নানা সমস্যার মাঝে অন্যতম গণপরিবহন সঙ্কট। রাজধানী ঢাকা মহানগরীতে গণপরিবহন সঙ্কট অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। নগরবাসীকে প্রতিনিয়ত পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগ। গণপরিবহনের এই সঙ্কটের কারণ খুঁজতে গিয়ে নানা তথ্য বেরিয়ে আসে। এক দিকে কথিত মালিক-ড্রাইভার ও হেলপার সমিতি, এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের চাঁদাবাজি আর নেতাদের ‘আবদার’ মেটানো ও নগরজুড়ে তীব্র যানজটের কারণে ট্রিপ কমে যাওয়ার ফলে বেসরকারি বা ব্যক্তিপর্যায়ে পরিবহন খাতে বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীরা এ খাতে নতুন করে বিনিয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। অন্য দিকে একমাত্র রাষ্ট্রীয় পরিবহন প্রতিষ্ঠান বিআরটিসির কতিপয় কর্মকর্তার অনিয়ম আর সীমাহীন দুর্নীতির কারণে গণপরিবহন সঙ্কট এখন চরমে উঠেছে। সূত্র জানায়, বর্তমানে নগরীতে গণপরিবহনের প্রয়োজন অন্তত ১০ হাজার। কিন্তু নগরীতে চলাচলকারী গণপরিবহনের সংখ্যা প্রয়োজনের অর্ধেক। এতে নগরবাসীকে কী পরিমাণ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তা বলার অপো রাখে না। মগবাজার বাসা থেকে মতিঝিলে প্রতিদিন অফিস করতে হয় ব্যাংকার কমরুদ্দিনকে। তিনি জানান, প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সময় হাতে রেখে বাসা থেকে বের হলেও গাড়ি না পাওয়ার কারণে অফিসে পৌঁছাতে প্রায়ই দেরি হয়ে যায়। অথচ মগবাজার মোড় থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর ২০-২৫ মিনিটের পথ। অনেক সময় তিনি হেঁটেও অফিসে গেছেন বলে জানান। সিএনজি অটোরিকশা চালকরা যা ভাড়া দাবি করে তাতে হেটে যাওয়ায় শ্রেয় মনে করেন তিনি। কারওয়ান বাজারে একটি বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে চাকরি করেন গীতা রানী দাস। বাসা সেগুনবাগিচা। প্রতিদিনই প্রেস কাব থেকে গাড়ি ধরতে হয় তাকে। তিনি জানান, অন্তত আধ ঘণ্টা গাড়ির জন্য অপো করতে হয়। তারপর গাড়ি এলেও যাত্রীদের যে ভিড় তাতে গাড়িতে ওঠাই দুষ্কর হয়ে পড়ে। তবুও ভিড় ঠেলে উঠতে হয় তাকে। নগরীর চিটাগাং রোড, সায়েদাবাদ, মতিঝিল শাপলা চত্বর, দৈনিক বাংলার মোড়, বাংলামোটর, পল্টন মোড়, প্রেস কাব, কাকরাইল মোড়, ফার্মগেট, মৌচাক, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান মোড়ে ঘুরে ও কয়েকটি রাস্তায় বাসে চড়ে যাত্রীদের বিড়ম্বনা আর হয়রানির চিত্র চোখে পড়ে। পরিবহন সঙ্কটের কারণে কর্মস্থল বা গন্তব্যস্থলে যথাসময়ে পৌঁছাতে না পারার সাথে রয়েছে বাড়তি আরেক ঝামেলা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। মতিঝিল থেকে কারওয়ান বাজার ভাড়া ১০ টাকা হলেও যাত্রীদের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে ১২-১৫ টাকা। অনেক সময় তা বেড়ে ২০ টাকায়ও দাঁড়ায়। শুধু মতিঝিল-কারওয়ান বাজার নয়, এভাবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে প্রায় সব রুটেই। এই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে যাত্রী-হেলপারের সাথে হাতাহাতির ঘটনাও কম ঘটে না। অতিরিক্ত ভাড়ার ব্যাপারে কথা বললে কনডাক্টর সুজনের সাফ জবাব ‘ওস্তাদের (ড্রাইবার) লগে কথা কন, আমারে কইয়া লাব নেই’। পরে ড্রাইভার কামালের সাথে কথা বললে তিনি জানান, লাইন খরচ বেড়ে যাওয়াতে তাদের পোষাচ্ছে না। তাই বাড়তি ভাড়া আদায়। অবশ্য এই লাইন খরচের ব্যাখ্যা চাইলে তিনি বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পরিবহন মালিক জানান, বাস পরিচালনা করতে গিয়ে তাদেরকে ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক আর এলাকাভিত্তিক নেতাদের ‘আবদার’ রা করতে হয়। তার সাথে আছে প্রশাসনের রিকুইজিসন আর চাঁদাবাজি। সব মিলিয়ে আয়-ব্যয় হিসাব করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাছাড়া হরতাল বা নানা ইস্যুতে গাড়ি ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগ তো রয়েছেই। ফলে তারা এই খাতে বিনিয়োগ অনেকটা বন্ধ করে দিয়ে অন্য খাতে বিনিয়োগে ঝুঁকছে। এতে রাস্তায় নামছে না চাহিদা মতো নতুন গাড়ি। লক্কড়-ঝক্কর মার্কা সেই পুরনো বাসগুলো দিয়েই চালিয়ে যাচ্ছে তারা।
এদিকে নগরীতে সকাল-বিকাল যাত্রীদের এই চরম দুর্ভোগের ব্যাপারে কোনো পদপে নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপ। যাত্রীদের এই সমস্যাকে একেবারেই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে এখাতের রাষ্ট্রীয় একমাত্র প্রতিষ্ঠান বিআরটিসি। অথচ নাগরিকের এই পরিবহন সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ এই প্রতিষ্ঠানেরই দায়িত্ব। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিআরটিসি’র এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বেসরকারি পরিবহন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে দিন দিন বিআরটিসিকে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে তুলছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা বিলাসবহুল ‘ভলভো’সহ এই প্রতিষ্ঠানের গাড়িগুলোকে সুপ্রিম কোর্ট, সচিবালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় বেকার দাঁড়িয়ে রাখা হয়। দেখা যায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সকালে অফিসে আনা আর বিকেলে বাসায় পৌঁছে দেয়া ছাড়া এই গাড়িগুলোর চাকা আর ঘুরে না। অথচ পরিকল্পিতভাবে এই বাসগুলোকে রাস্তায় নামালে নগরবাসীর পরিবহন সঙ্কট অনেকাংশে কমে যেত বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা।
অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, বিআরটিসিতে এখন চালক সঙ্কট চরমে। চালক সঙ্কট নিরসনে বারবার বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলেও যোগ্য ও দ চালক পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব চালক আসে তারা পরীায় ঝরে যায়। তবে এ ব্যাপারেও রয়েছে আনা অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিসি’র এক কর্মকর্তা জানান, দ চালক যে আসে না তা নয়। অনেক সময় চালকদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা চাওয়া হয়। ফলে তারা চলে যায়। তবে তিনি স্বীকার করেন চালকদের বিআরটিসি যে বেতন দেয় তা বেসরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পরিবহনের চালকদের এক তৃতীয়াংশ। চালক না পাওয়ার এটাও একটি কারণ। বর্তমানে বিআরটিসিতে অন্তত ৪০ শতাংশ চালক সঙ্কট রয়েছে। বিআরটিসি’র ডিপুটি জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) মেজর মোঃ ইসমাইল যাত্রী সেবায় বিঘœ ঘটার কথা স্বীকার করে বলেন, নীতিমালা মতে প্রতিটি গাড়ির জন্য ২ দশমিক ২৫জন চালক প্রয়োজন। সে হিসেবে প্রায় ৪০ শতাংশ চালক কম। তাছাড়া ১০ শতাংশ গাড়ি রণাবেণে থাকে। অবশ্য, বর্তমানে বিআরটিসি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান বলে জানান তিনি। বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন রুটে বিআরটিসি’র ১২শ’ বাস চলাচল করছে। চালক-সহকারীদের বেতন ভাতা নিজস্ব আয় থেকে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। বিআরটিসি’র একজন কর্মকর্তা জানান, ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়ির একজন চালকের মাসিক বেতন ন্যূনতম ১৫ হাজার টাকা। সে েেত্র বিআরটিসি’র একজন চালকের বেতন সর্বসাকুল্যে ৬ হাজার ৫শ’ টাকা। ফলে অভিজ্ঞ চালক বিআরটিসিতে আসতে চায় না।
বিআরটিসি’র নিজস্ব পরিচালনার চাইতে লিজে চলাচলকারী গাড়িতে লাভ বেশি হচ্ছে জানিয়ে ডেপুটি ম্যানেজার (অপারেশন) হারুন অর রশিদ বলেন, ৫ বছর মেয়াদী লিজের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ইতোমধ্যে তারা লিজ নবায়ন করে নিয়েছে। গত ৩ বছর যাবত লিজ বন্ধ রয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত আসলে আবেদনকৃত লিজের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দ্রুত গণপরিবহন সঙ্কট সমাধানে পদপে নেয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, গণপরিবহন সংক্রান্ত বৈঠকে যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধি থাকে না। ফলে মালিক প ইচ্ছামত সিদ্বান্ত নেয়। আর যাত্রীদের সেই সিদ্বান্ত মানতে বাধ্য করা হয়। তিনি আগামীতে গণপরিবহন সংক্রান্ত যে কোনো মিটিং-এ যাত্রীদের প্রতিনিধি রাখার দাবি জানান। সব কথার ওপরে নগরবাসীর একটাই চাওয়া তা হল যথা সময়ে গন্তব্যস্থলে পৌঁছানো। তাদের অভিমত কর্তৃপ একটু আন্তরিক হলেই সকাল-বিকাল মানুষের এই যে দুর্ভোগ, হয়রানি আর বিড়ম্বনা, তা নিমিষেই সমাধান হয়ে যাবে। তাদের এই চাওয়া কি পূরণ হবার নয়!
এ পাতার অন্যান্য খবর
- আগামী নির্বাচন রাষ্ট্রপতির অধীনেই
- ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে তিউনিসিয়া
- সরকারের রূপরেখা চূড়ান্ত না হলেও দশম জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ করেছে ইসি
- কুরআনের সমাজ কায়েম না হলে খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়
- মাওলানা নিজামীর মামলার রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু ২৬ আগস্ট
- দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেভাবে মানুষের জন্য কাজ করতে চাই : হামিদ আযাদ
- অধ্যাপক গোলাম আযমকে ঠিক মতো ইফতার ও সেহেরি সরবরাহ করা হচ্ছে না : মিসেস আফিফা আযম
- সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ল্েয সকলকে কুরআনের আলোকে জীবন গঠন করতে হবে : মাওলানা আবদুল হালিম
