বিবিসির সাথে সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচন দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে করার কথা বলেছেন। প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া তার এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বর্তমান মহাজোট সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করার পর এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৯০ এ হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারের পতনের পর ২০০১ সাল পর্যন্ত নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে যে কয়টি নির্বাচন হয়েছে, তা নিয়ে তেমন কোনো বির্তক নেই। বিগত ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফসল সেনাসমর্থিত মঈনউদ্দীন ফখরুদ্দিন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন এবং এর আগের কিছু অপ্রীতিকর ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিতর্কিত করেছে বর্তমান সরকারের নীতি নির্ধারকরা। বিতর্কিত করার কারণ জনগণের কাছে সুস্পষ্ট। সরকার ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলছে। জনপ্রিয়তার পারদ নিচে নামতে থাকার সাথে সাথে সরকারের স্বৈরাচারী আচরণের মাত্রাও বাড়ছে। বিরোধী দলের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি স্তব্ধ করতে খুন, গুম, জেলজুলুম, মিথ্যা মামলা, হামলা, হুলিয়ার পথ বেছে নিয়েছে ক্ষমতাসীন মহাজোট।
সরকার আদালতের রায়ের কথা বলে এ দাবি অগ্রাহ্য করছে। অথচ রায়ে আগামী দু’টি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার কথা বলা হয়েছে। আমরা মনে করি,আস্থার সঙ্কট দূর না হওয়া পর্যন্ত এ বিধান রাখতে হবে। সরকারের উচিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করার আগেই সংবিধান সংশোধন করা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন ছাড়াও আরো একটি কারণে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। দেশের বর্তমান সংবিধানের ধারা ১২৩ (৩) অনুসারে, সংসদের সময়সীমা শেষ হওয়ার তিন মাস আগে সংসদ নির্বাচনের বিধান রাখা হয়েছে। তবে ওই সময় সংসদের অধিবেশন বসবে না। সংসদ থাকা অবস্থায় নির্বাচন হলে বর্তমান সংসদ সদস্য ও এই পদে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ (সবার জন্য সুযোগ) থাকবে না। কারণ, নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্যদের অধিকার বা সুবিধা (প্রিভিলেজ) খর্ব করতে পারবে না। সংসদ সদস্যরা স্বাভাবিকভাবেই মানুষ ও প্রশাসনের কাছে অধিক গুরুত্ব পাবেন। নির্বাচনের সময় এই অসঙ্গতি দূর করার জন্য সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সংশোধন করতে হবে। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশেই সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিধান নেই। এ েেত্র ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও দণি আফ্রিকার কথা উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এসব দেশে সংসদের সময়সীমা পার হওয়ার পর অথবা ওই সময়সীমার আগে সংসদ ভেঙে দিয়ে তারপর নির্বাচন হয়। তাই নিরপে ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সংবিধানের এ-সংক্রান্ত বিধান সংশোধন করতেই হবে।
আমরা মনে করি, আর কালক্ষেপণ না করে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার স্বার্থে সরকারের উচিত সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান কায়েম করা এবং অন্যান্য অসঙ্গতি দূর করা।
