ঢাকা শুক্রবার ২ ভাদ্র ১৪১৯, ২৮ রমজান ১৪৩৩, ১৭ আগস্ট ২০১২

সামনে শুধু ঘন অন্ধকার
॥ জামশেদ মেহ্দী ॥
সব দেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল সুর হলো, ‘কারো প্রতি শত্রুতা নয়, সকলের সাথে বন্ধুত্ব’। এটি সব দেশের পররাষ্ট্রনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবে সেই নীতি কতটুকু মানা হচ্ছে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির হাল-হকিকত দেখে প্রশ্ন জাগছে, সরকার দেশটাকে কোথায় নিয়ে যেতে চান? বিগত কয়েক মাসে এই সরকারের কার্যকলাপ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন  উক্তি শুনে মনে হচ্ছে যে, পৃথিবী নামক এই গ্রহটির একটি মাত্র দেশ ছাড়া তারা সমগ্র পৃথিবীর বিরুদ্ধেই সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছেন। গত ১৪ আগস্ট মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে বসে ইংল্যান্ড এবং ইউরোপের অন্য দেশগুলোকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সবক দিয়েছেন। তিনি ইংল্যান্ডকে নসিহৎ করেছেন যে, এই ইস্যুতে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে তাদের উচিত মিয়ানমারের সাথে কথা বলা। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ইংল্যান্ড, আমেরিকা ও জাতিসংঘসহ বিশ্বের একাধিক দেশ একাধিকবার বলেছে যে, রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে সাময়িক আশ্রয় দানের ব্যাপারে বাংলাদেশ অমানবিক আচরণ করছে। বাংলাদেশ জবাবে বলছে যে, বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই ৩ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। তার পক্ষে নতুন করে রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়া সম্ভব নয়। জাতিসংঘ এবং পশ্চিমা বিশ্ব বলছে যে, তারা রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে আশ্রয় দেয়ার কথা বলছেন না। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে বৌদ্ধ রাখাইন এবং মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেমে গেলে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা স্বদেশে ফিরে যাবে। অস্থায়ীভাবে তাদের জন্য বহির্বিশ্ব প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পাঠাবে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিশ্ব সম্প্রদায়ের কথা শোনেননি।

ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক প্রসঙ্গ : তবে এই সরকার সবচেয়ে ন্যক্কারজনক কাজ করেছে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে নিয়ে। বয়স বৃদ্ধির অজুহাতে ড. ইউনূসকে এই সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান পদ থেকে অপসারণ করে। অজুহাত তোলা হয় যে, ৬০ বছর বয়সে ব্যাংকের এমডি অবসরে যাবেন। অথচ চাকরির এই শর্তটি ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে যখন প্রয়োগ করা হয় তখন তার বয়স ৭০ বছর। ঐ দশটি বছর অন্য সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই ওভারলুক করেছেন। কারণ, গ্রামীণের ধারণা সারা বিশ্বে নতুন। সেই সাথে নতুন ক্ষুদ্র ঋণের সংজ্ঞা (গ্রামীণ ব্যাংক এবং ক্ষুদ্র ঋণ সম্পর্কে আমাদের রিজার্ভেশন রয়েছে। সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু তার মতো একজন সম্মানিত ব্যক্তিকে যেভাবে নাস্তানাবুদ করা হচ্ছে সমগ্র দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও তার বিরোধী)। সারা পৃথিবীতে ক্ষুদ্র ঋণের সংজ্ঞাটি ড. ইউনূসের মস্তিষ্কজাত এবং তার উদ্যোগেই গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে এখানে সরকারি  বিধি অতীতে কেউ প্রয়োগ করেননি। এই নোবেল বিজয়ীর প্রতি বিরল সম্মান দেখানোর জন্যই এটি করা হয়েছে। সেই ড. ইউনূসকে শুধুমাত্র গ্রামীণ ব্যাংক থেকেই সরানো হয়নি, ড. ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তি নিয়েও কত আপত্তিকর কটাক্ষ করা হয়েছে।

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে অপমানসূচক বক্তব্য যারা দিয়েছেন তাদের নেতৃত্বে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তাকে ‘রক্ত চোষক’ ‘সুদখোর’ বলে গালাগালি করেছেন। সুদখোর বলে যদি গালি দিতে হয় তাহলে শুধু মাত্র ড. ইউনূসকে নয়, বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে গালাগালি দিতে হবে। কারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তিই হলো সুদ। ইসলামী ব্যাংকিং ছাড়া পৃথিবীর আর সমস্ত ব্যাংক ব্যবস্থায় রয়েছে সুদ খাওয়া এবং সুদ দেয়ার বিধান বা ব্যবস্থা। আওয়ামী লীগ প্রধান থেকে শুরু করে তাদের তৃণমূলপর্যায়ের কর্মী পর্যন্ত এমন  একজনকেও কি খুঁজে পাওয়া যাবে যিনি বিনাসুদে ব্যাংকের সাথে লেনদেন করেছেন? (সুদ ভিত্তিক) ব্যাংক ব্যবস্থার আমরাও বিরোধী। কিন্তু সেটি ভিন্ন ইস্যু।

আওয়ামী লীগাররা নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে ড. ইউনূসের যোগ্যতা নিয়েও অশিষ্ট কটাক্ষ করেছেন। আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন যে, ড. ইউনূস কোথায় কোন যুদ্ধ থামিয়েছেন যে তাকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দিতে হবে? সৈয়দ আশরাফ এতদূরও বলেছেন যে, মদ ও স্যান্ডউইচ খাওয়ালেই নাকি নোবেল পুরস্কার পাওয়া যায়। এই তরিকা অনুসরণ করে সৈয়দ আশরাফ তো নিজেও নোবেল পুরস্কার পেতে পারতেন। তাহলে তিনি কেন সেই পুরস্কার পাননি?

তারপরেও তারা তার পিছু ছাড়েননি

গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরিয়েও ক্ষমতাসীন দলের মন ভরেনি। এখন তারা গ্রামীণ ব্যাংককে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক অর্ডিন্যান্স সংশোধন করে ব্যাংকের এমডি নিয়োগের একক ক্ষমতা চেয়ারম্যানের হাতে দেয়া হচ্ছে। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। ড. ইউনূস একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক। সরকার এবং আওয়ামী লীগ একের পর এক ব্যক্তিগতভাবে তার ওপর এবং প্রতিষ্ঠানগতভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর আঘাত করেই যাচ্ছে। এত অপমান এবং মানসিক নির্যাতন এ পর্যন্ত তিনি মুখ বুজে সহ্য করেছেন। কিন্তু সরকার যখন  গ্রামীণ ব্যাংক গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে, একমাত্র তখনই তিনি মুখ খুলেছেন। গ্রামীণ ব্যাংককে, তার ভাষায়, ‘ধ্বংস করার’ এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারের এই প্রচেষ্টার প্রতিবাদ জানিয়েছে আমেরিকার বিভিন্ন মহল। প্রথমে জানিয়েছেন একজন সিনেটর। তারপর প্রতিবাদ জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পত্র পত্রিকায় দেখা গেলো যে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা অর্থমন্ত্রী আবদুল মুহিতের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং এ ব্যাপারে মার্কিন সরকারের উদ্বেগ অর্থমন্ত্রীর মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছেন। এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিন্টন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন এবং বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে ছিলেন। তিনি ড. ইউনূস এবং ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের সাথে এক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মানবাধিকার রিপোর্টেও বাংলাদেশ সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ বাংলাদেশে মানবাধিকার লংঘনে শুধুমাত্র উদ্বেগ প্রকাশ করাই নয়, তারা আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠান র‌্যাব বিলোপ করারও সুপারিশ করেছেন। এসব ঘটনায় বাংলাদেশের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে সেটি বোঝা যায় আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের মন্তব্যে। তারা মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং হিলারি কিনটনের সমালোচনা করেছেন।

বিশ্বব্যাংকের সাথে সম্পর্কের অবনতি

পদ্মা সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের যে কত বড় অবনতি ঘটেছে সেটি সম্ভবত আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। পরিস্থিতির এমন অবনতি ঘটেছে যে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী আবুল হোসেনের পদত্যাগের পরেও শেষ রক্ষা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন সব কথা বলছেন যা শুনে মনে হবে যে, তিনি বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের কোনো কোনো মন্ত্রী এবং সিনিয়র  অফিসারের বিরুদ্ধে ঘুষ এবং দুর্নীতির অভিযোগ করলে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে পার্সেন্টেজ খাওয়া এবং দুর্নীতির পাল্টা অভিযোগ তোলেন। অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের ডামাডোলে বিশ্বব্যাংকের বিশাল পরিমাণ অর্থায়ন হারিয়ে গেছে।

ভারত ছাড়া আর কোনো বন্ধু আছে কি?

আমরা এই লেখার শুরুতেই বলেছি যে, একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল সুর হওয়া উচিত কারো সাথে শুত্রুতা নয়, সকলের সাথেই বন্ধুত্ব। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এই সরকার উল্টা পথে হাঁটছে। তাদের নীতি হলো, ‘কারো সাথে বন্ধুত্ব নয়, সকলের সাথে শত্রুতা’। অবশ্য এখানে একটি ছোট্ট সংশোধন রয়েছে। সেটি হলো, ‘কারো সাথে বন্ধুত্ব নয় সকলের সাথে শত্রুতা, শুধু মাত্র ভারত ছাড়া’। ইতঃপূর্বে বলা হয়েছে যে আমেরিকা এবং  পশ্চিমা বিশ্বের সাথে এই সরকারের সম্পর্ক মসৃণ নয়। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন ঢাকা ছিলেন তখন তার ঢাকা উপস্থিতিকালীনই তার বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। মুসলিম জাহানের সাথে সরকারের সম্পর্ক উষ্ণ নয়। গণচীনের সাথে সম্পর্ক নেহায়েত মামুলী এবং আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ডিপ ফ্রিজে চলে গেছে।

সারা দুনিয়ার মধ্যে আওয়ামী সরকারের একমাত্র বন্ধু হলো ভারত। ভারতও আবার সেই বন্ধুতের মাসুল কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে নিচ্ছে। গত রবিবারের খবরে প্রকাশ, ভারত এখন বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে একটি, দুটি করিডোর চায় না। তারা কমপক্ষে ১৩টি করিডোর চায়। তারা অবশ্য এটির ওপর আন্তর্জাতিকতার রঙ চড়ানোর জন্য ‘ট্র্যানজিটের’ লেভেল এঁটেছে। সুতরাং ভারত যে আচরণ করছে সেটিকে বন্ধুত্ব বলা যায় না। ভারতের ভূমিকা হলো শোষকের। তারা মনে করে যে, বাংলাদেশ তাদের অর্থনৈতিক কলোণি। আমরা শুধু দিচ্ছি আর তারা শুধু নিচ্ছে। এই সরকার যদি ভারতকে এক তরফাভাবে দেয়া বন্ধ করে তাহলেই ভারত স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হবে। সেই মূর্তিতে বন্ধুত্ব থাকবে না, থাকবে চণ্ডনীতি। শুধু দিয়েই যাবো আর বিনিময়ে কিছুই পাব না, সেটি যদি হয় বন্ধুত্বের নীতি, তাহলে দুনিয়াজোড়া বন্ধুত্ব অর্জন করা যায়।

এক মাত্র ভারত ছাড়া পশ্চিমা বিশ্ব এবং মুসলিম জাহানসহ সারা দুনিয়াকে বাংলাদেশ যেভাবে শত্রু বানাচ্ছে, সেই নীতি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে বাংলাদেশের সামনে থাকবে শুধু ঘন অন্ধকার।

jamshedmehdi15@gmail.com

অন্যান্য মিডিয়া bdnews24 RTNN Sheersha News barta24 Prothom Alo Daily Nayadiganta Jugantor Samakal Amardesh Kaler Kantho Daily Ittefaq Daily Inqilab Daily Sangram Daily Janakantha Amader Shomoy Bangladesh Pratidin Bhorerkagoj Daily Dinkal Manob Zamin Destiny Sangbad Deshbangla Daily Star New Age New Nation Bangladesh Today Financial Express Independent News Today Shaptahik 2000 Computer Jagat Computer Barta Budhbar Bangladesherkhela Holiday Bangladesh Monitor BBC Bangla Redio Tehran
homeabout usdeveloped by

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ মো. তাসনীম আলম।

মহীউদ্দীন আহমদ কর্তৃক জাতীয় মুদ্রণ ১০৯, ঋষিকেশ দাস রোড, ঢাকা - ১১০০ হতে মুদ্রিত ও ১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা - ১১০০ হতে প্রকাশিত। যোগাযোগের ঠিকানাঃ ৪২৩ এলিফেন্ট রোড, বড় মগবাজার, ঢাকা - ১২১৭। ফোনঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৯০৬৫, বার্তা - ৮৮ ০১৬৭০৮১৩২৭৬, সার্কুলেশন - ৮৮ ০১৫৫২৩৯৮১৯০, বিজ্ঞাপন - ৮৮ ০১১৯৯০৯০০৮৫, ফ্যাক্সঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৫৫৭১, ওয়েবসাইটঃ www.weeklysonarbangla.net, ইমেইলঃ weeklysonarbangla@yahoo.com