ভারতের দখলে ৮ হাজার কোটি টাকার ঈদ বাজার
॥ আহমাদ সালাহউদ্দীন॥
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের ঈদবাজার ছিল এবার বেশ জমজমাট। বছরের সর্ববৃহৎ উৎসব ঈদ উপলে সবাই পুরোদমে কেনাকাটা করেছেন। দরিদ্র থেকে বিত্তবান পর্যন্ত সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে নানা আঙ্গিকে। ফুটপাত থেকে ঝলমলে বিশাল শপিংমল- সর্বত্র ভিড় ছিল সঙ্গতি অনুযায়ী সমাজের নানা শ্রেণীপেশার মানুষের। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি আমীর হোসেন খান এবং ঢাকা মহানগরী দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও এফবিসিসিআইর অন্যতম পরিচালক মোহাম্মদ হেলালউদ্দিন জানান, ঈদ উপলে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই রমজান মাসজুড়ে কমপে ৩ হাজার কোটি টাকার শাড়ি, থ্রি-পিস, শিশুদের জামা-কাপড়, বড়দের পাঞ্জাবি ইত্যাদি পোশাক সামগ্রী বিক্রি হয়েছে। যার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ দেশী এবং বাকী দুই-তৃতীয়াংশই ভারতীয়। জুতা-স্যান্ডেলের মধ্যে কিছু ছিল চীনা। আর রেডিমেড গহনা এবং প্রসাধনীর বেশিরভাগই ভারতীয়। ঢাকার বাইরে দেশের অন্যান্য বাজারেরও একই দশা। প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বা ৮ হাজার কোটি টাকার ঈদ-পোশাকের বাজার রয়েছে বাংলাদেশে। এর পাশাপাশি জুতা-সেন্ডেল, প্রসাধনী ও গহনার বাজার রয়েছে আরো সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার। ঈদের এই পোশাক, জুতা-স্যান্ডেল, প্রসাধনী ও গহনার বাজারের প্রায় তিন- চতুর্থাংশই দখল করে রেখেছে ভারত। অর্থাৎ বাংলাদেশের ১২ হাজার কোটি টাকার ঈদ-বাজারের মধ্যে ভারতের দখলেই প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বাজার। চোরাপথেই এসেছে বেশিরভাগ পণ্য। ফলে দেশী উৎপাদকেরা মার খাবার পাশাপাশি সরকারও হারিয়েছে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। সাধারণ মার্কেটগুলোতে তো বটেই, রাজধানী ঢাকার বড় বড় শপিংমল, ওয়ানস্টপ মল ও অভিজাত এলাকার বুটিক শপগুলোতেও দেশী কাপড় এবার তেমন ছিল না বললেই চলে। প্রায় সবই ছিল ভারতীয়। তবে ভারতীয় পোশাকের চাহিদা বেশি হওয়ারও কারণ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের নায়িকা, গায়িকা ও অভিনেত্রীদের অনুকরণের জন্য তরুণীদের উথালপাথাল হয়ে ওঠা একটি বড় কারণ। ভারতীয় হিন্দী টিভি সিরিয়ালগুলো এেেত্র বাংলাদেশী মহিলা ক্রেতাদের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলছে। ভারতীয় টিভি চ্যানেগুলোর নানা প্রচারণার মাধ্যমে তাদের পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের ভালো ব্র্যান্ডিং করে ফেলেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের এই বাজার ধরার জন্য তারা সেভাবেই টিভিতে প্রোগ্রাম তৈরি করে। তাছাড়া রমজান মাস শুরু হওয়ার এক-দেড় মাস আগে থেকেই সীমান্ত এলাকাও চোরাচালানের জন্য ছিল পুরোপুরি উন্মুক্ত। সীমান্ত পথে স্্েরাতের মতো ঢুকেছে ভারতীয় পণ্য। গত তিন বছর ধরেই চলছে এ অবস্থা। ঈদের বাজারে এবার ভারতীয় ‘ঝিলিক’-এর দাপট ছিল উল্লেখ করার মতো। ঢাকাসহ সারাদেশের ঈদের বাজারে এবার ভারতের তৈরি ‘ঝিলিক’ নামের এই থ্রি-পিসের দারুণ চমক গেছে। দাম ছিল ৬ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। এছাড়াও ছিল ‘এক থা টাইগার’, ‘আওয়ারা’ ‘খুশি’ নামের ভারতীয় থ্রি-পিস। তবে দামে শীর্ষে ছিল ‘এজেন্ট বিনোদ’। এর সর্বোচ্চ দাম গেছে ৬৫ হাজার টাকা। বিক্রেতারা জানান, বেশ কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমা বা টিভি সিরিয়াল ও তারকাদের নামে নাম দিয়ে ভারতে তৈরি থ্রি-পিস ঢাকাসহ সারাদেশের ঈদের বাজারে দেদারসে চলছে। এর ব্যাপক কাটতি দেখে প্রতিবছরই এ ধরনের পোশাকের সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে।
ঈদ বাংলাদেশের মুসলমানদের এক অনাবিল আনন্দের নাম। ঈদকে সামনে রেখে তাই সাধ্যমতো দেশী-বিদেশী পণ্য সামগ্রীর কেনাকাটা পরিবারে বাড়তি আনন্দ যোগ করে। কেউই এ সময় পিছিয়ে থাকতে চায় না। ঈদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে নতুন পোশাক। বর্ষার শেষভাগে এবার ঈদের আগমন হওয়ায় পোশাকে রঙের বিচিত্র খেলা চলেছে। ঋতুর রাণীর সমন্বয়ে ঈদ পোশাকে আকাশি, নীল, সবুজ, মেরুন, ক্রিম, অলিভ, অফ হোয়াইট, পিংক, টিয়া অর্থাৎ উজ্জ্বল রঙগুলো দারুণ প্রাধান্য পেয়েছে। সবাই বলেছেন, এবার রঙিন ঈদ হবে। বিক্রেতারা দোকান সাজান রঙ বেরঙের পোশাক দিয়ে। রাজধানী যেন হয়ে ওঠে উৎসবের নগরী। তুলনামূলকভাবে এবার বৃষ্টি কম থাকায় জমজমাট হয়ে ওঠে রাজধানীর ঈদ বাজার। বিপণিবিতানগুলোতে ছিল সব বয়সী মানুষের ভিড়। আর ভিড় দেখে খুশি বিক্রেতারাও। সব ধরনের দোকানেই কমবেশি ভিড় ছিল। তবে বেশি ভিড় পোশাকের দোকানে। বেশিরভাগ দোকানেই দোকানিদের কথা বলার ফুরসত ছিল না। ব্যস্ত সময় গেছে তাদের। রোজা শুরুর পর থেকে প্রতি শুক্র-শনিবারই ছিল সবচেয়ে বেশি ভিড়। শুধু মার্কেট নয়, আশপাশের সড়কগুলোতেও বাড়তি ক্রেতার চাপে ছুটির দিনগুলোতে দিনভর লেগেছিল অসহনীয় যানজট। ফুটপাথের দোকানেও ভিড়। উৎসবের আমেজে কেনাকাটা চললেও বিক্রেতারা বেশি দামে পোশাক বিক্রি করেছেন- প্রায় সব ক্রেতারই এমন অভিযোগ। অপরদিকে বিক্রেতাদের সেই পুরনো অজুহাত। বেশি দামে কেনা, তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে পুরো শহরের প্রাণচাঞ্চল্য। ইফতারির পর যেন সব বিপণিবিতানে মানুষের ঢল নামে। কেনাকাটার মিছিল চলতে থাকে। আর তাই অফিসপাড়া ফাঁকা থাকলেও কেনাকাটার এলাকা- বিশেষ করে নিউমার্কেট, গাউসিয়া, চাঁদনী চক, মৌচাক, গুলিস্তান, নয়াপল্টন, বেইলী রোড, এলিফ্যান্ট রোড, ধানমন্ডির মিরপুর রোড এলাকায় ভিড় ছিল উপচে পড়া। নিউমার্কেট, গাউসিয়া, ধানমন্ডি এলাকায় পোশাক, জুতা, কসমেটিকস, শাড়ি, পাঞ্জাবিসহ সব ধরনের দোকানেই কমবেশি ভিড়। তবে বেশি ভিড় পোশাকের দোকানে। অন্যান্য দিন বেলা ১০/১১টার পর মার্কেটগুলো জমে উঠলেও, শুক্র-শনিবারের চিত্র ছিল ব্যতিক্রম। সকাল ৯টা থেকেই ক্রেতার আনাগোনা শুরু হয়। সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে ক্রেতার সমাগম বাড়তে শুরু করে। নারী-পুরুষ সকলেই পরিবার পরিজন নিয়ে দিনভর সময় কাটিয়েছেন কেনাকাটায়। কেউ পছন্দের পোশাকটি খুঁজে পাওয়ার সাথে সাথে কিনে নিয়েছেন। আবার কেউ বিভিন্ন মার্কেটের মধ্যে দাম যাচাই-বাছাই করে সময় পার করেছেন। থান কাপড়ের বিক্রি এবং টেইলার্সের ব্যবসাও এবার বেশ জমজমাট বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ছুটির দিনে ক্রেতাদের ভিড় যেমন বেড়েছে তেমনি বিক্রিও আশানুরূপ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর ব্যবসা ভালো বলে জানান একাধিক বিক্রেতা। অন্যবারের তুলনায় এ বছর ঈদের কেনাকাটা একটু আগেভাগেই শুরু হয়েছে। বেতন-বোনাস আগেই পেয়ে যাওয়ায় সবার হয়েছে পোয়াবারো। এবার মূলত জুলাই এবং আগস্ট- দু’মাসের বেতনের সমন্বয়ে ঈদ বাজারের সহজ বাজেট করতে পেরেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই রমজানের শুরুতেই সবাই কেনাকাটার জন্য মার্কেটে ভীড় জমিয়েছেন। চাঁদনী চক ও গাউছিয়ায় দেখা যায় একই চিত্র। প্রতিটি দোকানে মহিলাদের উপচেপড়া ভিড়। বিশেষ করে থ্রি-পিসের দোকানগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। পাশাপাশি শাড়ির দোকানগুলোও ফাঁকা নেই। তবে পুরো মার্কেট ভারতীয় পণ্যের দখলে। গাউছিয়া মার্কেটের ফিক্সড প্রাইসের শাড়ি দোকান সেঞ্চুরীর মালিক জানান, এখানে ৯০ শতাংশ শাড়ির বাজার ভারতীয় পণ্যের দখলে। দেশি মাত্র ১০ শতাংশ। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, গুণগত মানে ততোটা ভালো না হলেও ভারতীয় শাড়ির ফিনিশিং ভাল। বিভিন্ন রঙের পাথরের কাজ করা। আমাদের দেশের ডিজাইনার তেমন নেই এবং ভালমানের শাড়িও খুব একটা তৈরি করা হয় না। যা তৈরি হয় তাও বেশিরভাগ ভারতীয় শাড়িকে নকল করে। এজন্য তিনি নৈতিকতা ও ব্যবসায়ী জ্ঞানের অভাবকে দায়ী করেন। তার দোকানে বাহারী ডিজাইনের সর্বনিম্ন ২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা দামের শাড়ি বিক্রি হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দামের সিল্ক, জামদানি, কাতান, মসলিন, শিফন, জর্জেট, নেট, জুট কাতান এবং লেহেঙ্গাও ছিল। যার প্রায় সবই ভারতীয়।
বিক্রির শীর্ষে ভারতীয় শাড়ী ও থ্রিপিস
ঈদের বাজারে শাড়ী ও থ্রি-পিসের চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। দেশীয় কাপড়ের থ্রি-পিসের চেয়ে ভারতীয় বিভিন্ন আইটেমের থ্রি-পিস এবার বাজার দখল করে নিয়েছে। হিন্দি ছবি ও বাংলা সিরিয়ালের নামানুসারে এসব থ্রি-পিস ক্রেতাদের অনেক পছন্দ। এসব থ্রি-পিসের দামও বেশি। ভারতীয় থ্রি-পিস কেনার জন্য প্রতিটি মার্কেটে উপচেপড়া ভিড়। ৩ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে নানা নামের এসব থ্রি-পিস। নগরীর বিভিন্ন শপিং মলে ঘুরে দেখা গেছে ভারতীয় বিভিন্ন ধরনের থ্রি-পিসের দোকানে তরুণীদের পছন্দের পসরা। এসব দোকানে ছিল ভারতে তৈরি থ্রিপিস, টুপিস ও রকমারি পোশাকের বিপুল সমারোহ। হরেক রকম নামে এসেছে এবারের পোশাক। এসবের মধ্যে ঝিলিক, খুশি, আওয়ারা, ডনটু, জান্নাত, জানেমন, টাপুর-টুপুর, জানবি, সাবারিয়া, ফিটিংস হিট উল্লেখযোগ্য। সেলসম্যানরা জানান, অন্যবারের তুলনায় এবার রমণীদের কাছে ভারতীয় থ্রি-পিসের চাহিদা খুব বেশি। তাদের সাফ কথা, দাম বড় কথা নয়, পছন্দের কাপড়টি চাই। এবার সব দোকানির ব্যবসা ভালো বলে জানান তারা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতের দিল্লি, বোম্বে, কোলকাতা থেকে আমদানি করা হয়েছে এসব থ্রি-পিস। এলসি’র মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা একেকটি মার্কেটে গড়ে ৫০ কোটি টাকার কাপড় আনলে এর পাঁচ গুণ এসেছে অবৈধ পথে। তবে পোশাকের চাহিদা অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত সরবরাহে ঘাটতী দেখা দিতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন। শিশু ও মেয়েদের সন্তুষ্টি অর্জনে পছন্দের পোশাক কিনে হাসিমুখেই সবাই বাড়ি ফিরছেন। এছাড়া ঈদ উপলে শাড়ি, জুতা, শার্টসহ বিভিন্ন পোশাক সামগ্রীর বাজারের পাশাপাশি ভারতীয় মশলার বাজারও বেশ জমে উঠেছে।
পাঞ্জাবির বাজারও ভারতের
মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদের ঈদ বাজারও এবার ছিল ভারতীয় বিভিন্ন নামের পাঞ্জাবির দখলে। মেয়েদের পোশাকেও যেমন ভারতীয় সিনেমা-সিরিয়ালের ছোঁয়া, পাঞ্জাবির ক্ষেত্রেও তেমনি তার প্রভাব দেখা গেছে। রাজধানী ঢাকার বৃহৎ শপিং মলগুলোর বিভিন্ন দোকান ঘুরে ছেলেদের ঈদ কালেকশনে এবার এর ব্যাপক প্রমাণ মিলেছে। ছেলেদের ঈদ পোশাকের প্রথম সারিতেই থাকে পাঞ্জাবি। পুরুষ ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে তাই অভিজাত প্রায় সব শোরুমেই ছিল বাহারি ভারতীয় পাঞ্জাবির সম্ভার। ভারত থেকে এবার সরাসরি এসব পাঞ্জাবি আমদানি করা হয়েছে। অতীতে আর কখনোই এবারের মতো এতো ভারতীয় পাঞ্জাবি আমদানি করা হয়নি।
ঢাকার বাইরেও ভারতীয় ঝিলিক
জেলা-উপজেলার বিভিন্ন বাজার ও বিপণি বিতানে ভারতীয় পোশাক ঝিলিক, টাপুর-টুপুর বিশাল স্থান করে নেয়। নানা রকম রঙ-বেরংয়ের কাপড়ে দোকানগুলো সাজানো হয়। ছিট কাপড়ের দোকানগুলোতেও ভিড় উপচে পড়া। বিভিন্ন মার্কেটের দোকানগুলোতে বিদেশী কাপড়ই বেশি। অর্থাৎ সয়লাব হয়েছে ভারতীয় পণ্যে। শাড়ি, পাঞ্জাবি, শার্ট, থ্রি-পিস, ফ্রক, চুড়ি, সিটি গোল্ড- ভারতের কি নেই মাকের্টগুলোতে। যা পাওয়া যাচ্ছে তার বেশিরভাগই অবৈধপথে ভারত থেকে আনা। উন্নতমানের দেশী কাপড়ের অভাব মাকের্টগুলোতে। তবে অনেকে ভারতীয় কাপড়কে আবার দেশী বলেও চালিয়েছেন। ঈদ উপলে এবার বাজারে এসেছে বেশকিছু নতুন কোয়ালিটির থ্রি-পিস। যার বেশিরভাগই ভারতীয়। আর ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় সবার ওপরে ছিল ঝিলিক, আওয়ারা ও খুশি। এ আইটেমগুলোর চাহিদা বেশি থাকায় দামও ছিল চড়া। গত বছরের তুলনায় বাচ্চাদের নতুন নতুন পোশাকও মন কেড়েছে ক্রেতাদের। এরমধ্যেও ঝিলিক, টাপুর-টুপুর, ফুলকলি, আওয়ারা নামের পোশাক নিয়ে ছিল ক্রেতাদের বাড়তি আগ্রহ। জেলা-উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জের বাজারগুলোতেও ঈদের কাপড় চোপড় কেনার জন্য মহিলাদের ভিড়ই ছিল বেশি। ঢাকার পার্শ্ববর্তী সাভারের সিটি সেন্টার, উৎসব প্লাজা, কোরাইশী সুপার মাকের্ট, চৌরঙ্গী সুপার মার্কেট, হাসেম প্লাজা, শমসের প্লাজা, অন্ধকল্যাণ সংস্থা মার্কেটসহ বিভিন্ন বিপণি বিতানগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, ঈদ সামগ্রী ও কাপড় চোপড়ের ক্ষেত্রে ভারতীয় পণ্যই বিক্রি হচ্ছে বেশি। মাকের্টগুলোতে উপচেপড়া ভিড় লেগেই রয়েছে। এদিকে স্বর্ণের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে থাকায় সিটি গোল্ড, পাথরসেট জাতীয় ভারতীয় অলংকারের দিকে মেয়েদের আগ্রহ ছিল বেশি। আবার এর সাথে ম্যাচিং করে আকর্ষণীয়ভাবে সাজতে বিদেশী বিভিন্ন ধরনের জুতা-স্যান্ডেলের দোকানগুলোতেও ভিড় ছিল উল্লেখ করার মতো। সীমান্তপথে আসা ভারতীয় প্রসাধন সামগ্রীতেও ভরপুর বিপণি বিতানগুলো।
বিত্তবানদের ঈদ বাজার বিদেশী পণ্যে ঠাসা
ঈদ উপলক্ষে দু’ মাস আগে থেকেই বিদেশী বিভিন্ন পোশাক ও অলংকারে সাজানো হয় রাজধানীর গুলশান-বনানীর দোকানগুলো। ভারতীয় পোশাকের পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের হাল আমলের অনেক ফ্যাশনের তৈরি পোশাক থরে থরে সাজানো হয় শপিং মলগুলোতে। লাখ লাখ টাকা মূল্যের ওই পোশাক কেনাকাটা করেছেন বিত্তবানরা। পরিবার পরিজন নিয়ে শপিংয়ে আসেন তারা। যতই ঘনিয়ে আসছে ঈদ, ততই বাড়ছে এসব দোকানের বিকিকিনি। সময়ের সাথে সাথে ব্যাপক জমজমাট হয়ে ওঠে গুলশান, বনানী, উত্তরা, বারিধারার বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস। ঈদকে ঘিরে সাজসাজ রবে তৈরি হয় গুলশান, বনানীর শপিংমলগুলো। রোজার মাসখানেক আগে থেকেই শপিং মল ও ফ্যাশন হাউসগুলো তৈরি পোশাকের পসরা সাজিয়ে বসেছে। গুলশান ও বনানীর বড় ফ্যাশন হাউসগুলোর মধ্যে জারা ফ্যাশন, ভাসাবি, শপার্স ওয়ার্ল্ডসহ বিভিন্ন হাউসে ভারতীয় কাপড়ের প্রাধান্য বেশি দেখা গেছে। রাজধানীর বিত্তবান এলাকা বলে পরিচিত গুলশান-বনানীর ব্যবসায়ীদের মতে, বিত্তবানরা দুই লাখ টাকা থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত মূল্যের পোশাক কেনাকাটা করেছেন। ক্রেতাদের চাহিদার ভিত্তিতে এসব শপিং মলে সাজানো হয় বিভিন্ন দামি পোশাক ও গহনা। অভিজাত এসব শপিংমলগুলোতে শোভা পায় তিন লাখ টাকা দামের শাড়িও।
ভারতীয় শাড়ির আগ্রাসনে দেশী তাঁতশিল্প বিপর্যয়ের মুখে
ওদিকে পাবনা জেলা তাঁতী সমবায় সমিতির সভাপতি শাহজাহান আলী আশরাফী জানান, গত এক দশক ধরে সুতা, রঙ ও তাঁত উপকরণের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি এবং ভারতীয় শাড়ির আগ্রাসনে তাঁত শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এতে অনেক তাঁতী পুঁজি সংকটে পড়ে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে, এ পেশার সঙ্গে জড়িত লাধিক শ্রমিকও বেকার হয়ে পড়েছেন। বিলুপ্ত প্রায় দেশীয় এই তাঁতশিল্পকে তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে আন্তর্জাতিক মানের এবং সময় উপযোগী ডিজাইন প্রয়োজন বলে তিনি জানান। পাশাপাশি সীমান্ত চোরাচালান বন্ধ করা জরুরি।
তাঁত মালিক সমিতির নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিসহ আমদানিকৃত রঙ, সুতা ও তাঁত উপকরণের মূল্য বৃদ্ধিতে কাপড় উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে তাঁতীদের বেশি দামে কাপড় বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে ভারতের কাপড়ের সাথে প্রতিযোগিতায় তারা টিকতে পারছেন না।
ভারতীয় শাড়িতে সয়লাব বেনারসি পল্লী
ঈদের বাজারে এবার খুব একটা জমতে পারেনি রাজধানীর মিরপুরের বেনারসি পল্লীর দোকানগুলো। এ অবস্থায় তাদের এবারের ঈদ পসরায় ভারতীয় শাড়ির আধিক্যই আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি চোখে পড়েছে। দোকানিদের সঙ্গে কথা বলা জানা গেছে, এবারের ঈদের বেনারসি পল্লীর দোকানগুলোর প্রায় অর্ধেকই চলে গেছে ভারতীয় শাড়ির দখলে। শাড়ি তৈরির দেশী উপকরণ স্বল্পতা, অবকাঠামো, ডিজাইনার ও কারিগর সংকটসহ নানা সমস্যায় ঐতিহ্যের দেশী বেনারসি শিল্প মার খাওয়ায় ভারতীয় শাড়ী বাজার দখলে নিচ্ছে বলে জানালেন তারা।
ভারতীয় শাড়ীর মধ্যে নেট শাড়ী, গুপি, কোকিলা দির কাতান, রেম্বো, কোলাবেরি ইত্যাদির কদর বেশি।
দেশি শাড়ী সর্বনিম্ন ৫শ’ টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের আর ভারতীয় শাড়ী সর্বনিম্ন ৩ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া গেছে।
উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-ভারত বিভক্ত হওয়ার পর ভারতের বেনারস থেকে সাড়ে ৩শ’ মুসলিম তাঁতী পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে চলে আসেন। পূর্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও একাত্তরের স্বাধীনতার পর এদের বেশিরভাগ পরিবার মিরপুরে আবাস গড়ে তোলে। তাদের হাত ধরে ছোট ছোট তাঁতগুলো একসময় বিশাল বেনারসি পল্লী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মিরপুর দশ থেকে বার নম্বর হয়ে বাউনিয়া বেড়িবাঁধ পর্যন্ত এলাকা বেনারসি পল্লী হিসেবে পরিচিত। প্রায় এক লাখ মানুষ ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পে জড়িত থাকলেও সরকারি অব্যবস্থাপনা ও হালফ্যাশনের ভারতীয় শাড়ীর দাপটের কাছে ক্রমেই এই পল্লীর ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে।
এ পাতার অন্যান্য খবর
- বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে বাংলাদেশ
- অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারই কাম্য
- মিসরের সর্বোচ্চ দুই সামরিক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর
- জাতীয় শোক দিবস পালিত
- জিপিএতে মেডিকেলে ভর্তি কেন অবৈধ নয় : হাইকোর্ট
- অপশাসন থেকে জনগণকে মুক্ত করতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে : শিবির সভাপতি
- ১৫ আগস্ট আবদুল মালেকের ৪৩তম শাহাদাত বার্ষিকী
