॥ মুনতাসির রহমান॥
সেনাসমর্থিত সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে হোক বা অন্য কোনো কূটকৌশল অবলম্বন করে হোক আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করে। বিপুল বিজয়ের বিশালত্ব হারিয়ে গেছে সরকার পরিচালনার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় এসে। ব্যর্থতার গ্লানি এতোটাই বেশি যে, দেশের সাধারণ মানুষ সরকারের সফলতা ব্যর্থতাকে দাঁড়িপাল্লা দিয়ে আর মেপে দেখতে চাচ্ছে না। সকলের প্রশ্ন সরকার কবে বিদায় নেবে। যত তাড়াতাড়ি বিদায় হবে ততোই জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে। দেশের মানুষ এতোটা অতিষ্ঠ হতো না যদি সরকারের মধ্যে আরেকটি সরকারের আবির্ভাব না ঘটতো। সরকারের মধ্যে আরেকটি সরকারের আবির্ভাবের প্রশ্নটা এ জন্যই এসেছে যে মন্ত্রিপরিষদের ব্যর্থতা বা অযোগ্যতার কারণে। মন্ত্রিপরিষদ আছে অথচ তার কোনো ভূমিকা নেই। মন্ত্রিপরিষদ সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। বাস্তবায়ন হচ্ছে আরেক সরকারের সিদ্ধান্তে। সেই আরেক সরকার হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা মণ্ডলী। উপদেষ্টা নামধারী প্রধানমন্ত্রীর ৭ গুণধর শীর্ষকর্তা এতোটাই শক্তিধর যে তারা মন্ত্রী পরিষদের নাবালক সদস্যদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছেন। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে সরকার চালাচ্ছে কারা মন্ত্রীরা না উপাদষ্টারা? মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থাপনায় উপদেষ্টা গৌণ। মন্ত্রীরা সর্বময় ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার রাখেন। যেখানে প্রধানমন্ত্রী সর্বেসর্বা। কিন্তু আশ্চর্যজনক ঘটনা হলো বর্তমান সরকারের উপদেষ্টারাই যেন সর্বেসর্বা।
শেখ হাসিনা সরকার গঠনের পর একে একে ৭ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। এই গুণধর ৭ উপদেষ্টা হলেন জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী, জনপ্রশাসন এইচটি ইমাম, আন্তর্জাতিক বিষয়ক ড. গওহর রিজভী, অর্থ ড. মশিউর রহমান, স্বাস্থ্য মোদাচ্ছের আলী, শিক্ষা ড. আলাউদ্দীন এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী। উল্লিখিত ৭ উপদেষ্টার কেউই জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। কিন্তু মন্ত্রিপরিষদে যারা আছেন তাদের মধ্যে দু’জন বাদে বাকি সবাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। যেহেতু তারা নির্বাচিত প্রতিনিধি তাই তাদের জবাবদিহিতা আছে। তেমনি কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাও আছে। নেতৃত্ব কর্তৃত্বের ক্ষমতাও তাদের রয়েছে। সঠিক করুক আর বেঠিক করুক জনগণের কাছে জবাবদিহিতার বিধান রয়েছে। যেটা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু উপদেষ্টাদের বেলায় সেটা অনুপস্থিত। যদ্দুর জানা যায়, স্বাধীনতার ৪১ বছরে শেখ হাসিনা এই প্রথম অধিক সংখ্যক উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। ’৯৬ সালে যখন প্রধানমন্ত্রী হন তখনমাত্র তিনজন উপদেষ্টা নেন। তার মধ্যে একজন ছিলেন রাজনৈতিক নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। বাকি দুইজন ছিলেন আওয়ামী ঘরনার। বর্তমানে ৭ উপদেষ্টার কেউই রাজনৈতিক নেতা নন। সাবেক আমলা এবং আত্মীয়তার সুবাদে পুরস্কারস্বরূপ শেখ হাসিনা তাদের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সংবিধানে উপদেষ্টা নিয়োগের কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই। তবে সরকারের নির্বাহী প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী চাইলে উপদেষ্টা নিয়োগ দিতে পারেন রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য। তাদের প্রধান কাজ প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেয়া। কোনো পরামর্শ দেয়া ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাস্তবায়নের ক্ষমতা সংবিধান তাদের দেয়নি। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ৭ উপদেষ্টা সরকারের নীতিনির্ধারণী সকল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং তা বাস্তবায়নে মন্ত্রীসুলভ কর্মকাণ্ড এবং আচরণ করছেন।
দ্বন্দ্ব এখন প্রকট : সরকারের শেষ সময়ে এসে মন্ত্রীদের সঙ্গে উপদেষ্টাদের দ্বন্দ্ব এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। হাতে গোণা দুই চারজন দুর্বল মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী বাদে সকল মন্ত্রী ভীষণ ুব্ধ। তাদের বক্তব্য হলো উপদেষ্টাদের খবরদারির জন্য মন্ত্রণালয়ের কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। বিশেষ করে এইচটি ইমাম, তৌফিক-ই-ইলাহী এবং মোদাচ্ছের আলীর উপর বেশি ুব্ধ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা। মন্ত্রণালয়ের সচিবরা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর অধীন। কিন্তু উপদেষ্টারা সরাসরি সচিবদের নির্দেশ দিচ্ছেন বিভিন্ন কাজের। জানা গেছে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী গত সাড়ে তিন বছর মুখ বুজে সব সহ্য করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে এতোদিন মুখ খোলেননি। কিন্তু এখন তিনি মুখ খুলছেন। বিদ্যুৎ, গ্যাস নিয়ে উপদেষ্টার সঙ্গে লড়াই শুরু হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর একটি সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। উপদেষ্টা যেটা বলছেন প্রধানমন্ত্রী তাতেই সাড়া দিচ্ছেন। একই অবস্থা অন্য সবার বেলায়ও। ফলে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে জগাখিচুড়ি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
সচিবালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এবং উপদেষ্টা দ্বন্দ্বে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে আছে। ফাইল আটকে থাকার কারণে দলীয় সংসদ সদস্যরা বিপাকে পড়ছেন। তারা ফাইল ছাড়াতে কার কাছে যাবেন মন্ত্রী না উপদেষ্টার কাছে। এমন অবস্থায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন আমলারাও। জানা গেছে, মন্ত্রী-উপদেষ্টা দ্বন্দ্বের কুপ্রভাব পড়েছে শাসক দলের ভেতরেও। দলটির নেতাকর্মীরা বলছেন এমনিতে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকার ব্যর্থ। কোনো খাতেই আশার আলো নেই। এই ব্যর্থতার দায়ভার কে নেবেন মন্ত্রীরা নাকি উপদেষ্টারা? আগামী নির্বাচনের সময় তো উপদেষ্টাদের খুঁজেও পাওয়া যাবে না। জনগণের কাছে জবাবদিহি তো দলের নেতাকর্মী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের করতে হবে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই উপদেষ্টারাই সরকারকে ডোবাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় আছেন বিধায় টের পাচ্ছেন না। ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নির্বাচন করতে গেলে টের পাবেন কত ধানে কত চাল।
এদিকে সরকারের অংশীদারিত্বে থাকা জাতীয় পার্টির প্রধান জেনারেল এরশাদ ভীষণভাবে ুব্ধ উপদেষ্টাদের ওপর। তিনি অযোগ্য মন্ত্রীদের ওপরও ুব্ধ। তবে উপদেষ্টাদের উপর বেশি ুব্ধ হওয়ার মোক্ষম কারণটি হলো জাতীয় পার্টি থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো জেনারেল এরশাদকে আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা করার। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এ প্রস্তাবটি রাখেননি। এজন্য এরশাদ উপদেষ্টাদের নিয়ে বেশি সমালোচনা করছেন। অন্য দিকে শরিক ১৪ দলের নেতারাও উপদেষ্টাদের সীমাহীন খবরদারিতে অতিষ্ঠ। তারা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শুনেও না শোনার ভান করেন। তবে দলের একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলেছে, শেষ সময়ে এসে শেখ হাসিনা বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করছেন, কিন্তু সামগ্রীক পরিস্থিতি প্রতিকূলে চলে যাওয়ায় তিনি কিছু করতে পারছেন না। কিছু করতে না পারার প্রধান কারণ হলো উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে শেখ রেহানার প্রভাব বেশি। এখন একটা কিছু করতে গেলে দুই বোনের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। ফলে প্রধানমন্ত্রী উভয় সঙ্কটে পড়েছেন।
হাসিনার প্রস্তাবে এরশাদ নারাজ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যে প্রস্তাব বিরোধী দলের প্রতি রেখেছেন তাতে নাখোশ হয়েছেন জেনারেল এরশাদ। এরশাদের বক্তব্য হলো অন্তর্বর্তীকালীন বা কেয়ারটেকার সরকার গঠন কোনোটার প্রয়োজন নেই। আগামী নির্বাচন বর্তমান রাষ্ট্রপতির অধীনে হতে হবে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী এমন কথা আগে থেকেই বলে আসছেন। তিনি তার অবস্থান থেকে সরে এলে আগামীতে ক্ষমতায় যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ অন্তর্বর্তী বা কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে পরিস্থিতি বদলে যাবে। আর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে বিএনপি বা ১৮ দল কোনো অবস্থাতে নির্বাচনে অংশ নেবে না। বিএনপি নির্বাচনে না এলে সে ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি মহাজোট থেকে সরে গিয়ে এককভাবে নির্বাচন করবে। এককভাবে নির্বাচন করলে ক্ষমতা হাতে না পেলেও প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হবে। জাতীয় পার্টির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে এমন কৌশল নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যে করে হোক জামায়াত ও বিএনপিকে বাদ দিয়েই আগামী নির্বাচন করতে হবে। এই অবস্থান থেকে আওয়ামী লীগ সরে আসলে ক্ষতি তাদেরই বেশি হবে। দুই দলের এই গোপন আঁতাতের সঙ্গে উভয় দলের শীর্ষ নেতারা ছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা হঠাৎ করে লন্ডনে বসে আগামী নির্বাচন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে করতে বিএনপিকে অংশীদারিত্বের প্রস্তাব জেনারেল এরশাদ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। জানা গেছে, এ বিষয়টি নিয়ে দুই দলের মধ্যে নতুন করে ক্যাচাল শুরু হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এ অবস্থান থেকে সরে না এলে নির্বাচনের অনেক আগেই তারা মহাজোট থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। এমন হুমকি জাতীয় পার্টি থেকে দেয়া হচ্ছে।
