॥ আবুল ওয়াফী॥
সম্প্রতি লন্ডন সফরকালে বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্বাচনের সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে বিএনপিও যোগদান করতে পারে। বিবিসির হার্ডটকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার খুব বেহাল দশা হয়েছিল। তিনি কোনো প্রশ্নেরই ঠিকমত জবাব দিতে পারছিলেন না। এ নিবন্ধের আলোচ্য বিষয় যেহেতু সেটা নয় তাই সে প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় বাংলাদেশেও সেভাবে নির্বাচন হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে শেখ হাসিনা যা বলেছেন, এমন কোনো সরকারের কথা বাংলাদেশের সংবিধানে নেই। সুতরাং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হলে সেটা হবে অসাংবিধানিক সরকার। যে যুক্তিতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন যে, যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানে নেইÑ এটা একটা মৃত ইস্যু, এটা নিয়ে কথা বলে কোনো লাভ নেই; সেই একই যুক্তিতে বলতে হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারব্যবস্থাও সংবিধানে নেই তাই সেটা নিয়ে কথা বলারও কোনো যুক্তি নেই। এরপরও প্রধানমন্ত্রী বা আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে গলা ফাটাচ্ছেন কেন? তারা কি এটা নিয়ে জাতির সাথে প্রতারণা করছেন?
অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় বাংলাদেশেও সেভাবে নির্বাচন হবে। কথাটা খুবই সুন্দর। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশ যেমন ভারত, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, মালয়েশিয়াসহ যেসব দেশেই সংসদীয় ব্যবস্থা চালু আছে সেখানেই পার্লামেন্ট ভেঙে দেবার পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় অর্থাৎ যখন পার্লামেন্টের নির্বাচন হয় তখন কেউ পার্লামেন্ট মেম্বার থাকেন না। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘১২৩(৩) সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে (ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে।’ তখন সংসদ সদস্যগণ বহালতবিয়তে থেকে বেতন ভাতাসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি ভোগ করবেন আর অন্য প্রার্থীরা সাধারণ হিসেবে তাদের সাথে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এটা তো সমান মাঠ বা লেভেল প্লেইং ফিল্ড হলো না বরং অসম প্রতিযোগিতা।
এ ক্ষেত্রে নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবার প্রশ্নই ওঠে না। সংসদ সদস্য ক্ষমতায় বহাল থেকে প্রশাসনসহ সবকিছু তার নির্বাচনের পক্ষে ব্যবহার করবেন। আর ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য হলে তো কথাই নেই। তাহলে দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় বলেছেন, সেভাবে তো বাংলাদেশে নির্বাচন হচ্ছে না। প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রী জেনে শুনে এমন একটি অসত্য কথা (মিথ্যা শব্দটি অসংসদীয় বলে তা ব্যবহার করা হলো না) কেন বললেন। আওয়ামী অনেক মন্ত্রীও একই কথা বলে বেড়াচ্ছেন এবং বাংলাদেশের জনগণকে বিশ্বাস করাতে চাচ্ছেন যে, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেমন নির্বাচন হয় বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগ সরকার সেভাবেই নির্বাচন করাতে চাচ্ছে এতে দোষের কী আছে?
মজার কথা হলো আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা এবং আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবীর অনেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে বলছেন, তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা রাজনীতিকদের জন্য অসম্মান ও অপমানজনক। কেউ কেউ আরেক ডিগ্রি অগ্রসর হয়ে বলছেন, এটা অগণতান্ত্রিক এবং কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে এই ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ তারা বলতে চাচ্ছেন এ ব্যবস্থাটা অগণতান্ত্রিক ও অসভ্য। আওয়ামী লীগ যখন জামায়াতে ইসলামীকে সাথে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীন নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করলো তখন এ ব্যবস্থাটা কি গণতান্ত্রিক ছিল না অগণতান্ত্রিক ছিল, সভ্য ছিল না অসভ্য ছিল? যদি অগণতান্ত্রিক ও অসভ্য হয়ে থাকে তাহলে এজন্য আওয়ামী লীগ আন্দোলন করে অনেক মানুষের প্রাণনাশ ও দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করেছিল কেন? বিএনপি সরকারের অধীনে নির্বাচন করাটাই তো গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক হতো। আরেকটা প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তাহলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে ক্ষমতায় বসে। আওয়ামী লীগের তথা শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের জন্মদাতা হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার। জন্মদাতাকে আওয়ামী লীগ অস্বীকার করছে কেন? অবশ্য স্বার্থপরতা ও সুবিধাবাদী রাজনীতিতে চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে এটা আওয়ামী লীগের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। জন্মকাল থেকেই ক্ষমতা ও সুবিধাবাদের প্রয়োজনে আওয়ামী লীগ এমনটাই করে এসেছে।
ক্ষমতার রাজনীতির জন্য যখন প্রয়োজন হয়েছেÑ ‘পাকসার জমিন সাদবাদ’ ও ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলে রাজনীতি করে পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসেছে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তখনকার আওয়ামী লীগ নেতারা পাকিস্তানের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেছেন। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগান দিয়ে যখন আন্দোলনের দরকার ছিল তখন তাই করেছেন। আবার ‘জিন্নাহশালার পাকিস্তান আজিমপুরের গোরস্তান’ এই স্লোগানও দিয়েছেন। মুসলিম জনতার আস্থা লাভের জন্য দলের নাম প্রথমে দিয়েছিলেন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ কিন্তু সংখ্যালঘু ভোট ও প্রতিবেশী দেশের আনুকূল্য লাভসহ রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য ‘মুসলিম’ শব্দ বর্জন করে দলের নামকরণ করা হয় ‘আওয়ামী লীগ’। বাংলার প্রতি এত দরদ থাকা সত্ত্বেও পাক-আমলের আরবি ‘আওয়ামী’ শব্দ ছাড়া কোনো বাংলা শব্দ খুঁজে পায়নি দলটি।
সুবিধাবাদ ও ক্ষমতার রাজনীতির প্রয়োজনেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি মাত্র ১২ মিনিটে সংসদে আইন পাস করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করেছিল। গণতন্ত্রের কথা বলতে পাগল যে দল এবং যে দলের নেত্রী শেখ হাসিনাকে আখ্যা দেয়া হয়েছে ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ বলে সেই দলই গণতন্ত্রকে পার্লামেন্ট ভবনের মধ্যেই জবাই করেছিল। বাকশাল নাম ধারণ করেছিল এবং পরে বাকশাল ‘তালাক’ দিয়ে আবার আওয়ামী লীগ নামে সাচ্চা গণতান্ত্রিক দল হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী দলীয় সভানেত্রী, সংসদ নেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের টিকিট বিক্রয় বা সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত মনিটরিং থেকে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। দলীয় সকল অনুষ্ঠান ও সরকারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে প্রধানমন্ত্রীকেই প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করতে হচ্ছে। ব্রিজ, কালভার্ট, সেতু, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট, স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ভবনসহ যাবতীয় স্থাপনার উদ্বোধনেও প্রধানমন্ত্রী। উপরন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী একা বিদেশ সফর করে কুলোতে পারছেন না। তাই ‘বাঘ সম্মেলন’ থেকে শুরু করে অলিম্পিকের উদ্বোধনী ও সমাপনী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীকেই দৌড়াতে হচ্ছে এবং নিজের দেশে শান্তি না থাকলেও জাতিসংঘে গিয়ে বিশ্ববাসীকে শান্তির ফর্মুলা প্রদান করতে হচ্ছে। শেখ হাসিনার গণতন্ত্রের বদৌলতে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারে রাতদিন ২৪ ঘণ্টা বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের মন্ত্রীদের খবর আর সেই সাথে বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ড ও অবদান প্রচার করা হচ্ছে। প্রধান বিরোধী দল বা অন্য কোনো বিরোধী দলের কোনো খবর প্রচার করার প্রশ্নই ওঠে না। আওয়ামী লীগের গণতন্ত্র মানে ‘এক নেতা এক দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’। আর বিরোধী দলগুলো হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী!
জগৎবিখ্যাত পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ হাসিনা নাকি গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং অগণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা দখলের পথ চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছেন বলে প্রায়ই তার বক্তৃতায় বলে থাকেন। আবার এটাও বলেন যে, এর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানে নাকি তারা ফিরে গিয়েছেন। গণতন্ত্রে অবিশ্বাসী কম্যুনিস্টরাও ১৯৭২ সালের সংবিধানে প্রত্যাবর্তনের কথা বলে জনগণের সাথে প্রতারণা করে। মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিব দারুণ কম্যুনিস্ট বিরোধী ছিলেন যে কারণে মাওলানা ভাসানীকে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করতে হয়েছিল। শেখ মুজিব যেসব দলকে তার কাছেই ঘেঁষতে দিতেন না এবং বলতেন সাইনবোর্ড পাল্টিয়ে আসতে হবে। ১৯৭৩ সালের পর কম্যুনিস্টদের নিয়ে প্রথমে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট এবং তারও পরে বাকশাল গঠন করেন। এটাও ছিল ক্ষমতার জন্য সুবিধাবাদী রাজনীতি। যারা শেখ মুজিবের কট্টর সমালোচক ছিলেন যেমন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, তিনি এখন আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভার সবচাইতে প্রভাবশালী মন্ত্রী। তিনি এখন বঙ্গবন্ধু বলতে বেঁহুশ এবং আওয়ামী লীগ নেত্রীও তাকে ছাড়া কিছু বোঝেন না। সম্প্রতি এক লেখায় বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী মন্তব্য করেছেনÑ ‘৭২-এর পরের সংবাদপত্রের পাতা উল্টালে দেখা যাবে কত শতবার বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ভদ্র মহিলা ডুগডুগি বাজিয়েছেন, জুতো বানিয়েছেন।’ নীতি আদর্শের কোনো বালাই নেই। ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতায় থাকার জন্য যা কিছু করা দরকার চোখ বুজে আওয়ামী লীগ তাই করে থাকে এবং সেটাই আওয়ামী লীগের নীতি। মাদারীপুরের জাসদ নেতা শাজাহান খান, গণবাহিনী হিসেবে দুশ’র ওপর খুনের মামলার আসামি ছিলেন। তিনিও শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার মন্ত্রী।
আমরা শুরু করেছিলাম মিথ্যাচার, ধোঁকা, প্রতারণার রাজনীতি নিয়ে। তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিলের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের দোহাই দিয়েই শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ নেতারা সংবিধান বিরোধী ও অগণতান্ত্রিক বলে ব্যবস্থাটি বাতিল করেছেন বলে প্রচার করে থাকেন। এটাও তাদের অসত্য ভাষণ। প্রথমত এখন পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভাষণের লিখিত কপি প্রকাশিত হয়নি। এ নিবন্ধ লেখার দিন ২৫ আগস্ট ২০১২ পর্যন্ত রায় লেখা সম্পন্ন হয়নি। ১৮০ শব্দের সংক্ষিপ্ত আদেশে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করা হলেও বলা হয়েছে যে, আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীনে হতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান না করার জন্যেও এ আদেশে বলা হয়। এই সংক্ষিপ্ত আদেশে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করা হলো পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী আরো দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের জন্যেও তো পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই ব্যবস্থা নেয়া যেতো। কিন্তু তা না করে নিজেরা ক্ষমতায় থেকেই নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করলো আওয়ামী লীগ। এখানেও আওয়ামী লীগের সুবিধাবাদিতা ও স্বার্থপরতার রাজনীতিরই প্রতিফলন ঘটেছে। এটাও আওয়ামী লীগ করেছে সকল জনমত উপেক্ষা করে। আদালতের রায় সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। সম্ভবত ১৩ জনকে এমিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) হিসেবে মতামত দেয়ার জন্য আহ্বান করা হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে একজন বাদে সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মতামত দিয়েছিলেন।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৫টি ধারায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এই ধরনের দ্বিতীয় কোনো নজির আছে বলে মনে হয় না। অবশ্য বাংলাদেশে আছে। ৪র্থ সংশোধনীটি ছিল মূলত আরেকটি নতুন সংবিধান এবং সেটাও আওয়ামী লীগের অবদান। ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের খোল নলচে পাল্টিয়ে দেয়া হয়েছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীর আরো একটি বড় বৈশিষ্ট্য যে, সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশকে ৭(ক) ও ৭(খ) সংযোজনের মাধ্যমে একেবারে পবিত্র গ্রন্থের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। খোদ জাতীয় সংসদেরও ক্ষমতা এর মাধ্যমে খর্ব করা হয়েছে। সংবিধান একটি পরিবর্তনযোগ্য বা সংশোধনযোগ্য দলিল এবং সংবিধান কোনো আসমানি কিতাব নয়! জনগণ এবং জনগনের নির্বাচিত সংসদ চাইলে জাতীয় স্বার্থে সংবিধান সংশোধন করবে। অথচ এ সংশোধনীর মাধ্যমে জনগণের অধিকারও খর্ব করা হয়েছে।
পঞ্চদশ সংশোধনী আরেকটি সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি করেছে। সংসদ ভেঙে না দিয়ে নির্বাচনের যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সে কারণে বিদ্যমান সদস্য কেউই সংসদ নির্বাচন করতে পারবেন না। অনুচ্ছেদ ৬৬(২) এর (চ) অনুযায়ী ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবে না।’
অনুচ্ছেদ ৬৬(৩) এ বলা হয়েছে, ‘এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ সাধনকল্পে কোন ব্যক্তি কেবল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হইবার কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত বলিয়া গণ্য হইবেন না।’ এতে পরিষ্কার হলো যে, এখানে সংসদ সদস্যের কথা উল্লেখ না করায় সংসদ সদস্যের পদটি লাভজনক বলে গণ্য হবে এবং সে কারণেই নির্বাচনে প্রার্থী হবার যোগ্যতা হারাবে। সংবিধান সংশোধন করা ছাড়া আগামী নির্বাচনই করা যাবে না। সংবিধানকে উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার সরকার যদি গায়ের জোরে নির্বাচন করে তাতেও বিস্মিত হবার কিছু থাকবে না। সংবিধান লঙ্ঘন ও উপেক্ষা করার দৃষ্টান্ত ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ স্থাপন করেছে। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল পদত্যাগ করার দুই বছর পরও তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে। কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগপত্র গ্রহণ বা না করার কোনো বিধান সংবিধানে নেই। প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত অন্য যে কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট প্রদান করেন তাহলে তার পদ শূন্য হয়ে যাবে। বিগত ২৩ জুলাই সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেন পদত্যাগ পত্র প্রদান করলেও তা একমাস পর গ্রহণ করার গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানেও তানজিম আহমেদ সোহেলকে যেমন দফতরবিহীন মন্ত্রী দেখিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছিল, আবুলের ক্ষেত্রেও এক মাস ঝুলিয়ে রেখে একই কাণ্ড ঘটানো হয়েছে। কিছুদিন আগে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী তার পদ শূন্য হয়ে যায় এবং অন্য মন্ত্রীকে রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। পদত্যাগের একদিন পর তাকে দফতরবিহীন মন্ত্রী ঘোষণা করা হয় কোনো শপথ ছাড়াই। এ ক্ষেত্রেও সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে। এই হচ্ছে আওয়ামী লীগের সংবিধানের প্রতি আনুগত্য ও গণতন্ত্রের নমুনা।
ধরা যাক সংসদ না ভেঙে যদি নির্বাচন করা হয় তাহলে নির্বাচনের পর দেখা যাবে দেশে সংসদ সদস্যের সংখ্যা সাতশত হয়ে গিয়েছে। ক্ষমতাসীন সাড়ে তিনশত এবং নবনির্বাচিত সাড়ে তিনশত। মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নবনির্বাচিতরা শপথও নিতে পারবেন না। এমপি থাকা অবস্থায় সেই আসনেই নতুন একজনকে এমপি হিসেবে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
সম্প্রতি একটি খবরে জানানো হয়েছে যে, বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে কাজ করছে এবং তারা একটি রূপরেখা ঘোষণা করবে। তাদের আগের অবস্থান ছিল সরকারকেই এটা করতে হবে এবং সংসদে সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পাস করতে হবে। ছোট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে বিএনপিকে যোগদানের কথা বলে আওয়ামী লীগ যে ফাঁদ পেতেছে তা বিশ্বাস করা আদৌ ঠিক হবে না। সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে রাজি হলেই কেবল তা দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এর আগে কোনো সংলাপ বা সমঝোতার প্রশ্নই ওঠে না। দেশের মানুষ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় না। আওয়ামী লীগের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না এ ব্যাপারে দেশবাসীর মধ্যে কোনো বিভ্রান্তি নেই। কাজী রকিব উদ্দীনের নেতৃত্বে যে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে সেটাও যথাযথভাবে সংবিধান অনুযায়ী হয়নি। নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য কোনো আইনের বিধানাবলি তৈরি করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব পাঠিয়েছেন আর রাষ্ট্রপতি তদনুযায়ী একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করে দিয়েছেন। এই নির্বাচন কমিশন জাতীয় নির্বাচন আসার আগেই সরকারের দালালি শুরু করে দিয়েছে। বিগত ৫ আগস্ট এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারের উপস্থিতিতে একজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, জাতি পঞ্চদশ সংশোধনী মেনে নিয়েছে। নির্বাচনের জন্য কোনো নতুন আইন হবার দরকার নেই। সুতরাং সে অনুযায়ীই নির্বাচন হবে। অথচ কে না জানে দেশে আজকে সবচাইতে বড় প্রশ্ন আগামী নির্বাচন কিভাবে হবে তা নিয়ে এ ব্যাপারে দেশ দু’ভাগে বিভক্ত। আওয়ামী লীগ তাদের দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে চায়। দেশের সকল দল, সুশীল সমাজ ও সাধারণ কৃষক শ্রমিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নিরপেক্ষ ব্যবস্থার অধীন নির্বাচন চায়। আওয়ামী লীগের প্রচারণায় বিএনপি যদি ভুল করে আলোচনার পথে পা বাড়ায় সেটা হবে আত্মঘাতী। সরকার এটাকে বিএনপির দুর্বলতা হিসেবে নিবে এবং দেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে যে জনমত সৃষ্টি হয়েছে তা বিভ্রান্ত হবে। আওয়ামী লীগ একটা চরম সুবিধাবাদী দল এ কথা বিএনপিকে বুঝতে হবে। সুতরাং সংবিধান সংশোধন ছাড়া নির্বাচনের প্রশ্নে কোনো সমঝোতা নয়।
এ পাতার অন্যান্য খবর
- কঠোর আন্দোলন ছাড়া আর কোনো পথ নাই
- ইসলামী আন্দোলনের পথ ফুল বিছানো নয় : নাজির আহমদ
- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অচলাবস্থার জন্য ক্ষমতাসীনরাই দায়ী
- আ’লীগ সরকারের জনপ্রিয়তা কমছে॥ দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত ভারত
- ট্রাইব্যুনালের বিচারক জহির আহমেদের পদত্যাগ॥ ডিফেন্স টিমের উদ্বেগ
- রমনিই রিপাবলিকান প্রার্থী॥ ডেমোক্র্যাটের বারাক ওবামাই
- আজহারের গ্রেফতারে মকবুল আহমাদের নিন্দা ও প্রতিবাদ
- আসাম ও রাখাইন প্রদেশে মুসলিম নিধন বন্ধে মুসলিম বিশ্বকে এগিয়ে আসতে হবে : অধ্যাপক মুজিব
