সংবাদ শিরোনামঃ

সংবিধান সংশোধন ছাড়া কোনো সমঝোতা নয় ** কঠোর আন্দোলন ছাড়া আর কোনো পথ নাই ** ইসলামী আন্দোলনের পথ ফুল বিছানো নয় : নাজির আহমদ ** বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অচলাবস্থার জন্য ক্ষমতাসীনরাই দায়ী ** চাল নিয়ে মহা বিপাকে সরকার ** নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে সরকার ** বিরোধী দলের দাবি মেনে নির্বাচনে আসার সাহস নেই মতাসীনদের ** সংবাদপত্রের পাতা থেকে ** আমার শিক্ষক হুমায়ূন আহমেদ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ** দোয়া করবেন আল্লাহতায়ালা যেন জুলুম-নির্যাতন থেকে দেশবাসীকে মুক্তি দেন ** যোগাযোগ মন্ত্রী ৭ মাস আগে উদ্বোধন করে গেলেও যশোর-খুলনা সড়ক সংস্কারে অগ্রগতি নেই ** প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ করে দিনমজুর থেকে কোটিপতি ঝিনাইদহের আব্দুল করিম **

ঢাকা শুক্রবার ১৬ ভাদ্র ১৪১৯, ১২ শাওয়াল ১৪৩৩, ৩১ আগস্ট ২০১২

২৮ আগস্ট রাতে টিভির খবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ভাষণের অংশবিশেষ শুনছিলাম। ভাষণটি দিচ্ছিলেন তিনি ছাত্রলীগের ‘সোনার ছেলেদের’ উদ্দেশে। উপল ছিল প্রধানমন্ত্রীর পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী। রাষ্ট্রমতার কল্যাণে ছাত্রলীগের মতো একটি চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের সংগঠনের সমাবেশও আজকাল বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেদিনও হচ্ছিল (চীনের অর্থসাহায্যে নির্মিত আন্তর্জাতিক এ কেন্দ্রটির নামেও প্রধানমন্ত্রী অবশ্য নিজের পিতার নাম যুক্ত করেছেন!)। প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেয়ার জন্য মাইকের সামনে আসা মাত্র ‘জয় বাংলা’ আর ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে উন্মত্ত হয়ে উঠছিল ‘সোনার ছেলেরা’। প্রধানমন্ত্রীও কিছুণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে সে উন্মত্ততা উপভোগ করছিলেন। বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে বলেই মনে হলো, শেখ মুজিব নিজে কিন্তু এভাবে চাটুকারদের প্রশ্রয় দিতেন না। মওলানা ভাসানী হলে তো ‘খামোশ’ বলে ধমক দিয়েই বসিয়ে দিতেন। শেখ হাসিনার েেত্র জাতির শ্রেষ্ঠ নেতাদের প্রসঙ্গ টেনে আনাটা অবশ্য অনুচিত। ‘সোনার ছেলেদের’ স্লোগান এবং লম্ফ-ঝম্পের পর শুরু হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ। অনেক কথার মধ্যে মূলকথায় শেখ হাসিনা বলেছেন, তারা আর কাউকে ‘বাঁকা পথে’ মতা দখল করতে দেবেন না। কেউ যাতে ‘বাঁকা পথে’ মতা দখল করতে না পারে সেজন্যই তারা সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছেন। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, তারা নাকি জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখান। জনগণ চাইলে আওয়ামী লীগ আবারো মতায় আসবে। জনগণ না চাইলে তারা মতায় যেতে পারবেন না।

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী এমনভাবেই বলছিলেন যা শুনে মনে হচ্ছিল যে গণতন্ত্রের জন্য চিন্তা ও ভালোবাসায় রাতে তার ঘুম হয় না! অন্যদিকে দেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রমতা দখলের ব্যাপারে যারা খোঁজ-খবর রাখেন তারা কিন্তু বিশেষ করে ‘বাঁকা পথে’ মতা দখল করার কথাটা শুনে হাসি চেপে রাখতে পারেননি। এ ধরনের এমনকি আরো ব্যঙ্গাত্মক কথাও প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে শুনিয়েছেন। যেমন একবার বেগম খালেদা জিয়ার উদ্দেশে তিনি বলেছেন, তাকে কেউ অর্থাৎ কোনো গোষ্ঠী নাকি ‘চ্যাঙদোলা’ করে নিয়ে মতায় বসিয়ে দেবে না। সেবার প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছিলেন, খালেদা জিয়া নাকি সে রকম স্বপ্নই দেখছিলেন এবং কোনো গোষ্ঠীও নাকি সে রকম চেষ্টাই চালাচ্ছিল! বলা বাহুল্য, কথার ঢঙে ও সুরে যথেষ্ট ব্যঙ্গ থাকলেও কোনো উপলইে প্রধানমন্ত্রী মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারনেনি। কারণ, ‘চ্যাঙদোলা’ করে খালেদা জিয়াকে নয় বরং শেখ হাসিনাকেই মতায় বসানো হয়েছে। ‘বাঁকা পথে’ও শেখ হাসিনাই মতায় এসেছেন। নিজে ‘বাঁকা পথে’ মতায় এসেছেন এবং জেনারেল মইন উ’র মতো এর-ওর ঘাড়ে উঠেছেন বলেই প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই সংবিধান সংশোধনের জন্য উঠে-পড়ে লেগেছিলেন শেখ হাসিনা। সেটা তিনি করেও ছেড়েছেন। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তারা এমন কিছু অনুচ্ছেদও ঢুকিয়ে দিয়েছেন যা কারো পে ‘বাঁকা পথে’ যেমন মতায় আসা সম্ভব হবে না তেমনি সংবিধানের কোনো ধারা-উপধারা ও অনুচ্ছেদের সমালোচনাও করা যাবে না।  সমালোচনা করলে কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগেও বিচার করা হবে তাদেরÑ যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। প্রসঙ্গক্রমে বিশেষ করে ৭(ক) ও (খ) অনুচ্ছেদের উল্লেখ করা দরকার। যেমন ৭(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘(১) কোন ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোন অসাংবিধানিক পন্থায়Ñ (ক) এই সংবিধান বা ইহার কোন অনুচ্ছেদ রদ, রহিত বা বাতিল বা স্থগিত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে; কিংবা (খ) এই সংবিধান বা ইহার কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলেÑ তাহার এই কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে এবং ঐ ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হইবে।’ একই অনুচ্ছেদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি (১) দফায় বর্ণিতÑ (ক) কোন কার্য করিতে সহযোগিতা বা উস্কানি প্রদান করিলে; কিংবা (খ) কার্য অনুমোদন, মার্জনা, সমর্থন বা অনুসমর্থন করিলেÑ তাহার এইরূপ কার্যও একই অপরাধ হইবে।’ ৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই অনুচ্ছেদে বর্ণিত অপরাধে দোষী ব্যক্তি প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।’ ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানগুলোকে ‘সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায়’ সংশোধনেরও ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করেছেন মতাসীনরা।

আইন করে সংবিধানের বিরোধিতা নিষিদ্ধ করা হলেও পঞ্চদশ সংশোধনীর বিরুদ্ধে দল ও মত নির্বিশেষে সকলেই সোচ্চার হয়েছেন। সংবিধান প্রণেতা হিসেবে পরিচিত রাজনীতিক ও আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের মতো বিশিষ্টজনেরা এমনকি এ অভিযোগও করেছেন যে, ৭(ক) ও (খ) যুক্ত করে জনগণকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। গণভোট ছাড়া সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তনের কোনো সুযোগ না থাকলেও সে কাজটিই ‘বেআইনীভাবে’ করেছেন মতাসীনরা। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার পরিবর্তে এখানে শুধু একটি কথা জানিয়ে রাখা দরকার কথাটা হলো, বিতর্কিত ও নিন্দিত প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের দেয়া যে রায়ের আলোকে মতাসীনরা কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছেন সে একই রায়ে কিন্তু পরবর্তী দুটি নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে হতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছিল। উচ্চ আদালতের প্রতি মতাসীনরা এতটাই সম্মান দেখিয়েছেন যে, রায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকুকেই তারা পাশ কাটিয়ে গেছেন। কেয়ারটেকার সরকারের বিকল্প হিসেবে মতাসীনরা অবশ্য ‘অন্তর্বর্তী সরকারের’ ফর্মুলা হাজির করেছেন। সংশোধিত সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদের মূলকথা হলো, বিদ্যমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে সংসদকে অকার্যকর করা হবে। সংসদ বহাল থাকলেও এর কোনো অধিবেশন হতে পারবে না। এ সময়ে আগের মন্ত্রিসভা থাকবে কিন্তু রুটিন কাজের বাইরে কোনো কাজ করতে পারবে না। প্রশাসন ও পুলিশসহ সবকিছু চলে যাবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। সকল মতাও থাকবে নির্বাচন কমিশনের হাতে। সবশেষে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর সংসদের অধিবেশন বসবে এবং ওই সংসদ নতুন সংসদের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে। সরকারও তখনই গঠন করা হবে। প্রশ্ন উঠেছে, সবই যদি একইভাবে করবেন তাহলে আর কেয়ারটেকার সরকারের দোষ কোথায়? ‘অন্তর্বর্তী সরকারের’ নামে  মাঝখান দিয়ে সংসদের মেয়াদ যে ৯০ দিন কমে যাবে তার তিটাই বা পূরণ করা হবে কিভাবে? তাছাড়া ‘অন্তর্বর্তী সরকারের’ কারণে নতুন পর্যায়ে জটিলতার সৃষ্টি হবে। বিদ্যমান তথা পুরনো সংসদ ৯০ দিন আগেই দায়িত্ব পালন থেকে সরে আসতে সম্মত হতে চাইবে না। মতাসীনরাও যে ৯০ দিন আগে ‘নিরামিষভোজী সাধু-সন্ন্যাসী’ সাজতে চাইবেন তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়? তাছাড়া সংসদের মেয়াদ তথা পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে নির্বাচন করা হলেও সংবিধান অনুযায়ী তখনও সংসদ যেমন বহাল থাকবে তেমনি এর সদস্যরাও সকল সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার ভোগ করার অধিকারী থাকবেন। তেমন অবস্থায় বর্তমান এমপিদের অনেকেও যেহেতু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন সেহেতু তারা তাদের প্রাপ্য সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার এবং অধিকার প্রয়োগ করার চেষ্টা চালাবেন। প্রশাসন ও পুলিশও তাদের অধিকার অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বাধ্য থাকবে। এর ফলে নির্বাচনের প্রচারণা চালানোর সময় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে বর্তমান এমপিদের তুলনায় পিছিয়ে পড়বেন। তারা বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলবেনই। অর্থাৎ নামে যতো নির্দলীয় সরকারের প্রচারণাই চালানো হোক না কেন বাস্তবে নির্বাচনকালীন সরকার মতাসীন দলীয় সরকারের অবস্থানেই থেকে যাবে। তাদের কর্মকাণ্ডও চলবে এখনকার মতোই। পাশাপাশি থাকবেন এমপিরাও। পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত এমপিরা নিশ্চয়ই তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার ছেড়ে দিতে সম্মত হবেন না। তাছাড়া বিশ্বের কোনো দেশেই সংসদ বিলুপ্ত করার আগে নতুন সংসদ নির্বাচনের বিধান নেই। কিন্তু সব জেনেও শেখ হাসিনারা অসম্ভব একটি বিষয়ে দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের’ ফর্মুলা গেলানোর মাধ্যমে তারাই আবারও মতায় ফিরে আসতে চাচ্ছেন।

আবারো মতায় আসার জন্য বিকল্প অনেক পন্থা নেয়ারও চেষ্টা চালাচ্ছেন মতাসীনরা। এ ব্যাপাারে বারবার উঠে আসছে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নাম। বেশ কিছুদিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনায় বলা হচ্ছে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলো যদি আগামী নির্বাচনে অংশ না নেয় তাহলে এরশাদের জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়েই নির্বাচনে যাবে আওয়ামী লীগ। ইনু-মেনন ও দিলীপ বড়–য়া ধরনের নেতাদের নাম সর্বস্ব দলগুলো তো থাকবেই। এই প্রচারণার পেছনে অবশ্য ‘ঐতিহাসিক’ প্রোপট রয়েছে। ইতিহাসের কিছু বিশেষ অধ্যায়জুড়েও রয়েছে এরশাদ ও আওয়ামী লীগের সুসম্পর্ক। কারণ, শেখ মুজিবের মৃত্যুর তথা ১৯৭৫-পরবর্তী যুগে আওয়ামী লীগের বিকাশ ও উত্থান ঘটানোর ব্যাপারে রীতিমতো ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করেছিলেন জেনারেল এরশাদ। অন্তরালে অবশ্য লেনদেনের হিসাব ছিল। যেমন ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে এরশাদ মতা দখল করার পর শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি ‘আনহ্যাপি’ নন। ওদিকে দলটির নেতা ও শেখ হাসিনার ফুফাত ভাই শেখ সেলিমের পত্রিকা ‘বাংলার বাণী’ পরদিন, ২৫ মার্চই এরশাদকে অভিনন্দন জানিয়ে ‘অমানিশার ঘোর কেটে যাক’ শিরোনামে প্রথম পৃষ্ঠায় সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছিল। এতে গণতন্ত্রের প্রতি এরশাদের ‘শ্রদ্ধার’ জন্য ‘মোবারকবাদ’ জানিয়ে বলা হয়েছিল, দেশ ও জাতিকে ‘একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ তিনি (এরশাদ) দেখাতে পারবেন।’

বাস্তব েেত্র দু’জনে দু’জনার মতো করে ‘পথ’ অবশ্য উভয়ে উভয়কে দেখিয়েছিল। সামরিক শাসনের ৯ বছরে নানা কৌশলে এরশাদকে রা করেছে আওয়ামী লীগ। এদিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। গণতন্ত্র উদ্ধারের সে আন্দোলনে ছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৫ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী। ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এরশাদকে রার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ প্রতারণার পথে পা বাড়িয়েছিল। স্বৈরাচারের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের ‘জাতীয় বেঈমান’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে বলে ঘোষণা দেয়ার একদিন পরই শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ২১ মার্চ গভীর রাতে এমন এক সময়ে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, যখন চাইলেও বিএনপি ও সাত দলীয় জোটের পে নির্বাচনে অংশ নেয়া সম্ভব হতো না। কারণ, এরশাদ সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এর ফলে ১৫ দলে ভাঙন ঘটেছিল। অন্যদিকে সংসদে ৭৬টি আসনসহ আওয়ামী লীগ পেয়েছিল প্রধান বিরোধী দলের অবস্থান। শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী হয়েছিলেন। সংসদ থেকে পদত্যাগ না করে এরশাদকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে লেনেদেনের আরো একটি উদাহরণ। সেবার ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে আন্দোলন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যখন আওয়ামী লীগের এমপিরা পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতি এরশাদের পতন ঘটতো। জামায়াতের এমপিরা আগেই পদত্যাগ করেছিলেন, আওয়ামী লীগের এমপিরাও নেত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু আজ দেই, কাল দেই করে শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্রগুলো জমা দেননি। ফলে জেনারেল এরশাদ টিকে গিয়েছিলেন। তিনি এমনকি রাষ্ট্রপতি হিসেবে মতা খাটিয়ে সংসদের বিলুপ্তিও ঘটিয়েছিলেন।

এরশাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের লেনদেন চলে আসছে সেই থেকে। জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ১/১১-পরবর্তী সমঝোতাও হয়েছিল একই লেনদেনের হিসাবে। এবারের ঘটনাস্থল ছিল লন্ডন। ২০০৮ সালের জুলাই মাসে লন্ডন থেকে ফিরে আসার পর সমঝোতার ব্যাপারে ঘোষণা দিয়েছিলেন এরশাদ। সে সময় গুঞ্জনে শোনা গিয়েছিল, শেখ হাসিনার সঙ্গে লন্ডনে এরশাদের বৈঠক হয়েছে। ঢাকায় ফিরে এরশাদ বলেছিলেন, শেখ হাসিনাকে তিনি ‘বোন’ ডেকেছেন। সুতরাং ‘বোনের’ সঙ্গে ‘ভাইয়ের’ বৈঠক হয়ে থাকলে তাতে ‘দোষের’ কিছু থাকতে পারে না। রীতিমতো ঘোষণার ঢঙে এরশাদ আরো বলেছিলেন, মহাজোট বিজয়ী হলে তিনিই রাষ্ট্রপতি হবেন। এ শুধু তার ইচ্ছা নয়, শেখ হাসিনাও তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মেনে নিতে রাজি হয়েছেন। তাকে রাষ্ট্রপতি বানানোর শর্তেই জাতীয় পার্টি মহাজোটে থাকবে বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন এরশাদ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হাসতে হাসতে এরশাদ বলেছিলেন, তিনি রাষ্ট্রপতি হতে ‘প্রস্তুত’ আছেন! অঙ্গিকার রা না করা এবং প্রতারণার মতো আওয়ামী বৈশিষ্ট্যের কারণে এরশাদকে অবশ্য নিরাশ হতে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এরশাদের পে মহাজোট ছেড়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। আগামীতেও তিনি যে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকবেন সে ব্যাপারেও স্বয়ং এরশাদই অতি সম্প্রতি নতুন করে জানান দিয়েছেন। ক’দিন আগে পবিত্র রমজানের একেবারে শেষভাগে তিনি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি সফরে গিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধী দলের নেতা না হলেও ভারত সরকার এবার এশাদকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দেখিয়েছে। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তো বটেই, দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাসহ মতাধর অনেকেই এরশাদের সঙ্গে সাাৎ ও বৈঠক করেছেন। রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি অবশ্যই অস্বাভাবিক। প্রসঙ্গক্রমে সচেতন অনেকেরই জেনারেল মইন উ আহমেদের কথা মনে পড়ে গেছে। একজন চাকরিজীবী হলেও জেনারেল মইন উ’কেও এভাবেই সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো হয়েছিল। তাকে এমনকি ছয়টি ঘোড়াও উপহার দিয়েছিল ভারতীয়রা। মাত্র সেদিনের এ অভিজ্ঞতার পরিপ্রেেিতই এরশাদের দিল্লি সফর নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। এরশাদ নিজেও কিছু তাৎপর্যপূর্ণ কথা শুনিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন, ভারতের নেতারা তার নিজের এবং জাতীয় পার্টির প্রতি ‘পূর্ণ সমর্থন’ জানিয়েছেন। এরশাদ শুধু এটুকু বলতেই বাকি রেখেছেন যে, ভারতীয়রা তাকেই আগামীতে মতায় দেখতে চান। অর্থাৎ কোনো কারণে আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হলে জাতীয় পার্টিকেই মতায় বসাতে চান ভারতের নেতারা।

এ ধরনের বিভিন্ন কারণেই আগামী নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছে। আলোচনার প্রাধান্যে রয়েছে নির্বাচনকালীন সরকার। বস্তুত নির্বাচনকালীন এ সরকাই এখন প্রধান ইস্যু। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলো সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবির পাশাপাশি বিশেষ করে কেয়ারটেকার সরকার প্রশ্নে অনড় অবস্থান বজায় রেখেছে। মাঝখানে কেয়ারটেকার সরকারের বিকল্প হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকারকে নির্দলীয় হতে হবে। অর্থাৎ কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার ব্যাপারে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। আশা করা হয়েছিল, শেখ হাসিনার সরকার এই ছাড়ের সুযোগ নেবে এবং সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনবে। অন্যদিকে মতাসীনদের মনোভাবে সামান্য পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে না। তারা বরং মতার জোরে নিজেদের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। জুলাইয়ের শেষদিকে লন্ডন সফরকালে বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, নির্বাচনের সময় সরকারি ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে এবং তার নিজের নেতৃত্বে একটি ছোট আকারের মন্ত্রিসভা অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। বিএনপি ও জামায়াতসহসহ বিরোধী দলগুলো প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর বা তার সহকর্মীদর মুখে ওই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রসঙ্গে আর কোনো কথাই শোনা যায়নি। এখনো তারা বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করার জন্যই প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন। পর্যবেকরা মনে করেন, এমন কোনো ভাবনা অবশ্যই বোকামী হবে যে, সবকিছু কেবল আওয়ামী লীগের একার পরিকল্পনা অনুসারে ঘটবে। কারণ, জনগণ তো বটেই, রাষ্ট্রমতার রাজনীতিতে অন্য অনেকেও রয়েছে, যাদের নির্ধারক বা ‘ফ্যাক্টর’ বলা হয়। শুধু ভারতের কথা মনে রাখলে চলবে না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে। তাছাড়া এরশাদও তার কথায় যথেষ্টই ফাঁক রেখেছেন। দিল্লি থেকে আসার পর বহুকিছু বললেও এরশাদ কিন্তু বলেননি, আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হলে ভারত জাতীয় পার্টিকেই মতায় বসাতে চায়। তেমন কোনো আয়োজনই এরশাদ করে এসেছেন কিনা সে ব্যাপারেও শেখ হাসিনার উচিত এখনই খোঁজ-খবর করা। সবচেয়ে বেশি দরকার আসলে বিরোধী দলের দাবি মেনে নেয়া। নির্বাচন যাতে নির্দলীয় একটি সরকারের অধীনে হতে পারে তার ব্যবস্থা করা। এই দাবি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার এবং বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতায় আসার মধ্যে দেশ ও জাতির জন্য শুধু নয়, প্রধানমন্ত্রীর নিজের জন্যও মঙ্গল নিহিত রয়েছে। কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে, বিরোধী দলের দাবি মেনে নির্বাচনে আসার সাহস নেই মতাসীনদের।

অন্যান্য মিডিয়া bdnews24 RTNN Sheersha News barta24 Prothom Alo Daily Nayadiganta Jugantor Samakal Amardesh Kaler Kantho Daily Ittefaq Daily Inqilab Daily Sangram Daily Janakantha Amader Shomoy Bangladesh Pratidin Bhorerkagoj Daily Dinkal Manob Zamin Destiny Sangbad Deshbangla Daily Star New Age New Nation Bangladesh Today Financial Express Independent News Today Shaptahik 2000 Computer Jagat Computer Barta Budhbar Bangladesherkhela Holiday Bangladesh Monitor BBC Bangla Redio Tehran
homeabout usdeveloped by

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ মো. তাসনীম আলম।

মহীউদ্দীন আহমদ কর্তৃক জাতীয় মুদ্রণ ১০৯, ঋষিকেশ দাস রোড, ঢাকা - ১১০০ হতে মুদ্রিত ও ১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা - ১১০০ হতে প্রকাশিত। যোগাযোগের ঠিকানাঃ ৪২৩ এলিফেন্ট রোড, বড় মগবাজার, ঢাকা - ১২১৭। ফোনঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৯০৬৫, বার্তা - ৮৮ ০১৬৭০৮১৩২৭৬, সার্কুলেশন - ৮৮ ০১৫৫২৩৯৮১৯০, বিজ্ঞাপন - ৮৮ ০১১৯৯০৯০০৮৫, ফ্যাক্সঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৫৫৭১, ওয়েবসাইটঃ www.weeklysonarbangla.net, ইমেইলঃ weeklysonarbangla@yahoo.com