॥ জামশেদ মেহ্দী ॥
ভারত ও বাংলাদেশের একাধিক কর্তৃপক্ষীয় সূত্রে জানা গেছে যে আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য বর্তমান সরকার কিছু দিন আগে থেকেই আঁটঘাট বাঁধা শুরু করেছে। আগে থেকে প্রস্তুত করা প্ল্যান মোতাবেক নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য নরমে ও গরমে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হবে। কিছু কিছু পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই নেয়া হয়েছে। অবশিষ্ট পদক্ষেপসমূহ, যেগুলোকে বলা হচ্ছে মেজর স্টেপ, সেগুলো আগামী বছরের জুনের মধ্যেই সম্পন্ন করা হবে। ঐ সূত্রে আরো জানা গেছে যে আওয়ামী সরকার বিভিন্ন সরকারি এজেন্সির মাধ্যমে তাদের জনপ্রিয়তার পরিমাপ করেছে। এছাড়া দলীয় ও নিজস্ব মহলের মাধ্যমেও জনপ্রিয়তার পারদ মাপা হয়েছে। উত্তর ভারতের অত্যন্ত জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক ‘টাইমস অব ইন্ডিয়ার’ খবর মোতাবেক, ভারতও তার নিজস্ব বিভিন্ন সূত্রে বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা যাচাই করেছে।
দেশী ও বিদেশী সমস্ত সূত্রেরই জরিপের ফলাফল মোটামুটি এক রকম। সরকারের জনপ্রিয়তা ৬৮ থেকে ৭৩ শতাংশ কমে গেছে। যে হারে সরকারের জনপ্রিয়তা কমে গেছে সেই হারে বিরোধীদল বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। জনপ্রিয়তার এই সমস্ত ফলাফলই শেখ হাসিনাকে জানানো হয়েছে। বিভিন্ন এজেন্সির তরফ থেকে তাঁকে এমনও নাকি বলা হয়েছে যে সরকার যদি নির্বাচনে কারচুপি না করে তাহলে শেখ হাসিনার প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগ হেরে যাবে এবং বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন দল বা জোট বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।
সর্বাধিক চিন্তিত ভারত
আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এই সম্ভাব্য বিপর্যয়ের চিত্রে খোদ আওয়ামী লীগ যতটা না বিচলিত হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি বিচলিত হয়েছে ভারতের কংগ্রেস সরকার। কারণ গত নির্বাচনের সমঝোতা অনুযায়ী আওয়ামী লীগের নিকট থেকে ভারতের যা কিছু পাওয়ার কথা ছিল তার অনেক কিছুই ভারত পেয়েছে। সেই সাথে অনেক কিছু পাওয়ারও বাকি রয়েছে। সমঝোতা মোতাবেক যেসব বিষয় ভারতের পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ভারত এখনও পায়নি, সেসব বিষয় আওয়ামী সরকারের নিকট থেকে আদায় করতে না পারলে ভবিষ্যতে সেগুলো পাওয়ার আশা ভারতের জন্য ‘হনুজ দূর অস্ত’ হয়ে যাবে। আবার শেখ হাসিনার বর্তমান শাসনের মেয়াদের যে কটা দিন অবশিষ্ট আছে সেই কয়টি দিন অর্থাৎ ১৩ মাস বা ১৬ মাসের মধ্যে সেইগুলি পাওয়া সম্ভব নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে পঞ্চদশ সংশোধনী যদি অক্ষত থাকে এবং নির্বাচন যদি ঐ সংশোধনী মোতাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হয় তাহলে আগামী বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। আর যদি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হয় এবং বিরোধী দলের দাবি মোতাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্পিরিট অক্ষুণœ থাকে তাহলে আগামী বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। তাই বলছিলাম যে আগামী ১৩ বা ১৬ মাস সময়ের মধ্যে, বিশেষ করে দূর থেকে যখন নির্বাচনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তখন আর শেখ হাসিনার পক্ষে ভারতকে এক তরফাভাবে বড় কোনো কনসেশন দেয়া সম্ভব নয়। দিলে বাংলাদেশের জনমত সম্পূর্ণ বিগড়ে যাবে। যে কারণে সে সব পাওনা এখনও অনাদায়ী আছে সেগুলো যদি আদায় করতে হয় তাহলে আরেকটি মেয়াদের জন্য শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে হবে।
ভারত যা পেয়েছে
এবং যা পায়নি
বিগত ৫০ বছরে শেখ হাসিনার সরকার এক তরফা ভাবে ভারতকে যা কিছু দিয়েছে সেটির তালিকা বানালে অনেক দীর্ঘ হবে। তবে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন যে সবচেয়ে বড় যেটি পাওয়ার সেটি ভারত শেখ হাসিনার নিকট থেকে পেয়ে গেছে। সেটি হলো, উত্তর-পূর্ব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে দমন করা। এই একটি বিষয় নিয়ে বহু বছর ধরেই ভারতের খুব বড় মাথা ব্যথা ছিল। এশিয়ায় চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আঞ্চলিক পরাশক্তিরূপে উত্থিত হওয়ার পথেও ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল সাতবোনরূপে চিহ্নিত উত্তর-পূর্ব ভারতের ৭টি রাজ্যের সশস্ত্র স্বাধীনতার লড়াই। এসব রাজ্য হলোÑ ১. মেঘালয়, ২. মনিপুর, ৩. মিজোরাম, ৪. অরুণাচল, ৫. ত্রিপুরা, ৬. নাগাল্যান্ড ও ৭. আসাম।
এসব রাজ্যের স্বাধীনতা সংগ্রাম দমনের জন্য ভারতকে কম করে হলেও ৪ লক্ষ সৈন্য মোতায়েন রাখতে হতো। এবার শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর ঐ সব স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোর অনেক নেতাকে গ্রেফতার করে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে তীব্র স্বাধীনতা সংগ্রাম জারি ছিল আসামে। আসামের স্বাধীনতার লড়াই চলছিল ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম বা উলফার নেতৃত্বে। উলফার একচ্ছত্র নেতা ছিলেন পরেশ বড়–য়া। উলফা ও পরেশ বড়–য়া উভয়েই যেমন ছিলেন দুর্ধর্ষ তেমনি ছিলেন জনপ্রিয়। নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও বোড়ো সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়। অবশিষ্ট ছিল উলফা। একমাত্র পরেশ বড়ুয়া ছাড়া উলফার প্রেসিডেন্টসহ অবশিষ্ট প্রায় সমস্ত শীর্ষ নেতাকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়। এ ভাবে সেভেন সিস্টার্স বা সাত রাজ্যের স্বাধীনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামকে কঠোরভাবে দমনে শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার বিশাল ভূমিকা রাখে।
যে জিনিসটি দীর্ঘদিন ধরে চাওয়ার পরেও ভারত পায়নি সেটি হলো করিডোর। ভারত এবং আওয়ামী পন্থীদের ভাষায় ট্রানজিট। ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামক দু’টি রাষ্ট্রের জন্ম হওয়ার পর থেকেই ভারত করিডোরের আবদার করে যাচ্ছিল। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত কোনো সরকারই এই করিডোরের আবদার পূরণ করেনি। ১৯৯৬ সালে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ভারতকে করিডোর দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের জনমত প্রবলভাবে বিরোধী হওয়ায় সেই যাত্রায় শেখ হাসিনা ভারতকে করিডোর দেয়া থেকে বিরত থাকেন।
কিন্তু ২০০৯ সালে পরিস্থিতি পূর্বের তুলনায় আওয়ামী লীগ ও ভারতের জন্য অনেক অনুকূল হয়। শেখ হাসিনা ভারতকে বহুমুখী করিডোর দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যে রাস্তা চাচ্ছে সেটি হলো করিডোর। সেটি ট্র্রানজিট নয়। কারণ এক দেশ থেকে আরেক দেশের মধ্য দিয়ে তৃতীয় কোনো দেশে পৌঁছার রাস্তাকে বলা হয় ট্রানজিট। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ থেকে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে আবার ভারতেরই আগরতলা যাওয়াকে বলে করিডোর। বাংলাবান্ধা থেকে উত্তর বঙ্গের হাটিকুমরুল দিয়ে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আসাম মেঘালয় বা মনিপুর যাওয়ার রাস্তাকে বলে করিডোর।
এবার কেন পুরা করিডোর
দেয়া সম্ভব হয়নি
বস্তুত শেখ হাসিনার বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই ভারতকে বাংলাদেশ বহুমুখী করিডোর দিত। কেউ কেউ এমনও বলছেন যে ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ১৫টি করিডোর চেয়েছে। সে যাই হোক, বাংলাদেশ শুধু দিয়েই যাবে, বিনিময়ে কিছু পাবে না, এমন একটি পরিস্থিতি আওয়ামী সরকার মেনে নিলেও জনগণ তো সেটা মানবে না। তিস্তার পানি নিয়ে ভারতের সাথে বিরোধ দীর্ঘ দিনের। ছিটমহল বিনিময় সমস্যাও তো বাংলাদেশের জন্মের শুরু থেকেই সৃষ্টি হয়ে আছে। অথচ এগুলোর কোনো সমস্যারই সন্তোষজনক সমাধান ভারত দেয়নি। এগুলো না পেয়ে ভারতকে করিডোর দিলে গণআন্দোলন হবে, যে আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানেও রূপান্তরিত হতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় ভারতকে করিডোর দেয়া সম্ভব হয়নি।
আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা
পুনরুদ্ধারের প্ল্যান
আগেই বলেছি যে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা এখন মাত্র ২৫ থেকে ২৭ পার্সেন্ট। এই জনপ্রিয়তা নিয়ে বিপুল ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করেও নির্বাচনে পার পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। তাই ধসে যাওয়া জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের জন্য হাইডোজের ওষুধ দিতে চাচ্ছে আওয়ামী সরকার। ভারতের তরফ থেকে তারা চেষ্টা করছে তিস্তার পানি নিয়ে একটা কিছু সুরাহা করতে। মাইল্ড ডোজ হিসেবে ইতোমধ্যেই তারা রাজনৈতিক সুবিধার টোপ ফেলে স্বৈরাচারী এরশাদকে তাদের বড়শীতে গেঁথে ফেলেছে। এখন তিস্তার পানি। এই জায়গাতে এসে তারা ফাটা বাঁশে আটকে গেছে। এখান থেকে কিভাবে উত্তরণ ঘটবে সেটি কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ নিজেরাও জানে না। তবে শেখ হাসিনার ক্রমহ্রাসমান জনপ্রিয়তা ঠোকানো এবং সেটিকে আবার বৃদ্ধি করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে এবং ভারত সরকারের তরফ থেকে যুগপৎ প্রচেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কংগ্রেস সরকার ও আওয়ামী সরকার।
বিএনপি ও জামায়াতকে যুগপৎ শায়েস্তা করার জন্য বাংলাদেশ সরকার তার কর্মপন্থা ঠিক করে রেখেছে। সেই কর্মপন্থা মোতাবেক কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিএনপি ও জামায়াতের যে ১০ জন নেতার বিচার চলছে সেই বিচার এই বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই সম্পন্ন করা। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর যেকোনো পক্ষ যদি উচ্চআদালতে আপিল করে তাহলে সেই আপিলও মার্চ মাসের মধ্যেই শেষ করা। কোনো কারণে যদি মার্চের মধ্যে শেষ করা না যায় তাহলে জুন মাসের মধ্যেই সেটি শেষ করা। অন্যদিকে তারেক রহমানের গ্রেনেড হামলা এবং মানি লন্ডারিংয়ের মামলার বিচার মার্চের মধ্যে শেষ করা এবং জুন মাসের মধ্যে আপিল বিভাগের বিচার (যদি আপিল হয়) শেষ করা। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চ্যারিটেবল ট্রাস্টের যে মামলা হচ্ছে সেটিও জুনের মধ্যে শেষ করা।
এ ব্যাপারে সরকারের মহাপরিকল্পনা হচ্ছে এই যে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিও কোনো নমনীয়তা প্রদর্শন করা হবে না। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অযোগ্য ঘোষণা করার জন্য বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও আওয়ামী সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। অনুরূপভাবে তারেক জিয়াকে তো অযোগ্য ঘোষণা করা হবেই, অধিকন্তু তিনি দেশে ফিরলে তাকে কারাগারে ভরা হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শেষ করে জামায়াতের ৮ জন শীর্ষ নেতাকেও নির্বাচনের বাইরে রাখতে বাধ্য করা হবে। ঐ দিকে হরতালে বাস পোড়ানো এবং সচিবালয়ে ককটেল বিস্ফোরণের মামলায় বিএনপির অন্তত ৩৬ জন নেতাকে দ্রুত বিচার আদালতে শাস্তি দেয়া হবে এবং নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে।
এসব হলো আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা। তবে কথায় বলে All is well whose end is well. অর্থাৎ ‘সব ভালো যার শেষ ভালো তার’। কথায় আরো বলে যে Man proposes but God disposes.
মুসলমানরা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে, ‘মারে আল্লাহ রাখে কে, রাখে আল্লাহ মারে কে’।
jamshedmehdi15@gmail.com
এ পাতার অন্যান্য খবর
- হাসিনা-খালেদা সংলাপ সমঝোতা অসম্ভব
- দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে অবশ্যই হরতাল অবরোধের মতো কর্মসূচি আসবে
- দেশ কোন পথে চলেছে?
- বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি
- বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে : ডা. শফিক
- মিসরে ৭০ জেনারেল বাধ্যতামূলক অবসরে
- ট্রাইব্যুনালে রায়ের পর আপিলের সময় ৬০ এর পরিবর্তে ৩০ দিন করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী
- সংবিধান থেকে কুরআনের আয়াত তুলে দিয়ে সরকার মুসলমানদের ঈমানের ওপর আঘাত করেছে : অধ্যাপক মুজিব
