হাসিনা-খালেদা
॥ আবুল ওয়াফী॥
বর্তমান মহাজোট সরকারের মেয়াদ আর মাত্র ষোল মাস! দেখতে দেখতেই এ সময় চলে যাবে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কিভাবে অনুষ্ঠিত হবে এ নিয়ে যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে তা যে একটি কঠিন মতপার্থক্য তা অস্বীকার করার উপায় নেই। মহাজোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ নেত্রী অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী তার সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। আদালত সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বা অবৈধ বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুবই দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন কোনো অসাংবিধানিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন না। তার দলের অন্যান্য নেতাও বলছেন, বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিরোধী দল বিএনপিকেও সেই নির্বাচনেই আসতে হবে। ওদিকে বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালনের জন্য এক সময়ের স্বৈরশাসক এবং মহাজোটের দ্বিতীয় প্রধান শরিক দল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিকে তৈরি করা হচ্ছে। এরশাদ অনেকদিন থেকেই বলে আসছেন তার দল তিনশত আসনেই এককভাবে নির্বাচন করবে। আদালতের আংশিক রায় বাস্তবায়ন করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনের ব্যবস্থা বাতিল করে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থেকেই তাদের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। পরবর্তী দু’টি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার পক্ষে আদালত মতপ্রকাশ করলেও তা বাধ্যতামূলক নয় বলে ব্যাখ্যা করে তা উপেক্ষা করেছে আওয়ামী লীগ। আদালতের পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায় প্রকাশের সময় পর্যন্তও অপেক্ষা করেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তড়িঘড়ি পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়েছে। দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল একটি নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের পক্ষে। সাধারণ কৃষক-শ্রমিক জনতাও মনে করে দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতেই আওয়ামী লীগ এবং মহাজোটের শরিক এরশাদের জাতীয় পার্টি ছাড়া কেউই মূলত দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পক্ষে নয়।
পক্ষান্তরে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোট শুরু থেকেই বলে আসছে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। এজন্য বিরোধীদলীয় নেত্রী সভা-সমাবেশ বিক্ষোভ, মহাসমাবেশ, রোডমার্চ, এমনকি কয়েকটি হরতাল কর্মসূচিও পালন করেছেন। সরকারের বাধা-বিপত্তি, গ্রেফতার, নির্যাতন, হামলা-মামলা উপেক্ষা করে ঐসব কর্মসূচিতে লাখ লাখ মানুষ শরিক হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবির প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। দাতাগোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদারীদের পক্ষ থেকে সকল দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে জোরালো মতামত ব্যক্ত করা হয়েছে। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছেন কোনো দলীয় সরকারের অধীনে তার দল এবং ১৮ দলীয় জোট কোনো নির্বাচনে অংশ নিবে না। সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য করার জন্য জনমত গঠনের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মসূচিও বিরোধী দল অব্যাহত রেখেছে।
সম্প্রতি লন্ডন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি ছোট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে বলে মতামত ব্যক্ত করে তাতে বিএনপিকেও যোগদানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিরোধীদলীয় নেত্রী তাও প্রত্যাখ্যান করেছেন। শেখ হাসিনা বলছেন, তার সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে আর খালেদা জিয়া বলছেন, দলীয় সরকারের অধীনে তার দল ও ১৮ দলীয় জোট নির্বাচনে যাবে না এবং দেশে তেমন কোনো নির্বাচন হতেও দেবেন না। দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির এই বিপরীতমুখী অবস্থানের প্রেক্ষিতে অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তি সংলাপ ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট নিরসনের কথা বলছেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল-হকসহ অনেকে দুই নেত্রীকে এক টেবিলে বসিয়ে আলোচনার কথা বলেছেন। বিভিন্ন স্যাটেলাইট টিভির টক শোতে অনেক রাজনীতি বিশ্লেষক, বুদ্ধিজীবী বা সুশীল সমাজের বিশিষ্টজন সংলাপের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির তাকিদ দিয়েছেন। অনেক বড় বড় কলাম লেখক এ ব্যাপারে তাদের সুুচিন্তিত মতামত জানিয়ে বিস্তর লেখালেখি করছেন। কিন্তু এই দুই নেত্রী বা দুই রাজনীতিক প্রতিপক্ষকে যে আদৌ এক সাথে বসানো সম্ভব নয় তা এক শ’ভাগ গ্যারান্টি দিয়েই বলা যায়। আর এ জন্য শেখ হাসিনাকেও দোষারোপ করা যায় না। কারণ তিনি তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে এটা ভালোভাবেই বোঝেন যে, যে ব্যাঘ্রের পিঠে তিনি সওয়ার হয়েছেন সেখান থেকে নেমে আসা তার জন্য মোটেই নিরাপদ নয়। জাতীয় নির্বাচন তো দূরের কথা, তিনি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন দিতে পর্যন্ত সাহস করেননি। ৪ মিনিটে ঢাকাবাসীর দাবি-দাওয়া ছাড়াই সিটি কর্পোরেশন দুুই ভাগ করে দলীয় অনুগত আমলাদের প্রশাসক নিয়োগ করে কোনোমতে আপাতত ঢাকা সিটি নির্বাচনের হাত থেকে রেহাই পেয়েছেন।
বিগত ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দিনের সেনা সমর্থিত নির্বাচনের আগে জাতির কাছে দিনবদলের সনদ ঘোষণা করে পর্বত প্রমাণ প্রতিশ্রুতি শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন। তিন বছর ৮ মাস অতিবাহিত হবার পর তেমন কোনো প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়ন করতে পারেননি। ১০ টাকা কেজি চাল, বিনামূল্যে সার, ঘরে ঘরে চাকরি দিতে পারেননি। দুর্নীতি, সন্ত্রাস দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এসব কোনো ওয়াদাই রক্ষা করতে পারেননি। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, সরবরাহের নিশ্চয়তার পরিবর্তে দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি করে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছেন। প্রবৃদ্ধির হার নিম্নগামী, বিনিয়োগ নেই, আমদানি ব্যয় বাড়ছে, রফতানি কমছে, রিজার্ভ কমে আসছে। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে ৩৫ লাখ লোক পথে বসেছেন এবং হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে গিয়েছে। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে দলীয় লোকরা জড়িত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া তো দূরে থাক, তাদের নামটা পর্যন্ত প্রকাশ করতে পারেননি। সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় ডলারের দাম ছিল ৫৮-৫৯ টাকা আর বর্তমানে তা ৮৩ থেকে ৮৫ টাকায় উন্নীত হয়েছে। টেন্ডার ছাড়া কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনের ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা প্রতি মাসে গচ্চা দিতে হচ্ছে, ব্যাংক লোন নিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণ করায় বেসরকারি বিনিয়োগ মুখ থুবড়ে পড়ছে। নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ৯টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিয়ে দলীয় লোকদের কালো টাকা সাদা করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।
প্রাইমারি স্কুল, স্বাস্থ্য বিভাগ, খাদ্য মন্ত্রণালয়, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগসহ যাবতীয় সরকারি নিয়োগ দলীয়করণ ও চাকরি বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রকৃত চাকরিপ্রার্থী যোগ্যব্যক্তিদের বঞ্চিত করে সমাজে ভারসাম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্ধসহস্রাধিক সরকারি কর্মচারীকে ওএসডি, রাজনৈতিক বিবেচনায় যোগ্যকর্মচারীদের অপসারিত ও চাকরিচ্যুত করে এবং বাছবিচার ছাড়া নির্বিশেষে দলীয় অনুগতদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে দিয়ে জনপ্রশাসনকে অকার্যকর ও স্থবির করে ফেলা হয়েছে।
চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য ইত্যাদি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের প্রকাশ্য সংঘাত-বিবাদ, নিজেদের মধ্যে খুনাখুনি, হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি চলছে অব্যাহতভাবে। দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রলীগ নামধারীদের সন্ত্রাসের তাণ্ডবে শিক্ষাঙ্গনে চরম অশান্তি ও উত্তেজনা বিচার করছে। দলীয় সংগঠন সুবিধা করতে পারবে না বলে কোথাও ছাত্রসংসদ নির্বাচন পর্যন্ত দেয়া হচ্ছে না। অনির্বাচিত ভিসি দিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে দলবাজির তাণ্ডব চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি ঐতিহ্যবাহী সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাস ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেবার পরও কোনো ব্যবস্থা তাদের বিরুদ্ধে সরকার গ্রহণ করেনি। প্রধানমন্ত্রী নিজে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার নাটক করে জনগণকে ধোঁকা দিয়ে আবার নিজেই চাঁদাবাজ ও টেন্ডারবাজ সন্ত্রাসীদের এই প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন।
শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মনি কথায় কথায় বিদেশ ভ্রমণ করে বেড়ালেও কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যসহ সর্বত্র শ্রমবাজারে বাংলাদেশী শ্রমিকদের রিক্রুটমেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। চাকরি নবায়ন ও ভিসা বদলানোর সুযোগ বঞ্চিত হয়ে হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফেরত আসছে। লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিক চাকরি হারাচ্ছে। কোথাও নতুন চাকরির বাজার সরকার সৃষ্টি করতে পারেনি।
প্রতিবেশী ভারতের সাথে সুসম্পর্কের ঢাক-ঢোল পিটানো হলেও ভারত যা চাইছে সবকিছু দেবার পরও অদ্যাবধি ভারতের কাছ থেকে কোনো সুবিধাই সরকার আদায় করতে পারেনি। তিস্তার পানিচুক্তি হয়নি। টিপাইমুখে ভারতের বাঁধ নির্মাণ বন্ধ হয়নি। সীমান্তে পাখির মতো গুলি করে বাংলাদেশী হত্যা এবং এখনো নতুন নতুন কৌশলে বাংলাদেশী নিধন বন্ধ হয়নি। বেরুবাড়ি দেয়া হয়েছে ভারতকে ১৯৭৪ সালে কিন্তু এখনো অঙ্গরপোতা দহগ্রাম যাওয়ার জন্য একটি রাস্তা তিনবিঘা করিডোরের মালিকানা বাংলাদেশ পায়নি। ওখানে ভারতের পতাকা উড়ছে। ছিটমহল বিনিময় নিয়ে চুক্তি হয়েছে। কিন্তু এটা বাস্তবায়নের কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ এজন্য সংবিধান সংশোধন করার মতো দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন মনমোহন সরকারের নেই। এজন্য যত বৈঠকই হোক না কেন, তা বাস্তবায়ন এই মুহূর্তে অবাস্তব। দিল্লি সরকার বলবে আমরা তো দিতেই চাই। কিন্তু লোকসভায় এটা অনুমোদন ছাড়া তো সম্ভব নয়। ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশের অনেক লাভ হবেÑ এ কথা সরকার জনগণকে শুনিয়েছে। কার্যত ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা হাসিনা সরকার দিয়েই দিয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণ ছাড়াই। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ভারতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখা গেলেও বাংলাদেশের কোনো চ্যানেল ভারত দেখায় না। সম্প্রতি আমাদের কিছু পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়ার চুক্তি হলেও নানা অশুল্ক ও প্যারাট্যারিফের অজুহাতে এতেও বাংলাদেশের তেমন কোনো লাভ হয়নি। ভারতের সাথে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমার কোনো লক্ষণ নেই।
বাংলাভাষার রাষ্ট্র বাংলাদেশ এজন্য আমরা গর্ব করি। আসামের বাংলাভাষীদের ওপর নির্যাতন চলছে। ৫ লাখ বাংলাভাষী বাড়িঘর ছাড়া অমানবিক জীবন-যাপন করছে। তাদের হত্যা করা হচ্ছে। ট্রেন থেকে ছুড়ে ফেলে হত্যার নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বাংলাভাষার রাষ্ট্র বাংলাদেশের সরকারের পক্ষে আসামের বাংলাভাষীদের পক্ষে একটা কথাও বলার প্রয়োজন মনে করেনি। আসামে প্রচারণা চলছে Snakes are better than Benglies? ভারতের অনেক রাজনৈতিক দল ও মিডিয়া ভারতের বাংলাভাষী যারা বিভিন্ন রাজ্যে আছে বিশেষ করে যারা মুসলমান তারা বাংলাদেশ থেকে সেখানে গিয়েছে বলে মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু হাসিনা সরকার নিশ্চুপ। আরাকানের মুসলমানদের খতম করা হচ্ছে তাদের নাগরিকত্ব দেয়া হচ্ছে না। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার এসব ব্যাপারেও নির্লিপ্ত।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির জন্য বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। নিজ খরচে পদ্মা সেতু নির্মাণের দাম্ভিকতাপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে এখন আবার সেই বিশ্বব্যাংকের পেছনেই দৌড়াচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। বিশ্বব্যাংকের শর্ত পূরণে মন্ত্রী আবুল হোসেনের পদত্যাগ করানোর পর ‘দেশপ্রেমিক’ উপাধি দিয়ে শেখ হাসিনা দুর্নীতিকেই সমর্থন করেছেন। কিন্তু এতেও শেষ রক্ষা হয়নি। এখন প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের উপদেষ্টাসহ আরো কয়েক ব্যক্তিকে সরিয়ে দেবার কথা উঠেছে।
দেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে রক্তচোষা, সুদখোর ইত্যাদি আখ্যায়িত করে তার এবং গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে সরকার জেহাদ ঘোষণা করেছে। ড. ইউনূসকে কতভাবে হেনস্তা করা যায় তার সবই করা হচ্ছে এবং গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনাবিধি সংশোধন করে ব্যাংকটিকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে সরকার। দেশের বিবেকবান মানুষ এসব কর্মকাণ্ডের তীব্র বিরোধী জানা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা সরকার তার তোয়াক্কা করছে না। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চরিত্র হননের জন্যও সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে ও প্রচার চালানো হচ্ছে।
সরকার মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দেয়ার পরিবর্তে হত্যা, খুন, গুমের মহা উৎসব চলছে দেশে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার ঘটনা এবং শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যার কোনো সুরাহাই করতে পারেনি সরকার। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম হওয়ার মতো নৃশংস ও অমানবিক কর্মকাণ্ড বেড়ে গিয়েছে ব্যাপকভাবে।
আদালতগুলোতে ৩০ লাখ মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলে আছে। কোনো অগ্রগতি নেই। সরকার বিচার বিভাগ দলীয়করণের মাধ্যমে ভিন্নমতের লোকদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। সরকারি আইনজীবীরা মিথ্যা মামলা সাজিয়ে যুদ্ধাপরাধেদের বিচারের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে খতম করার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। বিচারাধীন বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা প্রতিদিন মিডিয়ায় লাগামহীন বক্তব্য দিয়ে চলছেন। সরকারের আচরণে মনে হয় একটি ইসলামী দলের নেতাদের যুদ্ধাপরাধী সাজিয়ে বিচার করাই যেন আজ বাংলাদেশের সবচাইতে বড় কাজ। জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম, জামায়াতের বর্তমান আমীর মাওলানা নিজামী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ যাদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন মিথ্যা অভিযোগ এনে গ্রেফতার করে কারাগারে আটক রেখেছে যেনতেন প্রকারে তাদের ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দিতে পারলেই যেন বাংলাদেশ সোনার বাংলা হয়ে যাবে এবং দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
উল্লিখিত সব ক্ষেত্রে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হবার পর এটাকেই একমাত্র মোক্ষম ইস্যু হিসেবে শেখ হাসিনার সরকার অবলম্বন করে অগ্রসর হচ্ছে। দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক এই ব্যবস্থা নিয়ে শেখ হাসিনা আগামীতে ভোটের রাজনীতিতে কতটা সুবিধা আদায় করতে পারবে তা ভবিষ্যতই বলে দিবে। জনগণের সামনে সংক্ষিপ্তভাবে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তাতে সরকার যে আগামীতে নির্বাচনে সুবিধা করতে পারবে না তা অনেকটাই নিশ্চিত। শেখ হাসিনা নিজেই তার দলের সংসদ সদস্যদের এক বৈঠকে আগামীতে ৭০টি আসন হারাবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এতে তিনি যে আস্থার সঙ্কটে ভুগছেন এবং অনেক হতাশ হয়ে পড়েছেন তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে তাদের বিভিন্ন স্বেচ্ছাচারী ও ফ্যাসিবাদী সিদ্ধান্তে।
হতাশা থেকেই ১৮ দলের শীর্ষ নেতাদের সেক্রেটারিয়েটে বোমা বিস্ফোরণ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে বাস পোড়ানোর মামলা দিয়েছে। হতাশা ও বিরোধী দলের জনসমর্থনের ভয়েই বিএনপি-জামায়াতকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে দিচ্ছে না। এই হতাশা থেকেই ১৮ দলের ১২ মার্চ ও ১১ জুনের কর্মসূচিতে লোক যাতে আসতে না পারে, তার জন্য সরকার নিজেই রাজধানী অবরোধ করে হরতালের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। বেপরোয়া শেখ হাসিনার সরকার আস্থাহীনতার কারণেই কর্মসূচি দিলে বিএনপির অফিসের সামনে পুলিশ মোতায়েন করে। জনগণের প্রতিবাদকে ভয় করছে বলেই শেখ হাসিনার গণতান্ত্রিক (?) সরকার জামায়াতের কেন্দ্রীয় অফিস, ঢাকা মহানরীর অফিসসহ সারা দেশে জামায়াত-শিবিরের দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধাদান করছে। কোথাও বৈঠক করলে তাদের ধরে প্রধানমন্ত্রীর প্রাণনাশের হুমকির কারণে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা অথবা পুলিশের কাজে বাধা দেয়ার জন্য হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে। শেখ হাসিনার সরকারের যদি এতই জনসমর্থন থাকবে তাহলে বিএনপি অথবা জামায়াত-শিবির একটি মিছিল-সভা করলেই সরকার এতটা ভীত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ লেলিয়ে দিচ্ছে কেন?
এ পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা দেশকে আজ যে জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন তাতে আগামীতে ক্ষমতায় আসা ছাড়া তার সামনে কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। তাই কোনো অবস্থাতেই খালেদা জিয়া বা বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে দেবার ঝুঁকি শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষে নেয়া সম্ভব নয়। যেহেতু নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে অনেকে মনে করছেন এবং বিভিন্ন জনমত জরিপ থেকেও আভাস পাওয়া যাচ্ছে শেখ হাসিনা এবং তার দলের সমর্থন মারাত্মকহারে হ্রাস পেয়েছে তাই খালেদা জিয়ার সাথে বসে বা সংলাপ করে তিনি ঝুঁকি নিতে যাবেন কেন? এর আগে তো আমেরিকা সফরকালে বলেই দিয়েছিলেন (খালেদা জিয়াকে লক্ষ্য করে) চোর-বাটপারদের সাথে আবার কিসের সংলাপ! সুতরাং আমাদের বড় বড় মাথাওয়ালা বিজ্ঞ ব্যক্তি দুই নেত্রী বা দুই রাজনীতিক শক্তিকে এক সাথে বসিয়ে সংলাপ সমঝোতার মাধ্যমে সঙ্কট উত্তরণের যে স্বপ্ন দেখেন তা নিতান্তই স্বপ্নবিলাস। আর খালেদা জিয়া তো খুব ভালো করেই জানেন, আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিস্ট দলের অধীনে নির্বাচনে যাওয়াটা হবে আত্মহত্যার শামিল। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা-মঈনুদ্দীনের আঁতাতের নির্বাচনে অংশ নিয়ে তার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা ভোলার নয়। কাজী রকিবুদ্দীনের নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই আওয়ামী লীগের দালালি শুরু করে দিয়েছে। গত ৫ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে একজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, জাতি পঞ্চদশ সংশোধনী মেনে নিয়েছে। সুতরাং নির্বাচনের জন্য কোনো নতুন আইনের দরকার নেই। অথচ গোটা দেশের মানুষের ৯০% মনে করেন দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না। খালেদা জিয়া বা বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছেন এবং আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলে যে ঘোষণা দিয়েছেন এজন্য খালেদা জিয়াকেও দোষারোপ করার কোনো যুক্তি নেই। দুই পক্ষ শক্ত বিপরীত অবস্থানে আছে। ফলে আন্তর্জাতিক মহলও ২০০৬ সালের মতো সঙ্ঘাতের আশঙ্কা প্রকাশ করছে। খালেদা-হাসিনা সংলাপ-সমঝোতার আশা করে যারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণ হবে বলে মনে করছেন তারা অবশেষে হতাশ হবেন। সব চাইতে বড় কথা হলো আওয়ামী লীগ সঙ্কট তৈরি করতে পারে কিন্তু সঙ্কট উত্তরণ করতে জানে না। ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন জারি করে ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাজনৈতিক সাংবিধানিক সঙ্কট সৃষ্টি আওয়ামী লীগই করে বাংলাদেশের গণতন্ত্র বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিল। এবারও একরোখা নেত্রী শেখ হাসিনা সবার পরামর্শ এমনকি আদালতের রায়কেও উপেক্ষা করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে আরেকটি বড় সঙ্কট তৈরি করেছেন। ১৯৭৫ সালে গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় শাসন কায়েমের চাইতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও উন্নয়নের ধারা শক্তিশালী হচ্ছিলো সেই ব্যবস্থা বাতিল করা কোনো অংশেই ছোট সঙ্কট নয়। এহেন প্রেক্ষাপটে খালেদা-হাসিনা সংলাপ-সমঝোতা যে আদৌ সম্ভব নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অতএব সংঘাত অনিবার্য!
এ পাতার অন্যান্য খবর
- বিএনপি ও জামায়াতকে নির্বাচনের বাইরে রাখার আওয়ামী সরকারের গভীর ষড়যন্ত্র
- দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে অবশ্যই হরতাল অবরোধের মতো কর্মসূচি আসবে
- দেশ কোন পথে চলেছে?
- বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি
- বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে : ডা. শফিক
- মিসরে ৭০ জেনারেল বাধ্যতামূলক অবসরে
- ট্রাইব্যুনালে রায়ের পর আপিলের সময় ৬০ এর পরিবর্তে ৩০ দিন করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী
- সংবিধান থেকে কুরআনের আয়াত তুলে দিয়ে সরকার মুসলমানদের ঈমানের ওপর আঘাত করেছে : অধ্যাপক মুজিব
