॥ মুনতাসির রহমান॥
সরকার কিভাবে চলছে বা আগামীতে চলবে এটা মুখ্য বিষয় নয়, এই মুহূর্তে মুখ্য বিষয় হলো আওয়ামী লীগ নামক দলটিকে টিকিয়ে রাখা যাবে কি না। নির্বাচন যতই কাছে আসছে ততই দলের অস্তিত্ব সঙ্কট আরো প্রকট হচ্ছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এতটাই অগোছালো যে, তারা স্থির কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন এক কথা আর তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা বলেন অন্য কথা। কারো কথার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে এমনটাই জানালেন তারা। তারা বলেছেন, গত সাড়ে তিন বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী যাদের কাছ থেকে বুদ্ধি পরামর্শ নিতেন তারা অবস্থা বেগতিক দেখে ক্রমান্বয়ে দূরে সরে যাচ্ছেন। নির্বাচন যত কাছে আসতে থাকবে তারা ততই দূরে যাবেন। আগামী নির্বাচনে জয়ী হতে হলে করণীয় কী এমন কোনো সঠিক পন্থা প্রধানমন্ত্রীকে তারা দিতে পারছেন না। অতীতে যারা এ ব্যাপারে শেখ হাসিনাকে সঠিক পরামর্শ দিয়েছেন তাদের দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। পদ্মা সেতু নিয়ে সব শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দলের মধ্য থেকে কথা উঠেছে তাকে সরিয়ে দিতে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর হাত-পায়ের বন্ধন এতটাই শক্ত যে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েও তা কার্যকর করতে পারছেন না। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সরকারকে আরো নাজুক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। দেশের ব্যাংক একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছেন আওয়ামী ঘরানার অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান। অর্থমন্ত্রী হলেন আধা আওয়ামী লীগার আবুল মাল আবদুল মুহিত। সরকারের শেষ বেলায় এসে ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারির দায় এই দুই ব্যক্তি এড়িয়ে যেতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের ক্ষোভ হলো শেখ হাসিনা জেনেশুনে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতে অদলীয় লোকদের বসিয়েছেন। যে কারণে সরকার পরিচালনায় এত ব্যর্থতা। সরকারের ব্যর্থতার কারণে দলের মধ্যে সঙ্কট দেখা দিয়েছে। দলকে যারা ক্ষমতায় এনেছে তাদের কোনো খবর নেই। তাদের মতে, সরকার তো চলছে। বিরোধী দল আন্দোলনে এতটাই দুর্বল যে, সরকারকে কোনোভাবেই ক্ষমতা থেকে নামাতে পারবে না। ক্ষমতার মেয়াদ হয়তো কাঁটায় কাঁটায় পূরণ হয়ে যাবে। কিন্তু ক্ষমতা শেষে আগামী নির্বাচনে কী হবে? নির্বাচন করবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকরা। তারা হতাশাগ্রস্ত ও ুব্ধ। দল ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা মূলত অদলীয়। শীর্ষ নেতৃত্ব কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দল বা রাষ্ট্র পরিচালনায় গঠনমূলক কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। বিশ্বব্যাংকের চাপে সরকার আরেক দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে অথচ বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের টাকা আনতে পারছে না। এসব বিষয় নিয়ে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
জাপাকে ধরে রাখতে নানা কৌশল
জাতীয় পার্টিকে নিয়ে মহাজোট। এই মহাজোটে আওয়ামী লীগ ছাড়াও ১৪টি দল রয়েছে। যে দলগুলো মূলত বামপন্থী। কিন্তু আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের কাছে জাতীয় পার্টির গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে ছাড়া আগামী নির্বাচনে জামায়াত-বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট অংশ নেবে না। সে ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে না গেলে নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। আওয়ামী লীগ এটা ভেবে জাতীয় পার্টিকে ধরে রাখতে অর্থাৎ নির্বাচনে অংশ নেয়াতে উঠেপড়ে লেগেছে। যদিও দলটির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদ এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে ইতোমধ্যে দুই শ’ আসনে প্রার্থীও ঠিক করা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে দলীয় সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও সম্প্রতি এরশাদ ভারত সফর করে দেশে ফেরার পর দলীয় পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। জাতীয় পার্টির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, দলের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে যেতে নারাজ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো একাধিকবার বলেছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর ফর্মুলা অনুযায়ী জাতীয় সংসদ বহাল রেখে সরকারের ক্ষমতার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার তিন মাস আগে নির্বাচন হবে; সেখানে শেখ হাসিনা স্বপদে বহাল থাকবেন। তার এ ফর্মুলায় জেনারেল এরশাদ রাজি হয়েই তিনি মহাজোট থেকে পদত্যাগ করার কথা বলেছেন। জামায়াত-বিএনপি নির্বাচনে না গেলে সংসদে জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দলে থাকবে এবং এরশাদ বিরোধী দলের নেতা হবেন। কিন্তু এই সাজানো আয়োজন ওলট-পালট হয়ে গেছে। সূত্র জানায়, জাতীয় পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা কাজী জাফর আহমেদ, বেগম রওশন এরশাদ, মহাসচিব রুহুল আমীন হাওলাদারসহ একটি বড় অংশ কোনো অবস্থাতেই আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। তাদের বক্তব্য হলো, বিএনপি নির্বাচনে না গেলে তারাও নির্বাচনে যাবেন না। কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে বিএনপির আন্দোলনে শরিক হতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের অংশীদারিত্বে থেকে জাতীয় পার্টির অনেক দুর্নাম হয়েছে। অনেকে জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের বি টিম বলতে শুরু করেছে। এত বড় মন্ত্রিপরিষদে একজনমাত্র মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। গত সাড়ে তিন বছরে মন্ত্রী উপদেষ্টাদের দুর্নীতির ভাগিদার জাতীয় পার্টি নেবে কেন? আগামী নির্বাচনে জয়ী হতে পারবে না বলে দলীয় সরকারের অধীনে ভোটারবিহীন, অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে জাপাকে বিরোধী দলে বসাতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগ। তাদের এই পাতানো ফাঁদে যাওয়া ঠিক হবে না। সূত্র আরো জানায়, জেনারেল এরশাদ ভারত সফর শেষে দেশে ফেরার পর কাজী জাফরসহ দলের নীতিনির্ধারকরা তার সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে জানিয়েছেন। এরশাদ তাদের জানিয়েছেন, নির্বাচনের এখনও অনেক সময় আছে। দলীয় প্রস্ততি নিতে হবে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় সেটা দেখে পরে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। তবে জাতীয় পার্টির আওয়ামী সমর্থিত অংশ জিএম কাদের, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দন বাবলুরা বিএনপি বলয়ে ঘেঁষতে রাজি নন। তাদের বক্তব্য হলো দলের নেতাকর্মীরা চাইলে মহাজোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তাই বলে কোনো অবস্থাতে বিএনপির সঙ্গে যাওয়া যাবে না।
জাতীয় পার্টির এ অবস্থান সম্পর্কে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, জেনারেল এরশাদ নিজেই কেয়ারটেকার সরকারের বিপক্ষে। আর বিএনপি তো কেয়ারটেকার সরকার নিয়ে আন্দোলন করছে। কাজী জাফরসহ কয়েকজন নেতা বিএনপির জোটে যেতে চাচ্ছেন বলে আমরা খবর পেয়েছি। শেষ মুহূর্তে এরশাদের ভোল পাল্টালে ভুল করবেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একজন দ্বিতীয় সারির নেতা জানান, পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে জাতীয় পার্টিকে ধরে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে। আমরা শুনেছি প্রধানমন্ত্রী নিজেই সার্বক্ষণিকভাবে জেনারেল এরশাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ রেখে চলেছেন। আগামীতে নির্বাচন করতে গেলে এরশাদকে ছাড় দিয়ে হলেও ধরে রাখতে হবে।
শীর্ষ নেতৃত্বে হতাশা
শেখ হাসিনা সরকারের প্রধানমন্ত্রী আবার দলের সভানেত্রী। দুই জায়গাতে তিনি প্রধান। প্রধান হিসেবে সর্বময় ক্ষমতা তার হাতে। গত সাড়ে তিন বছরে তার ৭ উপদেষ্টাদের নিয়ে সরকার চালাতে যেয়ে হোঁচট খেয়েছেন। অন্তত ডজনখানের মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু কোনো অভিযোগকে তিনি পাত্তা দেননি। শুধু মন্ত্রী বা উপদেষ্টা নয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা অতীতেও উঠেছে। কিন্তু বর্তমান সরকারের মতো এত ঢালাও অভিযোগ আগে কখনো ওঠেনি। সাম্প্রতিক সময়ে সোনালী ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা বিরল। অবৈধভাবে হলমার্ককে ঋণ পাইয়ে দেয়ার ঘটনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা গোপালগঞ্জের মোদাচ্ছের আলীর জড়িত থাকার কথা শোনা যাচ্ছে। শেখ হাসিনার ৭ উপদেষ্টার মধ্যে ৪ জনের বিরুদ্ধে সরাসরি নানা অভিযোগ উঠলো। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীদের মন্তব্য হলো : প্রধানমন্ত্রীর প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও অদূরদর্শিতার ফলে সরকারের মধ্যে বেহাল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এত দুর্নামের পরও উপদেষ্টাদের সরাতে পারলেন না। যেখানে এত বড় মন্ত্রিপরিষদ সেখানে ৭ জন উপদেষ্টার প্রয়োজনটা কি? তার প্রতিহিংসাপরায়ণতার স্বীকার হলেন দলের ত্যাগী নেতারা। এত বড় ভুলের মাশুল আগামী নির্বাচনে দিতে হবে। তবে শোনা যাচ্ছে শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচন নিয়ে হতাশায় ভুগছেন। তার মূল লক্ষ্য যে কোনোভাবে হোক আগামীতে ক্ষমতায় আসতে হবে। ক্ষমতায় আসার টার্গেট নিয়ে হতাশার মধ্যেই সামনে এগুচ্ছেন। এরশাদ হাতছাড়া হলে তার সকল কৌশল ভণ্ডুল হয়ে যাবে।
এ পাতার অন্যান্য খবর
- সরকারের অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক আচরণ সহ্য করা হবে না : শিবির সেক্রেটারি জেনারেল
- ইউরোপে মুসলিমরা বর্ণবৈষম্যের শিকার
- বিচারক অপসারণে সংসদের মতা চান সরকারদলীয় এমপিরা
- ছাত্রদলের সভাপতি জুয়েল সম্পাদক হাবিব
- রেলের ভাড়া ৫০ ভাগ বৃদ্ধির অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে জামায়াতের প্রতিবাদ
- কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে সরকার নিজেরাই মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত : মাওলানা আব্দুল হালিম
