সংবাদ শিরোনামঃ

বিএনপি ও জামায়াতকে নির্বাচনের বাইরে রাখার আওয়ামী সরকারের গভীর ষড়যন্ত্র ** হাসিনা-খালেদা সংলাপ সমঝোতা অসম্ভব ** দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে অবশ্যই হরতাল অবরোধের মতো কর্মসূচি আসবে ** দেশ কোন পথে চলেছে? ** দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে নারাজ জাপার একটি অংশ॥ আ’লীগে হতাশা ** সরকারের অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক আচরণ সহ্য করা হবে না : শিবির সেক্রেটারি জেনারেল ** নির্বাচন হতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ** বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের সর্বাত্মক প্রস্তুতি ** শ্রেষ্ঠ ব্যাংকের মর্যাদা অুণœ রাখতে হলে মানব সম্পদকে আরও যোগ্যতর করে গড়ে তুলতে হবে : আবদুল মান্নান ** জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ মৌলিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন ** কীর্তনখোলা নদীর আকস্মিক ভাঙনে চরকাউয়া ফেরিঘাটসহ বিলীন হয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা **

ঢাকা শুক্রবার ২৩ ভাদ্র ১৪১৯, ১৯ শাওয়াল ১৪৩৩, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১২

বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতীয়দের অবারও ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। রাজনীতিকদের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমগুলোও বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে পাড়া মাতিয়ে চলেছে। ওদিকে যথারীতি জোর তৎপরতা চালাচ্ছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তাদের কৌশলও আবার যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক। বাংলাদেশের তথা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনীতি ও মতার পালাবদলের মতো অত্যন্ত গুরুতর বিষয় সংক্রান্ত কোনো রিপোর্ট যেখানে গোপন রাখার কথা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সেখানে সংবাদ মাধ্যমকে দিয়ে তার ব্যাপক প্রচার করাচ্ছে। কথার পিঠে কথা বাড়িয়ে চলেছে বিশেষ করে সংবাদ মাধ্যম। কখনো খবরের আড়ালে কখনো আবার জনমতের নামে তারা বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণাকে সর্বাত্মক করছে। এ সংক্রান্ত সর্বশেষ কিছু তথ্যের উল্লেখ করার আগে খোদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের দিকে দৃষ্টি ফেরানো দরকার।  এ ব্যাপারে বেশিজনকে ধরে টানাটানি করার পরিবর্তে সাবেক স্বৈরশাসক ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাম্প্রতিক ভারত সফর প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে। পবিত্র রমজানের শেষ দশদিনে ধর্মপরায়ণ মুসলানরা যখন এতেকাফে নিয়োজিত থাকেন, সামর্থ্যবান অনেকে যখন ওমরাহ করতে যান তখন এরশাদ এবার গিয়েছিলেন তার তীর্থভূমি নয়াদিল্লিতে। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংসহ মতাধরদের সঙ্গে বৈঠক করে এসেছেন তিনি। এটুকু অবশ্য খবর নয়, আসল খবর হলো, দেশে ফেরার পর এরশাদ বলেছেন, ভারতীয়রা নেতারা নাকি তার এবং তার দলের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। তারা নাকি আবারও এরশাদকে মতায় দেখতে চান!

কথাগুলো যে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য অসম্মানজনক হলেও এরশাদ এমনভাবেই বলেছেন যেন তিনিও শেখ হাসিনার মতো ভারতের কোনো অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছেন! রাজনৈতিক পর্যবেকরা অবশ্য মোটেও অবাক হননি শুনে। কারণ, বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্যের বিস্তার ঘটানোর ব্যাপারে সবচেয়ে ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে গেছেন এই এরশাদ। ভারতের ষড়যন্ত্রে মতা দখল করার পর থেকে আজও পর্যন্ত এরশাদ সে একই ভূমিকা পালন করে চলেছেন। সুতরাং অমন একজন বিশ্বস্ত সেবাদাসের ব্যাপারে ভারতীয়দের আগ্রহ থাকতেই পারে। আপত্তি উঠেছে আসলে এরশাদের নির্লজ্জতার কারণে। তিনি বুঝিয়ে ছেড়েছেন, ভারতের ‘অনুমোদন’ ছাড়া কারো পইে বাংলাদেশের রাষ্ট্রমতায় যাওয়া সম্ভব নয়। সে ‘অনুমোদন’ই তিনি দিল্লি থেকে অর্জন করে এসেছেন। কথাটার ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, কোনো কারণে ভারতীয়রা সম্ভবত শেখ হাসিনার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে এরশাদকে।

প্রকৃত সত্য কিন্তু অন্য রকম। এ ব্যাপারে আবার জানান দিয়েছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন এবং মতার পালাবদল নিয়ে নিজেদের মাথাব্যথার প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, এসব সংস্থার ধারণা, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে জিতে বেগম খালেদা জিয়াই মতায় আসবেন। বিএনপির নেত্রী যে ভারতের ‘মিত্র’ নন এবং তিনি যে ভারতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুসম্পর্ককে ‘তাঁবেদারি’ হিসেবে তুলে ধরছেন রিপোর্টে তারও উল্লেখ রয়েছে। কথাগুলো জানা গেছে গত ২৯ আগস্ট দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়ার অনলাইন সংস্করণে। এতে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, খালেদা জিয়া মতায় এলে শেখ হাসিনার সরকারের মাধ্যমে ভারতের গত কয়েক বছরের সব অর্জনই নস্যাৎ হয়ে যাবে। ভারতবিরোধী সন্ত্রাসী গোাষ্ঠীগুলোও বাংলাদেশ থেকে সশস্ত্র কর্মকান্ড শুরু করবে। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় ধস নামার এবং বিএনপির সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলেছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র যুদ্ধকে পর্যুদস্ত করাসহ বিভিন্ন ব্যাপারে ভারতকে ‘অভূতপূর্ব সহযোগিতা’ করা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের কাছ থেকে তিস্তাচুক্তিসহ কিছুই অর্জন করতে পারেননি। সে কারণে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তায়ই শুধু ধস নামেনি, ভারতের প্রতিও বাংলাদেশীদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব শক্তিশালী হয়েছে। এমন অবস্থার সুযোগেই বেগম খালেদা জিয়া মতায় আসতে পারেন। কারণ, জনগণের মধ্যে তার ভারতবিরোধী পরিচিতি রয়েছে। রিপোর্টে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অবশ্য বিপরীত কিছু সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছে। তাদের ধারণা, বিভিন্ন মামলায় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কারাদন্ড হতে পারে। তাছাড়া আগামী বছরের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদেরও দন্ড দেয়া হবে। ফলে নির্বাচনে তারা প্রার্থী হতে পারবেন না। তেমন অবস্থাতেই শুধু আওয়ামী লীগের পে আবারও মতায় ফিরে আসা সম্ভব।

বলার অপো রাখে না, মতার পালাবদলসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এই রিপোর্ট শুধু আশংকাজনক নয়, আপত্তিজনকও। এটা অবশ্য নতুন খবর নয় যে, এসব সংস্থা বাংলাদেশে সব সময়ই তৎপরতা চালাচ্ছে। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও তথাকথিত সুশীল সমাজসহ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের এজেন্ট ও সেবাদাসদের সংখ্যাও হাজার হাজার। সুতরাং বাংলাদেশের সব বিষয়ই তাদের নখদর্পণে থাকার কথা। প্রশ্ন উঠেছে অন্য একটি বিশেষ কারণে। কারণটি হলো, মতার পালাবদলের মতো অত্যন্ত গুরুতর বিষয় সংক্রান্ত কোনো রিপোর্ট যেখানে গোপন রাখার কথা সেখানে সংবাদ মাধ্যমকে দিয়ে তার ব্যাপক প্রচার করিয়েছে। পেছনের কারণ ল্য করলে দেখা যাবে, সুচিন্তিত কৌশল ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে দিয়ে ভারতের নীতি নির্ধারকরা একই সঙ্গে কয়েকটি উদ্দেশ্য হাসিল করতে চেয়েছেন। মন্ত্রিত্বসহ মতার ভাগ পাওয়া-না পাওয়ার মতো বিভিন্ন কারণে আওয়ামী মহাজোটের শরিকদের মধ্যে সৃষ্ট অসন্তোষ প্রশমিত করে দলগুলোকে আবারও ঐক্যবদ্ধ করা একটি প্রধান উদ্দেশ্য। ভারতীয়দের পরিস্কার ‘বার্তা’ হলো, আওয়ামী লীগ মতায় আসতে না পারলে মহাজোটের কোনো নেতাই রেহাই পাবেন না। জেনারেল এরশাদকে তো বটেই, ইনু-মেনন ও দিলীপ বড়–য়ার মতো অনেক নেতাকেও জেলের ঘানি টানতে হবে। সুতরাং বৃদ্ধ বয়সে জেল খাটার পরিণতি এড়ানোর জন্য হলেও নেতাদের উচিত মহাজোটকে শক্তিশালী করা, শেখ হাসিনাকে আবারও মতায় ফিরিয়ে আনা এবং বেগম খালেদা জিয়াকে প্রতিহত করা। এজন্যই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একদিকে মহাজোটের শরিকদের ওপর পরোভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে মনমমোহন সিংরা নিয়েছেন এরশাদকে সমর্থন দেয়ার কৌশল। এরও উদ্দেশ্য আসলে শেখ হাসিনার ওপর চাপ সৃষ্টি করা। তিনি যাতে মান-অভিমান ভুলে ভারতের ইচ্ছাপূরণে সচেষ্ট থাকেন সেটাই চেয়েছেন মনমোহন সিংরা। তারা সেই সাথে জানিয়ে দিয়েছেন, শেখ হাসিনা এদিক-সেদিক করতে চাইলে তারাও সমর্থন প্রত্যাহার করে নেবেন এবং এরশাদকে সামনে নিয়ে আসবেন। মনমোহন সিংদের ধারণা, এমন কৌশলে ইনু-মেনন ধরনের মহাজোটের শরিকরা শেখ হাসিনার ব্যাপারে বেশি জোর দেবেন। তেমন অবস্থায় বিএনপি-জামায়াতকে প্রতিহত করা সহজ হয়ে উঠবে।

উল্লেখ্য, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রিপোর্টে বিএনপির জন্যও ‘বার্তা’ রয়েছে। বিএনপিকে বুঝতে হবে, ভারতের প্রতি ‘বন্ধুসুলভ’ না হওয়া পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার পে মতায় যাওয়া সহজে সম্ভব হবে না। এর মাধ্যমে বিএনপিকে প্রকৃতপে ভারতের অধীনতা স্বীকার করে নেয়ার জন্যই চাপ দেয়া হয়েছে। এরপরও বিএনপি যদি ঘাড় বাঁকিয়ে রাখে তাহলে সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কেও স্পষ্ট আভাস রয়েছে রিপোর্টে। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন মামলায় কারাদন্ড দেয়া হবে, তারা নির্বাচনেই দাঁড়াতে পারবেন না। ওদিকে কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীকেও ছিটকে পড়তে হবে। এভাবে কথার মারপ্যাঁচে একই সঙ্গে আওয়ামী মহাজোট এবং বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে নগ্নভাবে ভয় দেখানো হয়েছে। রাজনীতিতে এ ধরনের কৌশলকে ‘ব্ল্যাকমেইলিং’ বলা হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের সে ‘ব্ল্যাকমেইলিং’-ই করতে চেয়েছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ল্যণীয় বিষয় হলো, রিপোর্টের কোথাও কিন্তু আওয়ামী লীগকে আবারও জিতিয়ে আনার জন্য হলেও বাংলাদেশের কোনো দাবি পূরণের ব্যাপারে সামান্য তাগিদ দেয়া হয়নি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বতোভাবে শুধু ভারতের স্বার্থকেই প্রাধান্যে রেখেছে। ভারতীয়দের জন্য সেটাই অবশ্য স্বাভাবিক। এ সম্পর্কেও সুনির্দিষ্টভাবে জানা গেছে ভারতের সংবাদপত্রে। এ ব্যাপারে সবশেষে এগিয়ে এসেছে দেশটির প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘আউটলুক’। পিলখানা হত্যাকান্ডের সময় বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এবং কথিত ‘বিদ্রোহীদের’ সমর্থনে ভূমিকা পালনের কারণে ‘বিখ্যাত’ হয়ে ওঠা ‘আউটলুক’-এর ৩ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় ‘দ্য নিউ এনিমি’ শিরোনামে এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নাকি আবারও ইসলামী জঙ্গিদের আস্তানায় পরিণত হতে চলেছে! আওয়ামী লীগ মতায় না আসতে পারলে বাংলাদেশ থেকে আবারও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সশস্ত্র কর্মকান্ড শুরু হবে বলেও রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে। এরও উদ্দেশ্য একই রকম, অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াতকে প্রতিহত করা।

এ ধরনের খবরের পাশাপাশি বিশেষ করে টাইমস অব ইন্ডিয়া বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণার নতুন কৌশল নিয়েছে। দৈনিকটি প্রতিদিন সাধারণ ভারতীয়দের নামে চরম উস্কানিমূলক মন্তব্য প্রকাশ করে চলেছে। এরকম একটি মন্তব্যে জনৈক ভারতীয়র নামে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশকে দখল করে নিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।’ স্মরণ করা দরকার, অতীতে এমনকি বিজেপির বড় বড় নেতারাও কথাটা প্রকাশ্যেই বলেছেন। তাদের সোজা কথা ছিল, ভারতের সেনাবাহিনী চাইলে সকালে রওয়ানা দিয়ে বিকেলে ঢাকায় বসে চা খেতে পারে। বর্তমান পর্যায়েও ভারতীয়দের একই উদ্দেশ্যের প্রকাশ ঘটে চলেছে। তারা বলতে চাচ্ছে, কোনো কারণে আগামী নির্বাচনে যদি ভারত বান্ধব আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী মহাজোট জিততে না পারে এবং বিএনপি-জামায়াতের বিজয়কে যদি প্রতিহত না করা যায় তাহলে ভারতের উচিত সামরিক অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশকে দখল করে নেয়া। তাহলেই নাকি ‘ল্যাঠা চুকে’ যাবে! বিষয়টিকে হাল্কাভাবে নেয়া যায় না। কারণ, ২০০৯ সালের ফেব্র“য়ারিতে পিলখানা বিদ্রোহের সময়ও ভারতের সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশ সীমান্তে জড়ো করা হয়েছিল। বিমান বাহিনীকেও রাখা হয়েছিল প্রস্তুত অবস্থায়। ভারত বুঝিয়ে দিয়েছিল, বাংলাদেশকে তাদের ‘রাডারের’ আওতার বইরে যেতে দেয়া হবে না। সে একই মনোভাবের প্রকাশ ভারতীয়রা সাম্প্রতিক সময়েও ঘটাতে শুরু করেছে।

এটা অবশ্য একটি দিক। বিশ্লেষণের অন্য দিকটিও কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এমন মনে করাটা মোটেও সমীচীন নয় যে, ভারত কেবলই বাংলাদেশকে ইচ্ছাধীন রাখার উদ্দেশ্য থেকে সবকিছু করতে চাচ্ছে। অন্তরালে ভারতের অভ্যন্তরীণ সঙ্কটও একটি প্রধান নির্ধারক হিসেবে ভূমিকা পালন করে চলেছে। এ ব্যাপারে ধারণা দেয়ার জন্য মুসলিম নিধনসহ আসামকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের উল্লেখ করা দরকার। বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের সর্বশেষ সংখ্যায় বলা হয়েছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো ভারতকে বৈশ্বিক যুদ্ধেেত্র পরিণত করতে পারে। মন্তব্যের কারণ হিসেবে ‘ধর্মনিরপে’ ভারতে বর্ণ হিন্দুদের একচেটিয়া প্রাধান্য, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও হানাহানি, প্রাণবিনাশী দাঙ্গা এবং অর্থনৈতিক শোষণ ও সামাজিক দুর্দশার পাশাপাশি চীনসহ কয়েকটি রাষ্ট্রের উপস্থিতির উল্লেখ করেছে ম্যাগাজিনটি। বিভিন্ন সময়ে সঙ্ঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়ার পাশাপাশি বিশেষ করে বলেছে কিছুদিন ধরে চলমান আসামকেন্দ্রিক মুসলিম নিধনের কথা। ‘দাঙ্গা’ নামের এ নিধন অভিযানে সংখ্যালঘু মুসলমানরাই যে প্রধানত মারা যাচ্ছেন তারও উল্লেখ রয়েছে রিপোর্টে। ভারতের এক সাম্প্রতিক গবেষণা রিপোর্টেও জানা গেছে, দেশটিতে এ পর্যন্ত ৬২টি বড় ধরনের ‘দাঙ্গা’ সঙ্ঘটিত হয়েছে এবং এসব ‘দাঙ্গায়’ সরকারি হিসেবে মারা গেছে অন্তত ২৬ হাজার মুসলমান। সে কারণে ‘দাঙ্গা’গুলোকে মুসলিম নিধনের অভিযান হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ‘দাঙ্গা’গুলো সঙ্ঘটিত হওয়ার সময় বেশির ভাগ েেত্র কেন্দ্রে মতাসীন ছিল কংগ্রেস। এসবের বাইরে যে সব রাজ্যে মুসলমানদের ‘কচুকাটা’ করা হয়েছে সেগুলোরও বেশিরভাগ রাজ্যে ছিল কংগ্রেস সরকার। যেমন এই মুহূর্তের আসাম সরকারও কংগ্রেসেরই। তাছাড়া বাবরী মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে যে ‘দাঙ্গা’ হয়েছিল তখনও কংগ্রেসই কেন্দ্রে মতাসীন ছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও বাবরী মসজিদ ভাঙার সময় পুজায় ‘মগ্ন’ ছিলেন বলে সম্প্রতি খবর প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ মুখে ধর্মনিরপেতার ভণিতা করলেও কংগ্রেসও মুসলমানদের নির্মূল করার অভিযানে সব সময় অগ্রবর্তী অবস্থানেই থেকেছে।

প্রাসঙ্গিক দ্বিতীয় তথ্যটি অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ এবং আশংকাজনক। অতীতের মতো সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহেও এ অভিযোগ সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ‘ধর্মনিরপে’ রাষ্ট্র ভারতে কংগ্রেসের পাশাপাশি বিজেপিসহ অন্য প্রায় সব দলই মুসলমানদের নির্মূল করার ব্যাপারে একযোগে ভূমিকা পালন করে থাকে। বর্তমান পর্যায়েও ব্যতিক্রম ঘটেনি। আসামের কংগ্রেস দলীয় মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ থেকে বিজেপির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানী ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলটির সভাপতি নিতিন গড়কড়ি পর্যন্ত ডজন-ডজন নেতা মুসলিম হত্যার চলমান অভিযানের জন্য বাংলাদেশী মুসলমানদের দায়ী করেছেন। তারা বলে চলেছেন, বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীরাই আসামে ঢুকে পড়ে ‘দাঙ্গা’ বাঁধিয়েছে! বাংলাদেশের প্রশ্নে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন মহারাষ্ট্রের ‘নবনির্মাণ সেনা’র দাঙ্গাবাজ হিন্দুত্ববাদী নেতা রাজ ঠাকরে। ১১ আগস্ট এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, বিহার ও উত্তর প্রদেশকে নিজেদের ‘স্বর্গরাজ্য’ বানানোর পর ‘বাংলাদেশী’ মুসলমানরা এখন ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী বোম্বেকেও ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছেন! মনমোহন সিং-এর নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রীনিত কাউরও বাংলাদেশ বিরোধী এই প্রচারণার ‘ঢোলে’ যথেষ্ট আওয়াজ তুলেই ‘বাড়ি’ দিয়েছেন, ‘ঘি ঢেলেছেন’ জ্বলন্ত আগুনে। বিচিত্র এক পরিসংখ্যান হাজির করে ১৭ আগস্ট লোকসভায় দেয়া বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, গত তিন বছরে ২৩ হাজার ৬২৩ জন বাংলাদেশীকে ‘পুশ ব্যাক’ করার পরও বর্তমানে ৮৩ হাজার ৪০০ বাংলাদেশী অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছেন!

আসামকেন্দ্রিক মুসলিম হত্যাকান্ডের দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবে এভাবেই দল ও মত নির্বিশেষে ভারতীয় রাজনীতিকরা সম্প্রতি নতুন পর্যায়ে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণায় সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। সহজবোধ্য কারণে আওয়ামী লীগ সরকার কোনো প্রতিবাদ না জানানোয় ভারতীয়দের এই প্রচারণা বিশ^াসযোগ্যতা অর্জন করতেও শুরু করেছিল। বিশ্ববাসী ভাবতে শুরু করেছিল, বাংলাদেশী মুসলমানরা হয়তো সত্যিই ভারতে অনুপ্রবেশ করে ‘দাঙ্গা’ বাঁধিয়েছেন! অন্যদিকে ‘সত্যের ঢোল’ কিন্তু খোদ ভারতেই বেজে উঠেছে। এ ব্যাপারে সবশেষে এগিয়ে এসেছে দেশটির প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘আউটলুক’। কিছুদিন আগে বিবিসি’র পরিচালিত অনুসন্ধান এবং প্রচারিত রিপোর্টসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের উদ্ধৃতি দিয়ে ‘আউটলুক’ বলেছে, মাঝে-মধ্যে স্বল্পসংখ্যক বাংলাদেশী ভারতে যাতায়াত করলেও তাদের সংখ্যা কখনোই ‘লাখে লাখে’ বলার মতো ছিল না। তারা আসামে যায় বিশেষ করে চাষাবাদের মজুর হিসেবে। অন্য কিছু কাজে ও উপলওে তারা ভারতে যাতায়াত করে সত্য কিন্তু কাজ শেষে আবার ফিরেও যায়। স্থায়ীভাবে তো নয়ই, একনাগাড়ে খুব বেশিদিনও বসবাস করে না তারা। বিবিসি ও ‘আউটলুক’-এর দু’টি রিপোর্টের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের প্রতিষ্ঠান প্রতীচী ফাউন্ডেশনের সাবেক পরিচালক এ জে ফিলিপও। বিভিন্ন তথ্য-পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বেশিরভাগ সূচকেই বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় অনেক এগিয়ে আছে। সুতরাং ভালো অবস্থা থেকে খারাপ অবস্থার দেশ ভারতে বাংলাদেশীদের চলে আসার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণই থাকতে পারে না। উল্লেখ্য, আসামের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী উলফা’র সামরিক শাখার প্রধান পরেশ বড়ূয়াও ক’দিন আগে এক বিবৃতিতে বলেছেন, বাংলাদেশীদের কারণে নয়, আসাম কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণেই সেখানে রক্তয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। নিজেদের অপরাধ ও দায়দায়িত্ব আড়াল করার এবং ভারতীয়দের পাশাপাশি বিশ^বাসীকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশীদের ওপর দোষ চাপানোর অপচেষ্টা চলছে। একই উদ্দেশ্য থেকে ভারতীয়রা বাংলাদেশের নির্বাচনেও নাক গলাতে চাচ্ছেন।

উদ্বেগের কারণ হলো, লগি-বৈঠার হত্যা-সন্ত্রাস থেকে অওয়ামী লীগকে মতায় বসিয়ে দেয়া পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহে ভারতীয়রাই প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটন তো নিজেও জানিয়েছেন, কিভাবে ভারতের উদ্যোগে পূর্ব নির্ধারিত একটি নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে মতায় আনা হয়েছে এবং ভারতের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে ওই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপে বলে সমর্থন জানিয়েছিল। পার্থক্য হলো, সেবার ভারতের সমর্থন থাকায় শেখ হাসিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘গুডবুকে’ ছিলেন, এবার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কারণে অবস্থায় পরিবর্তন ঘটেছে। ভারতও একই কারণে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। মার্কিন সমর্থন হারানোর পাশাপাশি শেখ হাসিনা জনসমর্থনও খুইয়ে বসে আছেন বলেই ভারতীয়রা নিজেদের তৎপরতাকে বহুমুখী করে চলেছে। সেজন্যই বাংলাদেশের জনগণের এবং বিএনপি ও জামায়াতসহ দেশপ্রেমিকদেরও উচিত এখনই সতর্ক হওয়া, ভারতের পাশাপাশি আওয়  ামী মহাজোটের গতিবিধির প্রতি ল্য রাখা এবং যথাসময়ে যথাযথ ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রাখার প্রস্তুতি নেয়া।

অন্যান্য মিডিয়া bdnews24 RTNN Sheersha News barta24 Prothom Alo Daily Nayadiganta Jugantor Samakal Amardesh Kaler Kantho Daily Ittefaq Daily Inqilab Daily Sangram Daily Janakantha Amader Shomoy Bangladesh Pratidin Bhorerkagoj Daily Dinkal Manob Zamin Destiny Sangbad Deshbangla Daily Star New Age New Nation Bangladesh Today Financial Express Independent News Today Shaptahik 2000 Computer Jagat Computer Barta Budhbar Bangladesherkhela Holiday Bangladesh Monitor BBC Bangla Redio Tehran
homeabout usdeveloped by

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ মো. তাসনীম আলম।

মহীউদ্দীন আহমদ কর্তৃক জাতীয় মুদ্রণ ১০৯, ঋষিকেশ দাস রোড, ঢাকা - ১১০০ হতে মুদ্রিত ও ১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা - ১১০০ হতে প্রকাশিত। যোগাযোগের ঠিকানাঃ ৪২৩ এলিফেন্ট রোড, বড় মগবাজার, ঢাকা - ১২১৭। ফোনঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৯০৬৫, বার্তা - ৮৮ ০১৬৭০৮১৩২৭৬, সার্কুলেশন - ৮৮ ০১৫৫২৩৯৮১৯০, বিজ্ঞাপন - ৮৮ ০১১৯৯০৯০০৮৫, ফ্যাক্সঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৫৫৭১, ওয়েবসাইটঃ www.weeklysonarbangla.net, ইমেইলঃ weeklysonarbangla@yahoo.com