॥ আবুল ওয়াফী॥
সংবিধান নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। সংসদ, পত্রপত্রিকার কলামে এবং টেলিভিশনের টক শোতে বাংলাদেশের সংবিধান সম্পর্কে বিস্তর আলোচনা ও মতামত ব্যক্ত করা হচ্ছে। ৮ সেপ্টেম্বরের সংখ্যা একটি বাংলা পত্রিকার শিরোনাম ছিল ‘সবার উপর সংবিধান সত্য’। একই পত্রিকায় ৩ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় একজন সংবিধান বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। সে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানে পরস্পর বিরোধী ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। সাংবিধানিক নৈরাজ্য চলছে। এ অবস্থার উত্তরণে সংবিধানের সংশোধন অপরিহার্য’।
২০০৬ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠা আন্দোলনে রাজপথে পিটিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনার পর তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করার সময়ও ব্যাপক সংবিধান চর্চা শুরু হয়। আবার ১১ জানুয়ারি ২০০৭ সালে তদানীন্তন সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য করা হয়। জরুরি অবস্থার নামে কার্যত একটি সামরিক শাসনই জাতির উপর চাপিয়ে দেয়া হয়। সেনাবাহিনীর সমর্থনে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে আরেকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। এই সেনা সমর্থিত সরকার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান না করে গায়ের জোরে অসাংবিধানিকভাবে দুই বছর ক্ষমতায় থাকে। তখনও সংবিধান নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও মতামত ব্যক্ত করতে দেখা যায়। এমনকি সংবিধানের ৫৮(খ), ৫৮(গ) এবং ৫৮(ঘ)তে কি আছে তা নিয়ে রিকশাওয়ালাকেও কথা বলতে বা প্রশ্ন করতে দেখেছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে রাজনৈতিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নিবে একথা থাকলেও এই সরকারের মেয়াদ হবে ৯০ দিন এমন সুস্পষ্ট বিধান উল্লেখ না থাকায় অনেকেই যার যার সুবিধামত ব্যাখ্যা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার খুত বা ত্রুটি আবিষ্কার করেছেন। ১৯৯৬ এবং ২০০১ এর নির্বাচনে কিন্তু এমন সমস্যা হয়নি।
আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলো এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞগণ যার যার সুবিধামত সংবিধানের ব্যাখ্যা করে থাকেন। সাংবিধানিক নৈরাজ্য চলছে বলে যে মন্তব্য করা হয়েছে এটা নতুন কিছু নয়। এ নৈরাজ্য অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগাররা প্রচার করে থাকে বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ সালে হত্যা করার পর বাংলাদেশের সংবিধানে কাটাছেঁড়া শুরু হয় এবং সংবিধানকে তছনছ করে ফেলা হয়, সামরিক শাসনকে বৈধতা দেয়ার জন্য সংবিধানকে কলঙ্কিত করা হয়। কথাগুলো মোটেই সত্য নয়। আওয়ামী লীগই সর্বপ্রথম ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশালী শাসন জাতির উপর চাপিয়ে দিয়ে সংসদের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রকে জবাই করে সংবিধানকে কলঙ্কিত করে।
সম্প্রতি দৈনিক যুগান্তরে ব্রি. (অব.) এম আব্দুল হাফিজ লিখেছেন, ‘একথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, স্বয়ং বঙ্গবন্ধু মুজিবও তার আদি অকৃত্রিম গণতন্ত্রের বিশ্বাসে স্থির থাকতে পারেননি। সারাজীবন গণতন্ত্রের ধ্বজা উড়িয়ে যখন তাকে অবয়ব দেয়ার সুযোগ এলো তখন বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রেই বিশ্বাস হারালেন এবং তদস্থলে এক উদ্ভট বাকশালী পদ্ধতির প্রবর্তন ঘটালেন।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমরা আকৈশোর যে আওয়ামী লীগের সাথে পরিচিত, কবেই তো তার বিলুপ্তি ঘটেছে। গণতন্ত্র তো বঙ্গবন্ধুর হাত দিয়েই শিকেয় উঠেছে! ... পরিহাসের বিষয়, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্যদিয়ে বঙ্গবন্ধুর আমলে গণতন্ত্রের জন্য সম্ভাবনার যে দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল, বঙ্গবন্ধুর হাতেই তা রুদ্ধ হয়।’ লেখকের প্রায় সব বক্তব্যের সাথে একমত হলেও ‘আমরা আকৈশোর যে আওয়ামী লীগের সাথে পরিচিত কবেই তো তার বিলুপ্তি ঘটেছে’ ‘কথাটুকুর সাথে একমত হওয়া কঠিন। জন্ম থেকেই দলটি সুবিদাবাদী, ধোঁকা ও প্রতারণার রাজনীতি এবং ফ্যাসিবাদে বিশ্বাসী ছিল এবং এখন তাই আছে।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৬(১) ‘এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল বলিয়া গণ্য হইবে। (২) রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।’ অথচ আওয়ামী লীগ সংবিধান দ্বিতীয় সংশোধনী আইন ১৯৭৩ এর ২ ধারা বলে (৩) দফা সংযোজন করে মৌলিক অধিকার হরণ করেছে। এ সংশোধনীর মাধ্যমে জরুরি অবস্থা জারি করার বিধানাবলী ১৪১(ক) সংযোজন করে মৌলিক অধিকার স্থগিত করণের বিধান করেছে। সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ৪৭(ক) অনুচ্ছেদে ৪৭(৩) ধারা সংযোজন করে মৌলিক অধিকার হরণের ব্যবস্থা করেছে।
আওয়ামী লীগই সংসদীয় ব্যবস্থার বদলে রাষ্ট্রপতি শাসিত একদলীয় ব্যবস্থা চালু করে সংবিধানের মৌলিক চরিত্র পাল্টিয়ে ফেলেছিল। সংবিধানকে কলঙ্কিত করার জন্য যে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে আওয়ামী লীগ অস্বীকার করার উপায় নেই। সে জিয়াই কিন্তু একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন। আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফলেই খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। এ সংশোধনীর বেনিফিশিয়ারি আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনের ২টিতেই (১৯৯৬ এবং ২০০৮) জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন হয়ে এখন আবার নিজেদের সুবিধামত সেই ব্যবস্থা বাতিল করেছে আওয়ামী লীগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। ক্ষমতার জন্য বরাবর দলটি অবস্থান পরিবর্তন করেছে এবং ভোল পাল্টিয়েছে। নিজেদের ইচ্ছামত সংবিধান পরিবর্তন করার রেকর্ড স্থাপন করেছে।
অবৈধ কর্মকাণ্ডের বৈধতা দেয়ার জন্য আওয়ামী লীগ অন্যের উপর দোষ চাপায় অথচ এ ব্যাপারে তাদের রেকর্ড মোটেই ভালো নয়। ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীনদের দুই বছরের সরকারের বৈধতা দেয়ার কথা শেখ হাসিনা আগাম ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর আগে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে যোগদান করে এরশাদের সামরিক শাসনের বৈধতা আওয়ামী লীগই দিয়েছিল। অবৈধভাবে জরুরি আইন জারি করে ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীনদের সরকার শপথ গ্রহণ করার দিন শেখ হাসিনাই দলবল নিয়ে বঙ্গভবনে উল্লাস করেছেন এবং এ সরকার তাদের আন্দোলনের ফসল বলে দাবি করেছেন। ক্ষমতায় এসে তাদের অবৈধ শাসনের বৈধতাও দেয় দলটি।
পঞ্চদশ সংশোধনীর জন্য আওয়ামী লীগ যে সংসদীয় কমিটি করেছিল সেই কমিটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আলাপ করে এবং এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাথেও আলোচনা করে। এ সময় আওয়ামী লীগের দাবি ছিল সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আছে তার সংশোধন করে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করাটা বাধ্যতামূলক করে দেয়া এবং যদি ৯০ দিনে নির্বাচন করতে না পারে তাহলে আগের সংসদ পুনরুজ্জীবিত করে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা। বিচারপতি খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে রায় দেবার পর আওয়ামী লীগ একেবারে ইউটার্ন করে সম্পূর্ণ উল্টো পথে যাত্রা করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অসাংবিধানিক ও অবৈধ তাই এ নিয়ে আর কোনো আলোচনাই নয়। প্রথমে তারা বলেন, সংবিধান সংশোধন করে আইন পাস করারও দরকার নেই, আদালত যে রায় দিয়েছে তার ভিত্তিতে সংবিধান ছেপে দিলেই হলো। এমনকি মান্যবর রায় দানকারী বিচারপতিও সংবিধান ছাপায় তাকিদ দিয়েছেন। অবশেষে যখন তাদের বোধোদয় হলো যে সংবিধান পরিবর্তন করার মালিক জনগণের পক্ষে সংসদে তখন পঞ্চদশ সংশোধনী সংসদে পাস করা হলো। এ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অনুচ্ছেদের পরিবর্তন পরিবর্ধন ও সংযোজন করা হলো।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে শুধু রাষ্ট্রের এ সর্বোচ্চ দলিলকে দলীয়করণই করা হলো না বরং অনেক বৈপরিত্য ও বিতর্কের জন্ম দেয়া হলো। এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিধানাবলী সংশোধন করা যাবে না মর্মে ৭(ক) এবং ৭(খ) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে এক নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হলো। এসব বিষয় কেউ দ্বিমত করলে বা উচ্চাবাচ্য করলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা দিয়ে দেয়া হলো। সংবিধান পবিত্র দলিল এবং আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে সংবিধান অপরিহার্য। সংবিধান কোনো আসমানী কিতাব নয় যে, তা সংশোধন করা যাবে না। মানুষ সামাজিক-চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন করেছে আর রাষ্ট্র গঠনের জন্য সংবিধান সর্বোচ্চ আইন বা বিধান যা রাষ্ট্রের মানুষগুলোর জন্যই। সব দেশেই সংবিধান সংশোধন হয়ে থাকে অনিবার্য বাস্তবতার কারণেই।
রাষ্ট্র মানুষের সৃষ্টি আর রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সংবিধানও তৈরি করেছে মানুষ। মহান আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তা এ বিশ্বজাহান, আসমান-জমিন এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে সমস্ত সম্পদ, পানি, আলো-বাতাস, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, সমুদ্র, পাহাড়-পর্বত, জীবজন্তু, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, ফসল ও ফলমূল সবকিছু মানুষের জন্য নিয়ামত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে মানুষকে দিয়েছেন জ্ঞান-হিকমত ও বিবেক-বুদ্ধি। মানুষ তার স্রষ্টাপ্রদত্ত যোগ্যতা বলেই নির্মাণ করেছে আধুনিক সভ্যতা। আধুনিক বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী সংস্থা হলো রাষ্ট্র এবং এ রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সংবিধানের দ্বারা বা তার অধীন। আর এ জন্যই বলতে হয় সংবিধান নয় মানুষই সবার উপর সত্য।
সম্প্রতি বাংলাদেশের উচ্চআদালতের হাইকোর্ট বিভাগের একটি রায়ের উপর বিতর্কে অংশ নিয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা সংসদে বেশ উত্তপ্ত ও প্রাণবন্ত আলোচনা করেছেন। ফলে সংবিধান নিয়ে বা সংবিধানের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক আবার সামনে চলে এসেছে। কেউ কেউ বলছেন আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমেই সংসদ ও আদালত যে মুখোমুখি অবস্থানে চলে এসেছে তার অবসান ঘটে যাবে। তেমনটা আশা করার কোনো কারণ নেই। কেননা বর্তমানে যে ইস্যুতে বিতর্ক চলছে এবং সংসদ সার্বভৌম, আদালত স্বাধীন, সংসদের ক্ষমতা কতটুকু আদালতের এখতিয়ার কতটুকু এর মধ্যে সংবিধান সংক্রান্ত বিতর্কের অবসান হবার উপায় নেই। যেহেতু বর্তমান সংবিধানে অনেক বিপরীতধর্মী এবং বিতর্কিত বিধান রয়েছে যা নিয়ে রাষ্ট্রের মালিক জনগণের অধিকারের প্রশ্ন আছে বা ভিন্নমতের অবকাশ আছে তা নিয়ে বিতর্ক হতে বাধ্য। সংবিধানে শুধু যে পরস্পর বিরোধী ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে তা নয় বরং বেশ কিছু অভিনব বিধান বিশেষ করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংশোধিত বা সংযোজিত হয়েছে।
সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখায় অনেক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। সংবিধান সংশোধন না করা হলে বর্তমান সংসদের সকল সদস্য নির্বাচনের অযোগ্য হবেন। ৬৬(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে এ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কোনো ব্যক্তি কেবল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হইবার কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত বলিয়া গণ্য হইবেন না।” সুতরাং ৬৬(২)এর(চ) ধারা অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মে লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকার কারণে সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচনে অযোগ্য হবেন।
সংসদ ভেঙ্গে না দিয়ে আরেকটি সংসদের নির্বাচন করা হলে তখন নবনির্বাচিত ৩০০ জন এবং বিদ্যমান সংসদের ৩৫০ জন মিলে সংসদ সদস্য সংখ্যা দাঁড়াবে ৬৫০ জন। ক্ষমতাসীন দল যদি নির্বাচনে ভালো করতে না পারে তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নির্বাচন বাতিলও করে দিতে পারে কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে। কারণ মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নবনির্বাচিত সদস্যরা দায়িত্ব নিতে পারছেন না বা শপথও নিতে পারবেন না। আমাদের দেশেই দৃষ্টান্ত আছে নির্বাচনে পরাজিত হবার পর ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনকে কারচুপির জন্য নির্বাচন বাতিল করার অনুরোধ করেছিল। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের কথা অনুযায়ী কাজ না করায় তাকে বেঈমান আখ্যায়িত করা হয়। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন একজন নীতিবান লোক হবার কারণেই এমন অন্যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি। আর আওয়ামী লীগ তো দলীয় অনুগত ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতির পদে বসিয়ে রেখেছে। তাকে ব্যবহার করে খুনের মামলা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সাজা মওকুফ করার রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। সুতরাং সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন কোনক্রমেই নিরাপদ নয়। দূরভিসন্ধিমূলকভাবেই যে এ বিধানটি রাখা হয়েছে তা বলাই বাহুল্য।
১৪২ অনুচ্ছেদে ‘সংসদের আইন দ্বারা এই সংবিধানের কোন বিধান সংযোজন পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণের দ্বারা সংশোধিত হইতে পারিবে’ মর্মে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় সংসদকে যে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭(খ) সংযোজন করে সেই ক্ষমতা হরণ করা হয়েছে।
সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ বদল করে যে নতুন অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে সেটাও সংবিধানের ২৬(২), ৭(২) এর ১৪২(১) অনুচ্ছেদের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
অনুচ্ছেদে ৪২, ৪৪ ও ৪৭ সংশোধন এবং ৫৮(ক), ২য় ভাগের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে তা সংবিধানের বিভিন্ন ধারার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সাংঘর্ষিক।
অনুচ্ছেদ ৬৬, ৭০, ৭২, ৮০, ৮৮ ও ৯৩ এর যে সংশোধনী আনা হয়েছে তা ১০২(১) এর সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাসের জন্য ১৪২ অনুচ্ছেদের (অ)তে শর্ত আছেÑ ‘অনুরূপ সংশোধনীর জন্য আনীত কোন বিলের সম্পূর্ণ শিরোনামার এই সংবিধানের কোন বিধান সংশোধন করা হইবে বলিয়া স্পষ্টরূপে উল্লেখ না থাকিলে বিলটি বিবেচনার জন্য গ্রহণ করা যাইবে না।’ এ শর্তও মানা হয়নি। সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও সাংঘর্ষিক এত অধিক সংখ্যক অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো এবং বৈশিষ্ট্যের উপর আঘাত হানা হয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও পরস্পর বিরোধী বা সাংঘর্ষিক ধারা সংবিধানে স্থান পাওয়ার ফলে সংবিধানের সংশোধনী অপরিহার্য হয়ে পড়েছে এমনকি সংশোধন অযোগ্য বলে গৃহীত অনুচ্ছেদ ও সংশোধন করার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
এ পাতার অন্যান্য খবর
- মারি তো গণ্ডার লুটি তো ভাণ্ডার
- ইলিশের দেশে ইলিশ আমদানি
- বর্তমান সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীকে বহাল রেখে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়
- ‘প্লুটোক্রেসি’ : বাংলাদেশ স্টাইল
- রোহিঙ্গাদের দেখতে বাংলাদেশে মার্কিন প্রতিনিধিদল
- চালকদের অসতর্কতায় সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে গিয়েছে : অধ্যাপক মুজিব
- ছাত্রলীগের তাণ্ডবে অস্থির শিক্ষাঙ্গন
- তুরস্কে নৌকাডুবি ও চীনে ভূমিকম্পে প্রাণহানিতে মকবুল আহমাদের শোক
- বিশ্ব প্রতিযোগিতা সমতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে যাচ্ছে
