সবই ‘ঠিকঠাক’ চলছে কথাটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। কথাটা শুধু ঘোষণার আকারে বলেননি প্রধানমন্ত্রী, খুবই বিরক্তির সঙ্গে একথাও বলেছিলেন, সবকিছু ‘ঠিকঠাক’ চলার পরও বিরোধী দল কেন হইচই করছে তার কারণ নাকি তিনি বুঝতে পারেন না। বলা বাহুল্য, প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের নানা কীর্তি ও সাফল্যের ফিরিস্তিও তুলে ধরেছিলেন। এখনো, এত কিছুর পরও তার কথাবার্তায় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। এই তো ক’দিন আগেও ৮ সেপ্টেম্বর দলীয় নেতাদের এক সমাবেশে নিজেদের গুণগান গাওয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী কেয়ারটেকার সরকারকে দিয়েও ভয় দেখিয়েছেন। বলেছেন, কেয়ারটেকার সরকার মতায় এলে আমরা তো জেলে যাবোই, কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে এখন যারা সোচ্চার রয়েছেন তারাও রেহাই পাবেন না। সে জন্যই মাথা থেকে কেয়ারটেকার সরকারের ‘ভূত’ ঝেড়ে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা আরো বলেছেন, তারা আর কাউকে ‘বাঁকা পথে’ মতা দখল করতে দেবেন না। কেউ যাতে ‘বাঁকা পথে’ মতা দখল করতে না পারে সে জন্যই তারা সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছেন। বলা বাহুল্য, প্রধানমন্ত্রীর মুখে বিশেষ করে ‘বাঁকা পথে’ মতা দখল করার কথাটা শুনে জনগণের সচেতন অংশের মনে জেনারেল মইন উ’দের সঙ্গে শেখ হাসিনার চমৎকার সমঝোতার কথাই মনে পড়ে গেছে।
এদিকে পরিস্থিতি কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কল্পিত বা পরিকল্পিত পথে এগোচ্ছে না। এ সম্পর্কে সবচেয়ে শক্তিশালী ধারণা দিয়েছেন ‘সবজান্তা’ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। বহুল আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গে একটি মন্তব্যের কারণে অতি বৃদ্ধ বয়সেও তাকে রীতিমতো ‘বেচারা’র করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। জাতীয় সাংবাদিকদের কাছে তো বটেই, জাতীয় সংসদেও তিনি মাফ চাইতে বাধ্য হয়েছেন। সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা যে আসলেও ‘তেমন কিছু’ সে কথাটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন তিনি। সে কারণেই মুখ ফসকে হলেও মিস্টার মুহিত আরো একটি সত্য কথাও বলে ফেলেছেন। তিনি নাকি গত নয় মাস ধরেই অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে কেটে পড়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন কিন্তু তিনি ছাড়তে চাইলে কি হবে, ‘কম্বল’ তাকে ছাড়ছে না! অর্থাৎ কেটে তিনি পড়তে পারছেন না। ব্যাপারটা আসলে সহজও নয়। ঘটনাপ্রবাহে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে নয় মাসের বিষয়টি। ঠিক এ সময়টুকুর কথাই অর্থমন্ত্রী কেন বলেছেন? উত্তরে বলা হচ্ছে, পদ্মা সেতুর দুর্নীতিকেন্দ্রিক সঙ্কটের শুরু হয়েছিল নয় মাস বা তারও কিছু আগে। তখন থেকেই মিস্টার মুহিত হয়তো ‘ছেড়ে দে মা’ বলে কাকুতি-মিনতি শুরু করে থাকবেন।
এটা অবশ্য বিশ্লেষণের একটি দিক। এর পাশাপাশি তথ্যাভিজ্ঞরা কিন্তু অন্য একটি তথ্যও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তথ্যটি হলো, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ওয়াশিংটনে বিশ^ব্যাংক ও আইএমএফ-এর বার্ষিক সভায় সংস্থা দু’টির কাছে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার জন্য হাত পেতেছিলেন অর্থমন্ত্রী। বলেছিলেন, ওই মুহূর্তে ঋণ না পেলে বাজেট ঘাটতি নাকি কাক্সিতপর্যায়ে ধরে রাখা যাবে না। বিশ^ব্যাংক ও আইএমএফ অবশ্য অর্থমন্ত্রীর আকুতিতে সাড়া দেয়নি। এর কারণ, দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সরকার যে শুরু থেকেই জবর দেখিয়ে চলেছে সে ব্যাপারে বিশ^ব্যাংক ও আইএমএফ ঘনিষ্ঠভাবেই ল করে আসছিল। এ জন্যই মতায় আসার পর থেকে বিরামহীনভাবে ঋণ চাইলেও বিশেষ করে আইএমএফ সরকারের অনুরোধে পাত্তা দেয়নি। ওদিকে কথায় মারপ্যাঁচ খাটালেও এবং প™§া সেতু নির্মাণ থেকে কৃষির উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানো পর্যন্ত নানা অজুহাত হাজির করলেও অর্থমন্ত্রী কিন্তু সরকারের দৈন্যদশা আড়াল করতে পারেননি। বরং প্রমাণিত হয়েছিল, অর্থনৈতিক েেত্র একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছে বলেই সরকারকে ঋণের জন্য এতটা মরিয়া হয়ে আকুতি জানাতে হয়েছে। চরম বিপদে পড়লে মানুষ যেমন অন্যের হাতে-পায়ে ধরে অর্থমন্ত্রীকে দিয়ে মহাজোট সরকারও তেমনি বিশ^ব্যাংক ও আইএমএফ-এর হাতে-পায়েই ধরিয়েছে! বলার অপো রাখে না, এ ভারি লজ্জার কথাই বটে! বলা বাহুল্য, সরকার নিজেই এমন এক পরিণতিকে অনিবার্য করেছিল। সাধ্যের অনেক বাইরে গিয়ে ল-হাজার কোটি টাকার ঘাটতি বাজেট তৈরি করাই পেছনের একমাত্র কারণ নয়। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মূলত লোক দেখানো এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার সস্তা উদ্দেশ্য নিয়ে সরকার অনেক প্রকল্প তৈরি করেছে। উদ্দেশ্যে অসততা থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায়ও সরকারকে যথেষ্ট তৎপর হতে দেখা যায়নি। পদ্মা সেতুর মতো কিছু কিছু েেত্র দুর্নীতির অভিযোগও তুলেছে দাতারা। পদ্মা সেতুই অবশ্য দুর্নীতির একমাত্র উদাহরণ নয়। এই অভিযোগ বহুদিন আগেই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, নির্মাণ কাজসহ প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নের েেত্রই সরকার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারি ও প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাচ্ছে মতাসীন দলের লোকজন। ব্যাপকভাবে চলছে টেন্ডারবাজি। সরকার সম্ভবত ভেবেই দেখেনি যে, বিশ^ব্যাংক ও আইএমএফ-এর মতো দাতা সংস্থাগুলো ঘাস খেয়ে বেড়ায় না। তাদের তাই মিথ্যা বলে বিভ্রান্ত করা যায় না। দাতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে পার পেয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। তারা অরে অরে শর্ত পূরণ করিয়ে নেয়। ঠিক এখানে এসেই ‘ধরা’ খেয়েছে সরকার। সরকার শুধু নিজেদেরই বিপন্ন করেনি, বাংলাদেশকেও চরমভাবে অসম্মানিত করেছে।
কথা উঠত না, সরকার যদি সততার সঙ্গে চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হতো এবং সে কারণে দেশকে অসম্মানিত হতে হতো। অন্য দিকে প্রকৃত কারণ লুকিয়ে রয়েছে বিশেষ একটি কঠিন সত্যের আড়ালে। প্রসঙ্গক্রমে বিবিসির বিশিষ্ট বাংলাদেশী সাংবাদিক সিরাজুর রহমান বর্ণিত একটি ঘটনার উল্লেখ না করে পারা যায় না। ১৯৫০-এর দশক থেকে বছর কয়েক আগে পর্যন্তও সিরাজুর রহমান বিবিসির বাংলা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান থেকে বেগম খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের সাাৎকার নিয়েছেন তিনি। সেগুলো বিবিসিতে প্রচারিত হয়েছে। এসবের মধ্যে দু-্একটি সাাৎকারের কিছু কথা নিয়ে বিতর্কের ঝড়ও উঠেছে। উদাহরণ দেয়ার জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সাাৎকারের উল্লেখ সিরাজুর রহমান নিজেই বহুবার করেছেন।
১৯৯০-এর দশকে প্রথমে দৈনিক ইনকিলাবে এবং পরবর্তীকালে দৈনিক নয়া দিগন্ত এবং আমার দেশের একাধিক নিবন্ধে তিনি ওই সাাৎকারের একটি বিশেষ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের জনগণকে জানিয়েছেন। এটা ১৯৯৪ সালের ঘটনা। শেখ হাসিনা তখন বিরোধী দলের নেত্রী। আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টিসহ বিরোধী সব দলের উদ্যোগে সে সময় কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে তুমুল আন্দোলন চলছিল। এরই মধ্যে শেখ হাসিনা একবার লন্ডনে গিয়েছিলেন। সিরাজুর রহমান তখন তার সাাৎকার নিয়েছিলেন। প্রশ্ন ও উত্তরের এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, যে জাতি তার পিতাকে হত্যা করে সে জাতির কখনো সুখে থাকার অধিকার থাকতে পারে না। কথাটা শোনামাত্র টেপ রেকর্ডার বন্ধ করে দিয়েছিলেন সিরাজুর রহমান। বিরক্ত শেখ হাসিনার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কী বলছেন তার অর্থ নেত্রী বুঝতে পেরেছেন কি না। অর্থাৎ এর প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে তা বুঝে-শুনেই তিনি কথাটা বলেছেন কি না, নাকি নিতান্ত আবেগের বশে এত গুরুতর একটি কথা বলে ফেলেছেন। শেখ হাসিনা নাকি তখন তেড়ে উঠেছিলেন। বলেছিলেন, তিনি সব বুঝে-শুনেই যা বলার তা বলেছেন এবং তার এ কথাগুলো হুবহু প্রচার করতে হবে। প্রচার যদি না করা হয় তাহলে তিনি বিবিসির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকবেন। বিবিসি তাই হুবহু প্রচার করতে বাধ্য হয়েছিল।
এ শুধু সিরাজুর রহমানের বর্ণনা নয়, অন্য অনেকের মতো আমি নিজেও বিবিসির সে সাাৎকারটি শুনেছিলাম। শেখ হাসিনা আসলেও ‘যে জাতি তার পিতাকে হত্যা করে সে জাতির কখনো সুখে থাকার অধিকার থাকতে পারে না’ কথাটা বলেছিলেন। এটা যে তার মনের কথাই ছিল সে সম্পর্কেও অনেক উপলে ধারণা পাওয়া গেছে। উদাহরণ দেয়ার জন্য ২০০৪ সালের একটি তথ্যের উল্লেখ করা যেতে পারে। তারও আগে, ২০০১ সালের সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপে যে নির্বাচন দেশে-বিদেশে প্রশংসিত ও অভিনন্দিত হয়েছিল, পরাজিত হওয়ার পর থেকে সে নির্বাচনের ফলাফলকে শেখ হাসিনা প্রত্যাখ্যান করে আসছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ােভ, লজ্জা ও হতাশা থেকে জনগণকেও তিনি ‘উচিত শিা’ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। পাঠকদের মনে পড়তে পারে, সেবার রমজান মাসে হঠাৎ কাঁচামরিচের দাম বেড়ে গিয়েছিল। বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে এই দাম বাড়ার ব্যাপারে তার প্রতিক্রিয়া ছিল মানুষকে স্তম্ভিত করার মতো। পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসার পর শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘সরকার আছে, থাকুক না। জনগণ ১২০ টাকা কেজি কাঁচামরিচ খেয়েছে। আর একটু দেখুক। তারা কাঁচামরিচের ঝাল বুঝুক।’ শেখ হাসিনার এ বক্তব্যের অর্থ বা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সে সময় বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ নেত্রী প্রকৃতপে জনগণকেই ‘একহাত’ নিয়ে ছেড়েছিলেন। ‘আর একটু দেখুক’ এবং ‘ঝাল বুঝুক’ কথাটুকুর মাধ্যমে শেখ হাসিনা আসলে তাকে মতায় ফিরিয়ে না আনার এবং চার দলীয় জোটকে বিজয়ী করার কারণে মনের রাগ ঝেড়েছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, তাকে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী না বানিয়ে জনগণ যে ‘অপরাধ’ করেছে, জনগণকে তার ‘শাস্তি’ ভোগ করতে হবে। আগে তারা সে শাস্তি ভোগ করে নিক, তারপর সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিষয়টি দেখা যাবে। অর্থাৎ জনগণকে ‘উচিত শিা’ দেয়াটা ছিল তার করণীয় তালিকার এক নম্বরে।
হঠাৎ শুনতে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে, কিন্তু তথ্য বা কথাগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়ার পেছনে বিশেষ কারণ রয়েছে। ল করলে দেখা যাবে, এসবের মধ্য দিয়ে ‘সে জাতির কখনো সুখে থাকার অধিকার থাকতে পারে না’ কথাটারই তিনি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। এটা যে আসলেও তার মনের ভেতরে গেঁথে গেছে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে তিনি এবার মতায় আসার পরও। প্রতিটি বিষয়ে জাতীয় স্বার্থকে ুণœ করে কেবলই ভারতের ইচ্ছাপূরণের মতো অন্য সব তথ্যকে পাশ কাটিয়ে যদি শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে বিষয়বস্তু বানানো হয় তাহলেও দেখা যাবে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা এমনভাবেই দেশ চালাচ্ছেন যাতে জাতি কখনো ‘সুখে’ থাকতে না পারে। এ সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য বাজারের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যেতে পারে। সব ধরনের পণ্যের দাম বহুদিন ধরেই বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। বেড়ে চলেছে বাস, রিকশা ও সিএনজিসহ যানবাহনের ভাড়া। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাড়িভাড়া। বিদ্যুতের দাম তো এরই মধ্যে পাঁচবার বাড়িয়েছে সরকার। অন্য দিকে এসবের তুলনায় আয় তো বাড়ছেই না বরং অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির দাপটে অধিকাংশ মানুষের আয়-রোজগার অনেক কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়েই মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। তারা চোখে অন্ধকার দেখছেন। কোনো একটি প্রসঙ্গেই এখন আর শতকরা হিসাব মেলানো যাচ্ছে না। বলা যাচ্ছে না, অমুক পণ্যের দাম এত শতাংশ বেড়েছে। মূল্য ও ব্যয় বাড়ছে প্রতি মুহূর্তে। মুদি দোকানের বিক্রেতা থেকে বাস, রিকশা ও সিএনজিসহ যানবাহনের মালিকরা তো বটেই, বাড়িওয়ালারাও যার যার ঘাটতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য দাম বাড়িয়ে চলেছে। মাঝখান দিয়ে চিড়েচ্যাপ্টা হচ্ছে সাধারণ মানুষ। মতাসীনদের কথা অবশ্য আলাদা। কারণ, মানুষের যখন জিহ্বা বেরিয়ে পড়ছে তখনও তারা কল্পিত সফলতার ঢেঁকুর তুলে বেড়াচ্ছেন। গলার স্বর নামিয়ে আনার পরিবর্তে উল্টো পথেই হেঁটে চলেছেন তারা।
জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য হলেও মতায় আওয়ামী লীগ রয়েছে বলে এসবের মধ্যে অস্বাভাবিকতা না খোঁজাটাই ভালো। কারণ, সরকার শুধু চমক লাগানোর মতো কাণ্ড ঘটানোর রেকর্ডই করে চলেছে। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে শত শত ‘আবুল হোসেনের’। মতাসীন দলের ভেতরে তো বটেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের নানা স্তরেও ‘আবুল হোসেনরা’ রয়েছেন ওঁৎ পেতে। সারা বছর কাজ না করেও অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে কিভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ফিরিস্তি হাজির করতে হয়, ফাইল চালাচালি করানোর জন্য ‘নগদ নারায়ণ’ দিয়ে বড় সাহেবদের কিভাবে দলে ভেড়াতে হয়Ñ এসবও ‘আবুল হোসেন’রাই শিখিয়ে-পড়িয়ে দিয়েছেন। সব টাকা তাই বলে ‘আবুল হোসেন’দের পকেটে যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের আমলে অমনটা কল্পনাও করা যায় না! শোনা যাচ্ছে, এভাবে ‘আবুল হোসেন’দের দিয়ে আগামী নির্বাচনের জন্য তহবিল গঠন করার কাজ শুরু হয়েছে আরো অনেক আগে। এখন চলছে সে তহবিলকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলার তৎপরতা। সে কারণেই এক দিকে এডিপির প্রকল্পগুলো লুটপাটের কবলে পড়েছে, অন্য দিকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটেপুটে নিচ্ছে হলমার্কের মতো বাহারী নামের নানা কোম্পানি। কিন্তু সবকিছু জানাজানি হওয়ার পরও কারো ব্যাপারেই কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। জবাবদিহিতা আদায় করারও প্রশ্ন উঠছে না। অথচ সত্যি সদিচ্ছা থাকলে এ ধরনের লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে তৎপর হতো সরকার। বলা বাহুল্য, সদিচ্ছা নেই বলেই ‘আবুল হোসেন’দের প্রভাব ও দাপট সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। দেশও শুধু পিছিয়ে পড়ছে না, মুখোমুখি হচ্ছে সর্বনাশেরও।
অর্থমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বাগাড়ম্বরকেও এ বাস্তবতার আলোকেই বিচার করা দরকার। যথেষ্ট আবেগপ্রবণতা দেখানোর চেষ্টা করলেও মিস্টার মুহিত নিজেও কি বিভিন্ন সময়ে কম দেখিয়েছেন? শেয়ার কেলেঙ্কারির দিনগুলোতে তার ভূমিকা ও বক্তব্যের কথাই স্মরণ করা যাক। মাত্র ১৪ মাসেই শেয়ারবাজার থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল তিন লাখ ১৫ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা। ডিএসই হারিয়েছে এক লাখ ৫৪ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকার মূলধন। অন্য দিকে সিএসইর হারানো মূলধনের পরিমাণ এক লাখ ৬০ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। বিপুল এই মূলধনের যোগান দিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন ৩৩ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারী। তারা রাজপথে নেমে এসেছেন, আন্দোলন করেছেন। আত্মহত্যাও করেছেন কয়েকজন। কিন্তু সরকারের টনক নড়েনি। স্টকহোল্ডার নামের এর-ওর সঙ্গে লোক দেখানো বৈঠক করার এবং বাহারী নানা পদপে নেয়ার ঘোষণা দেয়ার বাইরে এমন কোনো ব্যবস্থাই সরকার নেয়নি যার মাধ্যমে শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে, লেনদেন হবে স্বাভাবিক নিয়মে এবং তিগ্রস্তরা তাদের পুঁজি ফিরে পাবেন। এমন এক অবস্থার মধ্যেও এই মুহিত সাহেবই ৩৩ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারীকে ‘ধান্দাবাজ’ ও ‘দুষ্টু লোক’ বলে তামাশা করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তদন্ত রিপোর্টে যাদের নাম এসেছিল তাদের সবার নামও ‘ডিলিট’ করার অর্থাৎ মুছে ফেলার ঘোষণা মুহিত সাহেবই দিয়েছিলেন।
এ ধরনের আরো অনেক তথ্যেরই উল্লেখ করা যায় যেগুলো প্রমাণ করবে, অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আব্দুল মুহিত বিশেষ কিছু এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি ব্যস্ত থেকেছেন। প্রতিটি এজেন্ডারই উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে ফেলা। বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে ফেলা। পাঠকরা প্রসঙ্গক্রমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেই কথাটুকু স্মরণ করতে পারেন যেখানে তিনি বলে রেখেছেন, ‘যে জাতি তার পিতাকে হত্যা করে সে জাতির কখনো সুখে থাকার অধিকার থাকতে পারে না।’ নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মুহিত সাহেব শেখ হাসিনার ইচ্ছাই পূরণ করেছেন, দেশের স্বার্থ দেখেননি। সে কারণে সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে আসার এবং আবারও মতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেেিত মুহিত সাহেব এখন কেটে পড়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হতেই পারেন। এখানেই রয়েছে দেশপ্রেমিকদের দায়িত্ব। দেখা দরকার, দেশপ্রেমিকরা মিস্টার মুহিতকে বিনাবিচারে বিদেশে চলে যেতে দেন কি না।
