প্রযুক্তি বনাম মানসিকতা
আসিফ হাসান
অনেককেই বলতে শোনা যায়, যে মোবাইল ফোনটি তার সার্বণিক সঙ্গী, সেটির সব কাজ-কারবার তিনি বোঝেন না। তার ১২-১৩ বছরের ছেলেটিই ভরসা। সে সব করে দেয়। শুধু মোবাইল ফোন নয়, ওই বয়সের অনেক বাচ্চাকেই দেখা যায়, সোফায় আধ-শোয়া হয়ে হাঁটুতে ল্যাপটপ রেখে হোম ওয়ার্ক করছে, প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই-বাছাই করছে। পাশে টিভি চলছে, ফাঁকে ফাঁকে আবার ফেসবুকের দিকেও চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। কিছু কিছু লিখছে, মোবাইলে ফোন করছে আর আইপড হেডসেট লাগাচ্ছে, খুলছে। বাংলাদেশেই নয়, আমেরিকার মতো দেশেও অভিভাবকেরা বুঝতে পারেন না, একটা শিশু কিভাবে এত কিছু একসঙ্গে করে। আগের প্রজন্ম যখন একটি কাজ করতেই হিমশিম খেতে থাকে, তখন শিশুরা পড়ার মধ্যেই অনেক কিছুতে মেতে থাকছে। তাদের কাছে এগুলোই স্বাভাবিক।
এখন অনেক বিশেষজ্ঞের কাছেই প্রশ্ন : ‘এভাবে কাজ করাতে মস্তিষ্কের ওপর কেমন প্রভাব পড়ে?’
এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা বেশ অবাক হয়ে গেছেন। দেখা যাচ্ছে, অফিস কর্মীরা প্রতি তিন মিনিটে তাদের ফোন, কম্পিউটার, সহকর্মীদের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। পথচলতে চলতেও মোবাইলে কথা বলা, রেডিওতে গান শোনার কাছ চলে একসঙ্গে। এমনকি গাড়ি চালানোর সময় ফোন ধরা অবৈধ হলেও সে কাজটিও প্রায় সবাই চালিয়ে যায়। অনেকেই মনে করছে, নীরবতা আর অবিচ্ছিন্ন মনোযোগ বিশ্বের সবচেয়ে দামি সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে।
তবে এটা বুড়োর দলের দীর্ঘশ্বাসের বিরুদ্ধে নতুনের কোনো আহ্বান নয়। কয়েক বছরে বিজ্ঞানীরা আমাদের মস্তিস্কের ধারণ মতা সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি করতে পেরেছেন। আমাদের মস্তিষ্ক কতটা কাজ করতে পারে, আমাদের চারপাশের পৃথিবী এটাকে কতটা বদলে দিতে পারে- সে সম্পর্কে তারা অবাক করা তথ্য পেয়েছেন।
মস্তিষ্ক কি বদলাতে পারে?
এক যুগ আগের পাঠ্যপুস্তক খুললেই আপনি দেখতে পাবেন, সেখানে লেখা রয়েছে, আপনি যে মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন, সেটা নিয়েই আপনি মারা যাবেন, সেখানে নতুন কোনো কোষের জন্ম অসম্ভব। সেই ধারণা এখন পাল্টে গেছে। বিজ্ঞানবিষয়ক ওয়েবসাইট ঝযধৎঢ়ইৎধরহং-এর সিইও ও প্রতিষ্ঠাতা অ্যালভারো ফারনান্ডোসের মতে, ‘অত্যাধুনিক স্ক্যানারে দেখা যাচ্ছে, আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। মস্তিস্কের কোষ মারা যায়, তবে সব সময়ই নতুন নতুন কোষ সৃষ্টি হতে থাকে। আর আপনার মস্তিষ্ক যে কাজ করছে, তার আলোকেই নতুন কোষগুলো প্রস্তুত হয়ে থাকে।’ অর্থাৎ আপনি মস্তিষ্ককে যে কাজটি দিচ্ছেন, তার-ই আলোকে সে বদলে যেতে থাকে।
সাম্প্রতিক আরেকটি আবিষ্কারে দেখা গেছে, আপনি যদি ঠিক সফটওয়্যারটি ব্যবহারের প্রশিণ গ্রহণ করেন, তবে কম্পিউটার র্যামের সমমানে আপনার কাজ করার মতা, স্মরণশক্তি (ওয়ার্কিং মেমোরি) বাড়বে। মনে মনে কোনো হিসাব কষা কিংবা কাউকে কোথায় যেন দেখেছি, এমন কিছু স্মরণ করার সময় আমরা জট পাকানো তথ্য বিশ্লেষণে এই মতাই ব্যবহার করি। আর এসবের মাধ্যমে আপনি আপনার আইকিউ দুর্দান্ত ১০ পয়েন্টে বাড়িয়ে নিতে পারেন।
আপনার মস্তিষ্কের বিশেষ কোনো দতা বাড়ানোর েেত্র করণীয় সম্পর্কে চমৎকার উদাহরণ হতে পারে লন্ডনের ব্ল্যাক ক্যাবের ড্রাইভাররা। মস্তিষ্কের স্ক্যানে দেখা গেছে, এসব ড্রাইভারের হিপ্পোক্যাম্পাস (মস্তিষ্কের যে অংশটি স্মৃতি ও পথচলার কাজটি করে) স্বাভাবিকের চেয়ে বড়। লন্ডনের হাজার হাজার রাস্তা তাদের মুখস্থ রাখতে রাখতে তাদের দেহের এই অংশটি বিকশিত হয়েছে।
একসঙ্গে অনেক কাজে লাভ?
একসঙ্গে অনেক কাজ করা উচিত কি না তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রবল মতবিরোধ রয়েছে। সাংবাদিক ও লেখক ম্যাগি জ্যাকসন মনে করেন, শব্দ, টুইটার আর ২৪/৭ ডিজিটাল তথ্যের কাছে আমাদের আত্মসমর্পণ আমাদেরকে নতুন অন্ধকার যুগে নিয়ে যাচ্ছে। একসঙ্গে অনেক কাজ আমাদের চূড়ান্ত দতার দিকে ঠেলে দিলেও তা আমাদের অদতাই প্রকাশ করছে। আমরা কাজগুলোর মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকি, কোনোটার দিকেই পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারি না। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, এতে করে আমাদের সৃষ্টিশীলতার সুযোগ থাকে খুব কম।
আমাদের মনোযোগ কি কমে যাচ্ছে ?
‘মোটেই না’Ñ জানালেন স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ডেভেলপমেন্টাল কগনিটিভ নিওরোসায়েন্স ল্যাবের প্রধান ড. টরকেল কিংবার্গ। যেসব বিজ্ঞানী মস্তিষ্কের কর্মমতা বাড়ে বলে প্রমাণ করেছেন, তিনি তাদের অন্যতম। তিনি বিশ্বাস করেন, নিজস্ব সমস্যা সমাধানের জন্য মস্তিষ্ক প্রয়োজনমতো নিজের সামর্থ্য বাড়িয়ে নেয়। তার মতে, তথ্য গ্রহণের চাপ গ্রহণ করার মধ্যে কোনো তি নেই এবং এতে করে আমাদের মতা বাড়ে।
আর এ কারণেই ওই শিশুটি যেভাবে হোমওয়ার্ক করছে, সেটা সত্যিকার অর্থে মস্তিষ্কের মতা বাড়ানোর দুর্দান্ত এক ব্যায়াম।
এখন কেউ-ই জানে না, সম্ভাব্য কিংবা দীর্ঘমেয়াদে এর প্রতিক্রিয়া কী হবে। কিন্তু তাই বলে, মস্তিষ্কের মতা বাড়ানোর সুযোগকে হাতছাড়া করা উচিত নয়। ব্রিটেনে এখন কম্পিউটার গেমের জন্য ‘ব্রেইন এইজ’, ‘ব্রেইন ট্রেনিং’ প্রোগ্রাম বিক্রি হচ্ছে। এই বিক্রি ভালোই হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১৫ মিলিয়ন ইউনিট বিক্রি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের কাজ শুরু হয়েছে, তবে ভিন্নভাবে। সেখানে ব্রেন জিম আছে, আছে অনলাইন সাইট। গত কয়েক বছরে এসব বাজারের বিক্রি হয়েছে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের।
ব্রেন ট্রেনিং কি ফলপ্রসূ?
নিউরোসায়েন্টিস্ট ও সাইকোলজিস্টদের মধ্যে এখনো এ নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। মার্কিন স্বাস্থ্য সংগঠন লাইফস্প্যান (তারা আলঝেইমার’স ও ডেমেনশিয়া জার্নাল প্রকাশ করে থাকে) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানিয়েছে, ব্রেন ট্রেনিং গেমগুলো এমনভাবে তৈরি, যার ফলে মস্তিষ্কে আলঝেইমার রোগ বাসা বাঁধতে পারে না বলে যে কথা বলা হয়, তা সত্য নয়। ভোক্তা ম্যাগাজিন হুইচও চলতি বছরের প্রথমদিকে একই ধরনের কথা বলেছে। ব্রেন ট্রেনিং যন্ত্রগুলোর কার্যমতা নিয়ে যেসব গালভরা কথা বলা হয়েছে, সে সম্পর্কে বাস্তব প্রমাণ তেমন পাওয়া যায়নি। আরো প্রমাণ সংগ্রহের ল্েয গত সেপ্টেম্বরে বিবিসি ব্রেন টেস্ট ব্রিটেন পরিচালনা করে। তারা ওয়েবসাইটে ছয় সপ্তাহব্যাপী ১০ মিনিটের ব্রেন ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য আগ্রহী সবাইকে আমন্ত্রণ জানায়। চলতি বছরে এর ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
তবে স্টারলিং ইউনিভার্সিটির সাইকোলজিস্ট ড. ট্রাসি অ্যালোওয়ের মতে, ব্রেন ট্রেনিং কাজ করে কি না তা প্রমাণের জন্য এ ধরনের বিশাল পরীা-নিরীার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তার মতে, যাচাইয়ের নামে অনেক নেতিবাচক সমীা হচ্ছে। তিনি আপনি আপনার মেধা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন কি না এবং সেজন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করছেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি কোনো জিমে গিয়ে প্রতিদিন ২০ মিনিট ওঠা-বসা করে ম্যারাথনে আপনার উন্নতি হলো কি না সে প্রশ্ন করতে পারেন না। আপনি যে কারণে যে ব্যায়ামটি করছেন, সেদিকে আপনার উন্নতিই বিবেচ্য বিষয়।
কোন ট্রেনিংটি ফলপ্রসূ?
ড. ট্রাসি অ্যালোওয়ে ও আরো কয়েকজন প্রমাণ করেছেন, ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে ওয়ার্কিং মেমরি বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ ধরনের ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে বুদ্ধিমত্তা ও মনোযোগমতা বাড়ানো যায়। অ্যালোওয়ে জানান, ‘আমার গবেষণায় দেখা গেছে দুর্বল ওয়ার্কিং মেমরি, যা ১০ শতাংশ শিশুদের মধ্যে দেখা যায়, পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
ফুয়েড বুদ্ধিমত্তা?
‘আমরা সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ফুয়েড বা তরল বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করি’, জানালেন আলভারো ফারনান্ডোস। এটা উদ্ভূত পরিস্থিতি উপলব্ধি করে সমস্যার সমাধান করে। এটা (ক্রিস্টালাইন ইন্টিলেজেন্স) স্ফটিকতুল্য বুদ্ধিমত্তার বিপরীত, যা দীর্ঘমেয়াদি মেমোরির ওপর নির্ভরশীল। তরল বুদ্ধিমত্তা ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়। অন্য দিকে, ক্রিস্টালাইন বুদ্ধিমত্তা ৬০ বছরের আগে হ্রাস পায় না। তবে এই বুদ্ধিমত্তা ফুটবল ম্যাচের গোল কিংবা নৌকা বানানোর কৌশল- সব কিছুই মনে রাখতে সাহায্য করে থাকে।
বদলে ফেলার সময় কি এটা নয়?
অবশ্যই। ইন্টারনেটের যুগে আমরা ক্রিস্টালাইন বুদ্ধিমত্তাকে পাশে সরিয়ে রাখতে পারি। কবে কোন রাজা সিংহাসনে আসীন ছিলেন, ডাইনোসর স্তন্যপায়ী প্রাণী ছিল কি না, সে-ই সব তথ্য মস্তিষ্কে ধারণ করে রাখার প্রয়োজন এখন অনেকটাই ফুরিয়েছে। এ জাতীয় হাজার হাজার তথ্য আমরা এখন অতি সহজেই পেতে পারি, আগের মতো অনেক বই ঘাটার দরকার নেই। এখনকার শিশুরা লিখতে লিখতে ইন্টারনেটে সেই সব তথ্যই টুকে নিচ্ছে। তাৎণিকভাবে যা কাজে লাগে, সেটাই এখন সবচেয়ে বেশি উপযোগী হয়ে উঠেছে।
আর ঠিক এ কারণেই ড. কিংবার্গ মনে করেন, অনেক কাজ একসঙ্গে করলেই আমাদের সম্ভাবনা বাড়ে। তার মতে, আমরা আইকিউ টেস্ট ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি, আইকিউয়ের সাধারণ মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে। এখানে সেটাই প্রয়োগ করা যেতে পারে। আপনি যখন অনেক কাজ একসঙ্গে করেন, তখন ক্রমবর্ধমান তথ্য আপনার ওয়ার্কিং মেমোরি বাড়িয়ে দেয়। সেটাই ফুয়েড বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধি করে। আধুনিক যুগ আমাদের অনেক বেশি এগিয়ে দিচ্ছে।
তবে এই জায়গাতেই অনেক কাজ একসঙ্গে করার আসল বিপদ নিহিত। ম্যাগি জ্যাকসনের মতে, এর ফলে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ মতা হ্রাস পেতে পারে। তিনি বলেন, ডিজিটাল যুগে আমরা একসঙ্গে অনেক কাজ করতে হতে পারে, কিন্তু সেটাই যদি আমাদের কাজ করার প্রধান পদ্ধতি হয়, তবে তা হবে বিপর্যয়। সফলভাবে কাজ করতে চাইলে, আপনাকে অবশ্যই পূর্ণ মনোযোগী হতে হবে।
সমস্যার মূলে রয়েছে, আমদের পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে আমরাও বদলে যাচ্ছি, যেভাবে আমরা প্রতিটি ইমেইলে সাড়া দিচ্ছি। এতে করে আমরা খেলার পুতুলে পরিণত হচ্ছি, ছোটাছুটিতেই মত্ত থেকে যাচ্ছি। জ্যাকসনের মতে, এই সমস্যা সমাধানে ব্রেন ট্রেনিং কাজ করবে ভাবলে ভুল হবে। তিনি বলেন, আমাদের সর্বোত্তম ধারণাগত সামর্থ্য ফুয়েড বুদ্ধিমত্তা, সৃষ্টিশীল অন্তর্দৃষ্টি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ সব কিছুরই একত্রে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আপনি যদি ইমেইল চেক, কম্পিউটারে লেখা কিংবা গান শোনার কাজ একসঙ্গে করতে থাকেন, তবে কোনোটিই যথাযথভাবে করতে পারবেন না।
(রিডার্স ডাইজেস্ট অবলম্বনে)
