তোফায়েলের সাহসী অভ্যুত্থান
আ’লীগে বিভক্তির আলামত
দ্বিখণ্ডিত বামপন্থীরাও
॥ মুনতাসির রহমান॥
শেষবেলায় এসে মন্ত্রিপরিষদ সম্প্রসারণকে অনাকাক্সিত নাটক বলে মনে করছেন শাসক দলের নেতাকর্মীরা। দলনেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় চারটি বছর ধরে যে সকল ভুল করে আসছেন সেসব ভুলের ষোলকলায় পূর্ণতা দিলেন মন্ত্রিপরিষদ সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে। তার প্রতিহিংসাপরায়ণ কর্মকাণ্ড বা নীতি আত্মঘাতী হবে, বুমেরাং হবে তা তিনি বুঝতে পারেননি। নিজ দলের মধ্যে তার একক কর্তৃত্ব নেতৃত্ব যে অচল হয়ে পড়েছে সেটাও প্রমাণিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্নপর্যায়ের অন্তত ৫০ জন নেতাকর্মীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করে সার কথা যেটা পাওয়া গেছে তা হলো : দলের মধ্যে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটা অভ্যুত্থান ঘটে গেল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক এ প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনাকালে বলেছেন, শেখ হাসিনা দলের সভানেত্রী হলেও একক নেতৃত্ব তার হাতে আর নেই। থাকলে তোফায়েল আহমেদ এত বড় সাহস দেখাতে সাহস পেতেন না। রাশেদ খান মেনন যিনি শেখ হাসিনার আশীর্বাদ নিয়ে নৌকায় চড়ে, ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনি তুলে খোদ রাজধানী থেকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছেন। তিনিও মন্ত্রিত্ব প্রত্যাখ্যান করলেন। পরিস্থিতি কতটা নাজুক তা মেননের মন্ত্রিত্ব প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে অনুমান করা যায়। আরো অবাক হওয়ার ঘটনা হলো : মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টি থেকেও একজনকে মন্ত্রী করার প্রস্তাব দেন শেখ হাসিনা। জাতীয় পার্টির নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ছিলেন তার পছন্দের প্রার্থী। আনিসুল ইসলাম রাজি ছিলেন, কিন্তু দলের প্রভাবশালী নেতা কাজী জাফরের চরম বিরোধিতার কারণে জেনারেল এরশাদ প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেন। এ জন্য শেখ হাসিনা ুব্ধ হয়ে বঙ্গভবনে জাতীয় পার্টিকে শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাননি। একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মন্ত্রিপরিষদ সম্প্রসারণের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান জড়িত ছিলেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তিনিই প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন এ ব্যাপারে। তাঁর পরামর্শ ছিল শুধু তোফায়েল আহমেদ নন, আমীর হোসেন আমু, আবদুল জলিলকেও মন্ত্রিপরিষদে নেয়া হোক। ৭ উপদেষ্টার মধ্যে ড. মসিউর রহমান, তৌফিক-ই-ইলাহী, এইচটি ইমাম, মোদাচ্ছের আলীসহ ৫ জন এবং বিতর্কিত মন্ত্রীদের বাদ দিতে হবে। যতজনকে বাদ দেয়া হবে তাদের স্থলে দলের অভিজ্ঞ নেতা, শরিক জাতীয় পার্টি ও ১৪ দল থেকে যোগ্যদের মন্ত্রী করা হবে। যে দাবিটি দলসহ বিভিন্ন মহল থেকে এতদিন করা হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শদাতারা একমাত্র তোফায়েল আহমেদ ছাড়া আর কাউকে মন্ত্রী করতে রাজি হয়নি। সূত্রটি আরো জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নিজেই তোফায়েল আহমেদের ব্যাপারে অনমনীয় ছিলেন। এজন্য তিনি সরাসরি তাকে ফোন না করে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে দিয়ে শপথ নিতে ফোন করান। বিষয়টি তোফায়েল আহমেদ জানতে পেরে ুব্ধ হন। মূলত এই ক্ষোভ থেকে তিনি শপথ নিতে রাজি হননি। তোফায়েল আহমেদের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে তোফায়েল আহমেদকে ডেকে গাজীপুর উপনির্বাচন পরিচলনার দায়িত্ব দেন। মন্ত্রিত্বের শপথ নেয়ার জন্য তিনি তাকে ডেকে বলতে পারতেন। সেটা না করায় তাঁর অভিমান ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। সরকার বা দলের জন্য একটি ভালো কাজ করতে যেয়েও দলনেত্রী ভুল করলেন। তাঁর এই প্রতিহিংসাপরায়ণতার জন্য যে ক্ষতি হয়ে গেল তার জন্য তিনি নিজেই দায়ী।
দলের মধ্যে বিদ্রোহ
দলের মধ্যে বিদ্রোহ হঠাৎ করে হয়নি। বিগত জাতীয় নির্বাচন, সরকার গঠন এবং দলের জাতীয় কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে ভেতরে ভেতরে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। সূত্রমতে, দলের মধ্যকার দ্বন্দ্বটা ছিল মূলত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে নিয়ে। ওয়ান-ইলেভেনে যারা সংস্কারপন্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন তারা দলনেত্রী শেখ হাসিনার কাছে শত্রুতে পরিণত হন। আওয়ামী লীগের ঘিলুওয়ালা প্রবীণ-নবীন অন্তত দুই ডজন নেতার প্রতি তিনি ভীষণ ুব্ধ ছিলেন। যে কারণে অনেককে তিনি গত নির্বাচনে মনোনয়ন দেননি। যাদের মনোনয়ন দেন তাদের কাউকে মন্ত্রী করেননি, দলের যোগ্য স্থানে রাখেননি। শেখ হাসিনার এ ধরনের স্বৈরাচারী নীতিকে দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মেনে নিতে পারেননি। হাসিনা বন্দনায় যারা মত্ত তাদেরকে কাছে টেনেছেন। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের একজন সহ-সভাপতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আবদুর রাজ্জাকের মতো একজন নেতাকে দুঃখবেদনা নিয়ে সরে যেতে হয়েছে। দলের জন্য দেশের জন্য যার এতবড় অবদান তিনি মন্ত্রী হয়ে চিরবিদায় নিতে পারলেন না। এটা আওয়ামী লীগের জন্য বেদনাদায়ক ঘটনা। এই বেদনাদায়ক ঘটনা অভিশাপে পরিণত হয়েছে বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। সেটা না হলে দল ও সরকারের মধ্যে এত বিশৃঙ্খলা কেন? সরকার যেটা করতে যাচ্ছে সেখানেই দুর্নাম। নির্বাহী প্রধান হিসেবে তার কথাও কেউ মানছেন না। প্রশাসনেও হ-য-ব-র-ল অবস্থা। আমলারা মন্ত্রীদের নির্দেশ পর্যন্ত মানছেন না। কোথাও চেইন অব কমান্ড নেই। সোহেল তাজকে ধরে রাখতে পারলেন না। ভারতের চাপে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দিতে পারছেন না। এত দুর্নামের পরেও দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের সরিয়ে দিতে পারলেন না। ছাত্রলীগ শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসী রাজত্ব কায়েম করে চলেছে। কিন্তু কিছুই করতে পারছেন না। কয়েক দিন আগে দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক হয়েছে। সেখানে দলের সাধারণ সম্পাদকসহ অধিকাংশ নেতা অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমানকে সরিয়ে দেয়ার কথা বলেন। নাম প্রকাশ করতে চাননি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য জানান, শুধু মসিউর রহমান নন, ৭ উপদেষ্টাকে বাদ দেয়ার কথা ওঠে। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে এসেছে তাদেরও সরিয়ে দেয়ার কথা বলেন অনেকে। বিশেষ করে ১৪ দলের শরিক সাম্যবাদী দলের দীলিপ বড়–য়াকে রাখা ঠিক হবে না বলে এক নেতা বৈঠকে বলেছেন। দলের পলিসি মেকার খ্যাত আমীর হোসেন আমুকে সচল করার দাবি তুলে এক বক্তা বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতি দলের জন্য ভয়ঙ্কর। এ সময় অতীত ভুলে গিয়ে দলকে সংগঠিত করতে হলে সংস্কারপন্থী এবং দূরে ঠেলে দেয়া নেতাদের কাছে টানতে হবে। দলকে শক্তিশালী করতে না পারলে আগামী নির্বাচনে চরম ভরাডুবি হবে। দলের জন্য ইতিবাচক কোনো বক্তব্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছুই বলেননি। তবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সরাসরি।
বামপন্থীরা দ্বিখণ্ডিত
বামপন্থীদের শাসক দলে চরম বিরোধ দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বলেছেন, স্বাধীনতার পর বামপন্থী নেতা মনি সিংহ ও মোজাফফর আহমেদ শেখ মুজিবকে ডুবিয়েছিলেন। তাদের পরামর্শে বাকশাল করতে যেয়ে ২১ বছর তার খেসারত দিতে হয়। এবার সেই বামপন্থীরাই শেখ হাসিনাকে ডুবাতে যাচ্ছে। সরকারের মধ্যে শেষ মুহূর্তে এসে মেনন এখন পিছুটান দিচ্ছেন। অন্যদিকে আরেক বাম ইনুকে সরাসরি মন্ত্রী পরিষদে আনলেন শেখ হাসিনা। মেনন-ইনু দু’জনই প্রথমদিকে মন্ত্রিত্ব না পেয়ে সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন। ১৪ দলের শরিক দল গণতন্ত্রী পার্টির এক নেতা এ প্রতিনিধিকে বলেন, বামপন্থীরা বরাবরই বিভক্ত। এবার আওয়ামী জোটে এসেও বিভক্ত হয়েছে। বিভক্তির জন্য মূলত আওয়ামী লীগই দায়ী। কারণ সরকার গত প্রায় চার বছরে দুঃশাসন ছাড়া সুশাসন দিতে পারেনি। ১৪ দলকে কোনো মূল্যায়ন করেনি। শেষ মুহূর্তে এসে যখন নৌকা ডুবতে বসেছে তখন শেখ হাসিনা ঘটা করে মেনন-ইনুকে মন্ত্রী বানাতে চাইলেন। রাজনীতিতে তারা দুজনই পাকা খেলোয়াড়। মেনন খেলবেন বাইরে থেকে, আর ইনু খেলবেন ভেতরে থেকে। ওই নেতা আরো বলেন, শেখ হাসিনা ভুল পথেই পা বাড়িয়েছেন।
গত চার বছরে আমাদের কোনো দিন ডাকেননি। এখন তরী যখন ডুবন্ত তখন ডাক পড়েছে। এ ডাকে ইনু সাড়া দিয়েছেন, কিন্তু অন্য বাম দলগুলো সাড়া দেবে না। সাড়া না দেয়ার প্রধান কারণ সরকারের দুর্নীতির দায় ১৪ দল নেবে না। হাসানুল হক ইনু কি জন্য দুর্নীতির দায় কাঁধে নিলেন তা তিনি বলতে পারবেন। তবে খোঁজখবর নিয়ে যদ্দুর জানা যাচ্ছে তাতে নির্বাচনের আগেই ১৪ দল বিভক্ত হয়ে যাবে। সিপিবির নেতৃত্বে বামপন্থীদের নিয়ে আলাদা একটি নির্বাচনী জোট হবে। তাতে জাসদ এবং সাম্যবাদী দল বাদে বাকিরা জোট বাঁধবে। সেখানে ড. কামাল হোসেনের গণফোরামসহ আরো কয়েকটি ছোট দল যুক্ত হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া মহাজোটের অন্যতম শরিক দল জাতীয় পার্টিও বেরিয়ে যাবে। শেখ হাসিনা মন্ত্রিপরিষদ সম্প্রসারণ করতে যেয়ে ভাঙ্গনকে আরো ত্বরান্বিত করেছেন। এমন মন্তব্য আওয়ামী লীগের নেতাদের। দলটির অনেকে বলেছেন, তোফায়েল আহমেদের সাহসী অভ্যুত্থান দলের বিরুদ্ধে নয়। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। তবে তার এ ভূমিকা আওয়ামী লীগকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তেমনি শীর্ষ নেতৃত্বকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। যার প্রভাব আগামী নির্বাচনের ওপর পড়বে।
