দরবার-এ শাহ
রায়ের ফাঁদে দেশ ও জাতি
কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ের নানাদিক নিয়ে এখন দেশের সচেতন সকল মহলে জোর আলোচনা চলছে। রায়টি আসলে প্রথম থেকেই আলোচিত শুধু নয়, বিতর্কিতও হয়ে এসেছে। গত বছর অর্থাৎ ২০১১ সালের ১০ মে রায় ঘোষিত হওয়ার পর এতদিন এটা ছিল ‘সংপ্তি আদেশের’ আকারে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ৩৪২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বার করে সেটা সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছে দিয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। এতে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সকলে অর্থাৎ সাতজন মাননীয় বিচারপতি স্বার করেছেন ১৪ সেপ্টেম্বর। মাঝখানে পার হয়ে গেছে দীর্ঘ ১৬ মাস চারদিন। এবার এ তথ্যও জানা গেছে যে, সাতজনের মধ্যে চারজন কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পে রায় দিয়েছিলেন। বাকি তিনজনের মধ্যে দু’জন সরাসরি বিরোধিতা করেছেন এবং একজন বিষয়টিকে জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়ার পে অভিমত দিয়েছেন। ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সকলে স্বার করায় রায়টি এখন আইনসম্মতভাবে কার্যকর হবে। এদিকে প্রকাশিত রায়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নানা প্রশ্ন যেমন উঠেছে তেমনি সৃষ্টি হয়েছে বিতর্কেরও। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ, প্রথমত, ‘সংপ্তি আদেশের’ আকারে রায়টি ঘোষণা করার সাতদিনের মধ্যে অবসরে গিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক। দায়িত্ব যেখানে ছিল অবসরে যাওয়ার আগেই সকলের স্বারসহ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে যাওয়া, সেখানে তিনি নিজে স্বার করতেই সময় নিয়েছেন দীর্ঘ ১৬ মাস তিনদিন। সে কারণে রায়ে স্বার দেয়ার অধিকার নিয়ে তো বটেই, অমন কোনো রায়ের বৈধতা ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞরা। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে প্রবীণ আইনজীবী ও সাবেক বিচারপতি টি এইচ খান বলেছেন, অবসরে যাওয়ার পর রায়টিতে স্বার দেয়ার এখতিয়ারই নেই সাবেক প্রধান বিচারপতির। স্বার দিলে রায়টি বৈধতা হারাবে। এতদিন পর স্বার দিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতির সঙ্গে একমত পোষণকারী অন্য বিচারপতিরাও অবৈধ কাজই করেছেন। বিচারপতি টি এইচ খান আরো বলেছেন, সম্পূর্ণ গায়ের জোরে রায়টি লেখা হয়েছে। কারণ সাবেক প্রধান বিচারপতি যখন স্বার করেছেন তখন আর তিনি শপথের অধীনে ছিলেন না। অথচ সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতিদের জন্য শপথের অধীন থাকাটা বাধ্যতামূলক। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিসহ আরো অনেকেই রায়টির বৈধতার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন।
‘সংপ্তি আদেশের’ আকারে ঘোষিত রায়ের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ রায়ের যথেষ্ট পার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক মৌলিক বিষয়েই রায় দুটির মধ্যে বিস্তারে ফারাক ল্য করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞরা। প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, ওপেন কোর্টে যখন ‘সংপ্তি আদেশের’ আকারে রায় ঘোষণা করা হয়েছিল তখন তার মধ্যে আগামী দুটি সংসদ নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে হতে পারে বলে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের পে মত প্রকাশ করেছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি। অথচ পূর্ণাঙ্গ রায়ের উপসংহারে বলা হয়েছে, কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা সংবিধানের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক’। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মতে এই বিচ্যুতি পরিস্কার ‘মিসকন্ডাক্ট’। প্রশ্ন উঠেছে, সংবিধানের সঙ্গে সত্যিই ‘সাংঘর্ষিক’ হয়ে থাকলে একই মাননীয় বিচারপতিরা কোন যুক্তিতে পরবর্তী দুটি নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে হতে পারে অভিমত প্রকাশ করেছিলেন? তারা কি তাহলে সংবিধানের বাইরে চলে যাননি? সাধারণ কোনো মানুষ করলে বিষয়টিকে কিন্তু এই মাননীয় বিচারপতিরাই সংবিধানের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে শাস্তি দিতেন! পূর্ণাঙ্গ রায়ে মতাসীনদের ইচ্ছা পূরণের অভিযোগও উঠেছে। যেমন সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি যেভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে ছোট মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন রায়টিতেও সেভাবেই অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে। ল্যণীয় যে, ‘নির্বাচিত’ ব্যক্তিদের নিয়ে মায়াকান্না জুড়ে দিলেও মাননীয় বিচারপতিরা কিন্তু উপদেষ্টাদের ব্যাপারে কিছু বলেননি!
রায়টির পটভূমিও বিতর্কের একটি প্রধান কারণ। ইতিহাসের পর্যালোচনায় দেখা যাবে, একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে ২০০৪ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিল। সে রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়েছিল গত বছরের ১ মার্চ। প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চকে সহায়তা করার জন্য ১০ জন সিনিয়র আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিযুক্তি দেয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, বিচারপতি টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, ড. এম জহির, ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি প্রমুখ শুনানিতে বক্তব্য রেখেছিলেন। কিছু সংস্কার ও পরিবর্তনের সুপারিশ করলেও ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি ছাড়া অ্যামিকাস কিউরিদের প্রত্যেকেই কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সংবিধানসম্মত ব্যাখ্যা ও বক্তব্যের পরও এবং পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সাত সদস্যের মধ্যে ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও প্রধান বিচারপতি হিসেবে খায়রুল হক কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করেছিলেন। ভিন্নমত পোষণকারীদের অভিমত সম্পর্কেও এতদিন কিছু জানতে দেননি তিনি।
বিতর্কের আরেকটি প্রধান কারণ হলো, কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পাশাপাশি একই রায়ে তখন একথাও বলা হয়েছিল যে, ‘দেশের শান্তি স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে’ পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু ১৪ সেপ্টেম্বর যে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে তার মধ্যে কথাটাকে গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়েছে। রায়ের একেবারে শেষদিকে, ৩৩৮ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা সাময়িকভাবে শুধু পরবর্তী দুটি সাধারণ নির্বাচনের েেত্র থাকিবে কি না সে সম্বন্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র জনগণের প্রতিনিধি জাতীয় সংসদ লইতে পারে।’ পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, ‘কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনকারী ত্রয়োদশ সংশোধনী ‘অবৈধ’ হওয়া সত্ত্বেও ‘সহস্্র বছরের পুরাতন ল্যাটিন ম্যাক্সিম প্রয়োগ করতঃ’ দশম ও একাদশ নির্বাচন জাতীয় সংসদের বিবেচনা অনুসারে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার অধীনে হতে পারে। ল্যণীয় যে, মাননীয় বিচারপতিরা কিন্তু ‘ল্যাটিন ম্যাক্সিম’-এর আড়াল নিয়ে একটি ‘অবৈধ’ ব্যবস্থাকেই বৈধতা দিয়েছেন। তাও আবার পরপর দুটি সংসদ নির্বাচনের জন্য!
একই কারণে ১৬ মাস আগে ঘোষিত ‘সংপ্তি আদেশ’ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে, মাঝখানের ১৬ মাসে এমন কিছু ঘটে গেছে কি না যার জন্য ‘পরবর্তী দুটি নির্বাচন’ সম্পর্কিত অংশটুকুকে ভিন্নভাবে এবং অনেক কম গুরুত্বের সঙ্গে ৩৩৮ নম্বর পৃষ্ঠায় গিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাসঙ্গিক একটি কারণও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ১৬ মাস আগে রায়ের নামে যা ঘোষণা করা হয়েছিল তা ছিল একটি ‘সংপ্তি আদেশ’, পূর্ণাঙ্গ রায় নয়। অথচ এ ‘সংপ্তি আদেশের’ ভিত্তিতেই মতাসীনরা তাড়াহুড়ো করে সংবিধান সংশোধন করেছেন এবং কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছেন। এটা কিন্তু সম্ভব হতো না বিচারপতি খায়রুল হক যদি শুধু একথাটুকু যুক্ত করে দিতেন যে, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার আগে সংবিধান সংশোধন করা যাবে না। অন্যদিকে সব জেনে-বুঝেও প্রধান বিচারপতি হিসেবে খায়রুল হক সুকৌশলে ‘সংপ্তি আদেশ’টিকেই সে সময় প্রাধান্যে এনেছিলেন। মতাসীনরাও সে সুযোগের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন। ঘটনাপ্রবাহে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল জাতীয় সংসদের মর্যাদা এবং উচ্চ আদালতের এখতিয়ার নিয়ে। বলা হয়েছে, আদালতের রায়ে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে। রায়ের মাধ্যমে প্রকৃতপে আওয়ামী লীগের ইচ্ছারই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও প্রশ্ন উঠত না, মতাসীনরা যদি বিষয়টিকে সংসদে নিয়ে যেতেন। অন্যদিকে বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য নামকা ওয়াস্তে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং সে কমিটিকেও কোনো বিষয়ে ভূমিকা পালন করতে দেয়া হয়নি। কমিটির পে তৎপরতা চাালিয়েছেন প্রধানত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। আইনমন্ত্রী এই মর্মে ব্যাখ্যাও হাজির করেছিলেন যে, রায়ের আলোকে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করাই নাকি যথেষ্ট! এখানে নাকি সংসদের তেমন কিছু করার নেই! এই ব্যাখ্যার পরিপ্রেেিত মনে হয়েছিল, সরকার সংসদকে একই সঙ্গে হুকুম পালনকারী থানায় শুধু নয়, ছাপাখানায়ও পরিণত করতে চাচ্ছে। কারণ, আদালতের হুকুম সাধারণত থানা-পুলিশই পালন করে থাকে, অন্যদিকে মুদ্রণের কাজ করে ছাপাখানা। কোনোটিই নির্বাচিত জাতীয় সংসদের কাজ নয়। মূলত এমন ব্যাখ্যার পরিপ্রেেিতই সে সময় প্রশ্ন উঠেছিল, নির্বাচিত এবং ‘সার্বভৌম’ জাতীয় সংসদকে যদি ব্যক্তির তথা দু-একজন বিচারপতির ইচ্ছাই পূরণ করতে হয় তাহলে আর জাতীয় সংসদ রাখার যৌক্তিকতা কোথায়?
এজন্যই বলা হচ্ছে, স্ববিরোধিতাপূর্ণ রায়টি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মতাসীনদের ইচ্ছা পূরণ করা। কথাটা বলার কারণ, সংবিধান সংশোধনের সময় মতাসীনরা শুধু কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল সম্পর্কিত অংশটুকুকেই হাতিয়ার বানিয়েছেন। তারা ‘সংপ্তি আদেশের’ সঙ্গে জুড়ে দেয়া সে অভিমতটুকুর ধারেকাছেও যাননিÑ যেখানে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে তখন বলা হয়েছিল, ‘দেশের শান্তি স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে’ পরবর্তী দুটি নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। এটা আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কি না সেটা একটি প্রশ্ন বটে, তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিচারপতি খায়রুল হককে তখন টু শব্দটিও করতে দেখা যায়নি। কথা আরো আছে। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ‘সংপ্তি আদেশের’ আকারে রায় ঘোষণা করেছিলেন ২০১১ সালের ১০ মে। অথচ আওয়ামী লীগ সরকার কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করে ফেলেছিল তারও অনেক আগেÑ ১০ ফেব্র“য়ারি, যখন এমনকি শুনানিই শুরু হয়নি। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকসহ দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে ‘গুরুতর’ হিসেবে উল্লেখ করলেও এবং এ ব্যাপারে প্রতিকারের দাবি উঠলেও প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। সঙ্গত কারণেই তখন প্রশ্ন উঠেছিল, সরকার সত্যি আদালতের ‘রায়ের আলোকে’ ব্যবস্থা নিয়েছিল, নাকি আদালতের আড়ালে বিশেষ কোনোজন সরকারের ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন? এরপর এসেছিল সংবিধানকে কাটছাঁট করার পালা। সে পর্যায়েও সর্বোচ্চ আদালত নীরবতাই পালন করেছিলেন।
অন্য কিছু কারণেও বিচারপতি খায়রুল হক ব্যক্তিগতভাবে বিতর্কিত হয়েছেন। এ রকম খুবই উল্লেখযোগ্য একটি কারণ হলো, ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট তিনি এবং বিচারপতি ফজলে কবির সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে একটি রায় দিয়েছিলেন। এর পেছনে ছিল পুরনো ঢাকার মুন সিনেমা হলের মালিকানা বিষয়ক প্রশ্ন। সমালোচনায় বলা হয়েছিল, এমন কোনো মামলার রায়ে পঞ্চম সংশোধনীর মতো রাষ্ট্রীয় বা সংবিধানের এমন কোনো বিষয়কে টেনে আনা সমীচীন হয়নি, যার সঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান ‘সার্বভৌম’ জাতীয় সংসদ জড়িত রয়েছে। কারণ, সংশোধনীসহ সংবিধান সংক্রান্ত সকল বিষয়ে এখতিয়ার রয়েছে কেবল সংসদেরই। রায়টি ঘোষিত হওয়ার পর পর প্রবীণ আইনজীবী ও সাবেক বিচারপতি টি এইচ খান যথার্থই বলেছিলেন, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ হাইকোর্ট বিভাগকে কিছু মতা দিয়েছে সত্য কিন্তু তাই বলে সংসদে পাস হওয়া কোনো সংশোধনী বাতিল করার মতা দেয়নি। পঞ্চম সংশোধনী ছিল দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদে পাস হওয়া একটি ‘অ্যাক্ট অব পার্লামেন্ট’। সেটা বাতিল বা সংশোধন করার এখতিয়ারও একমাত্র সংসদেরই, বিচারপতিদের নয়। এজন্যও আর একটি ‘অ্যাক্ট অব পার্লামেন্ট’ই দরকার। অর্থাৎ যা কিছু করার সবই সংসদকে করতে হবে। এ ব্যাপারে বিচারপতিদের রায় চূড়ান্ত হতে পারে না। কিন্তু মাননীয় বিচারপতিরা তাদের সীমা অতিক্রম করেছিলেন, অন্যদিকে মতাসীনরাও পরিস্থিতির সুযোগ নিতে ভুল করেননি। সে সময়ও বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায় দেয়ার অভিযোগ উঠেছিল। বলা হয়েছে, রায়ের মাধ্যমে প্রকৃতপে আওয়ামী লীগের ইচ্ছারই বাস্তবায়ন করেছেন তিনি।
সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ রায়ের মাধ্যমেও সঙ্কটের আগুনে ঘি ঢেলে গেছেন এই সাবেক প্রধান বিচারপতি। দীর্ঘ ১৬ মাস পর স্বারিত রায়টির বিভিন্ন দিক বা প্রসঙ্গ নিয়ে বিতর্ক কেবল বাড়তেই থাকবে। মতাসীনরা যে নিজেদের মনের মতো করে ব্যাখ্যা হাজির করবেন তার লণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। উদ্বেগের কারণ হলো, সবদিক থেকেই সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক জাতিকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে গেছেন। কারণ, বিশেষ করে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া রায়ের কারণে রাজনৈতিক সঙ্কট মারাত্মক হয়ে উঠেছে। এই সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সহজে সম্ভব হবে না এবং তার ফলে দেশ ও জাতির তি হবে অপুরণীয়। নির্বাচন ও সংসদসহ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াও ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বলা দরকার, পূর্ণাঙ্গ এ রায়ের ফলে মতাসীনরাও বিপদে পড়বেন। কারণ, এতে নির্বাচনের অন্তত ৪২ দিন আগে সংসদ ভেঙে দেয়ার এবং নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ছোট আকারের মন্ত্রিসভা গঠনে নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনার ‘আলোকে’ ব্যবস্থা নিতে হলে সংবিধানে অবশ্যই আরো একবার কাঁচি চালাতে হবে। মতাসীনরা অবশ্য সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার জন্য এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারেন। তারা যদি অন্য কোনো নামে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনেন তাহলে নির্বাচন নিয়ে কোনো সমস্যাই থাকবে না। এখন দেখার বিষয়, উচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি এত যাদের শ্রদ্ধা সে মতাসীনরা কোন পথে পা বাড়ান। তবে একটি কথা বলতেই হবে, সাবেক প্রধান বিচারপতি দেশ ও জাতিকে রায়ের ফাঁদে ফাঁসিয়ে রেখে গেছেন। সব সংকট ও সম্ভাব্য সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির জন্য জনগণও প্রধানত একজনকেই দায়ী করবে। তার পরিচিতির ব্যাপারে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক নিশ্চয়ই ভেবে দেখবেন।
