॥ জামশেদ মেহ্দী ॥
১৮ দলীয় জোট এখন বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের প্ল্যাটফর্ম। বেগম খালেদা জিয়া ঐ প্ল্যাটফর্ম তথা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কন্ঠস্বর। সেই বেগম জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে যে বক্তব্য রেখেছেন সেটি এ দেশের কোটি কোটি মানুষের ধ্বনির প্রতিধ্বনি। ১৬ মাস অবসরে থাকাকালে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক যে রায়টি লিখেছেন অবসরে যাওয়ার পর সেই রায় লেখার আদৌ কোনো আইনী ও সাংবিধানিক ক্ষমতা তাঁর রয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন বেগম খালেদা জিয়া। বিগত ১৬ মাসে রাজনীতির অঙ্গনে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বুড়িগঙ্গা দিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক গতিধারার সাথে তাল মিলিয়ে খায়রুল হক বসে বসে এমন একটি রায় লিখেছেন যেটি শাসক দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক এজেন্ডা রাস্তবায়নে বিপুলভাবে সহায়তা করেছে। সেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন বেগম জিয়া তাঁর সংবাদ সম্মেলনে। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা ঘোষণা করছি যে সাবেক প্রধান বিচারপতির দেয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত অযৌক্তিক ও পরস্পরবিরোধী রায় জনগণ কখনো গ্রহণ করবে না এবং তার ভিত্তিতে আয়োজিত কোনো নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করবে না। ’ রায়ের রাজনৈতিক মতলব সম্পর্কে বেগম জিয়া কোনোরূপ রাখঢাক না করে বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের নামে পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সরকারি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলন চলছে এবং ক্রমান্বয়ে তা তীব্র হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারকে তাদের অনৈতিক ইচ্ছা পূরণের হাতিয়ার হিসেবে নতুন করে লেখা এই রায় উপহার দেয়া হলো। আরো অবাক ব্যাপার হলো এই যে, ফখরুদ্দিনের ২ বছরের জরুরি সরকারকে অসাংবিধানিক এবং অবৈধ হিসেবে আখ্যা দেয়া সত্ত্বেও ঐ সরকারের সমস্ত কার্যকলাপকে খন্ডন বা মার্জনা করা হয়েছে। অর্থাৎ মঈনউদ্দিন ফখরুদ্দিনের সমস্ত কার্যকলাপকে বৈধতা দেয়া হয়েছে।
একই রায় দুইবার করে লেখা
খায়রুল হক নিজেই স্বীকার করেছেন যে, পূর্ণাঙ্গ রায় একবার লিখে তিনি চলতি বছরের ২৯ মার্চ সুপ্রিম কোর্টে জমা দিয়েছিলেন। এর কিছু দিন পর তিনি রায়টি ফেরত নিয়ে যান। ফেরত নেয়ার কয়েক মাস পর তিনি রায়টি সংশোধন করেন। সেই সংশোধিত রায় তাদের ৪ জনের রায় হিসেবে স্বাক্ষরিত ও প্রকাশিত হয়েছে। খায়রুল হক ছাড়া অপর ৩ জন বিচারপতি হলেন বর্তমান প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন, এস কে সিনহা এবং বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে জনাব খায়রুল হক একই রায় ৩ বার লিখেছেন। প্রথম রায়টি হলো ৮-৯ লাইনের সংক্ষিপ্ত রায়। দ্বিতীয়টি হলো ২৯ মার্চের রায়, যেটি ফেরত নেয়া হয়েছে এবং যেটি দিনের আলোর মুখ দেখেনি। সব শেষে প্রকাশিত ও ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ রায়। তাহলে পূর্ণাঙ্গ রায়টি হলো তৃতীয় রায়। প্রথম ও তৃতীয় রায়ের মধ্যে রয়েছে বিরাট অসঙ্গতি ও পরস্পর বিরোধিতা। দ্বিতীয় রায়ের সাথে প্রথম রায় অথবা তৃতীয় রায়ের কতখানি সঙ্গতি অথবা কতখানি অসঙ্গতি ছিল সেটি খায়রুল হক ছাড়া আর কেউ বলতে পারবেন না। প্রশ্ন উঠেছে, ২৯ মার্চের পূর্ণাঙ্গ রায়টি তিনি ফেরত নিয়েছিলেন কেন? এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে যে শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী সরকারের ইচ্ছা এবং রাজনৈতিক কৌশলে সহায়ক শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য তিনি সময় ক্ষেপণ করেছেন এবং রায়টি ফেরত নিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়াও সংবাদ সম্মেলনে খায়রুল হকের বিরুদ্ধে সেই অভিযোগই করেছেন। নেহায়েত সমালোচনা জন্য এটি কোনো সমালোচনা নয়। সংক্ষিপ্ত প্রথম রায়ে এবং পূর্ণাঙ্গ রায়ের একটি অংশ তুলে ধরলেই জনগণের কাছে খায়রুল হকের বিচার নিয়ে রাজনৈতিক খেলা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
সংক্ষিপ্ত অর্ডার
সকলেই দেখেছেন যে আগামী দু’টি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়ার কথা ছিল। সংক্ষিপ্ত রায়ে সেই রকম কথাই বলা হয়েছিল। জনগণের তাৎক্ষণিক অবগতির জন্য সংক্ষিপ্ত রায়ের ইংরেজিসহ বাংলা অনুবাদ নিম্নে তুলে ধরছি। Short Order: It is hereby declared : (1) The appeal is allowed by majority without any order as to costs. (2) The Constitution (Thirteenth Amendment) Act 1996 (Act 1 of 1996) is prospectively declared void and ultravires the Constitution. (3) The election to the tenth and eleventh Parliament may be held under the provisions of the above mentioned Thirteenth Amendment of the age old principle, namely quod alias non est licitum, necessitas licitum facit (That which otherwise is not lawful, necessity makes lawful), salus populi suprema lex (safety of the people is supreme law). The Parliament, however, in the meantime, is at liberty to bring necessary amendments excluding, the provisions of making the former Chief Justice of Bangladesh or the Judges of the Appelate Division as the head of the Non Party Care taker Government.
(সংক্ষিপ্ত আদেশ : এই মর্মে ঘোষণা করা হলো : ১. সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী (তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বৈধ উল্লেখ করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে) আপিল গ্রহণ করা হলো। ২. সংবিধানের (ত্রয়োদশ সংশোধনী) অধ্যাদেশ ১৯৯৬ (১৯৯৬-এর অধ্যাদেশ ১) এই রায়ের দিন থেকে বাতিল এবং সংবিধান পরিপন্থী বলে ঘোষণা করা হলো। ৩. তবে আগামী দশ ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর অধীনে গৃহীত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত হতে পারে। এ জন্য যে, অনেক সময় আইন না থাকলেও প্রয়োজনই আইনসম্মত বলে বিবেচিত হয়, দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ আইন হিসেবে ধরে নেয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে সংসদ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অথবা আপিল বিভাগের কোনো বিচারককে যুক্ত করার বিধান সংশোধন করে নিতে পারে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ের স্ববিরোধিতা
সংক্ষিপ্ত রায় অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক অসাংবিধানিক হলেও রাষ্ট্র ও জনগণের সর্বোচ্চ স্বার্থে তত্ত্বাবধায়কের অধীনে আগামী ২টি নির্বাচন হতে পারে বলে তিনি বলেছিলেন। সেই একই খায়রুল হক ১৬ মাস পর পূর্ণাঙ্গ রায়ে বললেন যে যদি জাতীয় সংসদ চায় তাহলে আগামী ২টি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে হতে পারে। মাত্র ১৬ মাসের ব্যবধানে খায়রুল হকের একই কলম থেকে সম্পূর্ণ স্ববিরোধী বা পরস্পরবিরোধী ২টি রায় বের হলো। তিনি জাতীয় সংসদের কথা কেন বললেন? তিনি কি জানেন না যে আওয়ামী লীগ প্রভাবিত জাতীয় সংসদ ইতোমধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক বাতিল করেছে? ১৬ মাস পর পূর্ণাঙ্গ রায়ে খায়রুল হক কি আওয়ামী লীগের পঞ্চদশ সংশোধনীর পোস্ট ফ্যাক্টো অনুমোদন দিলেন না? এই ধরনের রায় জনগণের কাছে কিভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? সম্ভবত এই কারণেই প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক রায় সংশোধনকে একজন বিচারপতির পক্ষে অসদাচরণ বলে মন্তব্য করেছেন। বার সমিতির প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও বার কাউন্সিলের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন এটিকে সরাসরি প্রতারণা বলে আখ্যায়িত করেছেন।
অনির্বাচিত সরকারের যুক্তি
ধোপে টেকে না
খায়রুল হকের প্রধান যুক্তি ছিল যে, তিন মাসের জন্য যে অনির্বাচিত সরকার গঠিত হবে সেটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবে না। তাই সেটি হবে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর লঙ্ঘন। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার তথা সংবিধানের ১৩ নম্বর সংশোধনী সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই সেটিকে বাতিল করা হলো। খায়রুল হকের এই যুক্তির সাথে অপর তিনজন বিচারপতি, অর্থাৎ বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিয়া, বিচারপতি নাজমুল আরা সুলতানা এবং বিচারপতি ইমান আলী এক মত হননি। সমস্যার সমাধান হিসেবে বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিয়া বিষয়টি জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়ার বিভক্ত রায় দিলেও সংবিধানের মৌলিক কাঠামো এবং ‘নির্বাচিত’ ‘অনির্বাচিত’ প্রশ্নে খায়রুল হকের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন। এই তিনজন বিচারপতিই তাঁদের রায়ে বলেছেন, যে মন্ত্রিসভায় ১০ শতাংশ টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী নেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তারা সকলেই অনির্বাচিত। বর্তমান মন্ত্রিসভাতেও ৩ জন অনির্বাচিত মন্ত্রী রয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে ৪৫ জন মহিলা সংসদ সদস্য রয়েছেন। তাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। ৪৫ জন সংসদ সদস্য একটি বিরাট শক্তি। তাঁরা দেশ শাসনের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মন্ত্রিসভায় যদি অনির্বাচিত সদস্য থাকতে পারেন, সংসদ সদস্যদের মধ্যে প্রায় অর্ধশত যদি অনির্বাচিত থাকতে পারেন তাহলে মাত্র ৩ মাসের জন্য একটি অনির্বাচিত সরকার, তাও যেটি শুধুমাত্র অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য গঠিত হবে, সেটি কেন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী হবে? যদি সেটি সংবিধান পরিপন্থী হয় তাহলে অনির্বাচিত মন্ত্রী এবং ৩০০ জনের ভোটে নির্বাচিত ঐ ৪৫ জন মহিলা এমপির প্রভিশনও সংবিধানের পরিপন্থী হবে। এ ব্যাপারে খায়রুল হক দুর্বোধ্য নীরবতা অবলম্বন করেছেন।
সংসদ ভেঙে যাওয়ার
পর কী হবে?
খায়রুল হকের রায়ে রয়েছে যে নির্বাচনের ৪২ দিন আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে যাবে। তখন প্রধানমন্ত্রী এবং সমস্ত মন্ত্রীসহ সমস্ত সদস্য আর সংসদ সদস্য থাকবেন না। বলা হচ্ছে যে, ঐ ৪২ দিন অথবা নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান মন্ত্রিসভা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ছোট আকারে অস্থায়ী সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এখন খায়রুল হক সাহেব বলুন, ঐ ৪২ দিন বা ততধিক দিন শেখ হাসিনার ঐ অন্তর্বর্তী সরকার তো তখন অনির্বাচিত সরকার থাকবে। তাহলে সেটি জায়েজ হয় কিভাবে? খায়রুল হক একই যাত্রায় দুই রকম ফল ফলাবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন।
এ ছাড়া বড় কথা হলো, চারজন দিয়েছেন এক রকম রায় আর তিনজন দিয়েছেন ভিন্ন রায়। সুতরাং এই বিভক্ত রায় সর্বসম্মত রায়ের মতো শক্তিশালী হতে পারে না এবং তাই সর্বশ্রেণীর জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ থাকে।
বেগম জিয়া জনগণের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি করে যথার্থই বলেছেন যে, এই ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায়ের অধীনে নির্বাচন হতে পারে না। সেই নির্বাচন জনগণ অনুষ্ঠিত হতে দেবে না।
jamshedmehdi15@gmail.com
এ পাতার অন্যান্য খবর
- রেলের অযৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধি
- পদ্মা সেতুতে ফেরার সিদ্ধান্ত হয়নি : বিশ্বব্যাংক
- নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি না মানলে কঠোর কর্মসূচি আসবেই
- বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে অর্থপাচারসহ ২৯ অভিযোগ
- তুরস্কে ৩ শতাধিক সেনা কর্মকর্তার কারাদণ্ড
- ১৯৭১ সালের মে থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি মাওলানা সাঈদী আমার বাড়িতে ছিলেন
- মাওলানা আব্দুস সুবহান কেমন আছে কেউ জানে না
- রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে র্যাব : হারস
