সারা বিশ্বে রেল যোগাযোগ সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সাশ্রয়ী যাতায়াত মাধ্যম। আর তাই প্রতিটি দেশেই রেল যোগাযোগ উন্নত করার চেষ্টা চলে। ইউরোপসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যাতায়াত ব্যবস্থা রেলপথনির্ভর। অন্য যোগাযোগ মাধ্যমের তুলনায় রেলপথে ভাড়া যেমন কম তেমনি দ্রুততর ও নিরাপদ। সুবিধার দিক থেকে উন্নত হওয়ায় সারা বিশ্বে রেলওয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং যাত্রীও বেশি। প্রতিটি রাষ্ট্রও রেলওয়েকে সর্বসাধারণের যানবাহন হিসেবেই গড়ে তুলেছে। কিন্তু বাংলাদেশে তার ব্যতিক্রম। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ উন্নয়নের তেমন কোনো চেষ্টা চলেনি। বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারই রেল যোগাযোগকে অবহেলা করে সড়ক পথকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত রয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে রেল যোগাযোগ উপেক্ষিত হয়েছে আর জনগণ হয়েছে রেলবিমুখ।
প্রতিটি দেশে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও জলপথ ব্যতীত রেলপথেই বেশি মালামাল পরিবহন হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে রেলপথে মালামাল পরিবহনের পরিমাণ অনেক কম। এক সময় বাংলাদেশে শতকরা ৭০ ভাগ মালামাল পরিবহন করা হতো রেলপথে। আর বর্তমানে তা কমে ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশে রেল যোগাযোগে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন কমার পাশাপাশি রেলপথও কমেছে। সর্বোপরি রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে রেল বিভাগের প্রতি গুরুত্ব না দেয়ার কারণে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম রেল অবহেলিত।
সড়ক পথ যখন সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, দেশের সাধারণ মানুষ রেল যোগাযোগমুখী হচ্ছে তখন সরকার রেলপথের ভাড়া বৃদ্ধি করছে। আর সরকারের পক্ষ থেকে এ বৃদ্ধির হারও অনেক বেশি। বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রেলের ভাড়া বৃদ্ধি করা হচ্ছে শতকরা ৫০ ভাগ। বিশ্লেষকরা বলছেন বাড়ানো রেলের ভাড়ায় ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ রয়েছে। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ৫০ শতাংশ হারে ভাড়া বাড়লেও প্রকৃতপে বাড়ছে সর্বোচ্চ ১১৫ শতাংশ। এ েেত্র বাড়তি ভাড়ার ‘অজুহাত’ হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে বিশেষ রেয়াত সুবিধা কর্তন। আগামী ১ অক্টোবর থেকে এ বর্ধিত ভাড়া কার্যকর হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত হঠাৎ করে রেলের ভাড়া ১১৫ শতাংশ বৃদ্ধির কারণে রেল যোগাযোগের প্রতি সাধারণ জনগণের আকর্ষণ আগ্রহ আবার কমে যাবে। ভোক্তা অধিকার সংস্থার নেতৃবৃন্দও বলছেন সাধারণ জনগণ এ বর্ধিত ভাড়া মেনে নেবে না। যেহেতু বাংলাদেশে রেলের সেবার মান উন্নত নয় কিন্তু ভাড়া সাশ্রয়ী হওয়ায় জনগণ রেলপথের প্রতি আগ্রহী ছিল। কিন্তু সেবার মান উন্নত না করে রেলের ভাড়া বৃদ্ধি করায় জনগণ পুনরায় সড়ক যোগাযোগমুখী হবে। তাই আমাদের পরামর্শ রেলের ভাড়া বৃদ্ধি না করে সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকি বাড়ানো প্রয়োজন। সরকারকে রেলপথ, রেলের কোচ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে রেল যোগাযোগকে সাধারণ জনগণের নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ মাধ্যমে পরিণত করতে হবে। সর্বোপরি এ মুহূর্তে রেলের ভাড়া বৃদ্ধি নয়, রেলের সার্বিক উন্নয়ন প্রয়োজন।
