সরকারবিরোধীরা কোনো বিশেষ প্রসঙ্গে চুপ থাকতে বা প্রসঙ্গটিকে পাশ কাটাতে চাইলে কি হবে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের দিয়ে না বলানো পর্যন্ত থামবেন না। সর্বশেষ েেত্র আবারও পদ্মা সেতু নিয়ে খোঁচা মেরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাই বলে দেশের ভেতরে নয়, ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক দলীয় অনুষ্ঠানে বলেছেন। তাঁর দু’টি বক্তব্য নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রথমত বিশ্বব্যাংক নাকি কিছু ‘যৌক্তিক’ ও ‘অযৌক্তিক’ কারণে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ঋণচুক্তি বাতিল করেছিল এবং ‘দেশের স্বার্থে’ তারা অসম্মানজনক শর্তে রাজি হয়ে বিশ্বব্যাংককে ফিরিয়ে এনেছেন। দ্বিতীয় বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের কোনো এক ‘বিশেষজন’ নাকি তার ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে বিশ্বব্যাংককে দিয়ে ঋণচুক্তি বাতিল করিয়েছিলেন!
পদ্মা সেতুর দুর্নীতিকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহে বাংলাদেশের মানসম্মান একেবারে ডুবে গেছে বলেই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দু’টি পর্যালোচনা করা দরকার। প্রথম বক্তব্যের পর্যালোচনায় কিন্তু পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের পেছনে আসলেও ‘যৌক্তিক’ কিছু কারণ ছিল! ওই কারণ যে মতাসীনদের সীমাছাড়ানো ও ধরা পড়ে যাওয়া দুর্নীতি সেকথা নিশ্চয়ই উল্লেখের প্রয়োজন পড়ে না। ‘দেশের স্বার্থে’ কথাটা বলতে গিয়েও প্রধানমন্ত্রী কোনো প্লাস পয়েন্ট অর্জন করতে পারেননি। প্রকারান্তরে তিনি বরং স্বীকার করে নিয়েছেন, বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাদের সাহায্য ছাড়া পদ্মা সেতু নির্মাণের চেষ্টা তারা যথেষ্টই করে দেখেছেন। কিন্তু এটা হাওয়াই মিঠাই বানানোর মতো কোনো কুটির শিল্প কিংবা রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নয়, যা দলীয় লোকজনদের দিয়েই বানানো এবং সেগুলোর মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করতে লজ্জা বোধ করলেও সত্য হলো, দাতা সংস্থাগুলোর সাহায্য ও অংশগ্রহণ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের পে অন্তত পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া, ‘যৌক্তিক’ কারণ তথা দুর্নীতি তো ছিলই। সেই সাথে ছিল ওই দুর্নীতির অভিযোগ থেকে রেহাই পাওয়ার উদ্দেশ্যও।
কথাটা বলার পেছনেও বেশ কিছু ‘যৌক্তিক’ কারণ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দিকেই তাকানো যাক না কেন। এটা মাত্র ক’দিন আগের, ২৫ জুলাইয়ের তথ্য। পবিত্র রমজান শুরু হতে না হতেই প্রধানমন্ত্রী উড়াল দিয়ে লন্ডনে গিয়েছিলেন। সেখানে দেয়া বিভিন্ন ভাষণে একদিকে তিনি নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ করার আত্মম্ভরিতাপূর্ণ ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করেছেন, অন্য দিকে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে ‘পার্সেন্টেজ’ খাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন! ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগে নিন্দিত-ধিকৃত সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে আকাশে তোলার উদ্দেশ্যে বলেছেন, আবুল হোসেন ‘প্রকৃত দেশপ্রেমিক’ এবং দেশপ্রেম ও সৎসাহসের জন্য জনগণের উচিত তার প্রশংসা করা! এ পর্যন্ত এসেই থেমে যাননি শেখ হাসিনা। বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিলের কারণ সম্পর্কে এক অনুষ্ঠানে সরাসরি জবাব দেয়ার পরিবর্তে তিনি হিন্দু ধর্মের দেবতা কৃষ্ণ ও দেবী রাধার লীলা বিষয়ক একটি গানের প্রথম কলি গেয়ে শুনিয়েছেনÑ ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে ফুলে পাইলা ভ্রমরা, ময়ূর বেশেতে সাজন রাধিকা’। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছিল, গানটির মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটনের বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে ইঙ্গিত করেছিলেন। বুঝিয়েছিলেন, হিলারি কিনটন নাকি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যাপারে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার নতি স্বীকার করেনি বলেই হিলারি কিনটন মার্কিন সরকারের প্রভাব খাটিয়ে বিশ্বব্যাংককে দিয়ে ঋণচুক্তিটি বাতিল করিয়ে ছেড়েছেন।
লন্ডনে একাধিক উপলে কথার মারপ্যাঁচে বিতর্কও উসকে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথমত ‘যত দোষ নন্দ ঘোষের’ কথাটা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সবকিছুর জন্য বিশ্বব্যাংকের ওপর দোষ চাপিয়েছেন, নিজেদের ভুল বা ঘুষ-দুর্নীতির ধারে-কাছেও যাননি। শুধু তা-ই নয়, তিনি বলে বসেছেন, বিশ্বব্যাংক ‘পার্সেন্টেজ’ খায়! কথাটার অর্থ এভাবে করা হয়েছিল যে, পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য ঋণ দেয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে বিশ্বব্যাংক ‘পার্সেন্টেজ’ তথা ঘুষ দাবি করেছিল। কিন্তু সরকার এবং সৎ ও ‘প্রকৃত দেশপ্রেমিক’ মন্ত্রী আবুল হোসেন রাজি হননি বলেই বিশ্বব্যাংক চুক্তি বাতিল করেছে! কথাগুলোর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, বিশ্বব্যাংকের কর্তাব্যক্তিরা ‘পার্সেন্টেজ’ খান এবং ‘পার্সেন্টেজ’ খাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বলেই ‘প্রকৃত দেশপ্রেমিক’ মন্ত্রী আবুল হোসেনকে বিদায় নিতে হয়েছে! ‘নিজেদের অর্থায়নে’ পদ্মা সেতু নির্মাণ করার ঘোষণা দিতে গিয়েও প্রধানমন্ত্রী বিতর্কের ঝড় তুলেছিলেন। তিনি বলেছেন, আমরা যদি দেশ স্বাধীন করতে পারি তাহলে নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতুও নির্মাণ করতে পারবো। এজন্য প্রধানমন্ত্রী প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, তারা যদি ‘কিছু বেশি’ অর্থ পাঠান তাহলে সেতু নির্মাণে অর্থের কোনো সমস্যা হবে না। প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনে মনে হয়েছিল যেন প্রবাসীরা যে অর্থ পাঠান তার সবটাই পাঠান সরকারের ব্যয়ের জন্য! অন্য দিকে সত্য হলো, অর্থ পাঠান তারা স্বজনদের জন্য। এই অর্থের ওপর তাই সরকারের অধিকার থাকতে পারে না। প্রবাসীদের অর্থের মাধ্যমে সরকারের শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ে। সে রিজার্ভের অর্থ সরকার যেকোনো খাতেই ব্যয় করতে পারে। ব্যয় করেও। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এমনভাবে ‘কিছু বেশি’ অর্থ পাঠাতে বলেছেন যার কারণে সবার মনে এমন ভয়ই জেগেছিল যে, এখন থেকে প্রবাসীরা যে অর্থ পাঠাবেন তার সম্পূর্ণটুকুই সরকার দখল করে নেবে এবং পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজে ব্যবহার করবে। এভাবে ভয়-ভীতি ছড়িয়ে পড়লে প্রবাসীরা উল্টো ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো হয় কমিয়ে দেবেন না হলে বন্ধই করে দেবেন। অবস্থা তেমন হচ্ছিল বলেই প্রধানমন্ত্রীকে নিজেদের অর্থে সেতু নির্মাণের খায়েশ ত্যাগ করতে হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর দেশ স্বাধীন করা বিষয়ক কথাটুকুও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধ কথায় কথায় লন্ডন, ওয়াশিংটন আর টরন্টোতে দলবল নিয়ে হাওয়াই সফর করার মতো আনন্দ-স্ফূর্তি ও বিলাসিতার ব্যাপার ছিল না। এটা ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব রা এবং স্বাধীনতা অর্জনের জন্য রক্তয়ী যুদ্ধ। বিষয়টির তাৎপর্য ও গভীরতা এমন কারো পে অনুধাবন করা সম্ভব নয়, যুদ্ধে অংশ না নিয়েও যিনি যুদ্ধের সুফলটুকুই শুধু চেটে-পুটে ভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন। পদ্মা সেতুর সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধকে তুলনা করার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আসলে নিজের দেশপ্রেম ও জ্ঞানের গভীরতা সম্পর্কেই জানান দিয়েছিলেন।
শুনতে মন্দ মনে না হলেও প্রধানমন্ত্রীর আবেগ ও আকাক্সাই সব নয়, মাঝখানে অর্থ এক বিরাট তথা প্রধান নির্ধারক। কারণ প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ দু-চার হাজার কোটি টাকা মাত্র নয়। বিশ্বব্যাংকসহ দাতাদের প্রদেয় ঋণের পরিমাণ ছিল ২৯০ কোটি মার্কিন ডলার, বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি ছিল সরকারের দিক থেকেও অংশগ্রহণের শর্ত। সে হিসাবে দরকার হতো প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার। ঋণের বিপরীতে সুদের বিষয়টিও ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা হিসাব কষে দেখিয়েছেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে গেলে লাভের চেয়ে তি হবে বহু গুণ বেশি। বিশ্বব্যাংক যেখানে শতকরা মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ ভাগ সুদে ঋণ দিতে চেয়েছিল সেখানে পাঁচ থেকে আট শতাংশের কমে অন্য কোনো সংস্থা বা রাষ্ট্রের কাছেই ঋণ পাওয়া যাবে না। সরকার গোপনে-গোপনে সে চেষ্টা করে দেখেছেও। কিন্তু পায়নি তা ছাড়া অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরাও ‘আবেগপ্রবণ’ হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে ‘পার্সেন্টেজ’ খাওয়ার অভিযোগের কথাই ধরা যাক। এ ধরনের বক্তব্য বা অভিযোগ যে নতুন করে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ পাওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত নেতিবাচক হয়ে উঠতো সেকথা নিশ্চয়ই বলার অপো রাখে না। প্রধানমন্ত্রীরও কথাটা না বোঝার কোনো কারণ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি বিশ্বব্যাংককে সরাসরি আক্রমণ করে বসেছেন, তাও লন্ডনের মতো আন্তর্জাতিক একটি বড় নগরীতে দাঁড়িয়ে। এর মধ্য দিয়ে কিন্তু এমন ধারণাই প্রাধান্যে এসেছিল যে, প্রধানমন্ত্রী নিজেও সম্ভবত চান না, পদ্মাসেতু সত্যিই নির্মিত হোক এবং সে প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংক ঋণ দিয়ে অংশ নিক। মন্ত্রী আবুল হোসেন সম্পর্কে সার্টিফিকেট দিয়েও প্রধানমন্ত্রী সমস্যা তৈরি করেছেন। কারণ আবুল হোসেনের দেশপ্রেম নিয়ে নয়, বিতর্ক তৈরি হয়েছিল দুর্নীতির অভিযোগের কারণে। প্রধানমন্ত্রী কিন্তু সে দুর্নীতির ব্যাপারে একটি কথাও বলেননি। অন্যদিকে অভিযুক্ত মন্ত্রীকে বিদায় করার মধ্য দিয়ে তিনিই আবার একটু ঘুরিয়ে স্বীকার করে নিয়েছেন, লোকটি আসলেও দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন। না হলে অমন একজন ‘প্রকৃত দেশপ্রেমিক’কে হঠাৎ বিদায় করা হলো কেন? ‘উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র’সহ বিশ্বব্যাংক যে অভিযোগগুলো করেছে সেগুলোরও কোনো জবাব দেননি প্রধানমন্ত্রী। না দেয়ার কারণ, এ দেশেরই ‘উচ্চপর্যায়ের’ কারো কারো স্বজনের নাম শোনা গেছে ঘটনাপ্রবাহে। লন্ডন, ওয়াশিংটন ও টরন্টোতে বসবাসরতদের পাসপোর্ট বাতিল হওয়া বিষয়ক গুজবও আজকাল বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে এভাবেই ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সরদারের মতো ‘যুদ্ধ’ ঘোষণার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছুদিন পর্যন্ত বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপানোর কসরত করে বেড়িয়েছেন। তিনি নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেও টেনে এনেছেন। এমনভাবেই তিনি এক ‘বিশেষজন’ সম্পর্কে বলেছেন যা শুনে বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, প্রধানমন্ত্রী কার সম্পর্কে বলতে এবং কী বোঝাতে চাচ্ছেন। বলার অপো রাখে না, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে টেনে আনার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আসলে পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক ব্যর্থতার লজ্জা ও সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠার উদ্দেশ্যকেই প্রধান করেছেন। চেষ্টায় ত্র“টি না থাকলেও তিনি কিন্তু সফলতার ধারেকাছেও যেতে পারেননি। এটা সম্ভবও নয়। কারণ ঘুষ-দুর্নীতি এবং ‘উচ্চপর্যায়ের ষড়যন্ত্র’সহ চুক্তি বাতিল করার কারণগুলো বিশ্বব্যাংকের চিঠিতেই রয়েছে। বাস্তবে যুদ্ধ ঘোষণার পরিবর্তে জড়িতদের নাম প্রকাশ না করার কারণে মতাসীনদের আসলে বিশ্বব্যাংকের প্রতি কৃতজ্ঞতাই জানানো উচিত ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এবং তার নেত্রী বলে কথা! দায়িত্ব যেখানে ছিল জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বব্যাংককের আস্থা ফিরিয়ে আনা, প্রধানমন্ত্রী সেখানে ‘বিশেষজন’ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পেছনে লেগেছেন। জনগণকে বোঝাতে চেয়েছেন যেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্যই সবকিছু ‘স্বর্গে’ গেছে! বলা বাহুল্য, জনগণ ঠিক ততটা বোকা নয় যতটা মতাসীনরা মনে করেন। বস্তুত কোনো বিচারেই ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জড়িত করার চেষ্টা সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। কারণ প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর অনুসারীরা যা কিছুই বোঝাতে চান না কেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস অবশ্যই ‘এ ধরনের লোক’ নন বরং অনেক উপলইে তাঁর দেশপ্রেম পরীতি হয়েছে। তাঁর মতো একজন দেশপ্রেমিক ব্যক্তি জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো আন্তর্জাতিক আয়োজন বা কথিত ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকবেন তা কেবল আওয়ামী লীগের লোকজনই ভাবতে ও বোঝাতে চাইতে পারেন।
এদিকে খুবই কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ধরে টানাটানি করার মধ্য দিয়ে জনগণের দৃষ্টি ঘোরানোর হাস্যকর চেষ্টা চালালেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিন্তু এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করেছেনÑ বেগম খালেদা জিয়ার ভাষায় ‘নাকে খত দিয়েছেন’। উল্লেখ্য অনেক দেনদরবার, রশি টানাটানি ও নাটকীয়তার পর ২০ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য ১২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। এ ব্যাপারে ওয়াশিংটনে গিয়ে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান ছুটি চেয়ে যে দরখাস্ত পেশ করেছেন তার ‘অরিজিনাল’ কপিটিই নাকি বিশ্বব্যাংককে দেখাতে হয়েছে, ফটোকপি বা সত্যায়িত কপি নয়! সেটা দেখার অর্থাৎ দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত প্রধান একজন প্রকল্পে থাকছেন না বলে নিশ্চিত হওয়ার পরই বিশ্বব্যাংক ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। সংস্থাটি সেই সঙ্গে চারটি শর্তও জুড়ে দিয়েছে। শর্ত চারটি হলো, সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ছুটিতে পাঠানো, অনিয়ম তদন্তে দুদকের নেতৃত্বে বিশেষ একটি তদন্ত দল গঠন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতির তদন্ত রিপোর্ট পর্যবেণ করতে দেয়া এবং নতুন প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য দাতা গোষ্ঠীকে ক্রয় ব্যবস্থাপনা পর্যবেণ করতে দেয়া। বলার অপো রাখে না, বিষয়টি পুরো জাতির জন্যই অসম্মানজনক। পদ্মা সেতুর ঋণ নিয়ে বিগত কয়েক মাসে সমগ্র জাতিকেই লজ্জায় ডুবতে হয়েছে। দোষ অবশ্যই বিশ্বব্যাংকের নয়। সংস্থাটির জন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন সরকারের মধ্যকার বিশেষ কয়েকজনÑ বিশ্বব্যাংক যাদের ‘সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তারা ঠিক কারা এবং তাদের মধ্যে সর্বোচ্চপর্যায়ের কারো ঘনিষ্ঠ স্বজন রয়েছেন কি না সেকথা জনগণকে এখনও জানতে দেয়া হয়নি, যদিও বিশ্বব্যাংক নাম ধরে ধরেই সবার কথা সরকারকে জানিয়েছিল। বলেছিল, বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র’ সম্পর্কে বিভিন্ন উৎস থেকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসবের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের পরিচালিত তদন্তের দু’টি রিপোর্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানকে দেয়া হয়েছিল। দুর্নীতির ব্যাপারে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বানও জানিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। কিন্তু সরকার কোনো পদপে নেয়নি। সরকারের প্রতিক্রিয়া ও জবাবও ‘সন্তোষজনক’ ছিল না। সে কারণেই বিশ্বব্যাংকের পে ‘চোখ বুজে থাকা’ সম্ভব হয়নি। সংস্থাটি তাই ৩০ জুন পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তিই বাতিল করেছিল।
অন্য দিকে সরকার নিয়েছিল আক্রমণাত্মক কৌশল। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে এমনভাবে লম্ফ-ঝম্ফ শুরু করেছিলেন যা দেখে মনে হয়েছিল যেন বিশ্বব্যাংক বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো এ দেশের কোনো রাজনৈতিক দল! অথচ সত্যি দুর্নীতি না হয়ে থাকলে সরকারের বিশ্বব্যাংকের দাবি ও অভিযোগের ব্যাপারে আপত্তি থাকার কথা ছিল না। এতো দিনে অবশ্য অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে গেছে। বিশেষ করে আবুল হোসেনর পর প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান ছুটির দরখাস্ত করে কেটে পড়ায় বুঝতে বাকি থাকেনি যে, বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ঠিক কোন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ছিল। তাছাড়া কানাডা থেকে পাওয়া বিভিন্ন খবরেও অনেকের সম্পর্কেই জানা যাচ্ছে। কারো কারো ‘জামাইবাবু’ নাকি পাসপোর্ট ও ব্যবসা খুইয়ে কানাডা থেকে ভেগে এসেছেন! বিশ্বব্যাংক অসত্য বলেনি, আসলেও ‘উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র’ হয়েছিল। সে জন্যই নিজেদের লেখা ছয়টি চিঠি প্রকাশ করলেও সরকার বিশ্বব্যাংকের দুটি রিপোর্ট প্রকাশ করেনি। দুর্নীতি হয়েছিল বলেই সরকারকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের কাছে নতিও স্বীকার করতে হয়েছে। এমনকি নতুনপর্যায়ে চারটি কঠিন শর্তও মেনে নিতে হয়েছে। বলার অপো রাখে না, পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তিকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহে মতাসীনরা দেশ ও জাতিকে আসলেও লজ্জায় ডুবিয়ে ছেড়েছেন। জনগণ যাতে বিষয়টি নিয়ে বিুব্ধ না হয়ে ওঠে সে জন্যই আরো একবার লম্ফ-ঝম্ফ করার হাস্যকর কৌশল নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই লম্ফ-ঝম্ফে যে কাজের কাজ কিছুই হবে না সে কথাও কিন্তু তিনিই বুঝিয়ে দিয়েছেন। নিউইয়র্কের বক্তৃতায় ‘পার্সেন্টেজ’ খাওয়ার অভিযোগ শোনা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী বরং স্বীকার করেছেন, বিশ্বব্যাংক ‘যৌক্তিক’ অভিযোগই উত্থাপন করেছিল।
