রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ২ অক্টোবর মঙ্গলবার শিবিরের কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে গুলি করছে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। ছবিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সামনে থেকে তোলা
সোনার বাংলা রিপোর্ট : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের শান্তিপূর্ণ অবস্থানে হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা। ছাত্রলীগের গুলিতে আহত হয়েছে ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারিসহ ৬জন। ঘণ্টাব্যাপী ছাত্রলীগের হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, সহকারী প্রক্টর, সাংবাদিক, পুলিশ, সাধারণ শিার্থীসহ শিবির ও ছাত্রলীগের অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হয়েছে। এ সময় ছাত্রলীগ প্রায় অর্ধশত রাউন্ডগুলি ছোড়ে। তারা প্রশাসন ভবনসহ বিভিন্ন ভবনে ব্যাপক ভাঙচুর করে। সেখানে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র ভবনের সামনে ছাত্রশিবিরের ৩০-৩৫ নেতা-কর্মী শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলার চেষ্টা করে। এমন পরিস্থিতিতে শিবির নেতাকর্মীরা স্থান ত্যাগ করতে চাইলে ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেতা তাকিম , তুহিন, মিঠু, জাকির, আমিন, নিয়ন, আতিক, সবুজ সরওয়ারের নেতৃত্বে ৫০/৬০ জন ছাত্রলীগ কর্মীরা টুকিটাকি চত্বর থেকে পিস্তল, হাসুয়া, রামদা, কিরিচ, চাইনিজ কুড়াল, রড, হকিস্টিক ও লাঠিসোটাসহ শিবির কর্মীদের উপর হামলা করে এবং শিবিরকে ল্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকে। এ সময় নিজেদের রক্ষা করতে শিবির কর্মীরাও পাল্টা ইটপাটকেল নিপে করতে থাকে। এতে ছাত্রলীগ কর্মীরা প্রায় অর্ধশত রাউন্ড গুলি ছোড়ে। তাতে গুলীবিদ্ধ হন, রাবি শাখা শিবিরের সেক্রেটারি সাইফুদ্দিন ইয়াহহিয়া, শিবিরকর্মী জাহাঙ্গীর, শরীফ, আরিফ এবং জহির (ইসলামিক স্টাডিজ ৪র্থ বর্ষ)। ইটের আঘাতে অন্য আহতরা হলেন, বঙ্গবন্ধু হল শিবিরের সভাপতি মোবারক হোসেন বাবু, ইব্রাহীম হোসেন (ইসলামিক স্টাডিজ-৪র্থ বর্ষ), নাবিউল ইসলাম (ভাষা ২য় বর্ষ), আল আমিন (ইসলামের ইতিহাস ২য় বর্ষ), ইনকিলাবের রাবি রিপোর্টার ও প্রেসকাব সভাপতি আজিবুল হক পার্থ প্রমুখ।
ছাত্রলীগের মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় ক্যাম্পাসে শিক ও সাধারণ শিার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তারা দিগবিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের আক্রমণে শিবির কর্মীরা পিছু হটে এবং ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান নেয়। এ সময় ছাত্রলীগ কর্মীরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ভবন ও হলে অভিযান চালিয়ে শিবির সন্দেহে বেশ কয়েকজন শিার্থীকে মারধর করে। শুধু তাই নয়, ছাত্রলীগের হামলার সময় পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সহযোগিতা না করায় তারা পুলিশের ওপরও চড়াও হয়। এ সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে মারধর করে তারা। ক্যাম্পাসে শিবির কর্মীদের প্রবেশের সুযোগ করে দেয়ার অভিযোগে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে বিােভ মিছিল করে এবং ভিসির বাসভবনের গেট, প্রশাসন ভবন, জনসংযোগ দফতর, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, দোকানপাট, ক্যাম্পাসের বাস এবং পুলিশের গাড়ি ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহনের একটি বাসে ভাঙচুর চালায় তারা। এতে বাধা দিলে রাবির প্রক্টর চৌধুরী মোহাম্মাদ জাকারিয়াসহ কয়েকজন সহকারী প্রক্টরকে চড়-থাপ্পড়সহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে ছাত্রলীগের কর্মীরা। লাঞ্ছিত হয়ে প্রক্টর ভিসি ভবনে অবস্থান নিলে ছাত্র উপদেষ্টা গোলাম সাব্বির ক্যাম্পাসে পরিবেশ শান্ত করতে চেষ্টা চালান।
এদিকে বিভিন্ন ভবনে সাধারণ ছাত্রদের ওপর হামলার সময় ছাত্রলীগ কর্মীরা তর্কাতর্কি একপর্যায়ে নিজেদের দু’গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু করে। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মুন সমর্থিত কর্মী রনি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নোমানকে গালাগাল করলে নোমান ও হিমুর নেতৃত্বে ১২-১৫ জন রনিকে ধাওয়া দেয়। এতে সংঘর্ষ ভিন্ন মাত্রায় রূপ নেয়। পরে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সম্পাদকের হস্তেেপ পরিবেশ শান্ত হয়। এর পর উভয় গ্রুপ একত্রিত হয়ে ক্যাম্পাসে বিােভ মিছিল ও সমাবশে করে। ঘটনার সময় বিভিন্ন ভবন থেকে ছাত্রলীগ কর্মীরা ছাত্রশিবির কর্মীদের লাঠিসোটা, চাইনিজ কুড়াল ও রামদা দিয়ে কুপিয়ে জখম করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।
সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাস ফাঁকা হলে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ছাত্রলীগ কর্মীরা বিভিন্ন আবাসিক হল ও ভবনে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন শিবির কর্মীকে ব্যাপক মারধর করে। বঙ্গবন্ধু হলের ২০৩ নম্বর করে এক শিবির কর্মীকে ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত সালামের ২৩০ নম্বর কে নিয়ে ব্যাপক মারধর করে। এতে সে অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করা হয়।
প্রত্যদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ছাত্রলীগের কর্মীদের গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতেই নবিউল গুরুতর আহত হয়েছেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার সময় নবিউল নিজেও গণমাধ্যমকে বলেন,‘আমি ছাত্রলীগের কর্মী। বড় ভাইয়েরাই আমাকে মেরেছেন।’
ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের বক্তব্য : ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আশরাফুল আলম দাবি করেন,তাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানের ওপর ছাত্রলীগের চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও একাধিক মামলার আসামিরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছে। এতে শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারিসহ ছয়জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গ্রেপ্তার এড়াতে তাঁদের বাইরে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরো দাবি করেন, ছাত্রলীগের হামলায় আমাদের অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছে। এ হামলার পেছনে প্রশাসনের প্রত্য মদদ রয়েছে। ছাত্রশিবিরের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।
ছাত্রলীগের সভাপতি আহমদ আলী দাবি করেন, ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে তাদের দখলদারি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ছাত্রলীগের উপর হামলা চালিয়েছে। তারা ক্যাম্পাসে ফারুক হত্যার মতো নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চায়। তাদের হামলায় ছাত্রলীগের নেতা আখেরুজ্জামান, তৌহিদ আল হাসান ও নবিউল গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামীর নিন্দা ও প্রতিবাদ: রাবিতে শিবির নেতাকর্মীদের উপর হামলায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা.শফিকুর রহমান বলেছেন,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত পরিবেশ উত্তপ্ত করেছে ছাত্রলীগ। এ হামলায় ছাত্রলীগ স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে। তাদের হামলায় আহতদের মধ্যে ছাত্রশিবিরের ৫ জন কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাদের মধ্যে ২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
নগরীতে ছাত্রশিবির ও জামায়াতে ইসলামীর বিক্ষোভ সমাবেশ ও নিন্দা প্রতিবাদ : রাবিতে শিবিরের উপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে নগরীর মতিহার চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ইসলামী ছাত্রমিবির রাজশাহী মহানগরী। মিছিলের নেতৃত্ব দেন ছাত্রশিবির রাজশাহী মহানগরীর সেক্রেটারি আনোয়ারুল ইসলাম। অপরদিকে হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী রাজশাহী মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় কার্যকরি পরিষদের সদস্য আতাউর রহমান। তিনি বলেন,বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। ছিনতাই,চাঁদাবাজি, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীদের উপর নির্যাতনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্ট করেছে। ছাত্রলীগের এহেন ধ্বংসাত্বক কাজের কর্মকাণ্ডের কারণে নিজেদের কর্মী নিহত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য : এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গণমাধ্যমকে এড়িয়ে যান। তবে উপ-উপাচার্য মুহম্মদ নূরুল্লাহ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ শান্ত। এ ঘটনা ভর্তি পরীার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. দেলাওয়ার হোসেন বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে ছাত্রলীগ শিক্ষা কার্যক্রমকে ব্যহত করার জন্যই ছাত্রশিবিরের উপর হামলা চালিয়েছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। অচিরেই এই হামলাকারীদের খুজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। যাতে করে তারা আর কখনো এমন অন্যায় কাজ করতে সাহস না পায়।
পুলিশের অভিযান: দুপুরে ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন ছাত্রাবাসে পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রায় অর্ধশত নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে।
শিক্ষামন্ত্রীর ক্ষোভ : সচিবালয়ে নিজস্ব কার্যালয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ফোনে রাবির ভিসিকে নিদের্শ দিয়ে বলেন, এসব ছেলের আমার দরকার নেই। এরা সর্বনাশ করে দেবে। অবিলম্বে এদেরকে এক্সপেল করেন।
যোগাযোগ করা হলে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুজ্জামান বলেন, ‘যারা বিশ্ববিদ্যালয়কে অশান্ত করতে চায় তাদের বরদাশত করা হবে না। অতিরিক্ত এক কোম্পানি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ক্যাম্পাসকে শান্ত রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি।
এ পাতার অন্যান্য খবর
- পদ্মা সেতু ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পাঁয়তারা
- বৌদ্ধ বসতিতে হামলার নেপথ্যে ক্ষমতাসীন দল
- সমঝোতা কি একেবারেই অসম্ভব?
- ৭৫ ভাগ মানুষের ভোট বর্জন॥ সরকারকে লাল কার্ড
- জামায়াতের ৫ শীর্ষ নেতা ৪ ঘণ্টা এক হাজতখানায়
- সরকারের ইঙ্গিতেই ছাত্রলীগ রাবির শান্ত পরিবেশ উত্তপ্ত করছে : ডা. শফিকুর রহমান
- আমিরাতে বাংলাদেশী শ্রমিকরা ভারতীয় আগ্রাসনের শিকার
