॥ হারুন ইবনে শাহাদাত॥
রক্ত কথা বলে। রক্তের সে ভাষা যারা বুঝতে পারে না, তারাই বার বার রক্তপাত ঘটায়। ডেকে আনে ভয়াবহ পরিণতি। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। রাজধানীর পল্টন মোড়ে নিরীহ মেধাবী ৫ তরুণ ছাত্র ও ১ জন হাফেজসহ ৭ জন জিন্দাদিল মুজাহিদকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। সারা দেশে এই চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয় অর্ধশতাধিক নিরীহ মানুষ।
১৯৮৫ সালের ১৮ অক্টোবর মিথ্যা খুনের দায়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কবি, রাজনৈতিক কর্মী বেঞ্জামিন মলোয়সিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে তিনি লিখে যান,‘আমার রক্তের বৃষ্টিতে ভেসে যাবে শোষণের সকল রাজত্ব, আমি আমার এ নিঃসঙ্গ জীবন দিয়ে গর্বিত। ’ দক্ষিণ আফ্রিকায় স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছে। খুনের বন্যা তাদের টিকিয়ে রাখতে পারেনি। কোনো দিন কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তি অত্যাচার নির্যাতন করে টিকে থাকতে পারে না। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনাও ঘটেছে ফ্যাসিবাদী শক্তির ক্ষমতার মোহে। দেশবাসীকে সন্ত্রস্ত করে সামরিক শক্তিকে ডেকে আনে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে ক্ষমতা দখলের উচ্চাবিলাসে। তারা তাদের এ ষড়যন্ত্রে সাময়িকভাবে সফলও হয়েছে। এ ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করেছে। আবারও ১/১১-এর ভয় দেখাচ্ছে। আবার ২৮ অক্টোবরের ঘটনা ঘটবে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এমন বক্তব্য দিয়ে জাতিকে সন্ত্রস্ত করার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে। কিন্তু দেশবাসী আর কোনো ২৮ অক্টোবর ও ১/১১ দেখতে চায় না। তারা চায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে। ২৮ অক্টোবরে নিহত শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে না। একদিন এ রক্তও কথা বলবে। এ রক্তের সিঁড়ি বেয়ে বিজয় আসবেই।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ২০০৬ এর ২৭ অক্টোবর চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করার পরপরই ঢাকার রাজপথে ২৮ অক্টোবর বিশেষ করে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের আশেপাশে বিরোধীদল কর্তৃক বর্বর হামলা পরিচালিত হয় এবং যেভাবে ৭ জনের মৃত্যু হয় তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক ঘটনা। তখনকার বিরোধী দল অর্থাৎ আজকের ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান আওয়ামী লীগের কিছু সংখ্যক নেতাকর্মীর নির্দেশে বেশ কিছু সংখ্যক দুর্বৃত্ত সেই ঘটনার নায়ক। বিশেষ করে দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ ফলো করতেই লগি-বৈঠা নিয়ে পূর্ব থেকেই রাজধানীতে জড়ো হতে থাকে পেটুয়া নরপিশাচ বাহিনী। আর ২৮ অক্টোবর রাজপথে দেখা মিলল তাদের পাশবিকতা। মোট কথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পূর্বে দেশে যখন এক ধরনের নন গভর্নমেন্ট অবস্থা বিরাজ করছিল তখনই ঘটানো হলো এই নারকীয় তাণ্ডব। এটা মোটেও কাম্য ছিল না। সেদিনকার ঘটনা আজও অনেকের জন্য পীড়াদায়ক ।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আজকের তথ্য-প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এই ঘটনা মুহূর্তে বিশ্বময় প্রচারিত হয়। সারা বিশ্ব অবলোকন করে নিষ্ঠুর পাশবিকতার ভয়াল চিত্র। এবং একজন মৃত ব্যক্তিকে বারবার অসংখ্য নির্মম মানুষের আঘাতের সেই করুণ অমানবিক দৃশ্যটি পৃথিবীর অসংখ্য জনের মনে দাগ কাটে। এমন নির্মমতা মধ্য যুগের বর্বরতাকেও হার মানায়।
এ দেশের সুস্থ রাজনীতির জন্য যুক্তিবাদের যে প্রয়োজনীয়তা এবং আবেগের পরিবর্তে যৌক্তিক কর্মসূচির যে অপরিহার্যতা বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নির্মমতার পরিবর্তে সহনশীলতার একান্ত প্রয়োজনীতা সহজে অনুমেয়।
তিনি আরো বলেন,২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারিতে দেশে যে জরুরি অবস্থার ঘোষণা এলো এবং সামরিক সমর্থিত যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৯০ দিনের পরিবর্তে প্রায় ২ বছর অগণতান্ত্রিকভাবে কাজ পরিচালনা করল তার অন্যতম প্রেক্ষাপট ২৮ অক্টোবরের সেই বর্বরোচিত ঘটনা। এই ঘটনা সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এদেশে রাজনীতি কত অস্বচ্ছ, কত নির্মম, কত অযৌক্তিক এবং কত অরাজনৈতিক।
ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, দেশের তরুণরা এসব ঘটনাকে সামনে রেখে স্ব-দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী থেকে সমষ্টিগত কর্মে যুক্তিবাদকে প্রাধান্য দিক এবং পারস্পরিক সহনশীলতার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে দৃঢ়সঙ্কল্প হোকÑ এটা আশা করি। এবং ২৮ অক্টোবরের সে পৈশাচিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হোক সে কামনা করি।
স্বজনহারারা কি বিচার পাবেন না?
শুধু মাত্র ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে তরতাজা তরুণ কোনো রাজনৈতিক কর্মীকে লগি-বৈঠা দিয়ে সাপের মত পিটিয়ে মারার ঘটনা এ প্রতিবেদকের জানা মতে এটাই প্রথম। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রবাহের পথ ধরে ১১ জানুয়ারি ২০০৭ ক্ষমতা গ্রহণ করে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার। দেশের বিবেকবান প্রতিটি মানুষের সাথে শহীদ পরিবারের সদস্যরাও আশা করেছিলেন এ ঘটনার বিচার সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ডিজিটাল কায়দায় ক্ষমতায় আসে সে দিনের ঘটনার নায়ক আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তারা বিভিন্ন অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো একের পর এক প্রত্যাহার করতে থাকে। দেশের বিবেকবান প্রতিটি মানুষকে হতবাক করে গত ৯ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আবু সাইদ ‘জনস্বার্থে ২৮ অক্টোবরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয় এবং জেলা প্রশাসককে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পত্র দেয়। মহানগর পিপি আবদুল্লাহ আবু গত ১২ আগস্ট সিএমএম আদালতে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করলে গত সোমবার আদালত মামলা প্রত্যাহারের আদেশ দেন।
এ অবস্থায় স্বজনহারা পরিবারগুলো কী ভাবছে তা জানতে সোনার বাংলা প্রতিনিধি শহীদ পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন। পল্টনে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের লগি-বৈঠার আঘাতে শহীদ হয়েছেন সাইফুল্লাহ মুহাম্মদ মাসুম। মাসুমের মা শামসুন্নাহার বেগম বলেন, সরকার আইনের শাসনের বলে নিজের পিতার হত্যাকাণ্ডের বিচার করেছে অথচ ২৮ অক্টোরের নির্মম ও বর্বর হত্যাকাণ্ডের মামলা প্রত্যাহার করছে। এটা খুবই দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। শুনেই আমার মন খারাপ হয়ে গেছে। ২৮ অক্টোবরের বর্বরতা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে গোটা পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে। ভিডিও ফুটেজে খুনিদের ছবি রয়েছে, খুনিরা এখনো আমাদের চোখের সামনে দিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের ধরার জন্য পুলিশের স্পেশাল ব্র্যাঞ্চ সদস্যদের কোনো কষ্ট করতে হবে না। পত্রপত্রিকাগুলো সাক্ষী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার সন্ত্রাসী কর্মীদের লগি-বৈঠা নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়ে এ হত্যাকাণ্ডের মদদদাতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন। ইতিহাসের এ দায় থেকে কোনোদিন তিনি মুক্তি পাবেন না। দেশের যদি আইনের শাসন ও গণতন্ত্র থাকে, তবে অবশ্যই একদিন এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে। আমি মহান আল্লাহর দরবারে বিচার দিয়ে রেখেছি। তিনি যেন আমার সন্তানকে শহীদ হিসেবে কবুল করেন এবং দুনিয়া এবং আখেরাতে তাদের বিচারের ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেন, সে দিন সবার সামনে লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। শুধু দেশের মানুষ নয়, সারা বিশ্বের মানুষ তা দেখেছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নিদের্শেই সে দিন লগি-বৈঠার তাণ্ডব হয়েছিল। তিনিই ১ নম্বর হুকুমের আসামি। তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, তাই বলে তিনিতো আইনের ঊর্ধ্বে নন। তিনি বলেন, মামলা হয়েছে, তদন্ত হতো, বিচারে কেউ যদি নির্দোষ প্রমাণ হতো তাহলে সেখানে কোনো কথা থাকতে পারে না।
শামসুন্নাহার বলেন, সে দিন প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। সেদিনের ভিডিও চিত্র দেখলেই তা বোঝা যাবে। সে দিনের হত্যা মামলা প্রত্যাহার হয় কী করে? তিনি বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলে এখন নিজেরাই আইন ভঙ্গ করছে। দিন বদলের কথা বলে, নিজেদের কথাই বদল করে ফেলেছে। আমরা আল্লাহর দরবারে বিচার দিয়ে রেখেছি। তিনি অবশ্যই এ হত্যাকাণ্ডের বিচার করবেন।
শহীদ জসিম উদ্দিনের পিতা আবদুর রশীদ বলেন, তারা এখন ক্ষমতায়, এখন যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। দেশে কোনো আইন আছে বলে মনে হয় না। কারো জবাবদিহিতাও নেই। বিচার পাওয়ার অধিকার এভাবেই কেড়ে নেয়া হলো? তিনি বলেন, তদন্ত না করেই এভাবে মামলাই বাতিল করে দেয়া হলো? এর নিন্দা জানানোর ভাষাও আমাদের জানা নেই। এটা দেশের জনগণ মেনে নেবে না। তিনি আরো বলেন, ২৮ অক্টোবর কী হয়েছে শুধু দেশের মানুষই নয়, সারা বিশ্বের মানুষ দেখেছে। সে দিন প্রকাশ্য দিবালোকে লগি-বৈঠা দিয়ে রাজপথে সাপের মতো পিটিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। এর বিচার হওয়াতো দূরে থাক, এখন পুরো মামলাই প্রত্যাহার করে নেয়া হলো। অবাক কাণ্ড!
শহীদ ফয়সলের ছোট ভাই ফাহমিদ আল ফারিদ তার প্রতিক্রিয়ায় সোনার বাংলা প্রতিনিধিকে বলেন, এটা মানবতা বিরোধী কাজ। নিরীহ মানুষকে শুধু মাত্র রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে লগি-বৈঠা দিয়ে হত্যা করার পর অভিযুক্তরা ছাড়া পেলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বাড়বে, গণতান্ত্রিকমূল্যবোধ ধ্বংস হবে। আমি মনে করি আইনকে স্বাধীনভাবে নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, আইনের শাসনে বিশ্বাসী প্রত্যেক নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। যিনি লগি-বৈঠা নিয়ে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি বর্তমানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী। তিনি আইন আদালতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হত্যাকাণ্ডের দায় থেেেক মুক্তি পেলে আমাদের কিছু বলার ছিলেন না, তা তার জন্যও সম্মানজনক হতো। আমি চাই ভিডিও ফুটেজে যে সব খুনির ছবি আছে তাদের শাস্তি হোক। আমার বিশ্বাস খুনিরা অবশ্যই শাস্তি পাবে।
শহীদ ফয়সলের মা বলেন, আমি গরিব, দুর্বল, ফয়সলের বাবা নেই। আইন-আদালত করার শক্তি নেই, অপরাধীরা শক্তিশালী দুনিয়ার আদালত তাদের রেহাই দিলেও আল্লাহর আদালতে অবশ্যই ওরা শাস্তি পাবে। আমার সন্তান কোনো অপরাধী ছিল না, সে যে দলের সদস্য ছিলেন, তারা সব সময় মানুষকে আল্লাহর পথে ওকে ভালো কাজ করে, এমন সন্তানদের যারা হত্যা করেছে, তাদের বিচার অবশ্যই হবে।
