ঢাকা: শুক্রবার: ১১ কার্তিক ১৪১৯, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৩, ২৬ অক্টোবর ২০১২

ভাঙতে পারে ১৪ দল
॥ মুনতাসির রহমান॥
সরকার পরিচালনায় ব্যর্থতার দায়ভার শরিক ১৪ দলের নেতারা আর নিতে যাচ্ছেন না। ব্যর্থতার পাল্লা এতটা ভারী যে তা বহন করার ক্ষমতা শরিক দলের তো দূরের কথা খোদ আওয়ামী লীগেরও নেই। ১৪ দলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বললে সরকার সম্পর্কে তারা এমন মন্তব্য করলেন। তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দুটোই লক্ষ করা গেছে। তাদের ক্ষোভ হলো সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ শরিকদের  ভুলে গেছে। নির্বাচনের আগে কথা ছিল সরকারে তাদের যথাযথ অংশীদারিত্ব থাকবে। এমন কিছু করা যাবে না যাতে সরকারের দুর্নাম হয়। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে ‘জোটবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কিন্তু সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের চেহারা বদলে যায়। যথাযথ অংশীদারিত্ব তো দূরের কথা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে ১৪ দলের নেতাদের একটি পরামর্শও নেয়া হয়নি। গত চার বছরে নামেমাত্র ৫-৬টি বৈঠক হয়েছে। মূলত বৈঠকের ফলাফল শূন্য। এখানেই নেতাদের ক্ষোভ। অন্য দিকে হতাশা হলো যে উদ্দেশ্যে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল গত চার বছরে তা মোটেও বাস্তবায়িত হয়নি। শেখ হাসিনা ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজের ইচ্ছামতো অযোগ্য নেতাদের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য করেন। ১৪ দলের পর জেনারেল এরশাদকে নিয়ে মহাজোট হলো। যোগ্য মন্ত্রিপরিষদ করতে যোগ্য নেতার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু ১৪ দল নেত্রী সেটা করলেন না। তার অদূরদর্শিতা ও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির কারণে রাষ্ট্র পরিচালনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। দুর্নীতি, অর্থ কেলেঙ্কারি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এমন কোনো অপরাধ কর্মকাণ্ড নেই যা করা হয়নি। স্বাধীনতার ৪১ বছরে প্রথমবারের মতো ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনা ঘটলো। দুর্নীতির কারণে পদ্মা সেতুর মতো নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক তাদের প্রস্তাবিত ঋণ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণœ হয়েছে। দ্রব্যমূল্য সরকার কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। শিক্ষাঙ্গন ছাত্রলীগের দখলে। সেখানে রক্তের হোলি খেলা চলছে। বিরোধী দলের প্রভাবশালী নেতাদের গুম করা হচ্ছে। সকল মহলের গ্রহণযোগ্য কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি বাতিল করে এখন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে চাচ্ছে। পুলিশ র‌্যাবকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। ভারতের সঙ্গে সীমান্তসহ অনেক অমীমাংসিত বিষয়ে সুরাহা হয়নি। ফলে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফের হাতে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশী নিহত হচ্ছে। সরকার ইচ্ছা করেই জাতীয় সংসদকে অকার্যকর করে রেখেছে। অর্থাৎ নির্বাচনী কোনো অঙ্গীকারই সরকার বাস্তবায়ন করতে পারেনি। রাষ্ট্র পরিচালনায় অযোগ্যতা এবং দুর্নীতির কারণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্য ১৪ দলের নেতারা হতাশ।

১৪ দলের শরিক দল কমিউনিস্ট কেন্দ্রের এক নেতা এ প্রতিনিধিকে বলেন, ক্ষোভ ও হতাশার কথা আওয়ামী লীগের নেতাদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তারা বলেছেন, সমস্যা সঙ্কুল দেশে রাষ্ট্র চালাতে গেলে ব্যর্থতা থাকবেই। তবে ব্যর্থতার চেয়ে সফলতা অনেক বেশি। মিডিয়া আমাদের সফলতা ঢেকে দিয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন খোঁড়া যুক্তি মানতে চাচ্ছেন না তারা। তাদের বক্তব্য হলো ব্যর্থতা দৃশ্যমান। আর সফলতা অদৃশ্যমান। অদৃশ্যমান সফলতা জনগণ দেখেনি।

ভাঙনের মুখে ১৪ দল

দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতি মোটেই সরকারের অনুকূলে নয়। প্রতিকূল পরিস্থিতি, পরিবেশের জন্য শরিকরা নয়-শাসক দল আওয়ামী লীগকেই অভিযুক্ত করছেন ১৪ দলের নেতারা। বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে এবং আদর্শিক চিন্তা থেকে ভিন্ন পথে চলে যেতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। গণতন্ত্রী পার্টির শীর্ষস্থানীয় এক নেতার সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, আমরা ছোট দল বলে আওয়ামী লীগ অবহেলা করবে আমরা তা মেনে নেবো নাÑ তা হয় না। বিগত জোট সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামের সকল ধরনের কৌশল আমরা দিয়েছি। বামপন্থী নেতাদের বুদ্ধিপরামর্শে আওয়ামী লীগ তখন চলেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর আমরা অপাংক্তেয় হয়ে গেলাম। তিনি আরো বলেন, সরকারে বামপন্থী আদর্শের মন্ত্রীরা ভালো করছেন। সরকারের যতটুকু সাফল্য তা তো বামদের বদৌলতে। আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।

তবে এদিকে একটি দায়িত্বশীল সূত্রের খবর হলো : ১৪ দলের মধ্যে সাম্যবাদী দল ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থাকায় তারা আওয়ামী বলয়ের বাইরে যেতে চাচ্ছে না। কিন্তু অন্য দলগুলো আওয়ামী লীগের ওপর এতোটা চটা যে তারা যে কোনো সুবিধাজনক সময়ে ১৪ দল থেকে বেরিয়ে যাবে। সাম্যবাদী দলের দীলিপ বড়–য়া এবং জাসদের হাসানুল হক ইনু সরকারের মন্ত্রী। মন্ত্রিত্ব তাদেরকে আওয়ামী বলয়ে আটকে রেখেছে। রাশেদ খান মেননের ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের ন্যাপসহ অন্যান্য দল যে কোনো সময় বেরিয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যেই ৭টি দল জোটবদ্ধ হয়েছে। শোনা যাচ্ছে সিপিবি বাসদসহ অন্যান্য বামপন্থী আলাদা জোট গড়তে চাচ্ছে। আদর্শিক কোনো বিরোধ দেখা না দিলে তারা নির্বাচনী জোট করতে পারে। তবে আরেকটি সূত্রের খবর হলো ; ড. কামাল হোসেন ও সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরী সম্মিলিত ভাবে জাতীয় ঐক্যের যে ডাক দিয়েছেন সে ডাকে ১৪ দলের অনেকে সাড়া দিতে পারেন। জোটবদ্ধ ছাড়া সামনে এগুনো যাবে না এমনটা ভেবে জোটেই আসতে চায় ছোট দলগুলো। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর হলো : আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিপরীতে তৃতীয় শক্তি বা বলয় তৈরি করতে ড. কামাল এবং বি. চৌধুরী মাঠে নামতে চাচ্ছেন। এই তৃতীয় শক্তির সঙ্গে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট থেকে কোনো শরিক দলের যোগদানের সম্ভাবনা নেই। তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বা ১৪ দল থেকে অনেকে যোগ দেবেন বলে শোনা যাচ্ছে। সুতরাং ভাঙন ১৪ দলেই হবে। এ জন্য আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা অনেকটা শঙ্কিত বলে জানা গেছে।

বেগম জিয়ার চীন সফরে আতঙ্কিত

১৮ দলীয় জোট নেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া সপ্তাহখানেক চীন সফর করে এসেছেন। সফরকালে তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ডাচ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তার এ সফরকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলেছেন দলটির নেতারা। চীন সফরের পর ভারত সফরেও যাবেন। মূলত আওয়ামী লীগের রাজনীতি ভারতকেন্দ্রিক। আওয়ামী লীগ নতুন করে চীন কেন্দ্রিকও হয়েছে।  আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করেন ভারত এবং চীন পক্ষে থাকলে ক্ষমতা থাকা বা ফের ক্ষমতায় আসতে সহজ হবে। কিন্তু সেখানে বেগম জিয়ার ফলপ্রসূ সফরকে তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। চীনের পর ভারত সফর শাসক দলকে আরো শঙ্কিত করে তুলেছে। আওয়ামী লীগ চায় বিদেশী প্রভুত্ব তাদের বলয়ে থাকুক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে; চীনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির সম্পর্ক বরাবরই ভালো। কিন্তু চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে দিয়েছে ১৪ দলের শরিক দল সাম্যবাদী দলের দীলিপ বড়–য়া। মেননের মতো যোগ্য নেতা থাকতে দীলিপ বড়–য়াকে শেখ হাসিনা মন্ত্রী করেন চায়না লাইনকে মজবুত করতে। বাবু বড়ুয়া মন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনার টার্গেট কতটুকু বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছেন তা তিনিই জানেন। তবে সরকারে থেকে যে সুবিধা নেয়াা প্রয়োজন সেখানে কোনো ঘাটতি আছে বলে মনে হয় না। নাম প্রকাশ করতে চাননি আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা বলেছেন, বেগম জিয়ার ফলপ্রসূ চীন সফরে এটাই প্রতীয়মান যে, বাবু বড়–য়া চায়না কূটনীতিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এটা তার ইচ্ছাকৃত ব্যর্থতাও হতে পারে। কারণ তিনি সরকারের জন্য বিপজ্জনক। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। শিল্প মন্ত্রণালয় চালাতে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারেননি।

তবে সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, বিরোধী দলের সকল কর্মকাণ্ডই সরকারকে আতঙ্কের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। সবকিছুতেই সন্দেহ এবং ভীতি কাজ করছে। রাষ্ট্র চালাতে সরকার ব্যর্থ না হলে বেগম জিয়ার সফর নিয়ে শঙ্কিত হতো না। শেখ হাসিনা শঙ্কিত দলের প্রভাবশালী নেতাদের নিয়েও। যে কারণে ভীতি কাটাতে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে সংস্কারপন্থীদের সরকারে টেনে অস্বস্তি থেকে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এতে তিনি কতটা সফল হবেন তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে।

অন্যান্য মিডিয়া bdnews24 RTNN Sheersha News barta24 Prothom Alo Daily Nayadiganta Jugantor Samakal Amardesh Kaler Kantho Daily Ittefaq Daily Inqilab Daily Sangram Daily Janakantha Amader Shomoy Bangladesh Pratidin Bhorerkagoj Daily Dinkal Manob Zamin Destiny Sangbad Deshbangla Daily Star New Age New Nation Bangladesh Today Financial Express Independent News Today Shaptahik 2000 Computer Jagat Computer Barta Budhbar Bangladesherkhela Holiday Bangladesh Monitor BBC Bangla Redio Tehran
homeabout usdeveloped by

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ মো. তাসনীম আলম।

মহীউদ্দীন আহমদ কর্তৃক জাতীয় মুদ্রণ ১০৯, ঋষিকেশ দাস রোড, ঢাকা - ১১০০ হতে মুদ্রিত ও ১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা - ১১০০ হতে প্রকাশিত। যোগাযোগের ঠিকানাঃ ৪২৩ এলিফেন্ট রোড, বড় মগবাজার, ঢাকা - ১২১৭। ফোনঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৯০৬৫, বার্তা - ৮৮ ০১৬৭০৮১৩২৭৬, সার্কুলেশন - ৮৮ ০১৫৫২৩৯৮১৯০, বিজ্ঞাপন - ৮৮ ০১১৯৯০৯০০৮৫, ফ্যাক্সঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৫৫৭১, ওয়েবসাইটঃ www.weeklysonarbangla.net, ইমেইলঃ weeklysonarbangla@yahoo.com