দরবার-এ শাহ
সব সম্মানও শুধু ক্ষমতাসীনরাই পাবেন!
২৩ অক্টোবর সকালে এই লেখা শুরু করার আগে টিভিতে সংবাদ শিরোনাম দেখতে গিয়ে রীতিমতো ধাক্কা খেতে হলো। সব টিভি চ্যানেলেই বারবার দেখানো হচ্ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর খবর। বাংলা ভাষার একজন ‘নামকরা’ সাহিত্যিক তিনি। সুতরাং তার মৃত্যু জানানোর মতো একটি খবর বটে। কিন্তু ধাক্কা খেয়েছি বিশেষ কারণে। প্রায় সব চ্যানেলেই খবরটি দেখানো হচ্ছিল ‘জাতীয়’ খবর হিসেবে। অথচ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলাদেশের লোক ছিলেন না। ছিলেন ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক। সে কারণে তার মৃত্যু অবশ্যই ‘জাতীয়’ খবর হিসেবে প্রচারিত হতে পারে না। সেটাই করে ছেড়েছে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো। এমনকি সরকার সমর্থক নয় বলে নিজেদের যারা জাহির করে তারাও। একেই সম্ভবত ‘অতি ভক্তি’ বলা হয়।
এভাবে নিবন্ধের শুরু করার পেছনে সুনির্দিষ্ট একটি কারণ রয়েছে। মাত্র ক’দিন আগে, গত ২০ অক্টোবর ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনের প্রধান নায়ক ও দেশপ্রেমিক জাতীয় নেতা অলি আহাদ ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিলাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)। পাকিস্তান যুগের প্রাথমিক দিনগুলো থেকে জীবনের শেষ পর্যন্তও তিনি এদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসন এবং ভারতের আধিপত্যবাদী নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের সম্মানজনক অবস্থানে রাখার সংগ্রামে তিনি ছিলেন আপসহীন। মন্ত্রিত্ব কিংবা রাজনৈতিক কোনো সুযোগ-সুবিধা নেয়ার চিন্তা পর্যন্ত করেননি কখনো। তিনি বরং শিখিয়ে গেছেন, ক্ষমতায় না গিয়েও কিভাবে দেশ ও জাতির স্বার্থে ভূমিকা পালন করতে হয়। অমন একজন দেশপ্রেমিক জাতীয় নেতাকে নিয়ে কিন্তু এই টিভি চ্যানেলগুলোকেই সামান্য উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায়নি। কোনো কোনো চ্যানেলে ‘জাতীয়’ খবর হিসেবে প্রচার করা হলেও খবরটি এসেছে পাঁচ থেকে আট-দশ নম্বরের দিকে। ক্ষমতাসীনদের কেউই হাসপাতালে তাকে দেখতে যাননি, তার জানাজায়ও কোনো মন্ত্রী গিয়ে অংশ নেননি। এমনকি শোকও প্রকাশ করেননি ক্ষমতাসীনরা।
কথা শুধু এটুকু হলেও হয়তো আপত্তি উঠতো না। অন্যদিকে সরকারের সেবাদাস ও আওয়ামী চাটুকাররা সৌজন্যের সীমা পর্যন্ত অতিক্রম করেছেন। যেমন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অলি আহাদের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলে বসেছেন, এর ফলে ‘অসাম্প্রদায়িক মিলনস্থল’ শহীদ মিনারের ‘পবিত্রতা’ নাকি নষ্ট হয়েছে এবং এভাবে জানাজা পড়ানো নাকি ‘জাতীয় মূল্যবোধ বিরোধী’! সরকারের আরেক সেবাদাস নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেছেন, শহীদ মিনারে জানাজার আয়োজনের মধ্য দিয়ে নাকি ‘সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ’ ঘটেছে! কথাগুলোকে হাল্কাভাবে নেয়া যায় না। কারণ, একদিকে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আর অন্যদিকে বলেছেন এদেশের সাংস্কৃতিক জগতের আওয়ামী ‘দিকপাল’ (!), যিনি ৭০ পেরিয়ে গিয়েও বাচ্চু নামটি পরিত্যাগ করতে পারেননি। তিনিও এসেছেন ‘জাতীয় মূল্যবোধ’ এবং ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ সম্পর্কে জনগণকে জ্ঞান দিতে! পাঠকরাও বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন। কারণ, মহান যে ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এই শহীদ মিনার, মরহুম অলি আহাদ ছিলেন সে আন্দোলনের প্রধান নেতা। বাচ্চু এবং আরেফিন সিদ্দিকদের ‘পূজনীয়’ নেতার মতো ফরিদপুরের জেলখানায় বসে তিনি ‘চিরকুট’ পাঠিয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অসত্য দাবি জানিয়ে বসেননি। সুতরাং শহীদ মিনারে ভাষা আন্দোলনের প্রধান নেতার জানাজা অনুষ্ঠানের মধ্যে ‘দোষের’ কিছু থাকতে পারে না। তথাকথিত ‘পবিত্রতা’ এবং ‘জাতীয় মূল্যবোধের’ কথা বলবেন? একমাত্র শহীদ দিবস তথা একুশে ফেব্র“য়ারির উপলক্ষ ছাড়া ড্রাগ ও মদ ইত্যাদি খাওয়া থেকে নাচানাচি ও রাতের অন্ধকারে এটা-ওটা করা পর্যন্ত সারা বছর ধরে শহীদ মিনারে যা কিছু চলছে সে সবের কোনটি আপনাদের ‘পবিত্রতা’ এ্বং ‘জাতীয় মূল্যবোধের’ সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? এ ব্যাপারে সচিত্র বিভিন্ন তথ্য হাজির করা হলে কিন্তু আরেফিন সিদ্দিক এবং বৃদ্ধ বাচ্চু সাহেবদের লা-জবাব হতে হবে।
বলা বাহুল্য, বিরোধিতার মূল কারণ আসলে একটিইÑ মরহুম অলি আহাদ আওয়ামী লীগ করতেন না। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের অঘোষিত আইন হলো, সম্মান পেতে হলে আওয়ামী লীগ তো করতেই হবে, ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং ‘জাতির পিতাকে’ নিয়েও নৃত্য ও মাতামাতি না করলে চলবে না। ওনারা কবির চৌধুরীর মতো ঘোষিত নাস্তিককে নিয়ে শহীদ মিনারে শুইয়ে রাখলে দোষ হবে না। কিন্তু অলি আহাদের মতো ভাষা আন্দোলনের প্রধান নেতার জানাজা পড়া হলেই সেটা ‘মহা অপরাধ’ হয়ে যাবে! এভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার এবং এত কথা বলার কারণ বুঝতে হলে অলি আহাদের অবদান সম্পর্কে ধারণা দেয়া দরকার। অলি আহাদ শুধু ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেননি, একই সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ এমনকি দিকনির্ধারণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানে বিরোধী রাজনৈতিক দল গঠন করার উপর ছিল অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। সরকারের বিরোধিতাকে সে সময় রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। অমন এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও অলি আহাদ প্রগতিশীল সংগঠন ‘পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ’ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি নিজে ছিলেন এর প্রথম সাধারণ সম্পাদক। নামে অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও যুবলীগ অনেকাংশে বিরোধী দলের ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত যুবলীগের এই ভূমিকা অব্যাহত ছিল। যুবলীগ তাজউদ্দিন আহমদ ও মোহাম্মদ তোয়াহার মত অনেক রাজনৈতিক নেতাও তৈরি করেছে।
১৯৫০-এর দশকের রাজনীতি পর্যালোচনা করলেও অলি আহাদের অবদান সম্পর্কে জানা যাবে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল প্রথম বিরোধী দল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। এর সঙ্গেও শুরু থেকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন অলি আহাদ। ১৯৫৩ সালের কাউন্সিল অধিবেশনে অলি আহাদকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। সে অধিবেশনেই শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর পরপর ১৯৫৪ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে শেরে বাংলা ফজুলুল হকের কৃষক-শ্রমিক পার্টিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবির ভিত্তিতে প্রণীত ঐতিহাসিক ‘২১ দফা’ ছিল যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী কর্মসূচি। ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটেছিল। ২৩৭ আসনের মধ্যে দলটি মাত্র ১০টি আসনে জিততে পেরেছিল। অন্যদিকে মওলানা ভাসানীর আওয়ামী লীগ একাই জিতেছিল ১৪৩ আসনে। শেরে বাংলার কৃষক-শ্রমিক পার্টি পেয়েছিল ৪৮টি আসন। অন্য আসনগুলোতেও যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলোই জিতেছিল। কিন্তু এই বিরাট বিজয় সত্ত্বেও পূর্ব বাংলার তথা আজকের বাংলাদেশের শোষণ ও বঞ্চনার অবসান ঘটানো যায়নি। এর কারণ ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, যার শুরুটা করেছিলেন কোনো এক বিশেষ নেতা। আগে থেকে তৈরি সমঝোতার বিরুদ্ধে গিয়ে পরবর্তীকালে ‘পূজনীয়’ হয়ে ওঠা এই নেতা মন্ত্রী হওয়ার আবদার জানিয়ে বসেছিলেন। মওলানা ভাসানীর অনুরোধে অগত্যা তাকে মন্ত্রী বানানো হলেও যুক্তফ্রন্টে ভাঙন শুরু হয়েছিল। এরই ফায়দা নিয়েছিলেন পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠি। শেরেবাংলার নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারকে বরখাস্ত করা হয়েছিল কলমের এক খোঁচায়।
সেই থেকে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি কেবল ডাল-পালাই বিস্তার করেছে। এর ফলে একদিকে প্রদেশের শোষণ ও বঞ্চনা বেড়েছে অন্যদিকে আদায় করা যায়নি পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রধান দাবিটিও। কথা আরো আছে। একই নেতার অপতৎপরতার কারণে আওয়ামী লীগের মধ্যেও ঐক্য বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। তারা এমন এক সংবিধানের পক্ষ নিয়েছিলেন যে সংবিধানে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিটিই অস্বীকৃত হয়েছিল। খুবই কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য হলো, ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে সংবিধানটি যখন পাস করা হয় তখন কিন্তু এই একই নেতা স্বায়ত্তশাসন না দেয়ার প্রতিবাদে ওয়াক আউট করেছিলেন। তিনি অবশ্য একা ছিলেন না, তারও একজন নেতা ছিলেনÑ যিনি নিজে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেয়ে ঘোষণা করেছিলেন, সংবিধানে পূর্ব পাকিস্তানকে নাকি ‘৯৮ ভাগ’ স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছে! উল্লেখ্য, এভাবে পাকিস্তানিদের ন্যক্কারজনক দালালি করার পরও ওই নেতার নেতা এবং নেতা নিজেও ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। মাঝখান দিয়ে ষড়যন্ত্রের রাজনীতিকে উপলক্ষ বানিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন জেনারেল আইয়ুব খান। ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে জারি হয়েছিল প্রথম সামরিক শাসন।
অলি আহাদের অবদান সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্যই এখানে ইতিহাসের অধ্যায়টি স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে। কারণ, একজন মাত্র ব্যক্তির অভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য সেকালের পূর্ব বাংলাকে চরমভাবে বঞ্চিত ও অসম্মানিত হতে হয়েছিল। অন্যদিকে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে অলি আহাদ দাঁড়িয়েছিলেন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। হাতছানি শুধু নয়, মন্ত্রিত্বের সুযোগ অবারিত থাকা সত্ত্বেও তিনি বরং স্বায়ত্তশাসন আদায়ের আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছিলেন এবং ক্রমাগত আরও জোরদার করেছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতাও বিরাট নির্ধারক ছিল। মূলত জেনারেল আইয়ুব খানের উদ্যোগে পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একের পর এক সামরিক চুক্তি ও জোটে জড়িয়ে পড়েছিল। এই সত্য প্রমাণিত হয়েছে যে, সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিহত না করা গেলে স্বায়ত্তশাসন আদায় করা সম্ভব ছিল না।
সে কারণেই মওলানা ভাসানী স্বায়ত্তশাসন আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনকে গ্রথিত করেছিলেন। অলি আহাদ ছিলেন সে আন্দোলনের দুর্দান্ত সাহসী নেতা। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে অলি আহাদ দলের ভেতরে শুধু নয়, পুস্তিকা ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে জনগণের মধ্যেও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছিলেন। আওয়ামী লীগের এ সংক্রান্ত অনেক প্রস্তাবও ছিল। অন্যদিকে ‘পূজনীয়’ হয়ে ওঠা সেই নেতার নেতৃত্বে অলি আহাদকে দল থেকে বহিস্কারের জন্য রীতিমতো অভিযান শুরু হয়েছিল। একই কারণে আওয়ামী লীগ এসে গিয়েছিল ভাঙনের মুখোমুখি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল বলেই দলের সভাপতি হিসেবে মওলানা ভাসানী ঐতিহাসিক ‘কাগমারী সম্মেলনের’ আয়োজন করেছিলেন। ১৯৫৭ সালের ৭ ও ৮ ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠিত সম্মেলনে কাউন্সিলারদের নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অলি আহাদের তথা দলের ঘোষিত অবস্থানের পক্ষ নিলেও ‘পূজনীয়’ সেই নেতা তার দলবল ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে স্বায়ত্তশাসনের প্রধান দাবিটিকে পর্যন্ত পরিত্যাগ করেছিলেন। সব মিলিয়ে তারা এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন যখন দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানীকে পর্যন্ত আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল। ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে নতুন একটি দল গঠন করেছিলেন।
ইতিহাসের পরিহাসও এখানে স্মরণ করা দরকার। ১৯৫০-এর দশকে ক্ষমতার লোভে যিনি পাকিস্তানিদের সেবাদাসের ভূমিকা পালন করেছিলেন চপেটাঘাত খাওয়ার সে নেতাকেই ১৯৬০-এর দশকে এসে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষ নিতে হয়েছিল। বড়কথা, এ ব্যাপারেও প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হয়েছে। যে কেউ যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার ১৯ নম্বর দফার সঙ্গে আরেক ‘ঐতিহাসিক’ ছয় দফা মিলিয়ে দেখতে পারেন। দেখবেন, ১৯ নম্বর দফার বাক্যগুলোেেকই এক-দুই-তিন-চার-পাঁচ-ছয় করে সাজিয়ে ছয় দফা বানানো হয়েছে। পার্থক্য হলো, মওলানা ভাসানী এবং অলি আহাদ যখন আন্দোলন করেছিলেন তখন যদি ক্ষমতার লোভে কারো কারো বিচ্যুতি না ঘটত এবং কোনো কোনো ‘পূজনীয়’ নেতা যদি পাকিস্তানিদের সেবাদাসে পরিণত না হতেন তাহলে ১৯৫০-এর দশকেই স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি আদায় করা সম্ভব হতো। বাঙালি জনগোষ্ঠিকেও বঞ্চিত, শোষিত ও নির্যাতিত হতে হত না। বৈষম্যের শিকার তো বানানো যেতোই না। কিন্তু ওই নেতারা তখন ‘৯৮ ভাগ’ স্বায়ত্তশাসন দেয়ার গালগল্প শুনিয়েছেন। অন্যদিকে জাতির সে দুঃসময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও অলি আহাদ ভূমিকা পালন করেছেন পূর্ব বাংলার তথা আজকের বাংলাদেশের স্বার্থে। এখানেই ক্ষমতালোভী ‘পূজনীয়’ নেতাদের সঙ্গে অলি আহাদের পার্থক্য।
স্বাধীনতার প্রশ্নেও অলি আহাদ সব সময় অগ্রবর্তী অবস্থানেই থেকেছেন। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে ১২ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটলেও পাকিস্তান সরকার চরম উপেক্ষা দেখিয়েছিল। এর প্রতিবাদে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে অলি আহাদ জনগণের প্রতি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাক দিয়েছিলেন। একই কারণে ১৯৭০ সালের পাকিস্তানি নির্বাচনও বর্জন করেছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের মার্চে সামরিক শাসক ইয়াহিয়য়া খানের সঙ্গে শেখ মুজিবের সমঝোতা বৈঠকের বিরুদ্ধেও অলি আহাদ সোচ্চার থেকেছেন। সমঝোতা চেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেছেন। বলেছেন, শেখ মুজিবের উচিত স্বাধীনতা ঘোষণা করা এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উচিত জনসংখ্যার অনুপাতে প্রাপ্য সম্পদ পূর্ব পাকিস্তানকে বুঝিয়ে দেয়া। স্বাধীনতার পক্ষে কঠোর অবস্থান নেয়া সত্ত্বেও অলি আহাদ অবশ্য স্বাধীনতা যুদ্ধে ভূমিকা পালনের সুযোগ পাননি। কারণ, আওয়ামী লীগ করতেন না বলে ভারত তাকে সুনজরে দেখেনি। যুদ্ধকালীন নেতারাও তাকে সুযোগ দেয়ার উদারতা দেখাননি। এদিকে স্বাধীনতার পরও অলি আহাদের দেশপ্রেমিক ভূমিকা অব্যাহতই ছিল। ভারতের অবাধ লুণ্ঠনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন তিনি। দেশটির আধিপত্যাবাদী নীতি ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছেন এই দেশপ্রেমিক নেতা। শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-নির্যাতন এবং অগণতন্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদী আন্দোলনে প্রধান একজন নেতার ভূমিকা পালন করেছেন অলি আহাদ। এজন্য তাকে পুলিশের লাঠিপেটা হজম করতে হয়েছে, কারাগারেও যেতে হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রতিকূলতার মুখেই থেমে পড়েননি তিনি। তার এই দেশপ্রেমিক ভূমিকা অব্যাহত ছিল জীবনের শেষদিনগুলো পর্যন্তও।
কিন্তু অমন একজন মহান দেশপ্রেমিক জাতীয় নেতার ইন্তেকালের পর একদিকে আওয়ামী লীগ সরকার চরম হীনমন্যতা ও সংকীর্ণতা দেখিয়েছে, অন্যদিকে সরকারের সেবাদাসরা দেখিয়েছে অসভ্যতা। এসবের পরিপ্রেক্ষিতেই কিছু কথা না বলে পারা যায় না। বাংলাদেশ বুড়িগঙ্গার মত কোনো নদীতে ভাসতে ভাসতে এসে হাজির হয়নি। নৌকাও কোনো একজন মাত্র নেতাই শুধু চালাননি। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে মওলানা ভাসানীরর মত নেতারাও হাল ধরেছেন। বাংলাদেশকে তৈরি করার পেছনে অলি আহাদের মত আরো অনেক নেতারও প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে। সুতরাং যথাযথ সম্মান দেখানো দরকার তাদের প্রতি। যারা মনে করছেন, ইতিহাসকে বন্দী করে রাখা যাবে তাদের জানা উচিত, বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ভিত্তিতে এক সময় সঠিক ইতিহাস অবশ্যই লিখিত হবে। তখন নিশ্চয়ই একজন মাত্র নেতাকেই ‘পূজনীয়’র অবস্থানে রাখা যাবে না। অলি আহাদ তো বটেই, অন্য জাতীয় নেতারাও তখন যথাযথ সম্মান পাবেন। তখন বাচ্চু ও আরেফিন সিদ্দিকের মত সেবাদাসরাই বরং আস্তাকুঁড়েতে নিক্ষিপ্ত হবেন।
