ঢাকা, শুক্রবার, ২১ পৌষ ১৪১৯, ২১ সফর ১৪৩৪, ৪ জানুয়ারি ২০১৩

বিদায় নেয়া বছরের বিভিন্ন দিক নিয়ে সাধারণ একটি পর্যালোচনা করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সব মিলিয়ে এমন এক বিচিত্র অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যখন অল্প কথায় সেটা সম্ভব নয়। আর এর কারণ, মতাসীনদের মুখে ‘মধুর’ নানা বচন শোনা গেলেও কোনো একটি খাতেই আহা মরি ধরনের কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, সাফল্য অর্জন না করা সত্ত্বেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকেই কিন্তু সামান্য লজ্জিত হতে দেখা যাচ্ছে না। সব বিষয়ে তারা বরং আগে আক্রমণের কৌশল নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। আইনের সীমানা পর্যন্ত মানছেন না কেউ কেউ। উদাহরণ দিতে গেলেও যে কাউকে বিপদেই পড়তে হবে। কারণ, কাকে রেখে কার কথা উল্লেখ করবেন আপনি? আদালত পাড়ায় ‘ব্রিফলেস উকিল’ হিসেবে পরিচিত এবং ঘুষ কেলেঙ্কারিতে রেলমন্ত্রীর পদ হারানো দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কথাই ধরা যাক (কোনো মামলায় জিততে পারেন না বলে যে উকিলরা মামলা পান না তাদেরকেই ‘ব্রিফলেস উকিল’ বলা হয়)। কথিত যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পর্কে গত ২২ ডিসেম্বর ১৪ দলীয় জোটের গণমিছিলের সমাবেশে সুরঞ্জিত ঘোষণা করেছেন, আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৩ সালে এই বিচার শেষ হবে এবং মার্চের মধ্যে ১৪ জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। জামায়াতে ইসলামী তো বটেই, বিএনপি ও বেগম খালেদা জিয়াও যে এই বিচার বানচাল করতে পারবেন না এবং ১৪ জনের ফাঁসির রায়ও ঠেকাতে পারবেন না সদম্ভে সে ঘোষণাও মিস্টার সেনগুপ্ত বেশ জোরেশোরেই শুনিয়েছেন।

কথিত যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেয়ার ব্যাপারে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কথাগুলোকে কিছু বিশেষ কারণে গুরুতর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বেছে বেছে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনায় এবং অগ্রহণযোগ্য ও হাস্যকর বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ হাজির করায় প্রথম থেকেই বিচারটি নিয়ে দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় বয়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তো তুলেছেই, একই সাথে ট্রাইব্যুনাল বাতিল করারও দাবি জানিয়েছে। অনেক মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও একই বক্তব্য এসেছে। এখনো আসছে। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনালের পদত্যাগকারী চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের স্কাইপি সংলাপ ফাঁস হয়ে যাওয়ায় কথিত যুদ্ধাপরাধের পুরো বিচার প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। নিন্দিত ওই বিচারপতি পদত্যাগ করে বিদায় নেয়ার ফলে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। দাবি উঠেছে নতুন করে বিচার কার্যক্রম শুরু করার। সে দাবি দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমর্থনও পেয়েছে। এমন এক অবস্থার মধ্যেই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সরাসরি ‘রায়’ ঘোষণা করে বসেছেন! সে ‘রায়’ও আবার যেমন-তেমন নয়। ১৪ জন অভিযুক্তকে ফাঁসিতে ঝোলানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। অথচ বিচারে কারো কারো বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হতে পারে, কেউ কেউ আবার মুক্তিও পেতে পারেন। বড়কথা, বিচারাধীন কোনো বিষয়ে এভাবে ‘রায়’ ঘোষণা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু সব জেনেও মিস্টার সেনগুপ্ত যেহেতু বলেছেন সেহেতু বলার অপো রাখে না, এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতপে সরকারের গোপন পরিকল্পনারই প্রকাশ ঘটেছে। অর্থাৎ বিচারের নামে নাটক সাজিয়ে সরকার জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করতে চায়।

এ সম্পর্কে এরই মধ্যে অনেকে বলেছেন। ট্রাইব্যুনালও মিস্টার সেনগুপ্তের কাছে কৈফিয়ৎ তলব করেছে। সে কারণে বিষয়টি নিয়ে কথা না বাড়ানো ভালো। বছরশেষে এখানে বরং দেশের অর্থনীতির দিকে চোখ ফেরানো যেতে পারে। আর অর্থনীতি সম্পর্কে বলতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে পাশ কাটানো যায় না। তাছাড়া বছরজুড়ে তো বটেই, বছরের শেষপ্রান্তে এসেও তিনি এমন কিছু ‘বচন’ শুনিয়েছেন যার উল্লেখ না করাটা ভারি অন্যায়ও হবে। যেমন গত ২৩ ডিসেম্বর সাংবাদিকদের ঝেড়ে এক হাত নিয়েছেন তিানি। স্বভাবসুলভ অঙ্গভঙ্গি এবং বাংলা ও ইংরেজির সংমিশ্রণে অর্থমন্ত্রী যা বলেছেন সহজ কথায় তার অর্থ হলো, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা অর্থনীতি বিষয়ক রিপোর্টিং করতে জানেন না! সে কারণে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের কাস নেয়ার এবং প্রশিণ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, তারা অর্থাৎ বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা যখন উন্নয়ন-সমৃদ্ধির ব্যাপারে কিছু বলেন তখন নাকি সাংবাদিকরা সেগুলো হয় বিশ্বাস করেন না অথবা বিশ্বাস করলেও রিপোর্টে সঠিকভাবে তুলে ধরেন না। একই সাংবাদিকরা নাকি আবার বিদেশের কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরকে ফলাও করে প্রকাশ করেন। এসব কারণেই জনগণ নাকি সরকারের সাফল্য সম্পর্কে জানতে পারে না! অন্যদিকে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে বিরোধী দল সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এবং আন্দোলন গড়ে তোলে। এ থেকেই অর্থমন্ত্রীর মনে হয়েছে, কারণ আসলে সাংবাদিকদের অযোগ্যতা। এজন্যই সাংবাদিকদের ট্রেনিং দেয়া দরকার এবং সে দায়িত্বটুকুই পালনের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রীর এই আগ্রহকে সাধুবাদ জানানো যায় কি না পাঠকরা তা ভেবে দেখতে পারেন। সাংবাদিকরা কেন সরকারের সাফল্য তুলে ধরার ব্যাপারে কার্পণ্য করেন তার কারণ অন্তত অতি জ্ঞানী অর্থমন্ত্রীর না বোঝার কথা নয়। অর্থমন্ত্রীর এই বুঝতে না পারা এবং সাংবাদিকদের শেখানোর আগ্রহ খুবই কৌতূহলোদ্দীপক সন্দেহ নেই, অন্যদিকে বাস্তব অবস্থা এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছে গেছে, যখন মিস্টার মুহিত চাইলে সাধারণ মানুষের কাছেও তার জিজ্ঞাসার উত্তর জেনে নিতে পারেন। শত বা হাজার কোটি নয়, ল হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেছে শেয়ার বাজার থেকে। ৩৩ লাখ ুদে বিনিয়োগকারী তথা সাধারণ মানুষ তাদের শেষ সঞ্চয়টুকু খুইয়ে পথে বসেছেন। ২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বর এই ধসের শুরু হয়েছিল। সেদিন মাত্র সোয়া ঘণ্টার মধ্যে পতন ঘটেছিল ৫৪৪ পয়েন্টের। তারপর থেকে সূচক শুধু কমেছেই। কমেছেও লাফিয়ে লাফিয়ে। মাস চার-পাঁচেকের মধ্যেই আট হাজার ৯১৮ পয়েন্ট থেকে সূচক নেমে এসেছিল তিন হাজার ৮৮৭ পয়েন্টে, যা ছিল বর্তমান সরকারের আমলে বাজার চাঙ্গা হওয়ার শুরু হওয়ার সময়ে। এভাবে মাত্র ১৪ মাসেই শেয়ারবাজার থেকে তিন লাখ ১৫ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা উধাও হয়ে গিয়েছিল। সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন ৩৩ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারী। তারা রাজপথে নেমে এসেছেন, আন্দোলন করেছেন, আত্মহত্যাও করেছেন কয়েকজন। কিন্তু বাহারী নামের কিছু পদপে নেয়ার বাইরে এমন কোনো ব্যবস্থাই সরকার বা এসইসি নেয়নি যার মাধ্যমে শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। প্রধানমন্ত্রীর ২১ দফা প্রণোদনা প্যাকেজও সুফল প্রসব করতে পারেনি। সরকার এসইসির চেয়ারম্যানসহ কর্মকর্তাদের পরিবর্তন করেছে। কিন্তু সরকার দলীয় লোকজনদের নিয়োগ দেয়ার ফলে পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহতই থেকেছে। যেমন সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ২০১১ সালের ১৫ মে এসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান যেদিন কাজে যোগ দেন সেদিন মূল্য সূচক ছিল পাঁচ হাজার ৭৭৮ পয়েন্ট। অন্যদিকে দেড় বছর পর গত ৬ ডিসেম্বর সে মূল্য সূচক বাড়ার পরিবর্তে নেমে এসেছে চার হাজার ৬৬ পয়েন্টে।

এমন অবস্থার কারণও জানিয়েছেন তথ্যাভিজ্ঞরা। তারা বলেছেন, মন্দাবাজারে উচ্চ প্রিমিয়ামে আইপিও ও রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন, মিউচুয়াল ফান্ডের বিধিমালা পরিবর্তন, পরিচালকদের জন্য দুই শতাংশ হারে শেয়ার কেনার বাধ্যবাধকতা আরোপের মতো এমন কিঙ্কু নেতিবাচক পদপেই এসইসি নিয়েছে যেগুলোর ফলে শেয়ারবাজার আর চাঙ্গা হতে পারেনি। মতাসীনদের প থেকেও নেতিবাচক বক্তব্যই রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বিনিয়োগকারীদের ‘ধান্দাবাজ’ ও ‘কিছু লোক’ বলে তামাশা করে ঝামেলা পাকিয়েছেন। একই অর্থমন্ত্রী খন্দকার ইবরাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করতে দেননি। কেলেঙ্কারির খলনায়কদের নামগুলো ‘ডিলিট’ করতে চেয়েছেন তিনি। এসবের পাশাপাশি ছিল ১৯৯৬ সালের কেলেঙ্কারির অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়েই বুঝতে অসুবিধা হয়নি, আওয়ামী লীগ যেহেতু মতায় এসেছে এবং আগেরবারের কুশীলবরা যেহেতু বিনাবিচারে পার পেয়ে গেছে সেহেতু এবারও ব্যতিক্রম হবে না। ব্যতিক্রম ঘটেও নি। কয়েকগুণ পর্যন্ত মুনাফা দেয়ার তেলেসমাতি ঘটানোর এক পর্যায়ে রাতারাতি হঠাৎ ধস নামানো হয়েছে। নানারকমের দুর্নীতি ও অনিয়মের বৈধতা দেয়ার মাধ্যমে এসইসিও কেলেঙ্কারির নায়কদের পইে ভূমিকা পালন করেছে। ফলে সর্বস্ব খুইয়ে বিনিয়োগকারীরা পথে বসেছেন। এখনও শেয়ারবাজার গভীর খাদেই হাবুডুবু খাচ্ছে।

অন্যদিকে সরকার তো বটেই, এত যোগ্য যে অর্থমন্ত্রী তিনিও কিছুই করেননি। দরকার যখন ছিল সুষ্ঠু কোনো ব্যবস্থা নেয়া অর্থমন্ত্রী তখন বিনিয়োগকারীদের ‘ধান্দাবাজ’ ও ‘কিছু লোক’ বলে তামাশা করায় কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয়নি, লুণ্ঠনের ভাগ ঠিক কোন কোন পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া হয়েছে! বলার অপো রাখে না, মূলত সে কারণেই দেশের শেয়ারবাজার মুখ থুবড়ে পড়েছে এবং আজ পর্যন্তও আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। মাননীয় অর্থমন্ত্রী যদি শেয়ারবাজারের ১২টা বাজানোকেও তাদের ‘সাফল্য’ বলতে চান তাহলে স্বীকার করতেই হবে, এদেশের সাংবাদিকরা আসলেও যোগ্যতা রাখেন না!

হলমার্ক কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে ব্যাংকিং খাতসহ জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থাও কিন্তু অর্থমন্ত্রীর দাবির পে যায় না। কারণ, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিটি েেত্রই সরকারি দল নিজেদের দখল কায়েম করেছে। বেসরকারি ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় ও টিভি চ্যানেল থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ ও জাহাজ নির্মাণ পর্যন্ত এমন কোনো খাতের কথা বলা যাবে না, যেখানে মতাসীনদের বাইরে অন্য কারো পে বিনিয়োগ ও ব্যবসা করা সম্ভব হচ্ছে। এ অবস্থা চলছে আওয়ামী লীগ এবার সরকার গঠন করার পর থেকেই। সংবাদপত্রের রিপোর্টে জানা গেছে, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মতো মহাজোটের শরিক নেতারাও বিভিন্ন খাতে চুটিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন। এই প্রক্রিয়ায় কিছু কিছু খাতে মতাসীনরা একচেটিয়া কর্তৃত্বও প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছেন। যেমন রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ডাকসাঁইটে একজন মন্ত্রীর নাম। এরই মধ্যে তিনি বিদ্যুৎ খাতের ‘মহাজন’ হিসেবে কুখ্যাত হয়ে উঠেছেন। তার পারিবারিক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্র“প একাই হাসিল করেছে ছয়টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকানা। তারা আবার এতটাই মতাশালী যে, চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারলেও ভর্তুকির টাকা আদায় করে নিচ্ছেন কড়ায়-গণ্ডায়। এই মন্ত্রীদের উদর পুর্তির জন্য সরকার একদিকে ৩২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি গুনছে অন্যদিকে ভর্তুকির দোহাই দিয়ে তিন-চার মাস পরপর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে চলেছে। এর ফলে লোডশেডিং-এর দাপটে নুইয়ে পড়া জনগণের নাভিশ্বাস উঠছে। একই অবস্থা চলছে ব্যাংকিং খাতেও। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর থেকে প্রধানমন্ত্রীর ফুফাত ভাইয়ের ছেলে ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস পর্যন্ত মতাসীন দলের মন্ত্রী, এমপি এবং অন্য নেতারা মিলে নয়টি ব্যাংকের লাইসেন্স বাগিয়েছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদও ভাগ বসিয়েছেন। টেলিযোগাযোগ এবং জাহাজ নির্মাণের মতো খাতগুলোতেও মতাসীনদেরই দৌড়ঝাঁপ চলছে। এজন্য তারা আবার প্রতারণার আশ্রয়ও নিচ্ছেন। রাতারাতি খুলে বসছেন নানা কাগুজে কোম্পানি। এসব কোম্পানিকেই লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যখন এমনকি ‘ওপেন সিক্রেট’ ধরনের কথাও আর যথেষ্ট হচ্ছে না। ব্যবসা-বাণিজ্যের খাতগুলোতে মতাসীনরা আসলে ডাকাতিই করে বেড়াচ্ছেন। লুটেপুটে সবকিছু খাচ্ছেনও শুধু তারাই।

লুটপাটের এই একটি বিষয়ে আওয়ামী লীগ সরকার অবশ্য স্বাধীনতার পর প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই পারঙ্গমতা দেখিয়ে এসেছে। পার্থক্য হলো, সেবার নগদ অর্থ, পরিত্যক্ত শিল্প-কারখানা ও জায়গা-জমির পাশাপাশি রিলিফের মালামাল বেশি লুণ্ঠিত হয়েছিল। মাঝখানে অন্য সরকারের প্রচেষ্টায় জাতীয় অর্থনীতির যথেষ্ট বিকাশ ঘটায় বর্তমানে দলটি শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে নজর ফেলেছে। এখানেও উদ্দেশ্য তাদের লুটেপুটে খাওয়াইÑ জাতীয় শিল্প ও পুঁজির বিকাশ ঘটিয়ে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা কিংবা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো নয়। এ উদ্দেশ্যে আইনি-বেআইনি হেন পন্থা ও কৌশল নেই যার অবলম্বন তারা না করছেন। প্রকাশিত রিপোর্টে জনাকয়েকের নাম উল্লেখ করা হলেও বাস্তব েেত্র মতাসীন দলের ুদে নেতা-কর্মীরা পর্যন্ত এই ‘লাভজনক কারবারে’ জড়িয়ে পড়েছেন। বলার অপো রাখে না, এমন অবস্থা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সমর্থন ছাড়া মোটেও সম্ভব নয়। এ সম্পর্কিত প্রমাণও অনেকই রয়েছে। যেমন রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে শুরুতেই ‘ইনডেমনিটি’ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবরাহ করতে পারুক-না পারুক কোনো রেন্টালওয়ালার বিরুদ্ধেই কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। এ যেন সাত খুন মাফের মতো আয়োজন! চমৎকার এ সুযোগের ফাঁক গলিয়েই যথেচ্ছভাবে লুটেপুটে খাচ্ছেন ‘মহাজন’ সাহেবেরা। জনগণের জিহ্বা বেরিয়ে এলেও এবং জাতীয় অর্থনীতির বারোটা বাজি-বাজি করলেও সরকার এসব ‘মহাজন’কে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে উল্টো ঘাড়ে তোলার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। একই কথা অন্য সব খাতের বেলায়ও সমান সত্য। বলা বাহুল্য, এভাবে চলতে দেয়া হলে স্বল্প সময়ের মধ্যে জাতীয় অর্থনীতি একেবারে মুখ থুবড়ে পড়বে। ২০২১ সালে কেন, কোনোদিনই বাংলাদেশ কল্পিত মধ্যম আয়ের দেশ হতে পারবে না। কোনো চিকিৎসাতে কোনো কাজও হবে না!  

মাননীয় অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের শেখাতে চেয়েছেন বলেই এতকিছু বলতে হলো। কথা অবশ্য আরো আছে। যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গলা ফাটিয়ে তারা মতায় এসেছেন, সে দুর্নীতিও কি কমেছে সামান্য পরিমাণে? বিশিষ্ট কারো কারো প্রবাসী স্বজনসহ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থেকে দলের নেতা-কর্মী পর্যন্ত এমন কোনো একজন মতাধরের কথাই উল্লেখ করা যাবে না, ঘুষ না দিয়ে যার কাছ থেকে কোনো কাজ বের করে আনা সম্ভব। অর্থমন্ত্রীও মাঝে-মধ্যে স্বীকার না করে পারেন না যে, ঘুষ-দুর্নীতি প্রতিটি স্তরেই ছড়িয়ে পড়েছে। এভাবে শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে পদ্মাসেতু পর্যন্ত খাত ও নাম ধরে ধরে পর্যালোচনা করলে অর্থমন্ত্রীকে কিন্তু লজ্জায় পড়তে হবে। আমরা মনে করি না যে, লাফিয়ে বেড়ে চলা পণ্যমূল্য, ক’দিন পর পর জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোর পৃথকভাবে উল্লেখ করার প্রয়োজন রয়েছে। বস্তুত অর্থমন্ত্রীর বুঝতে না পারা এবং সমালোচনার জবাবে বরং পাল্টা এমন প্রশ্নই করা দরকার, তাদের সরকার কোন েেত্র ঠিক কোন ধরনের সফলতা অর্জন করেছে, যার জন্য বিরোধিতার পরিবর্তে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে সাংবাদিকদের নৃত্য করতে হবে? সুতরাং কেবলই সমালোচনা করার এবং কাস নেয়ার ও ট্রেনিং দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করার পরিবর্তে অর্থন্ত্রীর উচিত সাংবাদিকদের সততার প্রতি সম্মান দেখানো এবং জাতীয় অর্থনীতির অবশ্যম্ভাবী বিপদ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা। অর্থমন্ত্রী যা কিছুই বোঝাতে চান না কেন, তাদের তথা আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বব্যাপী ব্যর্থতা এবং তিকর নীতি ও দুর্নীতির কারণে দেশের অর্থনীতি অনেক আগেই মারাত্মক ঝুঁকি ও বিপদের মধ্যে পড়েছে। এই ঝুঁকি কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে সাংবাদিকরাই বরং অর্থমন্ত্রীকে ‘জ্ঞান’ না হলেও সঠিক পরামর্শ দিতে পারেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী বলে কথা! এজন্যই মিস্টার মুহিত উল্টো সাংবাদিকদের এমনভাবে তুলোধুনো করেছেন, যাতে সাংবাদিকরা সরকারের সমালোচনা করতে সাহস না পান। মাননীয় অর্থমন্ত্রী নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, এভাবে সঙ্কট পাড়ি দেয়া যায় যায় না। বিশেষ করে অর্থনীতি এমন একটি বিষয় যার সঙ্গে জনগণের বেঁচে থাকার প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। এজন্যই শুধু বচনে যে পেট ভরে নাÑ কথাটার অর্থ মিস্টার মুহিত এবং অন্য মতাসীনরা যতো তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবেন ততোই মঙ্গল। সে মঙ্গল শুধু চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে পড়া জনগণের নয়, মতাসীনদেরও!

অন্যান্য মিডিয়া bdnews24 RTNN Sheersha News barta24 Prothom Alo Daily Nayadiganta Jugantor Samakal Amardesh Kaler Kantho Daily Ittefaq Daily Inqilab Daily Sangram Daily Janakantha Amader Shomoy Bangladesh Pratidin Bhorerkagoj Daily Dinkal Manob Zamin Destiny Sangbad Deshbangla Daily Star New Age New Nation Bangladesh Today Financial Express Independent News Today Shaptahik 2000 Computer Jagat Computer Barta Budhbar Bangladesherkhela Holiday Bangladesh Monitor BBC Bangla Redio Tehran
homeabout usdeveloped by

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ মো. তাসনীম আলম।

মহীউদ্দীন আহমদ কর্তৃক জাতীয় মুদ্রণ ১০৯, ঋষিকেশ দাস রোড, ঢাকা - ১১০০ হতে মুদ্রিত ও ১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা - ১১০০ হতে প্রকাশিত। যোগাযোগের ঠিকানাঃ ৪২৩ এলিফেন্ট রোড, বড় মগবাজার, ঢাকা - ১২১৭। ফোনঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৯০৬৫, বার্তা - ৮৮ ০১৬৭০৮১৩২৭৬, সার্কুলেশন - ৮৮ ০১৫৫২৩৯৮১৯০, বিজ্ঞাপন - ৮৮ ০১১৯৯০৯০০৮৫, ফ্যাক্সঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৫৫৭১, ওয়েবসাইটঃ www.weeklysonarbangla.net, ইমেইলঃ weeklysonarbangla@yahoo.com