ঢাকা, শুক্রবার, ৩ ফাল্গুন ১৪১৯, ৪ রবিউস সানি ১৪৩৪, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

॥ সোনার বাংলা রিপোর্ট॥
কথিত তরুণদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে, দেশের সব সমস্যা ও সঙ্কট থেকে দৃষ্টি সরিয়ে, নিজেদের কৃত পাপকে ধামাচাপা দিয়ে, জনগণকে বোকা বানিয়ে শাহবাগের নাটক সাজিয়ে ক্ষমতায় থাকার ষড়যন্ত্র করছে আওয়ামী লীগ। তাই সরকারি ছত্রছায়ায় রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে চলছে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী পসরা। নামে অরাজনৈতিক আন্দোলন হলেও এটি মূলত ৯৫ ভাগ আওয়ামী ও বামপন্থী রাজনীতি সংগঠনের নেতারাই এর আয়োজক ও নিয়ন্ত্রক। সরকারের পক্ষ হতে সকল প্রকার সাহায্য সহযোগিতায় চলছে কথিত তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের নামে অশ্লীল কার্যক্রম। রাত বাড়ার সাথে সাথে বেড়ে যায় অপরাধ কার্যক্রমও। মদ, গাঁজা হতে শুরু করে নানা জাতীয় পানিয় বিক্রি হচ্ছে অহরহ। তরুণীরা শিকার হচ্ছে শারীরিকসহ নানা ধরনের নির্যাতনের। আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবির আড়ালে রয়েছে ইসলামী রাজনীতি বন্ধের পাঁয়তারার নগ্ন হস্তক্ষেপ। আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হচ্ছে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এ জাতীয় কর্মসূচি আদালত অবমাননার শামিল। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে এ রায়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা জ্ঞাপনের পর আর কোনো বিচার চলতে পারে না। অতিসত্ত্বর এ ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দিয়ে জাতিসংঘের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।

আন্দোলনের নেপথ্যে : গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়ার প্রতিবাদে সন্ধ্যায় রায়ের বিরুদ্ধে ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের ব্যানারে শাহবাগে অবস্থান নেয় কিছু  বাম কর্মী ও সমর্থক। সংগঠনটির সভাপতি ইমরান স্বাধীনতা চিকিৎসা ফোরামের সদস্য। তবে পরে তাদের আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দেয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আ’লীগের কর্মীরা। বাম নেতারা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চলা এ অবস্থানকে অরাজনৈতিক আন্দোলন দাবি করলেও বিভিন্ন বাম সংগঠন ও ছাত্রলীগ নেতারা এর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখছেন। বামদের নেতৃত্বে গত ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় মহাসমাবেশ। মহাসমাবেশে ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, ইবনে সিনা হাসপাতাল, ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, দিগন্ত মিডিয়া লিমিটেড, রেটিনা কোচিং সেন্টার ও ফার্মাসিউটিক্যালসহ জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মালিকানাধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠান দখল বা সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে জাতীয়করণের ডাক দেয়া হয়। এতে করেই বুঝা যাচ্ছে কর্মসূচিটি পুরোপুরি সরকারের লেলিয়ে দেয়া বাহিনী দ্বারা পরিচালিত একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি। এখানে সাধারণ জনগণের কোনো অংশগ্রহণ নেই।

সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা : শাহবাগের আন্দোলনে সরকার সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছে। ওয়াসার পক্ষ থেকে খাবার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ টয়লেট দেয়া হয়েছে আন্দোলনকারীদের জন্য। সরকারের পক্ষ থেকে খাবার সরবরাহ করছেন ন্যাশনাল ব্যাংকের সিকদার সাহেব। শাহবাগে দর্শনার্থী ইউসুফ বলেন, এটি সরকারের মদদে একটি আন্দোলন। তা না হলে কেন রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্টপোষকতা করা হচ্ছে। এখানে খাবার ও পানিয় সব কিছুইতো দেখছি সরকার সরবরাহ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জামাল বলেন, আমাদেরকে এখানে আসতে বাধ্য করা হচ্ছে। কাসে বলে দেয়া হয় শাহবাগে যেতে হবে। না গেলে হলের বড় ভাইয়েরা খোঁজ খবর নেয়।

অপর ছাত্র মতিউর বলেন, শাহবাগে এক রাত থাকলে ৫শ’ টাকা দেয়া হয়। আর খাবার তো আছে ফ্রি। ছাত্ররা এমন সুযোগ হাত ছাড়া করবে কেন? তারা গিয়ে রাত্রে সেখানে থাকে, খায় সকালে টাকা নিয়ে চলে আসে।

রাহমান বিপ্লব নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ইতঃপূর্বে একজনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল আদালত তখন কোনো আন্দোলন হলো না। এখন আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আদালত এমন কয়েকটি অভিযোগে সাজা দিয়েছে যার সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই।

তাছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এখানে আসতে বাধ্য করছেন প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিরা। সিটি কলেজের ছাত্রী নাসরিন আক্তার ও নায়মার সাথে আলাপকালে তারা জানান, তাদেরকে এখানে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। কলেজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে শাহবাগের চত্বরে সব ছাত্রছাত্রীকে বাধ্যতামূলক যেতেই হবে। তারা জানান নোটিশ দিয়ে জানানো হয় এখন আর কাস হবে না। সবাইকে শাহবাগ যেতে হবে এমন নোটিশ পড়ে শুনানো হয় কাসে কাসে। এছাড়াও আওয়ামীপন্থী লেখক-বুদ্ধিজীবীদের ফোনে নগরীর বিভিন্ন শিাপ্রতিষ্ঠানের শিক, শিার্থী সমাবেশে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। কথিত এ সমাবেশে  সপ্তাহ জুড়ে  শিার্থীদের উপস্থিতি বাড়ছে। কাস ড্রপ দিয়ে এভাবে সমাবেশে শিার্থীদের আসতে বাধ্য করায় অনেক অভিভাবক বিরক্তি প্রকাশ করেন। রাজধানীর নূর মোহাম্মদ রাইফেলস কলেজ, মুন্সী আবদুর রব রাইফেলস কলেজ, ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ, বি এম শাহীন কলেজ, ইস্কাটন গার্ডেন গার্লস হাইস্কুল, সেন্ট যোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, প্রভাতি বিদ্যানিকেতন, উইলস লিটল ফাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ ও ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজসহ বিভিন্ন শিাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিার্থীদের শাহবাগে আনা হয়।

যানবাহন চলাচলে বিড়ম্বনা : রাজধানীর মৎস্য ভবনের কাছে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ব্যারিকেড  দেয়া হয়েছে। উত্তর দিকে রূপসি বাংলা হোটেল, পশ্চিমে আজিজ সুপার মার্কেট ও দক্ষিণে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত ব্যাড়িকেড দিয়ে আন্দোলনকারীদের জায়গা দেয়া হয়েছে। এতে করে রাজধানীতে যাতায়াতে চরম যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। রাতে কয়েকটি মোটরসাইকেল নিয়ে যাতায়াতের সময় পুলিশের বাধার মুখে পড়লে একব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাস্তাঘাট বন্ধ করে মানুষের যাতায়াতে বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে। দেশের এ ব্যস্ত স্থানটিকে সপ্তাহ জুড়ে অবরোধ করে রাখা হয়েছে। এটা কেমন কর্মসূচি? তাছাড়া পিজি হাসপাতাল ও বারডেম হাসপাতালে রোগীদের যাতায়াতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ভ্যান দিয়ে এক রোগীকে নিয়ে আসা হলেও তাকে হাসপাতালে যেতে দেয়া হয়নি। ভ্যান থেকে রোগীকে নামিয়ে দেয়া হয়। এসব কারণে ঢাকা মেডিক্যালসহ ৩ টি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসতে পারছে না সাধারণ মানুষ। তাছাড়া মাইকের আওয়াজ রোগীদের বিরক্ত করে তুলছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায় আন্দোলনকারীদের জন্য আগে থেকেই পিজি হাসপাতালে কয়েকটি সিট বরাদ্দ দেয়া হয়। পিজির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন এখানে যে আন্দোলনের নামে লোকজন জড়ো করা হবে তা আমরা বেশ কিছু দিন আগেই জেনেছিলাম। আমাদেরকে আন্দোলনের আয়োজকরা জানিয়েছিল তাদের জন্য হাসপাতালে কয়েকটি সিট বরাদ্দ রাখতে। সে অনুযায়ী আন্দোলনকারীদের জন্য বিশেষভাবে সিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার নূরুল ইসলাম জানান, জনসমাগম কম থাকায় যান চলাচলের সুবিধার কথা ভেবে সকাল থেকে মাঝে মধ্যে সড়কের ওই অংশ খুলে দেয়া হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেই এটা করা হয়েছে।

মদ-গাঁজার আসর : শাহবাগ চত্বরের পূর্ব দিকে ফুলের দোকানগুলোর সামনে চলে গাঁজা সেবনের প্রতিযোগিতা। রাত বাড়ার সাথে সাথে বেচাকেনাও বেড়ে যায় দ্রুতগতিতে। গাঁজার দুর্গদ্ধে এলাকাটিতে হাটাহাটিও সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি শিশু নিয়ে ফুল কিনতে আসা মহিলা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের তরুণ সমাজ এতটা নিচে নেমে গেছে তা ভাবতেই অবাক হয়ে যাচ্ছি। এদের কি মা-বাপ নেই? অপর এক প্রবীণ ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন পড়ালেখা করতে আসা ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে এ সমাজ কি পাবে আমার বুঝে আসছে না।

নারী নির্যাতন : ১০ ফেব্রুয়ারি মূল মঞ্চের পূর্ব দিকে তিনজন তরুণী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। এতে করে সেখানে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তিনজন তরুণীই স্বীকার করে তাদের গায়ে হাত দিয়ে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। অবস্থা বেগতিক দেখে কয়েকজন ব্যক্তি তাদেরকে সেখান থেকে কোনোক্রমে বের হয়ে যেতে সহযোগিতা করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একব্যক্তি বলেন, এ আন্দোলন তরুণদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। রাত বাড়ার সাথে সাথে এখানে অপরাধ কার্যক্রম বেড়ে যায়। অনেক তরুণ-তরুণী পাশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে আপত্তিজনক কাজে জড়িয়ে পড়ে। তাদের এসব বিষয়-আসয়ের খবর দেশী-বিদেশী মিডিয়া কেন প্রকাশ করে না তা আমরা বুঝি না।

রাজনীতিবিদদের অংশ গ্রহণ: ১০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে শাহবাগের আন্দোলনরত তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, বিচারের রায় দেবে ট্রাইব্যুনাল। আইন দেখেই তারা চলবে। তারপরও তাদের অনুরোধ করব মানুষের আকাক্সা যেন তারা বিবেচনায় নেন। দেশের মানুষ কী চায় সেটা বিবেচনায় নিতে এই মহান সংসদ থেকে তাদের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি পড়াশোনাসহ অন্য কাজ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একটা সময় নির্দিষ্ট করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তরুণ-তরুণীদের।

 প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর আর ট্রাইব্যুনাল চলতে পারে না। কারণ এখন আর ট্রাইব্যুনালের রায় দেয়ার কোনো ক্ষমতা থাকলো না। এ আদালত ভেঙ্গে দিতে হবে। জাতিসংঘের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সেখানে বিচার করতে হবে। 

এ ছাড়াও শাহবাগের আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা.দীপু মনি, বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড.হাছান মাহমুদ, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী সাহারা খাতুন, তোফায়েল আহমদ, রাশেদ খান মেনন, ইসরাফিল আলম এমপি, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি মুনতাসির মামুন, শামিম খান, ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিনী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ সাকিব বাদশা, ছাত্রলীগ সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ, সেক্রেটারি সিদ্দিকী নাজমুল আলম, নুহ-উল আলম লেলিন, র আ ম ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরী ও মাহবুব-উল আলম হানিফ।

১৪ দলের শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, সিপিবি-বাসদের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি ও সংগঠনের উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খান, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ, রুহিন হোসেন প্রিন্স, শ্রমিক নেতা জলি তালুকদার, বাসদ নেতা ফজলুর রশিদ ফিরোজ, শাবিপ্রবির শিক ড.জাফর ইকবাল, জাবির ভিসি অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, ঢাবির ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত প্রমুখ।

বিশিষ্ট আইনজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্য : বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বর্তমান যে অবস্থা তাতে বিচার বিভাগ ধ্বংস হতে চলেছে। আজকে রাস্তায় স্লোগান দেয়া হচ্ছে বিচারক কি রায় দেবেন। একটি বিশেষ গোষ্ঠী বলছে যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই। এ বিচার আমিও চাই। কিন্তু বিচার যদি স্বচ্ছ আর আন্তর্জাতিক মানের না হয় তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। আমরা প্রথমেই বলেছি এ ট্রাইব্যুনাল স্বচ্ছ নয়, নিরপে নয়। আজকে শাহবাগের তরুণ সমাজ ফাঁসির যে দাবি করছেন তা সঠিক নয়। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ জানে এ ট্রাইব্যুনাল স্বচ্ছ নয়।

প্রফেসর ড. এমাজ উদ্দীন আহমেদ বলেন, কদিন ধরে শাহবাগে যে নাটকীয়তা চলছে সেটা স্বতঃস্ফূর্ত বলে মনে হয় না। এটি ম্যানেজড এবং অরগানাইজড বলেই মনে হয়।

প্রফেসর ড.তারেক শামসুর রহমান বলেন, শাহবাগের বিষয়ে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। একটা মামলায় রায় হয়েছে। এটার একটা আপিল হতে পারে। কিন্তু এভাবে হাজার হাজার মানুষ নিয়ে রায় পরিবর্তন করতে বলা কি আদালত অবমাননা নয়?

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আসম হান্নান শাহ বলেন, দেশবাসীকে বোকা বানাতে শাহবাগে আন্দোলনের নামে নাটক করা হচ্ছে। এ আন্দোলনের প্রতি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নেই। সরকারের সকল প্রকার সহযোগিতায় রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি করতে আন্দোলন হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধের নামে ভাওতাবাজির বিচার হচ্ছে।

এডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া আদালত অবমাননার শামিল। শাহবাগে আদালত ও ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়া হচ্ছে। এটি কখনো আইনসিদ্ধ হতে পারে না। তাছাড়া এক ব্যক্তি বলেছেন কাদের মোল্লাকে ফাঁসি না দিলে সে মোল্লাকে হত্যা করে দুই মাস জেলখানায় থাকবে। এ কথা বলে সে নিজেকে খুনি সাব্যস্ত করছে। নিজ হাতে আইন তুলে নিতে উৎসাহ যোগাচ্ছে।

শাহবাগের আন্দোলন প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. পিয়াস করীম বলেছেন, অনেক সময় দেখা গেছে একটা জনপ্রিয় আন্দোলন থেকেও ফ্যাসিবাদের উত্থান হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ বলেন, কথিত তরুণদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে, দেশের সব সমস্যা ও সঙ্কট থেকে দৃষ্টি সরিয়ে, নিজেদের কৃত অপরাধ ধামাচাপা দিয়ে, জনগণকে বোকা বানিয়ে শাহবাগের নাটক সাজিয়ে ক্ষমতায় থাকার ষড়যন্ত্র করছে আ.লীগ। আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবি নিয়ে সরকারের অনুগত দু’একটি বাম দল এই শাহবাগ মোড়ে পসরা বসিয়েছে। তাদের গান-বাজনা, বক্তৃতা-বিবৃতির পথ ধরে মাঠে নামানো হলো ছাত্রলীগ, যুবলীগ আর কিছু তরুণ ব্লগার। এরাও আওয়ামী লীগের অন্য ধরনের ক্যাডার। তারা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দিতে আদালতকে বাধ্য করার জন্য জড়ো হয়েছে। এখানকার ৯৫ ভাগই আওয়ামী লীগের লোক। সবার একটাই ‘স্বপ্ন’ শাহবাগ স্কোয়ারকে ‘তাহরির স্কোয়ার’ বানাবেন। এই জনসমাগমকে জনসমুদ্র বানানোর কাজটিও অবশ্য সরকারই করে দিয়েছে। তাহরির স্কোয়ারে মহাসমাবেশ হয়েছিল স্বৈরতন্ত্র, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে এবং জুলুম-নির্যাতন, হত্যা, গুম, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে। কিন্তু আমাদের শাহবাগের দাবিতে সেসব কিছু নেই। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড, গুম, ধর্ষণ, সীমান্ত- হত্যাকাণ্ড, টিপাইমুখ বাঁধ, ফারাক্কা বাঁধ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, বিধ্বস্ত বিচার ব্যবস্থা, মরণোন্মুখ শিক্ষাঙ্গন এখানকার এজেন্ডায় ঠাঁই পায়নি। তারা মূলত কমিউনিস্ট ও আ’লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।

এখন প্রশ্ন হলো দেশের রাজনৈতিক অবস্থা কোন দিকে মোড় নেবে কোনো কিছুই স্পস্টভাবে বোঝা যাচ্ছে না। দেশবাসী উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত। স্পষ্টত অনুধাবন করা যাচ্ছে যে, বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আওয়ামী সরকার মানবে না। তারা দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন দেবে এবং যেনতেনভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকবে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, শাহবাগের এই সমাগমের শুরু করেছিল মার্কিন সরকার। কিন্তু অবস্থাভেদে তা চলে যায় ভারত সরকারের হাতে। মার্কিন সরকার নিজের অবস্থান দৃঢ় করার জন্য কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি। সম্ভবত তারা শুরুটা করে দিতে চেয়েছিল। কারণ তারা ভালো করে জানে বাংলাদেশের কালচার হলো, ভিড়ের মাঝে চোর বলে একজনকে থাপ্পড় দিলেই আশপাশের সবাই কোনোকিছু না বুঝেই বা ঘটনার সত্যতা উৎঘাটন না করেই কথিত চোরকে বেদম প্রহার শুরু করবে। গত ১০ দিনে শাহবাগ মোড়ে যা ঘটেছে তা যদি গভীরভাবে মূল্যায়ন করা হয় তাহলে দেখা যাবে ভারত সরকারের ইঙ্গিতে বা ইচ্ছানুযায়ী এখানকার সবকিছু ঘটছে। শুরুটা হয়েছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে। এখন তা চলে গেছে আদর্শগত সংঘাতের মধ্যে। দেশের সকল ইসলামী সংঘটন, প্রতিষ্ঠান, আন্দোলন সবকিছু নির্মূল বা ধ্বংসের বিরুদ্ধে সোচ্চার আওয়াজ তোলা হচ্ছে। বিষয়টি ঠেলে দেয়া হচ্ছে সেক্যুলারিজম বনাম ইসলামের মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে ইসলামকে এ দেশ থেকে নির্মূল বা নির্বাসন করার আওয়াজ উচ্চকিত করা হচ্ছে। সম্ভবত আমেরিকানরা চাচ্ছে এখানে একটা সংঘাতের সৃষ্টি হোক। তখন তারা জাতিসংঘকে বলতে পারবে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে জাতিগত সংঘাত নিরসন করার জন্য জাতিসংঘ যেমন উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে সেই ধরনের একটা বাস্তব উদ্যোগ যেন জাতিসংঘ গ্রহণ করে। এই মনোভাব তারা গ্রহণ করেছে অনেকটা ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে। কারণ গত প্রায় ৪ বছর ধরেই আমেরিকানরা বলেছে জামায়াতে ইসলামী যেন আন্ডারগ্রাউন্ডে না যায়। গেলে দেশের পরিস্থিতি আরো অবনতি হবে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কোনো অবস্থাতেই শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করতে রাজি হচ্ছে না। তারা বরং পরোক্ষভাবে এ কথা জানিয়েছে যে, জাতিসংঘের ‘পিচ-কোর’ যদি বাংলাদেশের শান্তি রক্ষার কাজে নিয়োজিত হয়, তাহলে তাদের অংশ হিসেবে তারাও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ করতে পারে। সবাই জানে, মার্কিনিরা এই সরকারের ওপর ভয়ানক ক্ষুব্ধ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ধারাবাহিকভাবে মার্কিনিদের ক্ষুব্ধ করেছেন। অনেকেই তখন বুঝতে পারছিলেন না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর শক্তির উৎস কোথায়? এখন তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। ভারতই তার শক্তির একমাত্র উৎস। কারণ ভারতের ইচ্ছানুযায়ী তিনি দেশ চালানোর অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ দেশে মার্কিনিদের বিরাট স্বার্থ রয়েছে। শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, আমাদের সমুদ্রসীমা, আমাদের তেল-গ্যাস এবং ভারত ও চীনের আধিপত্য এসব তার বিবেচনার বিষয়। বাংলাদেশ, ভারতের ‘করদ রাষ্ট্র’ বা ‘ইচ্ছা-রাষ্ট্র’ হোক এটা মার্কিনিরা চায় না। তারা চায় ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলংকা-বাংলাদেশ-মায়ানমার তাদের অধীনস্থ বা ইচ্ছা-রাষ্ট্র থাকুক। তাতে তার আঞ্চলিক প্রভুত্ব অটুট থাকবে। এ কারণেই মার্কিনিরা চায় না আগামীতেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থাক।

১/১১ এর সময় আমরা লক্ষ্য করেছি, জাতিসংঘের একটি চিঠির বরাদ দিয়ে এখানে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছিল এবং সেনাপ্রধান সমর্থিত সরকার কায়েম করা হয়েছিল। সেটা ছিল একটা রিহার্সাল। শোনা যায়, এবার সত্যি-সত্যিই জাতিসংঘের চিঠি আসবে। ইতোমধ্যেই জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক বিচার ট্রাইব্যুনালের বিষয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে তা প্রকাশিতও হয়েছে। পরবর্তী এক বা দুই চিঠির মাধ্যমেই জাতিসংঘ বলতে যাচ্ছে যে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে জাতিগত সংঘাতের মতো বাংলাদেশে আদর্শগত সংঘাতও দুর্বার হয়ে উঠেছে। সরকার শান্তি ও স্বস্তি স্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ ছাড়া নাগরিকের জান-মাল-ইজ্জত সংরক্ষণ করা বা মানবাধিকার সংরক্ষণ করা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। সে কারণে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা যায়, জাতিসংঘের সদরদফতর এ বিষয়ে তৎপর রয়েছে।

সরকার যদি দেশে শান্তি ও স্বস্তি স্থাপনে ব্যর্থ হয় তাহলে দেশ এক অনিশ্চিত অবস্থার দিকে চলে যাবে। আমরা আন্তর্জাতিক ক্রীড়ানকে পরিণত হব। এখনও সময় আছে, সুবিচার, ন্যায়পরায়ণতা ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গীতে যদি বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয় এবং সরকার যদি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচনের পথ খুলে দেয় তাহলে দেশবাসীর উৎকণ্ঠা নিরসন হবে এবং একটি স্বস্তিময় পরিবেশ তৈরি হবে। নচেত দেশবাসী একটি অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে হাবুডুবু খাবে। দেশ চলে যাবে অনেক পেছনে।

অন্যান্য মিডিয়া bdnews24 RTNN Sheersha News barta24 Prothom Alo Daily Nayadiganta Jugantor Samakal Amardesh Kaler Kantho Daily Ittefaq Daily Inqilab Daily Sangram Daily Janakantha Amader Shomoy Bangladesh Pratidin Bhorerkagoj Daily Dinkal Manob Zamin Destiny Sangbad Deshbangla Daily Star New Age New Nation Bangladesh Today Financial Express Independent News Today Shaptahik 2000 Computer Jagat Computer Barta Budhbar Bangladesherkhela Holiday Bangladesh Monitor BBC Bangla Redio Tehran
homeabout usdeveloped by

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ মো. তাসনীম আলম।

মহীউদ্দীন আহমদ কর্তৃক জাতীয় মুদ্রণ ১০৯, ঋষিকেশ দাস রোড, ঢাকা - ১১০০ হতে মুদ্রিত ও ১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা - ১১০০ হতে প্রকাশিত। যোগাযোগের ঠিকানাঃ ৪২৩ এলিফেন্ট রোড, বড় মগবাজার, ঢাকা - ১২১৭। ফোনঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৯০৬৫, বার্তা - ৮৮ ০১৬৭০৮১৩২৭৬, সার্কুলেশন - ৮৮ ০১৫৫২৩৯৮১৯০, বিজ্ঞাপন - ৮৮ ০১১৯৯০৯০০৮৫, ফ্যাক্সঃ ৮৮ ০২ ৮৩১৫৫৭১, ওয়েবসাইটঃ www.weeklysonarbangla.net, ইমেইলঃ weeklysonarbangla@yahoo.com